Home দর্শন মাসুদুজ্জামান / সখী, ভালোবাসা কারে কয় বা ভালোবাসার দর্শন
0

মাসুদুজ্জামান / সখী, ভালোবাসা কারে কয় বা ভালোবাসার দর্শন

প্রকাশঃ February 14, 2017

মাসুদুজ্জামান / সখী, ভালোবাসা কারে কয় বা ভালোবাসার দর্শন
0
0

মানুষমাত্রই যদি ভালোবাসার পাত্র হয়, তাহলে ভালোবাসা সব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা পেরিয়ে যুক্ত হবে সামগ্রিক মানবসত্তা বা মানবিকতারই সঙ্গে। [রণজিৎ গুহ]

প্রেমের বোধ দ্বৈততার বোধ
প্রেম। শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রী তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। মানসপটে ভেসে ওঠে হয় কোনো নারীর মুখ কিংবা কোনো পুরুষের। প্রেমানুভবের সঙ্গে এভাবেই নারী ও পুরুষ জড়িয়ে পড়েছে। ব্যক্তিক আত্মসত্তার সবচেয়ে গভীর, তীক্ষ্ণ, একান্ত প্রকাশ ঘটে এই প্রেমে। প্রেমের ক্ষেত্রে আত্মসত্তার ভূমিকাই প্রধান। সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের দুজন মানুষ, কিন্তু প্রেমে পড়লেই কীভাবে যেন একাত্ম হয়ে যায়। পরস্পরকে অনুভব করতে শুরু করে। প্রেম কী তাহলে শুধু প্রেমাস্পদকে অনুভব করা, নাকি সক্রিয়তাও?

প্রেমকলা
প্রেম আসলে কলা নয়, প্রযুক্তিও নয়। প্রেম প্রেমই। এ এক অভূতপূর্ব অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা অস্তিত্ব অনুভবের, নিজের আত্মসত্তাকে উপলব্ধি করবার অভিজ্ঞতা। ‘প্রেমকলা’ নামে এরিক ফ্রমের একটা বই আছে। ফ্রম বলেছেন, প্রেম শুধু আত্ম-অনুভবমাত্র নয়, কলাও বটে; অর্থাৎ প্রেমের সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রেমচর্চার বিষয়টি। মানুষ প্রেমে পড়তে ভালোবাসে, ব্যাপারটা সহজ; কিন্তু প্রেম করতে গিয়েই দেখা দেয় যত বিপত্তি। কেউ আমাকে ভালোবাসুক, মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। এভাবে ভালোবাসা পাওয়া খুব সহজ। কিন্তু কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই, এরকম ভাবনা নিয়ে কেউ প্রেম করে না; এই প্রেম সহজ নয়। প্রেমের মাধ্যমে মানুষ আসলে নিজেকে খুঁজে ফেরে, নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে চায়। প্রেম হচ্ছে তাই অন্য আরেকজন মানুষের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করবার অনিঃশেষ অভিযাত্রা। আমি ভালোবাসা পেতে চাই, ভালোবাসতে চাই – প্রেম হচ্ছে এই ধরনের দ্বৈত অনুভূতি। একভাবেই একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতে চায়, তখনই আত্মঅস্তিত্ব বিলোপের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কেননা প্রেমের ক্ষেত্রে ‘দুটি মন’ আর ‘দুটি হৃদয়’ দ্বিধাবিভক্ত না থেকে ‘এক’ হতে চায়; আর এভাবে এক হতে গিয়ে কী প্রেমিক, কী প্রেমিকা, দুজনকেই অনেক স্বার্থত্যাগ করতে হয়। প্রেমের মধ্যে তাই পরাজয়ের অনুভূতিও সক্রিয় থাকে। তবে জয়ের হাতছানি আছে বলেই মানুষ এই পরাজয়কে সানন্দে মেনে নেয়। এই জয় হচ্ছে অন্যের হৃদয়কে জয় করা। প্রেমে তাই একইসঙ্গে যুগলবন্দিত্ব আর বিচ্ছেদ – দুই-ই সমান সক্রিয় থাকে। যুগলের বিভ্রম থেকেই একজন আরেকজনকে মেনে নেয়, ভালোবাসে।
প্রেমে দুজন মানুষের এক হওয়ার যুগ্ম অনুভব যেমন সক্রিয় থাকে, তেমনি তারা যে আলাদা সত্তাবিশিষ্ট মানুষ, সেই বোধও অপসৃত হয়ে যায় না। প্রেমে এই দুজনের কেউ-ই সর্বময় কর্তৃত্ব পায় না, তবে মানবিক সম্পর্কের গভীরে তারা প্রবেশ করে। যুগলের আচ্ছন্নতা আর যুগলের সম্পর্ক, এই হচ্ছে প্রেম। সেই সঙ্গে প্রেমে যুগল-সংবেদনাও সক্রিয় থাকে। দুজন ভিন্ন মানুষ হলেও প্রেমে বৈপরীত্যের মধ্যে ভারসাম্যই প্রধান হয়ে ওঠে। একদিকে সম্পূর্ণভাবে প্রেমাস্পদকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অন্যদিকে নিজেকে অনুভব করবার তীব্র আকুতি – প্রেমের ক্ষেত্রে এই বিপরীতমুখি অনুভূতির উপস্থিতি লক্ষ করি আমরা।
আনন্দ ও যন্ত্রণা, হর্ষ ও বিষাদ – বিপরীতমুখি নানান অনুভূতির উৎসারণই প্রেম। সম্পর্ক যত গভীর হয়, ততই একজনের জন্যে আরেকজনের একাত্মতার বোধ তীব্র হতে থাকে। একইসঙ্গে উভয়ের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা-বাসনার মধ্যে যে সূক্ষ্ণ পার্থক্য আছে, কালক্রমে তাও স্পষ্ট হয়ে যায়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, প্রেম হচ্ছে যুগল-সম্পর্কের অস্তিত্ব : প্রেমাস্পদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে মিলিত হবার অস্তিত্ব এবং বিচ্ছিন্ন হবারও। এই অস্তিত্বের অর্থ হচ্ছে সত্তার সঙ্গে সত্তার সংযোগ।
প্রেম একধরনের মানবিক অনুভব ও প্রক্রিয়া, প্রেমকে তাই তাত্ত্বিকতার মোড়কেও আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি। এই লেখায় সেইরকম একটা প্রেমতত্ত্ব দাঁড় করানো হয়েছে। এবার সেই প্রেমতত্ত্বের প্রসঙ্গ।

প্রেমতত্ত্ব
প্রেম কী? এ হলো সেইরকম একটা প্রশ্ন, যে প্রশ্ন করাটাই অর্থহীন। অর্থহীন কেননা, অনন্ত কাল ধরে মানুষ এই প্রশ্নটা করে আসছে। পরিষ্কার উত্তর যে মিলেছে, তাও নয়। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে দেখলে প্রেমাস্পদের বাসনার উদ্বেগাকুল দোলাচলই প্রেম। খুব সহজভাবে বললে, প্রেম হচ্ছে এক-আমির সঙ্গে অন্য-আমির সম্পর্ক স্থাপনের কথা। আমি ও আমার আমিত্ব, অন্য-তুমি বা অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে; প্রেম শুরু হয় এইভাবে। প্রেম তাই অস্তিত্বেরই নির্যাস। কিন্তু প্রেম সরলভাবে চলে না। বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে প্রেমের উন্মেষ বা বিকাশ ঘটে না। আমি তাকে ভালোবাসি, কিন্তু সে কী আমাকে ভালোবাসে? এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থেকেই প্রেমের প্রসঙ্গটি মনোবিদ্যার দিকে ঘুরে গেছে।
প্রেম তাই আর প্রেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রেম হলো একধরনের চর্চা, প্রয়োগ, প্রক্রিয়া। সময়ের দিক থেকে প্রেমের প্রক্রিয়াটি তিনটি স্তরে বিভক্ত : প্রেমপূর্বকাল, প্রেমের কাল এবং প্রেম-পরবর্তী কাল। এ হলো সেই ধরনের মানসিক অভিযাত্রা যার কোনো শেষ নেই। সত্তার অনিঃশেষ অভিযান। জুলিয়া ক্রিস্তেভা একেই চিহ্নতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, অর্থাৎ অস্তিত্বকে উপলব্ধির প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন। জাপানি দার্শনিক মোরি আরিমাসা বলেছেন, প্রেমাস্পদের সত্তাকে সর্বাংশে নিজের করে পাওয়াই প্রেম। প্রেম তাই সত্তারই নির্যাস। মোরি একথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে, কোনো মানুষই তার প্রেমিক বা প্রেমিকাকে সম্পূর্ণভাবে পায় না। কিন্তু প্রেম চায় পরিপূর্ণতা, প্রেমের মানুষটিকে পেলে এই পরিপূর্ণতার স্বস্তি অনুভব করে মানুষ। প্রেম তাই সত্তার মধ্যে সত্তার প্রতিফলন। প্রেমের এই যে সংবেদনশীলতা, এ থেকেই মানুষের মধ্যে অস্তিত্বের উদ্ভাস ঘটে। এরকম মুহূর্তে অন্য কিছু নয়, প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিলিত হবার আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে অথবা বিচ্ছিন্ন হতে চায় মানুষ। প্রেমের বাসনা মানেই নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে অন্যের সত্তার মধ্যে বিলীন করে দেওয়া। তবু উৎকণ্ঠা জাগে, হয়তো প্রত্যাখ্যাত হতে হবে অথবা যে বাসনা জেগেছে মনে, হৃদয়ে, তার হয়তো নিবৃত্তি ঘটবে না। প্রেম যদি ধরাও দেয়, এরপরও শঙ্কা জাগে মনে, সত্যিই কী প্রেম ধরা দিয়েছে? কৃষ্ণকে লক্ষ করে এ জন্যেই কী রাধা বলে ওঠেননি, “এই ভয় উঠে মনে এই ভয় উঠে, না জানি কানুর প্রেম তিলে জনি টুটে?”

প্রেমময় একাত্মতা
জাক লাকাঁ বলেছেন, প্রেমানুভবের অর্থ যৌনআনন্দ লাভ করা নয়, বরং প্রেম হচ্ছে পরমসুখ (জুইসঁস) অর্জন করা। প্রেম যেহেতু পরস্পরের সম্মতিসূচক একটা সম্পর্ক, ফলে, এটি আত্মিকভাবেই গঠিত হয়। প্রেমের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে দেখা যায় ‘সক্রিয় আমি’ ‘নিষ্ক্রিয় অপরে’র দ্বারা গৃহীত হয়, অথবা ‘সক্রিয় অপর’ ‘নিষ্ক্রিয় আমি’র দ্বারা গৃহীত হয়; অর্থাৎ দুই আমি পরস্পরের মধ্যে মিশে যায়। এই আমিদ্বয়ই পরমসুখ পাওয়ার জন্য প্রেমে পড়েছে বলে স্বীকার করে নেয় এবং তাদের এই প্রেমানুভবকে ঘিরে প্রেমের বোধ তৈরি হয়। কিন্তু চূড়ান্তভাবে দুঃখের অভিজ্ঞতাই তাদের ওপর এসে ভর করে। প্রেমে পড়া তাই পাহাড়চুড়োয় ওঠার মতো কঠিন একটি কাজ। প্রেমকে স্বীকার করে নেওয়ার অর্থই হলো, মন ও শরীর উভয় দিক থেকে প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া। একজনের জীবনকে অন্যের জীবনের মধ্যে বিলীন করে দেওয়া।
প্রেমের প্রকাশও তাই অভিনব হয়ে থাকে। সত্তা তার প্রেমানুভূতিকে আবেগ ও শব্দ দিয়ে প্রকাশ করে। প্রেমিক ও প্রেমিকা উভয়েই ভাবে, আমি যেভাবে অনুভূতির প্রকাশ ঘটাচ্ছি, অন্যপক্ষও সেইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে। এই ভয়ও আবার সত্তার মধ্যে কাজ করে যে, তার ব্যক্ত অনুভূতি হয়তো অন্যপক্ষ উপলব্ধি করতে পারবে না অথবা প্রত্যাখ্যাত হবে। সত্তা এভাবেই আশা ও হতাশার মধ্যে কখন অন্য পক্ষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে, সেই অপেক্ষায় থাকে। যদি প্রত্যাখ্যাত হয় তাহলে সে কী করবে, সেই ভাবনাও প্রেমিক বা প্রেমিকাকে পেয়ে বসে। প্রেমে-পড়া মানুষটি এইসময়ে এমন এক মানসিক অবস্থা অতিক্রম করতে থাকে, যখন যন্ত্রণাদায়ক এক বিশুদ্ধ আবেগ তার মধ্যে ঘনিয়ে ওঠে। সেই প্রথম প্রেমিক বা প্রেমিকা দুঃখ, আনন্দ আর এককীত্ব কাকে বলে, এইসব অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে শেখে।

প্রেম একটি লাল গোলাপ
প্রেমের ধরনটাই এমন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, বিশেষ কোনো মানুষকে বিশেষ কোনো মুহূর্তে এরকম কথা বলার আকুতি মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে। কেউ কেউ একবার, অনেকে হয়তো অনেকবার, এইকথা বলে উদ্দীষ্ট পুরুষ বা নারীর উদ্দেশে বাড়িয়ে দিয়েছে একটা লাল গোলাপ অথবা একটুকরো চিরকুট। আর যদি ভীরুতা এসে ভর করে তাহলে সামনাসামনি নয়, সেলফোনেই হয়তো অস্ফুট কণ্ঠে ‘ভালোবাসি’ বলে দুম করে কেউ টেলিফোনের সংযোগ কেটে দিতে পারে। তারপর প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য অপেক্ষার পর অপেক্ষায় কেটে যেতে পারে কয়েক মুহূর্ত বা কয়েক দিন। এক-একটি মুহূর্তকে তখন মনে হতে পারে এক-একটি দিনের সমান দীর্ঘ অথবা আরও বেশি প্রলম্বিত। প্রতিক্রিয়াটি যদি ইতিবাচক হয়, তাহলেই স্বস্তি। কিন্তু নেতিবাচক হলে কারো কারো জীবনে মহাপ্রলয় নেমে আসতে পারে, ব্যক্তিভেদে এই প্রলয়ের মাত্রা হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু জীবন যে তখন বিষময় হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শুধু অকারণ পুলকে…
প্রেমিক ও প্রেমিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা অকারণ পুলকে কথার পর কথা সাজিয়ে অথবা না সাজিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। প্রেমের ভাষিক ও আবেগিক প্রকাশেও তাই অভিনবত্ব আছে, আছে অন্য আরেক ধরনের সৌন্দর্য। প্রেমিক-প্রেমিকার কথা শুরু হয় “আমি তোমাকে ভালোবাসি” দিয়ে। তবে প্রত্যুত্তরে সাধারণত যে কথাটি বলা হয়, তাও কিন্তু প্রেমিক বা প্রেমিকার হৃদয়ে সংশয় জাগিয়ে তুলতে পারে : “কিন্তু আপনি তো আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না।” ফলে প্রেম শুরুই হয় যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে এরকম বাচনিক সংকটের মধ্য দিয়ে। রোলা বার্থ লিখেছেন, জো / তে’ / ইমে; বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়, আমি / তোমাকে / ভালোবাসি; এই শব্দগুচ্ছ প্রেমের ঘোষণা বা স্বীকারোক্তি নয়; বরং এ হচ্ছে প্রেমের জন্য কান্না বা হৃদয়ের গহনলোক থেকে উঠে আসা ভালোবাসার তীব্র আকুতি। লাকাঁ বলেছেন, সত্তার চূড়ান্ত অবস্থা হচ্ছে এটি। তিনি একে ‘আয়নার প্রতিবিম্বন’ বলে উল্লেখ করেছেন। লাকাঁর মতে, শব্দগুলো তেমন কিছুই ব্যক্ত করেনা, শুধু সত্তা বর্জনের ঘোষণা দেয় যা বক্তার নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। কথাগুলো যিনি বলছেন তিনি চান তার কথা যেন অপরের কাছে স্বীকৃতি পায়, অর্থাৎ তার প্রেম যেন স্বীকৃতি অর্জন করে।

সত্তার সঙ্গে সত্তার মিলন
মানুষ প্রেমে পড়লে এভাবেই নতুন এক সত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়। ওই সত্তাকে সে নানা ধরনের কল্পনা ও ভাবনা দিয়ে অনন্ত সত্তায় পরিণত করে। যুগল হওয়ার আচ্ছন্নতায় প্রেমের ক্ষেত্রে সবই সম্ভব; তবে একইসঙ্গে কী বলা যাবে আর কী বলা যাবে না, কথার সেই সীমারেখাটুকু প্রেমিক বা প্রেমিকাকে মনে রাখতে হয়। মন আর শরীর এবং শব্দ আর বাস্তবতার মধ্যে এভাবেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রেম আসলে এরকমই, একধরনের বিভ্রম, একধরনের আচ্ছন্নতা। একসময়ে ভালোবাসার বোধ হয়তো তীব্র হয়ে উঠলো, পর মুহূর্তেই জেগে উঠলো ঘৃণা। আবেগের এই যে উত্থান-পতন, দোলাচলবৃত্তি, একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই প্রেমিক বা প্রেমিকা প্রেমের আনন্দ খুঁজে পেতে পারে। প্রেম হচ্ছে হৃদয়ের অভিযান, যেখানে সত্তা এসে সত্তার সঙ্গে মিলে যায়। সত্তা এখানে একদিকে আনন্দের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে যন্ত্রণায় ডুবে যাওয়া; প্রেম এভাবেই অপরের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে অভিভূত হয়ে পড়ে। প্রেমতত্ত্ব তাই অস্তিত্বের তত্ত্ব, যেখানে একেবারে ভিন্ন দুটি সত্তা ভালোবাসার তুড়ীয় অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে নিজেদের অস্তিত্ব অনুভব করতে চায়। একে অন্যের সঙ্গে সংযোগসূত্রে সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার মধ্যে নিজেদের পরিসর খুঁজে নেয়।
ভারতীয় প্রেমতত্ত্বেও বলা হয়েছে এই দ্বৈত-অদ্বৈতবাদের কথা। রাধা ও কৃষ্ণের প্রতীকে একদিকে প্রেমের দ্বৈততা এবং আরেক দিকে অভিন্নতার তত্ত্ব হাজির করেছেন বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারকেরা। সুফিবাদেও এই দ্বৈত-অদ্বৈতের, অর্থাৎ প্রেমিক ও প্রেমিকার পৃথকতা আর অভিন্নতার দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে
আমাদের লোকগানে আছে, প্রেমের মরা জলে ডোবে না। প্রেম কী তাহলে চিরজীবী, চিরআয়ুষ্মান? আসলে প্রেমের পাত্র-পাত্রীরা যতদিন দিন থাকবে, প্রেমও হয়ে থাকবে অক্ষয়, অমলিন। প্রেমাধারে তাই প্রেমের মুক্তি, আর এই আধার হলো প্রেমিক আর প্রেমিকা। জীবনচক্রের সমাপ্তি ঘটলে মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই ভুবনে জন্ম নেওয়া নতুন কুশীলবেরা আবার প্রেমের ভুমিকায় অভিনয় করা শুরু করে। এভাবেই প্রেমিক আর প্রেমিকার যেহেতু মৃত্যু হয় না, প্রেমেরও তাই মৃত্যু নেই। এই পৃথিবীতে, এই ভুবনে তাই প্রেমের ফাঁদ পাতা। তাহলে প্রেমের অধিষ্ঠান কোথায়?
প্রেমের অধিষ্ঠান আসলে সেই যুগলের মধ্যে। যুগল সম্পর্কের মধ্যেই প্রেম তার আসন পেতে বসে। যুগলের সৃষ্টি হয় ভিন্ন দুই মানুষের সমন্বয়ে; আর ভিন্ন দুটি মানুষ মানে ভিন্ন দুই ব্যক্তিমানুষ। আধুনিক কালে এই ব্যক্তিমানুকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি। ব্যক্তিমানুষ যখন তার সত্তাকে উর্ধ্বায়িত করে নেয়, তখনি সে প্রবেশ করে প্রেমের জগতে। একধরনের ঘোরের মধ্যে থেকে নানা কিছু একসঙ্গে করবার ভেতর দিয়ে একজন আরেকজনকে উপলব্ধি করে। প্রেম তাই দেওয়া-নেওয়া আর আদানপ্রদানও বটে। ছোট ছোট ইচ্ছে, আকাক্সক্ষা, ভালোলাগা, মন্দলাগাকে শেয়ার করে মানুষ। একজন আরেক জনের উপযোগী হয়ে উঠবার জন্য নিজেকে বদলে নেয়। প্রেম এ কারণেও মহিমাময়, প্রেম মানুষকে বদলে দিতে পারে।
জাপানি দার্শনিক তাকাকি ইয়োশিমতো বলেছেন, তিন ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে আছে মানুষ :

[এক] সম্প্রদায়গত সম্পর্কের আচ্ছন্নতায়,

[দুই] ব্যক্তিগত সম্পর্কের আচ্ছন্নতায় এবং

[তিন] যুগল সম্পর্কে আচ্ছন্নতায়।

এদের মধ্যে যুগল-আচ্ছন্নতাই সবচেয়ে জটিল এবং ব্যাখ্যা করাও কঠিন। প্রেমের মধ্য দিয়েই এই সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মানবিক সত্তাকে যদি বিশ্লেষণ করতে হয় তাহলে এই আচ্ছন্নতার ব্যাখ্যা দিয়েই শুরু করা উচিত।

প্রথমত, প্রেমের যুগল সম্পর্কের মধ্যেই আছে দূরত্বের বোধ; ভিন্ন দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে দূরত্বের বোধটি লুপ্ত হয়ে যায় না।

দ্বিতীয়ত, যুগল সম্পর্কের মাধ্যমেই নারী ও পুরুষ নিজেদের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারে; একের অস্তিত্ব অন্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে বা বিলীন হয়ে যায়। প্রেমিক ও প্রেমিকারা এই অবস্থায় আত্মসত্তাকে যেমন অনুভব করে, তেমনি অনুভব করে একীভূত যুগলসত্তাকেও। সম্পর্কের তত্ত্বকে বুঝতে হলে তাই প্রেমের সম্পর্ককে বোঝাটা জরুরি হয়ে পড়ে; আবার প্রেমের সম্পর্ককে বুঝতে পারলে মানুষের অস্তিত্বকেও বোঝা সহজ হয়ে ওঠে। সিগমুন্ড ফ্রয়েড থেকে শুরু করে জুলিয়া ক্রিস্তেভা পর্যন্ত মানবিক এই অস্তিত্বকে উপলব্ধি করবার এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। তৃতীয়ত, প্রেমিক যুগলেরা একইসঙ্গে পরস্পর বিরোধী ধারণা, প্রত্যয় এবং মূল্যবোধকে ধারণ করে থাকে। তবে বিরোধিতার দিকটি কখনই প্রবল হয়ে ওঠে না, সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে যুগলের সম্পর্কটি এগিয়ে যায়। প্রেমকে তারা গভীরভাবে নিজেদের মধ্যে ধারণ করবার চেষ্টা করে।

প্রেমই মৌলিক আর সব তুচ্ছ
জর্মান লেখক মাইকেল এঁদে বলেছেন, প্রেম হচ্ছে মানুষের একধরনের মৌলসম্পর্ক। জাগতিক পরিবেশের পরিবর্তন সাধিত হওয়ায় এর বহিরাবয়বে রূপান্তর ঘটলেও অন্তর্গতভাবে কোনো রূপান্তর ঘটেনি, পরিবর্তনও নেই। দুজন মানুষের মিলনই প্রেম নয়, বলেছেন জুলিয়া ক্রিস্তেভা। তার মতে প্রেম হচ্ছে পরস্পরের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলার অনুভূতি এবং এমন এক তরলিত অবস্থায় নিপতিত হওয়া যেখানে প্রেমিকযুগল ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি না’ বলে বারবার সৃষ্টি করবে আর ধ্বংস করবে, দোলাচলের মধ্যে থাকবে; বলবে, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি’, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না’; ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি’, ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি না’; ‘আমি তোমাকে ঘৃণা করি’, ‘আমি তোমাকে ঘৃণা করি না।’ এতসব দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর পরস্পরবিরোধী ভাবনা সত্ত্বেও দুজনেই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা দেখাবে যে তারা পরস্পরকে গভীরভাবে ভালোবাসে। বিভ্রমের চুড়োয় উঠে অতিক্রম করে যাবে সব প্রতিকূলতা। ‘ভালোবাসার গল্পে’ ক্রিস্তেভা এভাবেই প্রেমের যে বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। ক্রিস্তেভাই বলেছেন, প্রেমকে মুক্তভাবে উপলব্ধি করতে হলে বিয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রেমে তাই বিপত্তি দেখা দিলে সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকে গড়াতে পারে।
বিলম্বিত পুঁজিবাদী সমকালীন সমাজব্যবস্থার মধ্যেই এই বিচ্ছেদের বীজ রয়ে গেছে। জীবন এখন বহুমুখী, বৈচিত্র্যও অনেক। একজনের সঙ্গে একজনের প্রেম, প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটবে বিয়ে আর সন্তান জন্মদানে, এইসব ভাবনাও বদলে যাচ্ছে। বিয়ে ছাড়া প্রেম এবং একসঙ্গে বসবাসের বৈধতাও পাচ্ছে সমাজে। বৈধতা পাচ্ছে পুরুষ ও নারীর সমকামিতাও। সমকামও যে প্রেমের আরেক স্বাভাবিক রূপ, তাও এখন আর অস্বীকার করবার উপায় নেই। বিচ্ছেদকে শুধু নেতিবাচকভাবে দেখার দিনও শেষ হয়ে গেছে। প্রেমের যে সম্পর্ক ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে, সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাইতে বিচ্ছেদই শ্রেয় বলে সমাজে ও সংস্কৃতিতে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি পাচ্ছে।

সংস্কারমুক্তিই প্রেম
শরীর সম্পর্কে মানুষের যে সংস্কার ছিল, বিশেষ করে প্রাচ্যের সমাজগুলোতে, তাতেও রূপান্তর ঘটে গেছে। প্রেমিকযুগলের শরীরী সম্পর্ক পাশ্চাত্যে অনেক আগেই স্বীকৃতি ও বৈধতা পেয়েছে। ধীরে ধীরে প্রাচ্যেও লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই সংস্কারটি। চুম্বন, আলিঙ্গন আর মিলন – এই তিনটি দিক হচ্ছে প্রেমের সবচেয়ে সক্রিয় শরীরী দিক। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের প্রেমিকযুগলের মধ্যে এ সবের প্রকাশ ক্রমশ সহজ হয়ে আসছে। প্রেম যদি হয় অস্তিত্বের অনুভব, যে অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মন ও শরীর, সেক্ষেত্রে সমাজ রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে শরীরী সংস্কার যে একদিন লুপ্ত হয়ে যাবে, জুডিথ বাটলারের লেখায় তারই প্রতিধ্বনি পাই। বাটলার বলছেন, ‘যৌনস্বভাব’ বা ‘স্বাভাবিক যৌনতা’র বিষয়টিকে নির্মাণ করা হয়েছে। সংস্কৃতির কথা বলা হলেও এটি মূলত রাজনৈতিক নির্মাণ। সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটলে যৌনধারণাও বদলে যাবে। নোবেলজয়ী হিস্পানি কবি অক্তাভিও পাস আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, “প্রেম ও কাম হচ্ছে জীবনের দ্বৈত শিখা।” প্রেমের ফাঁদপাতা ভুবনে প্রেম এভাবেই সামগ্রিক মানবসত্তা বা মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close