Home আমার বইমেলা মাহফুজা শীলু / আমার বইমেলা

মাহফুজা শীলু / আমার বইমেলা

প্রকাশঃ February 25, 2017

মাহফুজা শীলু / আমার বইমেলা
0
0

“এক পহেলা ফাল্গুনে মঞ্জুলি আর আমাকে দেখে রশীদ হায়দার বললেন, ‘দেখেছ আজ কী অবস্থা? মনে হচ্ছে বাংলা একাডেমির জন্ডিস হয়েছে। চারদিকে শুধু হলুদ আর হলুদ।’ কথাটি বহু ব্যবহারে এখন ক্লিশে হলেও সেদিন আমাদের নতুন মনে হয়েছিল। আমরা হেসে খুন।”

আমরা তখন উড়ে বেড়াই, ঘুরে বেড়াই, ঢাকা শহর চরে বেড়াই। যদিও ঢাকা শহরের আয়তন তখন আমার কাছে আজিমপুর থেকে  বাংলামোটরের  বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, টিএসসি,  ব্রিটিশ কাউন্সিল, পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ পর্যন্ত। আর ছিল আমাদের বাংলা একাডেমির বইমেলা। আমরা  পাঁচবন্ধু। সেই বন্ধুতার বয়স এখন ৩৭ বছর চলছে। এর মাঝে তিনজন দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলাম। এখন  আবার আমরা মিলেছি ভাই মায়ের টানে। ‘এ পরবাসে রবে কে হায়-!’

তো সেই ৩৭ বছর আগে আমরা পরস্পরের হাত ধরেছিলাম। আমরা প্রেমে পড়েছি একসঙ্গে। প্রেমহীনতায় দুঃখ পেয়েছি এক সঙ্গে। একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা অন্য তিনজন মহা আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি। সেই প্রেমিকপ্রবর শুধু তার প্রেমিকাকেই নয়, আমাদেরও চিঠি দিত নিয়মিত। দিতেই হতো। এরকমই ছিল বন্ধুতার জোর।

কবিবন্ধুটি যখন লেখে, ‘প্রেমিকা নও, বান্ধবী নও – তুমি আমার বন্ধু নারী।’

রবীন্দ্রনাথ যাদের বলেন ‘বঁধু তোমায় করব রাজা তুমি আমার তেমন বঁধু।’

আমরা তিনজনই ভেবেছি,  আমি তোমার তেমন বঁধু।

এসবে যখন আকণ্ঠ নিমজ্জিত  তখন আমাদের  আরেকটি আনন্দের জায়গা ছিল বইমেলা। ক্লাসের পরে আমরা নিয়মিত দেখা করতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে আমাদের আড্ডাস্থল  ছিল বইমেলা। কার কার কী বই বের হল, কোন বই কিনব – আগ্রহের জায়গা ছিল সেটাই।

আগের তুলনায় এখন পরিসর বেড়েছে কিন্তু মেলার সেই ভিড়ের নির্জনতাটুকু আর নেই। তখনও ভিড় হতো, অনেক অনেক মানুষ। তবু যেন সবাই সবাইকে  খুঁজে পেতাম কত সহজে। যেখানে যাই, যা দেখি ভালো লাগে। হয়তো আমাদের, অন্যদেরও। এক বিখ্যাত কবি একদিন বলেছিলেন, ‘আজ মেলার সবচেয়ে উজ্জ্বল নারী আপনি!’ অত বইয়ের পাশে মানুষ এমনিই উজ্জল হয়ে ওঠে কি?

এক পহেলা ফাল্গুনে মঞ্জুলি আর আমাকে দেখে রশীদ হায়দার বললেন, দেখেছ আজ কী অবস্থা? মনে হচ্ছে বাংলা একাডেমির জন্ডিস হয়েছে। চারদিকে শুধু হলুদ আর হলুদ।’ কথাটি বহু ব্যবহারে এখন ক্লিশে হলেও সেদিন আমাদের নতুন মনে হয়েছিল। আমরা হেসে খুন।

জাদুঘরের সামনে সারি ধরে ফুলের দোকান ছিল না তখন। বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস নিয়ে কোনো আদিখ্যেতাও শুরু হয়নি। অর্থাৎ ভালোবাসার বাণিজ্যিকীকরণ হয়নি। তখনও আমরা কেবল ‘ভালবাসি ভালবাসারেই।’ টিএসসির সামনে গোলচত্বরে সবুজ ঘাসে হলুদ ছোট ছোট নাম না জানা ঘাসফুল ফুটত। আমরা তাই ছিঁড়ে ছিঁড়ে চুলে গুঁজেছি। বড় অনানুষ্ঠানিক, বড় সাদাসিধে ছিল সে সব দিন।

তিনটে থেকে শুরু হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মগ্নচিত্তে,গভীর আগ্রহে কত না বিষয়ে বক্তৃতা শুনেছি। যে বিষয়ে আগ্রহ নেই, সে বিষয়েও।

আর ছিলেন মাসুদুজ্জামান। ডক্টর মাসুদুজ্জামান। কবি, শিক্ষক। ওঁর সঙ্গেও আড্ডা হতো। প্রভা আর আমাকে মাঝে মাঝে পড়ায় সাহায্য করতেন বলে আমরা তাঁকে ‘টিচার’ ডাকতাম। উনি আমাদের ডাকতেন ‘লাপ্পুস’ বলে।

বইমেলায় একটি পুকুর ছিল। একাডেমির মূল বিল্ডিং হাতের বাঁয়ে রেখে পুকুর। পুকুর ধারে ছিল বিরাট এক বৃক্ষ। সেই বৃক্ষতলে ছিল আমাদের আড্ডা।

আমরা পাঁচবন্ধু মিলে খুঁজে খুঁজে পছন্দের বই কিনতাম। আলম খোরশেদ  শিল্পের প্রায় সব বিষয়েই খোঁজ-খবর রাখে। যে-কোনো প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই ওর কাছে। জানা না থাকলে, সময় নিয়ে খুঁজে পেতে জানিয়ে দেবে।  কোন বই পড়ব। কোন বই কিনব এবারের মেলায়।

তো বইমেলা নিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেলাম কোথায়! স্মৃতির পথ বরাবরই অস্পষ্ট। আর অস্পষ্ট বলেই সবই প্রায় সুন্দর। পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে গেছে নব-প্রেম-জালে। ঊননব্বই থেকে শুরু হল আমার দু-নৌকায় পা দেওয়া। তখন বছরে একবার ঢাকা-নিউইয়র্ক করি। কোনো পিছুটান নেই। যখন ইচ্ছে চলে আসি। তো সেরকমই একবার বন্ধুদের না জানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন দেশে ফিরি সকালবেলা। বিকেলে সব ক্লান্তি ঝেড়ে চলে যাই বইমেলায়। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে সবাই। আমি তো বটেই, বন্ধুরাও আমাকে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। আহা কী সব দিন গেছে!

আজকাল মেলায় একবার-দু’বারের বেশি যাওয়া হয় না। আজ মেলার দশদিন চলছে। এখনও যাইনি। অফিসের কাজের প্রয়োজনে একটি বই খুঁজছিলাম ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’- অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির। বড়ভাই মেলায় ছিল, ওকে ফোন করে বললাম কিনে আনতে। তাতে বোঝা যাচ্ছে, মেলা যেমন বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছি আমিও।

এবার একটা মজার গল্প বলি। তখন বাংলা একাডেমির ভেতরে এক অংশে বেশ বড় পরিসর জুড়ে ছিল খাবারের স্থান। একবার ‘চুমুক’ নামে একটি দোকান ছিল সেখানে। কোন ফিচেল দুদিন যেতে না যেতেই সেই দোকানের সাইনবোর্ড থেকে ‘ক’ অক্ষরটিকে  সরিয়ে ফেলল।

পুকুরধারের বটতলায় মঞ্জুলি মৃদুকণ্ঠে গান ধরত, ‘আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা।’ প্রেমিক ও বিপ্লবী ইকবাল শক্তি চট্টেপাধ্যায়ের ‘অবনী বাড়ি আছো?’ কিংবা মায়োকোভস্কির কবিতা পড়ত। খোরশেদের ছিল নিজের লেখা কবিতা আর স্মৃতি থেকে বলা কত গান, কত কবিতা। প্রভা আবৃত্তি করত- ‘ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে।’ আমি জীবনানন্দ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু থেকে আবৃত্তি করতাম। বাংলা একাডেমির বইমেলায় ফেলে এসেছি আমাদের যৌবনের গান, কবিতা, আড্ডা আর কোনো কোনো একলা বিকেল!

একদিন এক তরুণ এসে আমাদের বন্ধু হতে চাইল। কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ। প্রাণে রবীন্দ্রনাথ। আমরাও তাই হাত বাড়ালাম অনায়াসে। এই বইমেলাতেই আমরা পাঁচ থেকে ছয়বন্ধুতে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আমাদের সেইসব দিনরাত্তির!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close