Home পঠন-পাঠন মাহফুজা শীলু >> হুমায়ূননামা

মাহফুজা শীলু >> হুমায়ূননামা

প্রকাশঃ November 12, 2017

মাহফুজা শীলু >> হুমায়ূননামা
0
0

মাহফুজা শীলু >> হুমায়ূননামা

 

হুমায়ূন আহমেদ লিখে গেছেন অজস্র। তার মধ্যে ভালোমন্দের হিসেবও থাকার কথা। তবে শেষকথা বলার আমি যেহেতু কেউ না- শুধু বলি তাঁর সহজ গদ্য আমার ভালো লাগে, তবে আমার পড়া বোশিরভাগ উপন্যাসই মনোযোগ ধরে রাখতে পারে নি। শাহজাদ ফিরদাউস থেকে শাহাদুজ্জামান, কতজনকেই তো পড়ি- তবু হুমায়ূন কেন যে কম পড়ি! তবে আবারও বলছি তাঁর স্মৃতিগদ্য বা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’-এর মতো লেখা ভালো লাগে।

‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসে শিলু নামের একটি চরিত্র আছে। পাশের বাড়ির মেয়ে, বেশ গান-টান শোনে। তো বেশ একটা মিল পেয়ে গেলাম আমার সঙ্গে। আমারও সাহিত্যপ্রীতি তখন ক্রমশ প্রকাশ্য। স্কুলে পড়ি। বড় ভাই ফেরদৌস সাজেদীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আমাদের বাড়ির যাবতীয় বইয়ের যোগানদার ছিল বড় ভাই এবং ছোড়দা মাসুদ সালেহীন। একজন পড়েছে ভেষজবিদ্যায় এবং একজন চিকিৎসাশাস্ত্রে। তবে পাঠক হিসেবে সর্বগ্রাসী। আমার সাহিত্যপ্রীতিও টের পেতে শুরু করেছে পরিবার। আমাদের বাড়ির জন্মদিনের উপহার ছিল বই। সেইসঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমিক হিসেবেও বেশ একটা পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে আমার। তবে পুষ্পচর্চা নয়, আমি পছন্দ করতাম বৃক্ষের গায়ে গায়ে লেগে থাকতে। সেরকম একটি আনন্দময় এবং প্রকৃতিময় পরিবেশে বড় হয়ে ওঠার মুহূর্তে হুমায়ূন আমাদের বাড়িতে এলেন এবং জয় করলেন। মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত পরিবারের এক চমৎকার গল্প আঁকতে শুরু করলেন তিনি। আর ভালো লেগেছিল বৈজ্ঞানিক গল্পকাহিনি ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা।’
এরপর পড়লাম ‘শঙ্খনীল কারাগার।’ দুটো বইয়ের নামই বেশ অন্যরকম। এবং বই দুটির নামেও ব্শে একটা মিল রয়েছে। নরক এবং কারাগার, দুটোই জীবনের কষ্টের কথা বলে। হুমায়ূন নিজেও কি সারাজীবন স্বেচ্ছা কারাগারে কাটিয়েছেন? নিজের খ্যাতির কাছে, জনপ্রিয়তার কাছে, মোহের কাছে, একাধিক প্রেমের কাছে!
সহজ করে, সহজ ভাষায়, সহজ মানুষের গল্প বলেছেন হুমায়ূন । অথচ তাঁর ব্যক্তিজীবন ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছিল। এমন কি তাঁর অসুখটি পর্যন্ত, যা ছিল অ-নিরাময়যোগ্য। ধন-সম্পদ-খ্যাতি, কোনো কিছুই তার জীবনের বিনিময় হয়ে উঠতে পারে নি।
আজ মৃত্যুর কথা থাক। আজ হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন।
হুমায়ুনের সহজ গদ্য আমার ভালো লাগে। কিন্তু কেন যে তার উপন্যাস আমাকে আর তেমনভাবে টানে নি! ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বইটি বছর কয়েক আগে পড়তে শুরু করেছিলাম। একদম বানিয়ে বলছি না, কয়েক পাতা পড়ে আর এগুতে পারি নি। এটা পাঠকের মৃত্যুর মধ্যে পড়ে কি?
মিসির আলী আর হিমুই বা কে? তারা কী খায়, কী পরে, আর কী-ই বা পড়ে, জানি না। শুধু অনেক হলুদ পাঞ্জাবি পড়া দিন এলে আশেপাশে শুনি হিমু বা হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন আজ।
বাংলাদেশের পাঠকসমাজকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যারা হুমায়ূন পড়েছেন আর যারা পড়েন নি। আমার অবস্থান মাঝামাঝি। কিছুটা পড়েছি। আড্ডায় অনেকটাই জেনেছি, দুর্দান্ত ভালো ছাত্র, সহজাত লেখার ক্ষমতা, নিত্যদিনের ছোটখাট ঘটনার মূল্যায়ন, বিজ্ঞানমনস্কতা, তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাÑতাঁকে যার-পর-নাই উচ্চাসনে বসিয়েছে। দুই বাংলা মিলিয়ে এমন লেখক দু’জনও কি পাওয়া যাবে? এখানে ভালো লেখক, মন্দ লেখকের তুলনা আসছে না। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার কল্যাণে জীবনের সঙ্গে জগতের একটি মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিলেন সহজে। কিন্তু হুমায়ূন আমার প্রিয় লেখক হয়ে উঠতে পারেন নি বা থাকতে পারেন নি, সেটা আমার ব্যর্থতাও হতে পারে। ( যদিও তাতে হুমায়ূন আহমেদের কোনোই ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি। বইয়ের কাটতিও একরত্তি কমেনি।)
উচ্চতর শিক্ষ গ্রহণ করে দেশে ফিরে এলেন হুমায়ুন। দুহাতে লিখতে শুরু করেন। তিনি সেই কাজটিই সারাজীবন করেছেন, যা করতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে তিনি ভাগ্যবান। গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা লিখেছেন। লিখেছেন গান। সিনেমা তৈরি করেছেন। জীবনকে নানাভাবে উপভোগ করতে চেয়েছেন। জীবন ছেনে আনা গল্পেরই কারিগর তিনি।
প্রতিদিনের জীবনের সাদামাটা ঘটনাও অভিনব উপস্থাপনার গুণে তাঁর নাটকে বিশেষ হয়ে উঠেছে। সূক্ষ পর্যবেক্ষকের মতো প্রতিটি চরিত্রকে এঁকেছেন। সেখানে বাড়ির সাহায্যকারী নারী বা পুরুষটিও নাটকের একজন বিশেষ মানুষ হয়ে ওঠে। নাটকের এই মানবিক দিকগুলো ঠিক এমন করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এর আগে কেউ আনে নি। কী ধারাবাহিক, কী একক নাটক, সবই দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।
‘ তীরন্দাজ’ এর জন্য হুমায়ন আহমেদকে নিয়ে লিখছি শুনে আমার এক বন্ধু বলল, শোন, হুমায়ূন আহমেদকে জনপ্রিয় করেছে তাঁর লেখা টেলিভিশন নাটক। সেটা লিখতে ভুলিস না।’ না, একদমই ভুলিনি। পুরো নাটক তো বটেই, নাটকের কোনো কোনো চরিত্রও হয়ে গেছে রীতিমতো ইতিহাস! ‘কোথাও কেউ নেই’ এর বাকের ভাই, ‘অয়োময়’-এর জমিদার, ‘এইসব দিনরাত্রি’র টুনি এইসব ইতিহাসেরই অংশ। টেলিভিশনের নাটকই বোধকরি হুমায়ূন আহমেদকে এতটা জনপ্রিয় করেছে।
বাজারে একটি চলতি কথা আছে, হুমায়ূন আহমেদ পাঠক সংখ্যা বাড়িয়েছেন। কথা সত্য। তবে কোয়ালিটি পাঠক বাড়াতে পেরেছেন কি? শিক্ষিত মধ্যবিত্তের পড়াশোনায় অবনমন কখন থেকে শুরু? কবে থেকেই বা বাংলাদেশের মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হারিয়ে ফেলে হয়ে পড়ে যেনতেন প্রকারের ভোগবাদী মানুষ। (কোনো কোনো ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে ধরছি না।) ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব, নানারকম সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অনিয়ম, দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে কিছুটা উন্মুল এবং উদ্বাস্তু করে দিয়েছে, যা শিল্প-সাহিত্যে প্রকাশমান।
হুমায়ূন আহমেদ লিখে গেছেন অজ¯্র। তার মধ্যে ভালোমন্দের হিসেবও থাকার কথা। তবে শেষকথা বলার আমি যেহেতু কেউ নাÑ শুধু বলি তাঁর সহজ গদ্য আমার ভালো লাগে, তবে আমার পড়া বোশিরভাগ উপন্যাসই মনোযোগ ধরে রাখতে পারে নি।
শাহজাদ ফিরদাউস থেকে শাহাদুজ্জামান, কতজনকেই তো পড়িÑ তবু হুমায়ূন কেন যে কম পড়ি!
তবে আবারও বলছি তাঁর স্মৃতিগদ্য বা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’-এর মতো লেখা ভালো লাগে।
শুভ জন্মদিন হুমায়ূন আহমেদ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close