Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মাসুদুজ্জামান / ছোট কাগজের বড় ভূমিকা > সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের সাহিত্য

মাসুদুজ্জামান / ছোট কাগজের বড় ভূমিকা > সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের সাহিত্য

প্রকাশঃ March 17, 2017

মাসুদুজ্জামান / ছোট কাগজের বড় ভূমিকা >  সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের সাহিত্য
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : প্রিয় পাঠক, এই মুহূর্তে যশোরে চলছে পঞ্চম জাতীয়  লিটিল ম্যাগাজিন মেলা। লিটিল ম্যাগ যে সাহিত্যের প্রাণ, সেকথা আমরা সবাই জানি। যশোরের লিটিল ম্যাগ মেলার পটভূমিতেই বাংলাদেশে লিটিল ম্যাগের ভূমিকা নিয়ে নিচের লেখাটি তীরন্দাজে প্রকাশ করা হল। আয়োজকদের অভিনন্দন, যশোর লিটিল ম্যাগ মেলা সফল হোক, এই প্রত্যাশা।]

কাকে বলবো লিটিল ম্যাগাজিন?

সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জনজীবনকে ঘনিষ্ঠভাবে জানার সুযোগ করে দেয় লিটিল ম্যাগাজিন। সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা উপলক্ষে এরকম একটা কথাই বলেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। লেখক শিবির থেকে প্রকাশিত তৃণমূলের ঘোষণায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ওই পত্রিকায় এমন ধরনের লেখাই প্রকাশিত হবে, যেখানে লেখকের নিজের পর্যবেক্ষণ ও মৌলিক ভাবনা প্রতিফলিত হওয়া দরকার। লিটিল ম্যাগাজিনের গুরুত্ব মূলত এইখানেই। লিটিল ম্যাগাজিনের হাত ধরেই সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটেছে আধুনিকতার। উত্তরাধুনিকতার চর্চাও চলছে লিটিল ম্যাগাজিনকে ঘিরে। প্রগতিশীল চিন্তারও আবির্ভাব ঘটেছিল লিটিল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে। লিটিল ম্যাগাজিনই তৈরি করে দেয় সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি। সাহিত্যে যত ধরনের আন্দোলন হয়েছে, যে-আন্দোলনকে বলা যায় সাহিত্যেরই প্রাণশক্তি, নতুন নতুন ভাবনা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাহিত্য এভাবে যে এগিয়ে চলে, নবাায়িত হয়ে ওঠে, লিটিল ম্যাগাজিনই সেই আন্দোলনে পুরোধা ভূমিকা পালন করেছে।

নামে লিটিল কাজে বড়

লিটিল ম্যাগাজিন – নামেই আছে আছে একধরনের অভিনবত্ব। এর বঙ্গীকরণ করলে দাঁড়ায় ছোট কাগজ। কিন্তু কোন অর্থে এটি লিটিল বা ছোট? আকারের দিক থেকে নাকি অন্তর্গত চারিত্র্যে? আদৌ কি একে ছোটো বলে চিহ্নিত করা সমীচীন হবে? আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথার সূত্র ধরে যদি বলি তাহলে এই ধরনের পত্রিকাই তো সিরিয়াস পত্রিকা যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তার মতো অসাধারণ এক ঔপন্যাসিক। লিটিল ম্যাগাজিনের সমধর্মী পত্রিকাকে বলা হয়েছে সাহিত্য পত্রিকা। ‘সৃষ্টিশীল এবং কল্পনাপ্রবণ সাহিত্যের বাহক’কেই সাহিত্যপত্র বলে উল্লেখ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, ‘কবিতা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যার সম্পাদক-খ্যাতি। এই উক্তিটিতে অভিনব কিছু বলা হয়নি, কেননা সাহিত্যমাত্রেই সৃষ্টিশীলতা আর কল্পনার বাহন। তবে বুদ্ধদেব এর পর সাহিত্য পত্রিকার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেই ব্যাখ্যা আসলে লিটিল ম্যাগাজিনেরই ব্যাখ্যা। তিনি ভেবেছিলেন, সাহিত্যপত্রের ক্ষেত্রে থাকে না কোনো রুচির বাধ্যবাধকতা, থাকে না কোনো সংঘ বা প্রতিষ্ঠানের বিধিনিষেধ। পাণ্ডিত্য বা বিশেষ কোনো বৌদ্ধিক ভাবনার দাস নন লেখক, লেখকের দায়বদ্ধতা তার নিজের কাছে, নিজের রুচির কাছে। তিনি মনে করতেন সাহিত্য যেহেতু ‘সৃষ্টিকর্ম’, ফলে তার আহ্বান অবারিত, তীর্থক্ষেত্রের মতো। এইধরনের পত্রিকার লক্ষ্য নয় কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ফিচারের ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ দিয়ে পাঠকের মনোরঞ্জন করা। কারো ‘মন জোগানো’ নয়, ‘মন জাগানোর’ দিকেই এই পত্রিকার নজর থাকে। চাইলেই চট করে এই পত্রিকা হাতের কাছে পাওয়া যায় না। এই পত্রিকা ভরা থাকে সীমিত সংখ্যক সুনির্বাচিত রচনায়। এর পাঠকেরাও রুচিশীল, রেলস্টেশনে বা ফুটপাথে ভরা সহজলোভ্য লেখা পড়তে তারা অভ্যস্ত নন। আয়তনে যা-ই হোক, রুচির দিক থেকে এই পত্রিকার বিশেষত্ব আছে। কোনো ব্যবসায়িক বুদ্ধি, বাইরের কোনো ‘প্রেরণা’, ‘পরামর্শ’ বা ‘মন্ত্রণা’ এখানে কাজ করে না, বরং অন্তঃপ্রেরণাই এই ধরনের পত্রিকার মূল শক্তি। এই প্রেরণা অন্তনির্হিত থাকে বিশেষ কোনো এক ব্যক্তির মধ্যে; যার আছে আর্থিক অপব্যয়ের ধৈর্য, শক্তি আর মনোভাব। শুধুমাত্র সাহিত্যঅন্তপ্রাণ ব্যক্তির সাহিত্যসেবার জন্যই এই পত্রিকা টিকে থাকে। এদের আয়ুষ্কাল সীমিত, স্বল্প সময়ের জন্য আবির্ভূত হয়ে অসামান্য কিছু কাজ করে অন্তর্হিত হয়ে যায়। সাহিত্যপত্র বা লিটিল ম্যাগাজিন সম্পর্কে এই ছিল বুদ্ধদেব বসুর ধারণা।

লিটিল ম্যাগ সাহিত্যের সমান বয়সী

লিটিল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব আধুনিক সাহিত্যের সমান বয়সী, এরকম বললেও তাই চমকে যাওয়ার কিছু নেই। শুরুটা ঘটেছিল সেই পশ্চিমে ১৮৪০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে দি ডায়াল পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। সম্পাদক ছিলেন মার্গারেট ফুলার। এর লেখকেরাও ছিলেন বেশ উল্লেখযোগ্য – এজরা পাউন্ড, টিএস এলিয়ট, ম্যারিয়েন মুর, বাট্রান্ড রাসেল, কার্ল স্যান্ডবার্গ, ডি এইচ লরেন্স, ডব্লিউ বি য়েট্স, টমাস মানের মতো সমীহ জাগানিয়া লেখক। এরাই লিখতে লিখতে একসময় এক-এক জন তারকা হয়ে ওঠেন। এদেরই আধুনিক, আভাঁগার্দধর্মী নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষামুলক লেখা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।

আঁভাগার্দ কবি ও আধুনিকতার ‘শিক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন এজরা পাউন্ড। ১৯১৪ সালে ডোরা মারসডেনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘ফ্রি ওমেন’ পত্রিকাটি যখন ‘দি ইগোইস্ট’ নামে প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন এজরা পাউন্ডের প্রভাবে সেটি সাহিত্য পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই পত্রিকাতে সেই সময় প্রকাশিত হয়েছিল বেশকিছু নিরীক্ষাধর্মী লেখা। জেমস জয়েসের ইউলিসিসের একটা অংশ এখানেই প্রকাশিত হয়েছিল এবং অচিরেই পত্রিকাটি কবিতাশরীরের সেই সংহতির ভাবনা, অর্থাৎ ইমেজিজম আন্দোলনের মুখপত্র হয়ে ওঠে। টিএস এলিয়ট কিছুদিন এটি সম্পদনা করেছিলেন আর তার সেই ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিক প্রতিভা’ শীর্ষক বিখ্যাত প্রবন্ধটিও এতে প্রকাশিত হয়েছিল। স্বল্পায়ু হওয়া সত্ত্বেও এখনও মনে করা হয় লন্ডন থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাটিই ছিল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিকতাবাদী পত্রিকা।

টিএস এলিয়টের খ্যাতি মূলত আধুনিক শীর্ষ কবি হিসেবে। কিন্তু তিনিও নান্দনিক গরজে আধুনিকতার চরিত্রকে ধরিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে এরপর সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন দি ক্রাইটেরিয়ন নামের একটা পত্রিকা। তবে এইসময় যে পত্রিকাটি পাঠকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল সেটি হচ্ছে হ্যারিয়েট ম্যুর সম্পাদিত পোয়েট্রি। এই পত্রিকার প্রভাব এতটাই দূরসঞ্চারী হয়েছিল যে এখনও এর প্রকাশনা অব্যাহত আছে।

নিজেদের কথা বলা আর সৃজনী আত্মপ্রকাশের প্রয়োজনে বাংলা ভাষাতেও আধুনিক কালে অসংখ্য পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর অনেকগুলোই, আজকে আমরা যাকে লিটিল ম্যাগাজিন বলে চিহ্নিত করি, সেই ধরনের পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উনিশ শতকে প্রকাশিত সাধনা, ভারতী, সাহিত্য এবং বিশশতকের প্রথম দিকে প্রকাশিত প্রবাসী, সবুজপত্র বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু তখনও বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ঢেউ জাগেনি, এর পালে লাগেনি ইউরো-মার্কিন আধুনিকতার মন্দ-মধুর হাওয়া। তিরিশের কবিদের আবির্ভাব যখন আসন্ন ঠিক সেই সময়েই বিশশতকের তৃতীয় দশকে প্রকাশিত হলো কল্লোল, শনিবারের চিঠি, কালি ও কলম এবং প্রগতি। চতুর্থ দশকে এসে প্রথমে পরিচয় এবং পরে কবিতা পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিকতা যে পূর্ণতা পেল তা নিয়ে আমরা নিঃসন্দেহে তর্ক জুড়ে দিতে পারি – কী ছিল সেই আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য? কতটা প্রাচ্যপ্রভাবিত, কতটা প্রতীচ্যঘেঁষা? কিন্তু এর প্রভাব এখনও এড়াতে পারিনি আমরা। এড়ানো হয়তো আর সম্ভবও নয়।

বাংলা সাহিত্যে লিটিল ম্যাগের আবির্ভাব

পোয়েট্রি থেকেই কবিতা প্রকাশের ভাবনা ভর করেছিল বুদ্ধদেব বসুর মনে, একথা নিজেই জানিয়েছেন তিনি, “আমি কখনো কখনো এমন পত্রিকার স্বপ্ন দেখতাম যেটা শুধ্ইু কবিতার জন্য। নিছক স্বপ্ন – বন্ধুদের কাছেও উচ্চার্য নয়।” এরকম একটা দুঃসাহসিক ভাবনা থেকেই কবিতা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক বুদ্ধদেব বসু। কবিতাকে এর আগে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেখানে শুধু পাদপূরণের কাজে ব্যবহার করা হতো, বুদ্ধদেব সেখানে কবিতাময় একটা পূর্ণাঙ্গ পত্রিকা প্রকাশ করলেন। বাংলা কবিতা আর কবিরা ‘পদপ্রান্তিকের অবমাননা’ থেকে বেঁচে গেলেন। বাংলা ভাষায় এভাবেই ১৯৩৫ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রথম প্রভাবশালী লিটিল ম্যাগাজিন ‘কবিতা’ পত্রিকার। জীবনানন্দের যে অপ্রতিম প্রভাব কবিতা পাঠকদের মাঝে পরবর্তীকালে আমরা ছড়িয়ে পড়তে দেখি, তাও ঘটেছিল ‘কবিতা’ আর বুদ্ধদেব বসুর সমালোচনামূলক রচনার পৃষ্ঠপোষকতায়। কবিতা এভাবেই অর্জন করেছিল সম্পাদকদের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি, উঁচু আসন আর অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত চতুরঙ্গ, পূর্বাশা প্রভৃতি নতুন অভিজাত পাঁচমিশালী পত্রিকায় কবিতা বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে ছাপা হতে শুরু করলো। গদ্যে বঙ্গদর্শন ও সবুজপত্রের মতো আধুনিক কবিতায় ‘কবিতা’র অবদান তাই অনস্বীকার্য। লিটিল ম্যাগাজিনের আদলেই এই পত্রিকাটিকে প্রকাশ করে গেছেন বুদ্ধদেব বসু – আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান পুরুষ। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যকেও যে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতে হয়, পাঠ করতে হয়, সেই শিক্ষা বাঙালিরা প্রথম পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। পরবর্তী কালে কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে বুদ্ধদেব দিয়েছেন এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠা। বাংলা সাহিত্যে আজও তাই কখনও কখনও ক্ষীণ হয়ে এলেও লিটিল ম্যাগাজিনের প্রভাব ক্ষুণœ হয়নি। ‘পরিচয়’ পত্রিকার প্রভাবও তো এড়িয়ে যাবার নয়। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল এর সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সেই অবিস্মরণীয় প্রবন্ধ ‘কাব্যের মুক্তি’। পরে এই পত্রিকাই হয়ে উঠেছিল মার্কসীয় প্রগতিবাদীদের মুখপত্র।

কৃত্তিবাস থেকে কাব্য-আন্দোলন

পুরনোকে অগ্রাহ্য করে নতুনের জয়ধ্বজা উড়িয়ে দেবার মধ্যেই নতুন কবি-লেখকের আত্মপ্রতিষ্ঠার আর্তিটুকু ভরা থাকে। বাংলা সাহিত্যে পঞ্চাশের দশকে আরেকবার যখন এই আত্মপ্রকাশের প্রয়োজন দেখা দিল নতুন কিছু কবির, তখনই তারা প্রকাশ করলেন ‘শতভিষা’ ও ‘কৃত্তিবাস’। ‘নিজেকে নিয়েই কবিতা’, এরকম একটা ঘোষণা দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘কৃত্তিবাস’। ‘কৃত্তিবাসে’র কবিদের দ্বারাই বাংলা কবিতায় আবির্ভাব ঘটলো আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার। শতভিষা গুরুত্ব দিল মননপ্রবণ ‘দার্ঢ্য’ কবিতার প্রতি। কৃত্তিবাস এমন একটা কাব্য-আন্দোলন গড়ে তুললো যে-আন্দোলনের মর্মকথা ছিল নিজেকে অকৃত্রিমভাবে প্রকাশ করে যাওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় এর পর আবির্ভাব ঘটে ‘ক্ষুধার্ত’ কবিসমাজের। কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের এই কলরোল বেশিদিন পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী লেখকদের আকর্ষণ করতে পারেনি। সত্তরে তাই উদ্ভব হলো নতুন এক পরিস্থিতির।

লিটিলম্যাগ যে সাহিত্যের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার একটা বিবরণ পাওয়া যায় কলকাতার সত্তরের কবি মৃদুল দাশগুপ্তের ‘আমরা দেখেছি যারা…’ শীর্ষক একটা লেখায়। বাংলা কবিতা সত্তরের দশকে, মৃদুলের ভাষ্য অনুসারে, নানা চিহ্নে ‘বহুধা ও বর্ণময় হয়ে ওঠে।’ পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম-গঞ্জ আর জেলা শহর থেকে ‘ছোট পত্রিকা’র মাধ্যমে সাহিত্যের ‘কেন্দ্র’ কলকাতা উঠে আসেন বা অবস্থান করে নেন অসংখ্য প্রতিভাবান কবি, কথাসাহিত্যিক। এভাবেই খর্ব হয় কলকাতার লেখকদের একাধিপত্য। শুরুতে এই কবি ও লেখকেরা পাননি ‘কবিতা ভবন’ অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসুর মতো কোনো অভিভাবককে। তারা দেখেননি কৃত্তিবাস পত্রিকাটিকে। ফলে এই লেখকেরা সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে ছিলেন ‘ফুল্ল, স্বাধীন, বাঁধন-হারা।’ মৃদুলের কথায়, “বাংলার যতো সব ছোট ছোট প্রেস, ভাঙা হরফ, ক্ষয়া হরফ সব আমাদের, সব আমাদের। সেসব পত্র পত্রিকায় আমরা কেবল আমাদেরই লেখাপত্তর প্রকাশ করতাম।” কবিতা, কৃত্তিবাস, শতভিষাকে ঘিরে যেভাবে কবিগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল, সেরকম কোনো নিজস্ব কবিগোষ্ঠীও তাদের ছিল না। কিন্তু প্রকাশিত সব পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি একক কবিসঙ্ঘ বা লেখকসঙ্ঘ, “সহস্র পত্র পত্রিকায় সেদিন আমরা ছিলাম যে যার মতো ধনুর্ধর, গুলতিধারী। এসব ছোট পত্রিকায় আলাদা আলাদা নিজস্ব কোনও গোষ্ঠী ছিলো না। গোষ্ঠীনেতা বা তার পার্ষদ হিসেবে পরিচিতি পেতে হয়নি সত্তরের কবিদের কাউকেই। সঙ্ঘ শিবির চুরমার করে আশ্চর্য সব যোগাযোগ পুরুলিয়া থেকে কুচবিহার, মেদিনিপুর থেকে শিলচরে হাওয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের বন্ধুত্ব।” কবিতা ও কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে এটাই ছিল সত্তর দশকে প্রকাশিত ছোট পত্রিকা বা লিটিলম্যাগের চরিত্রগত পার্থক্য। এভাবেই ঘুচে গিয়েছিল কেন্দ্র আর প্রান্ত, কলকাতার অভিজাত প্রতিষ্ঠিত লেখক আর ছোট শহর বা গ্রামের ব্রাত্য অপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের পার্থক্য। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ঘটে এই লেখকদের উত্থান, “প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাবই সত্তর দশকের জাগরণের ধর্ম।” প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাই ছিল ওই সময়ের বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যের বিষয়ভাবনা ও প্রকাশশৈলীতেও ঘটে যায় মৌলিক পরিবর্তন। এই ধারাতেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য লিটিল ম্যাগ।

স্যাড জেনারেশন থেকে কণ্ঠস্বর

বাংলাদেশেও আছে লিটিলম্যাগ প্রকাশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। শুরু সেই ষাটের দশকে। আসলে ষাটের দশকই হচ্ছে সেইসময় যখন বাংলাদেশে লিটিল ম্যাগাজিনের প্রকৃত আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর আগে বাংলাদেশে সেইভাবে কোনো লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়নি। সওগাত ও মোহাম্মদী বাঙালি মুসলমান লেখকদের মুখপত্র হয়ে উঠেছিল ঠিকই তবে আধুনিকতার বাহন হতে পারেনি। জন্ম দিতে পারেনি কোনো নতুন সাহিত্য আন্দোলনের। কিন্তু ষাটের দশকে সেই সময়ের তরুণ কবিরা দলবদ্ধভাবে প্রকাশ করলেন সপ্তক, অগত্যা, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, প্রতিধ্বনি, বক্তব্য, যুগপৎ ও স্যাড জেনারেশনের মতো কয়েকটি পত্রিকা। এই পত্রিকাগুলো ছিল চরিত্রের দিক থেকে পুরোপুরি লিটিল ম্যাগাজিন – আত্মপ্রকাশের তীব্র চাপ, যৌবনের উদ্ধত অহংবোধ, আত্মঘোষণা, দ্রোহ, তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পূর্বজদের অস্বীকার করা, নতুন সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তোলা – সবকিছুই ঘটেছিল এইসব পত্রিকাকে ঘিরে। তবে এই পত্রিকাগুলোকে যে-পত্রিকাটি প্রথম প্রথাবদ্ধ সাহিত্যরীতি ছেড়ে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল সেটি হচ্ছে সমকাল। সেই সঙ্গে স্বল্পায়ু উত্তরণের ভূমিকাও ভুলে যাবার মতো নয়। সমকালকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একটা লেখকগোষ্ঠী। সপ্তকের তিনটি সংখ্যার লেখক – আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হায়াৎ মামুদ, হুমায়ুন চৌধুরী, মনজুরে মওলা পরবর্তী কালে বাংলাদেশে স্বমহিমায় লেখক হিসেবে অর্জন করেন আত্মপ্রতিষ্ঠা।

তারুণ্যের স্বভাবই হচ্ছে নতুনকে আঁকড়ে ধরা আর পুঞ্জিত বিদ্রোহে আত্মপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান ভেঙে জায়গা করে নেওয়া Ñ ষাটের তরুণতর আরও কিছু লেখক খুঁজছিলেন সেই পথ। এদেরই নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ; যারা প্রথমে বের করলেন বক্তব্য, পরে কণ্ঠস্বর। বক্তব্যের প্রথম সংস্করণ দুই দিনে আর সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত আরেকটি সংস্করণ এক সপ্তাহের মধ্যে নিঃশেষিত হয়ে যায়। এই পত্রিকার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিলেন রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, আসাদ চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো লেখকেরা। বক্তব্যের পরেই ঘটে সেই বিস্ফোরণ – স্বাক্ষরের আবির্ভাব। এতে আরও যুক্ত হয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক, বুলবুল খান মাহবুব, শহীদুর রহমান, ফারুক আলমগীর, জিনাত আরা মালিক, সাযযাদ কাদির এবং আরও অনেকে। দুটি সংখ্যা বেরিয়েছিল এর, প্রকাশের জন্য রফিক আজাদকে কাবুলির কাছ থেকে টাকা পর্যন্ত ধার করতে হয়েছিল আর আসাদ চৌধুরী দিয়েছিলেন তার বেতনের সর্বাংশ। স্বাক্ষরের কৃতিত্ব এই যে প্রচলিত সাহিত্যরীতিকে এটি প্রচ-ভাবে আঘাত করতে পেরেছিল। সাম্প্রতিক পত্রিকার প্রকাশও ছিল রুচিশীলতায় ঋদ্ধ। তবে এই সময়ে প্রকাশিত যে পত্রিকাটি সবচেয়ে আলোড়ন তোলে সেটি কণ্ঠস্বর। সম্পাদকীয় রুচি, নিষ্ঠা, ধৈর্য্য, মেধা, মনন সবকিছুতেই অনন্যতার পরিচয় দিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যোগ্য সম্পাদক হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন কণ্ঠস্বর। তারই হাত ধরে ষাটের প্রায় সব নতুন কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিকের আবির্ভাব ঘটে। লিটিল ম্যাগাজিন যে শুধুই আত্মপ্রকাশজনিত অপরিণত লেখার অবনিবাস নয়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেটাই। লেখকের আত্মপ্রকাশ তা লিটিল ম্যাগাজিনেই হোক কিংবা কোনো গ্রন্থে, প্রতিটি রচনাই হতে হবে সিরিয়াস, সাহিত্যপদবাচ্য কিছু। এর লেখা অপরিণত হলেও তাতে থাকতে হবে প্রতিভার কিছু-না-কিছু বিচ্ছুরণ, এই রচনার মধ্যেই যেন ক্ষীণ হলেও শুনতে পাওয়া যায় ভাবি লেখকের প্রতিশ্রুত কণ্ঠস্বর।

যে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে

আসলে সেই শুরু, যে-পথিকৃতের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি, তারই পথ ধরে স্বাধীনতার পরে প্রকাশিত হলো একঝাঁক লিটিল ম্যাগাজিন। এর কিছু কিছু ছিল সত্যি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এইসময় কণ্ঠস্বরের একটা সম্পাদকীয়তে নতুন দেশের লেখকদের কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখেছিলেন, “যে তারুণ্য, নতুনত্ব, প্রতিভা, আপোষহীন, সত্যপ্রীতি গত দশকের তরুণ সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা দিয়েছিল, আজ তার সঙ্গে সংহত চারিত্র্যশক্তি এবং দুরূহের পিপাসা এসে যোগ দিচ্ছে মনে হয়।” আসলে ঘটেছিল অনেকটা এরকমি। এই সময়েই প্রকাশিত হয় রফিক নওশাদ সম্পাদিত কালপুরুষ, বেবী আনোয়ার সম্পাদিত কিছুধ্বনি, রইসউদ্দীন সম্পাদিত জনান্তিক, রাজশাহী থেকে পূর্বমেঘ, উত্তর অন্বেষা, বগুড়া থেকে বিপ্রতীপ এবং এই ধরনের আরও অসংখ্য পত্র-পত্রিকা। গণসাহিত্যও এই সময় পাঠক ও লেখকমহলে বেশ সাড়া তুলেছিল। আসলে সত্তর দশকেই লিটিল ম্যাগাজিনের প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছি আমরা। এর কারণ, প্রথমত, ওই সময়ে এখনকার মতো এত দৈনিক পত্রিকা ছিল না যে পত্রিকাগুলোর সাহিত্য সাময়িকীতে তরুণতর প্রতিভাবান লেখকের লেখা ছাপা হতে পারতো। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থপ্রকাশনার অবস্থাও ছিল খুবই করুণ, অর্থাৎ প্রকাশকের সংখ্যাা ছিল খুবই কম। পাঠকের সংখ্যা কম থাকায় প্রকাশকেরা প্রতিষ্ঠিত লেখক ছাড়া নতুন লেখকের সৃজনশীল বই প্রকাশে তেমন একটা উৎসাহ বোধ করতো না। ফলে আত্মপ্রকাশের গরজে নতুন লেখকদের লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্যের পরিবেশও এই লিটিলম্যাগ প্রকাশে সহায়ক হয়েছিল। নতুন দেশের নতুন রাজধানীতে জীবিকা ও পড়াশোনার কারণে তখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে অন্য অনেকের মতোই চলে আসছিলেন অসংখ্য কবি বা সাহিত্যযশোপ্রার্থী তরুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত চত্বরে তখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো সংগঠন বা লিটিলম্যাগের উদ্যোগে কবিতার আসর বসতো। শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনটি হয়ে উঠেছিল কবি-লেখকদের নিয়মিত আড্ডার কেন্দ্রস্থল। লিটিলম্যাগের সম্পাদকেরা এখানে এলেই পেয়ে যেতেন সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত কিংবা আত্মপ্রকাশে উন্মুখ তরুণতর লেখককে। লিটিলম্যাগের লেখার তাই কোনো অভাব ছিল না। এভাবেই সেইসময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতে পেরেছে অসংখ্য পত্রপত্রিকা। দেশের ছোট ছোট শহরেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশের নানা স্থানে তখন প্রায়ই কবি বা সাহিত্য সম্মেলন হতো। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল থেকে অসংখ্যা লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে শুরু করলো। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি এই ধারা অব্যাহত থেকেছে।

আশির দশকে লিটিল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত হলো আরও একটা নতুন মাত্রা। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের কবিতা গল্প উপন্যাস একটা জায়গায় পৌছে রুদ্ধ হয়ে গেছে বলে ভাবছিলেন কোনো কোনো তরুণ। তাদেরই উদ্যোগে নতুন ভাবনার বাহক হিসেবে প্রকাশিত হলো বেশ কয়েকটি লিটিল ম্যাগাজিন। নতুন ধরনের কবিতা ও গল্পের সুবাদে এই পত্রিকাগুলোর শীর্ষে অবস্থান করে নিয়েছিল গাণ্ডীব। একবিংশের মধ্যেও এরই বিচ্ছুরণ দেখা গেছে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় উত্তরাধুনিক ভাবনার লিরিক। ঢাকা থেকে লেখক শিবিরের তৃণমূল পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আবদুল মান্নান সৈয়দ শিল্পতরু সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। রাজশাহী থেকে এইসময়ে প্রকাশিত হয় আরও একটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা পেঁচা আর ঢাকা থেকে প্রান্ত। স্বল্পায়ু মননঋদ্ধ এসব পত্রিকার মধ্য দিয়েই নতুন ধরনের মনোগহনধর্মী আত্মগত সংহত কবিতাচর্চার সূত্রপাত ঘটে। গল্পের চর্চাও নতুন করে গতি পায়। শিল্পের সবগুলো শাখাই যে একসূত্রে বাঁধা, এমনকি দর্শন ও গণিতকেও যে অগ্রাহ্য করা যায় না, অথবা বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা – যেমন উত্তরাধুনিকতা কিংবা দেরিদা-ফুকো-সাঈদের সমকালীন ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, এর সবই সেই প্রথম লেখকেরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে দেখা গেল এই ভাবনাই জায়গা করে নিচ্ছে এই সময়ের কবিদের দ্বারা প্রকাশিত লিটিলম্যাগগুলোতে। কবিতা মনোগহনতার কথা বলতে গিয়ে হয়ে উঠেছে আরও বিমূর্ত, অনির্দেশ্য অনুভূত সংবেদনার স্বরলিপি বিশেষ।

লিটিল ম্যাগ ও সংঘশক্তি

লিটিল ম্যাগাজিনের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সংঘশক্তি। তবে এর ভেতর থেকেও সচেতন কবি ও গল্পকারকে নিজের সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে আলাদা করে পাঠকের অনুভবে উজ্জ্বল করে তুলতে হয়। যুথবদ্ধ থেকেও তাকে নিজেরই মুদ্রাদোষে বিশিষ্ট কোনো কবি বা লেখক হয়ে উঠবার সাধনায় ব্যাপৃত থাকতে হয়। নব্বইয়ের দশকে এরই ধারাক্রম অনুসারে প্রকাশিত হয়েছে শালুক, স্রোতচিহ্ন, রোদ্দুর, লোক, নন্দন, ক্যাথারসিস, কবিতাপত্র, অমিত্রাক্ষর, চিহ্ন, উলুখাগড়া, চারবাক, গোলাঘর, হালখাতা, নিসর্গ, মাদুলি, নান্দীপাঠ, উষালোক, অগ্রবীজ-এর মতো আরও অসংখ্য নতুন উল্লেখযোগ্য লিটিল ম্যাগাজিন। এই পত্রিকাগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো থিম বা লেখক Ñ যেমন অকালপ্রয়াত শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির, নব্বইয়ের কবিতা কিংবা জয়েস-এলিয়টকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে সাড়া তুলেছে শালুক। হালখাতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের উপন্যাস, কবিতা এবং জনগুরুত্ব সম্পর্কিত তেল গ্যাস কয়লা খনিজসম্পদ সংক্রান্ত অধিকার সংখ্যা। একবিংশতেও উজ্জ্বল কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এইসময়ে আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে পত্রিকাটি সেটি হচ্ছে অগ্রবীজ। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে তরুণতর লেখকদের মননসমৃদ্ধ বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রবন্ধ। নান্দীপাঠও পর পর দু’টি গদ্যসংখ্যায় বাংলাদেশের কবিতার গতিপ্রকৃতির ছবিটি পাঠকের কাছে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে। ঊষালোকের ঝোঁক কিছুটা ধ্রুপদী লেখকদের প্রতি আর এরই সূত্র ধরে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে নদী ও নারী, পদ্মার পলিদ্বীপের মতো উপন্যাসের উপর বিশেষ গদ্যসংখ্যা। গা-ীব এখনও প্রকাশিত হচ্ছে তবে এই গোষ্ঠী থেকে নিরীক্ষাপ্রবণ কোনো কোনো লেখক সরে যাওয়ায় পত্রিকাটি আর আগের চরিত্র ধরে রাখতে পারছে না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনায় বেরিয়েছিল আবহমান নামে একটি পত্রিকার পাঁচটি সংখ্যা। কিন্তু দু-একটি রচনা ছাড়া কণ্ঠস্বরের সেই অপ্রতিহত সাহিত্যিক রুচিবোধ, উদ্ভাবনা, নান্দনিকতা আর সাড়া জাগানো লেখার ছায়াও খুঁজে পাওয়া যায়নি এই পত্রিকায়। তবে শুধু গ্রন্থসমালোচনা নিয়ে যে একটি ব্যতিক্রমীয় চমৎকার লিটিলম্যাগ প্রকাশিত হতে পারে, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বইয়ের জগৎ।

লিটিল ম্যাগ  নতুন লেখকের

লিটিলম্যাগ মানেই নতুন দ্রোহী প্রতিষ্ঠান বিরোধী নিরীক্ষাপ্রবণ প্রতিভাবান নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশ ঘটবে তাতে। এর লেখককেরা অনেকটা অনুপ্রবেশকারীর মতো ঢুকে পড়বেন প্রচলিত সাহিত্যভুবনে। ফলে যা কিছু প্রতিষ্ঠিত তার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলবেন তারা। তাদের ভঙ্গিটিও থাকবে আক্রমণাত্মক, প্রচলিত রীতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে চাইবেন। একধরনের অহং ও প্রচ- দ্রোহই হচ্ছে লিটিল ম্যাগাজিনের লেখকদের বৈশিষ্ট্য। তবে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই লেখকদের রচনার দ্বারাই প্রভাবিত হবে সমকালীন সাহিত্য। তারাই গড়ে তুলবেন নতুন সাহিত্যরীতি Ñ ভাবনা ও শৈলী উভয় দিক থেকেই। শক্তিশালী লেখকের রচনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের বর্তমান ও ভবিষ্যত গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করাই হচ্ছে লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা।

বাংলাদেশে লিটিল ম্যাগ এই মুহূর্তে

গত কয়েক দশকে প্রকাশিত বাংলাদেশের লিটিল ম্যাগাজিনগুলোও এই ভূমিকাই পালন করেছে। তবে এমন কিছু কিছু লিটিল ম্যাগাজিন এইসময়ে প্রকাশিত হয়েছে যে পত্রিকাগুলোর অধিকাংশ লেখাই ছিল নি¤œমানের। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে দুর্বল রচনায় ভরা। তবে এর মাঝেও শক্তিশালী সৃজনশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, অর্থাৎ সার্বিকভাবে প্রভাবসঞ্চারী নতুন কিছু লিটিলম্যাগ  আমরা পেয়েছি। প্রকাশিত হয়েছে বেশকিছু ভালো লিটিল ম্যাগ। আবির্ভাব ঘটেছে নতুন কিছু শক্তিশালী লেখকের। এই লেখকেরা যদিও আত্মপ্রতিভার গুণেই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন, লিটিল ম্যাগগুলি শুধু তাদের আত্মপ্রকাশে সহায়তা করেছে।  তবে এরকম লিটিল ম্যাগাজিনের সংখ্যা হাতে গোনা। এখন লিটিল ম্যাগ থেকে আমাদের সাহিত্য আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটে প্রসারিত হচ্ছে। ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে লিটিল ম্যাগের বিকল্প। এই পরিস্থিতিতেও অবশ্য ভালো বেশ কিছু লিটিল ম্যাগ প্রকাশিত হচ্ছে। এবার ২০১৭ সালের বইমেলাতেই এরকম কয়েকটি দারুণ লিটিল ম্যাগ প্রকাশিত হয়েছে। যে লিটিল ম্যাগগুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেগুলি হলো শঙ্খচিল, শালুক, কাশবন, চিহ্ন ইত্যাদি।  তবে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে নিরীক্ষাধর্মী লিটিল ম্যাগ সেই অর্থে একটিও নেই। লিটিল ম্যাগের পরিবর্তে এখন সাময়িক পত্রই প্রকাশিত হচ্ছে।  আর লেখকদের চর্চার ক্ষেত্রটিও এককভাবে শুধু লিটিল ম্যাগাজিনগুলোকে কেন্দ্র করে ঘটছে, বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগ, সাময়িক পত্র আর মূলধারার দৈনিক পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লেখক হয়ে উঠবার প্রায় শুরুতেই নতুন লেখকের রচনা তারা প্রকাশ করেছে। তবু নতুন শক্তিশালী লেখকের প্রথম প্রকাশ এবং তার পরিণত হয়ে উঠবার ক্ষেত্রে লিটিল ম্যাগাজিনের ভূমিকার কথা অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশের লিটিল ম্যাগাজিনগুলো সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারলে আমাদের সাহিত্য যে আগামী দিনগুলোতে আরও সমৃদ্ধ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেরকম একটি লিটিল ম্যাগও দেখা যাচ্ছে না, যারা এই ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দ্রোহ, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মধ্য দিয়ে প্রতিভাবান লেখক যেভাবে উঠে আসে, সেই ভূমিকা কোনো লিটিল ম্যাগের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। এত কিছুর পরও প্রকাশিত লিটিল ম্যাগগুলি দৈনিক পত্রিকার উপর তরুণ লেখকদের যে নির্ভরতা ছিল তা থেকে আমাদের সরিয়ে আনতে পেরেছে। লিটিল ম্যাগ আর ওয়েব ম্যাগগুলি নতুন নতুন লেখকের সাহিত্যচর্চার পীঠস্থান হয়ে উঠেছে।  আশার কথা এটাই।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close