Home ছোটগল্প মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > ঘাসের সত্যমিথ্যা দিন >> ছোটগল্প

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > ঘাসের সত্যমিথ্যা দিন >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ August 1, 2018

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > ঘাসের সত্যমিথ্যা দিন >> ছোটগল্প
0
0

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > ঘাসের সত্যমিথ্যা দিন >> ছোটগল্প

 

এভাবে জীবন দেখতে দেখতে রন্টি দেখতে পায়, সে একটি সবুজ মাঠে শুয়ে আছে আর ধীরে ধীরে ঘাস হয়ে যাচ্ছে, তার চারপাশ দিয়ে গরু চষে বেড়াচ্ছে, ছেলেরাও এসে ফুটবল খেলছে, কিন্তু রন্টি উঠে দাঁড়াতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না। ঘাসের যেহেতু হাত-পা-মুখ নেই সেহেতু রন্টি যে এসব পারবে না বলাটা বাহুল্য।

শহরের পরেও বাড়ছে শহর। সেই বাড়ন্ত শহরের শরীরে রন্টিকে পা রাখতে হয়। তার নতুন আবাস উপশহর বলে জায়গাটিতে। দূরে বাসা নেওয়ার কারণ হিসেবে অফিস কাছে এমন একটি কারণ বললেও রন্টির মা সেটা বিশ্বাস করতে চান নি। ছেলে যে ছোট থেকেই পালাতে চায়, কিন্তু পালাতে না পেরে বহুবার পালানোর ভান করেছে, এটা ওনার চাইতে ভালো আর কে জানে? ভেবেছে খেয়াল চেপেছে যাক, ক’দিন পরেই কেটে গেলে ঘরের ছেলে ফিরবে ঘরে। বাসা বদলানোর প্রথম দিনেই মহল্লায় সিগারেট খেতে বের হয়ে দূর থেকে তার চোখে পড়ে মাঠটি। বাজার থেকে একটু সামনে এগিয়ে মূল সড়ক থেকে নেমে হাতের বা& দিকে রাস্তাটিতে ওঠার পর মিনিট দশেকের পথ। এত সুন্দর সবুজ মাঠ কখনো দেখেছে কিনা মনে করতে না পেরে গোলপোস্টের সামনে যে জায়গা থেকে পেনাল্টি নিতে হয়, ঠিক সেখানে গিয়ে সোজা শুয়ে পড়ল রন্টি। দ্বৈপরিক রোদ তার চোখকে অন্ধ করে দিতে চাইলে সে বুঁজল চোখ। আর অনুভব করল মাঠের সবুজ তাকে এক মখমলি চাদরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে চাদরে বহুদিন আগে তার নানু নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যৎবাণী করতে করতেই মরে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর ঘণ্টা দুই কী তিন আগে বলেছিলেন, আর সময় নাই, যাই গা। সেই যে গেলেন আর তিনি ফিরলেন না। রন্টির এসব মনে পড়তে থাকে।
নানু চলে যাওয়ার আরও কয়েকমাস পরে রন্টি একদিন আবিষ্কার করল হঠাৎ করেই একটি বিশেষ ক্ষমতা সে পেয়ে গেছে। এই ক্ষমতা যে রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, কিংবা বৈষয়িক সংশ্লিষ্ট কিছু নয়, সেটা নিশ্চয় আপনারা বুঝতে পারছেন। এমনও হতে পারে, নানুর মৃত্যুর সঙ্গে মিলিয়ে একটা কিছু আন্দাজও করে ফেলছেন যা অবশ্যই করতে পারেন। চিন্তা এমন একটি ব্যাপার যার গতিপ্রকৃতি আমরা ঠিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আর সব চিন্তা যে পুরোপুরি ঠিক তার নিশ্চয়তা দেওয়াটাও ঠিক বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
নানুর নিজের মৃত্যুর কথা আগাম বলেছিলেন ঠিকই কিন্তু ঐ একটি ঘটনা ছাড়া পুরো পরিবারে স্বাভাবিক ভিন্ন অন্য কোনো ঘটনার কথা জানা ছিল না রন্টির। তাই প্রথম যেদিন জানতে পারল সেদিনই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। একবার, দুইবার করে একমাসের ভেতরে যখন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পেল তখন সে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। যদিও একটি ক্ষমতার কথাই মুখ্য, তবে যদি আপনি তাকে জিজ্ঞেস করতে যান, সে বলবে তার মূলত দুটো বিশেষ ক্ষমতা আছে। প্রথমটি হিসেবে সে বলবে তার যে-কোনো কিছু ভুলে যাওয়ার দক্ষতাটি, কিন্তু আদৌ এটাকে এমন কোনো বিশেষ কিছু বলা যাবে কিনা সেই তর্কে সে যাবেই না বরং বলবে যদি ভুলে না যেতাম তবে দ্বিতীয় ক্ষমতার তো দরকারই হতো না। তারপর যদি আপনি তাকে বলেন, ভুলেই যদি যাও সব তবে তোমার যে একটা ক্ষমতা আছে তা মনে রাখো কী করে? তখন সে আপনার সঙ্গে আর কথাই বলবে না। তবে এসব এই মাঠে শুয়ে থাকা রন্টির সঙ্গে মেলানো যাবে না। এই রন্টি হয়ত কিছুক্ষণ থেমে থেকে আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে, আমি একজন ক্ষমতাহীন মানুষ অথবা কিছুই বলবে না।


শুরুর গল্পটায় যেতে হলে রন্টির স্কুলের ফিরে যেতে হবে; ক্লাস এইট কী নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার সময়। তখনকার ঘটনা। পাশের উপজেলা থেকে খেলার জন্য তার ডাক পড়ল। ফুটবলার হিসেবে ভালো নামডাক হয়েছে তখন। লিকলিকে শরীর নিয়ে স্কুল গোল্ডকাপের ফাইনালে তিনজনকে কাটিয়ে দেয়া গোলটির কথা তো শহরের মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছে অনেকদিন। বাইরে খেলতে যাওয়ার প্রস্তাবও সেটাই প্রথম। সে ফেরায় কীভাবে? ওদিকে পরীক্ষার বাকি একমাস। এই সময়ে বাবা কি যেতে দেবে? তাও সাতদিনের জন্য? রন্টিকে অবাক করে দিয়ে বাবা রাজি হলেন। আর সাতদিন পর ফাইনালে হেড থেকে একটা গোল দেওয়ার আনন্দ নিয়ে ফেরার পথে দুর্ঘটনা ঘটল। বাসায় না ফিরে রন্টিকে যেতে হলো হাসপাতালে। বাবার অগ্নিচোখের কারণেই হোক, চিকিৎসকদের কারণেই হোক, রন্টি সুস্থ হলো বটে, কিন্তু পরীক্ষা ততদিনে দোরগোড়া পার হয়ে ঢুকেই পড়েছে ঘরের ভেতরে আর ঢুকেছে যখন প্রাণ না নিয়ে কি আর সে যাবে? রন্টি ভয়ে পরীক্ষার আগের রাতে বই মাথার নিচে রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর পরদিন সকালে সে বুঝতে পারল, বইয়ের প্রতিটি অক্ষর তার মনে গেঁথে আছে। এটা কোন জাদুবলে সম্ভব হলো? নিজেকে প্রশ্ন করে মিলল না উত্তর। পরীক্ষাও ভালো হলো খুব। পরদিন আবার একইভাবে ঘুমিয়ে পড়ল। আর সকালে উঠে দেখল, বইয়ের সবই সে জানে। এভাবে পুরো পরীক্ষাটা পার হলো। সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথম স্থান পেল রন্টি। আর তার পুরস্কার হিসেবে বাবার কাছে থেকে রাজধানীর এক বড় ক্লাবে খেলতে যাওয়ার অনুমতিও নিয়ে ফেলল। সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে, ডাহুক নগরের সেরা স্কুলে ভর্তি না হলেও নয়। ওখানে আবার এমনিতে সুযোগ মেলা কঠিন। রন্টি সুযোগ পেল খেলোয়াড় কোটায়। রন্টি তো বুঝেই গেছে তার না পড়লেও চলবে। পরীক্ষার আগের রাতে মাথার নিচে বই নিয়ে ঘুমালেই হলো। সমীকরণ মিলল না, নতুন স্কুলের প্রথম পরীক্ষায়। ঠিক একই পদ্ধতি খাটিয়ে পেলো শূন্য। প্রথমে সে মনে করল, মাঝে বিষয়টির চর্চা না করায় হয়ত এমন হলো। পরে অবশ্য বুঝতে পারল, ঠিক যেমনটা সে ভেবেছিল তেমনটা নয়। রন্টি সেই ঘটনা কিংবা স্মৃতিটি মনে করতে পারে যা সে যাপন করে এসেছে, যার সঙ্গে তার কোথাও না কোথাও একটা সংযোগ পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে আয়ত্তে চলে এলো রন্টির। পড়াশোনা থেকে ক্ষেত্রটা একটু বাড়ালো। যেমন একদিন মা’র সঙ্গে কপাল ঘষে নিজের জন্মের স্মৃতিটাও স্পষ্ট দেখে ফেলল।
জন্ম হবার পর প্রথমে সে কাঁদেনি। সাদা পোশাকের এক সেবিকা তার নিতম্বে সজোরে যে চপোটোঘাত করল তাতেও সে কাঁদেনি। সবাই যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছে প্রায়, তখনই সে কেঁদে উঠেছিল। এরপর মায়ের সঙ্গে এমন সে প্রায় করতে থাকল। থেমে গেল একদিন একটি অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতায়। দুই-তিন বছর বয়সের একটা স্মৃতিতে সঙ্গমকালীন বাবা-মাকে দেখতে পেয়ে সে এক ঝটকায় মা’র থেকে দূরে সরে গেল। ছেলে যে মাঝে মাঝে এভাবে এসে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাপারটা ভালো লাগত রন্টির মায়ের। তাই আচমকা এভাবে লাফ দেওয়ায় তিনিও অবাক হলেন। রন্টি কি আর সেখানে দাঁড়ায়? হুড়মুড় করে বের হয়ে পড়ল ঘর থেকে। আর তখন তার মনে হলো, কৈশোর পার হয়ে যাচ্ছে অথচ কোনো মেয়ের সঙ্গে তার কোনোদিন কথাই হলো না। রন্টির জীবন বাস্তবতা অবশ্য একরকম থাকল না। খেলতে গিয়ে একদিন হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। চিকিৎসক বলে দিলেন উন্নত চিকিৎসা না নিলে খেলা আর সম্ভব হবে না। বাড়তি আয়ের উপায় হলো বন্ধ, স্বপ্ন হলো ভঙ্গ। ওদিকে ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ভর্তিও হয়ে গেল সে। ক্লাস শুরুর কয়েকদিন পরেই কে বা কারা যেন ওর বাবাকে মেরে ফেললে রন্টিকে ভাবতে হলো টিউশনির কথা।
রন্টির অতীত সম্পর্কে আপাতত এটুকু জানলেই চলবে আপনাদের।


রন্টি যা পারে তা অন্যকেউ পারে না। আপনি আমার সঙ্গে তর্ক করতে পারেন এই বলে যে প্রতিটি মানুষ কর্মের দিক থেকে হলেও ভিন্ন। সম্পূর্ণ মিল পাওয়াটা অলীক বললেও ভুল হবে না। আমি তর্কের খাতিরে আপনার কিংবা আপনাদের কথা মেনেও নিতে পারি কিন্তু রন্টির এই গুনটি যে সত্যি অনন্য সে ব্যাপারে আমি আপোষ করব না। এতক্ষণ যা বলা হলো, তাতে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন রন্টির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু যা আছে তাও কম নয়। অথচ এমন ক্ষমতা নিয়ে তাকে এই উপশহরের মাঠে, তপ্ত দুপুরবেলায় ত্রস্ত মানুষের হুড়োতাড়া এড়িয়ে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। সে তো চাইলে বিশ্বজয় করতে পারে। কিন্তু রন্টির এই উদাসীনতা মেনে নেওয়া বোধহয় যায়। তাছাড়া ফুটবলার হবার স্বপ্ন ভেঙে যাবার পর নিদেনপক্ষে যে সে একটা ফুটবলের দোকান দিতে চেয়েও মার্কেটের লোকদের রাজনীতি ও চাঁদার দাবির কারণে পারেনি, সেই কারণেও জীবন সম্পর্কে নির্লিপ্ততা চলে আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই এই সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হলে দোষ হবে না- রন্টি আসলে স্বাভাবিক একজন মানুষ যে অন্য সবার থেকে একটি দিক দিয়ে আলাদা।
উপশহরের এই মাঠটিতে কখনো খেলেনি রন্টি। জানেও না মাঠটি সম্পর্কে। এদিকের কোনো ফুটবল দল নেই? নাকি ক্রিকেটের চাপে ফুটবল আর কেউ খেলেই না এখন? তাও যদি হতো, মাঠে একটা ক্রিকেটের ন্যাড়া পিচ হলেও তো থাকত, নিদেনপক্ষে ক্রিকেটে খেলার চিহ্ন। অথচ কী সবুজ এক মাঠ। রন্টির মনে হচ্ছিল, কেউ কোনোদিন এখানে পা রাখেনি। সেই প্রথম। একটা শিরশিরে অনুভূতি তার পা বেয়ে ঘাড় পর্যন্ত উঠে গেলে বুঝতে পেরেছিল শিহরিত হচ্ছে। কতদিন পর মাঠে পা রাখল সে। কয়েকমাস আগে একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তীব্র ঈর্ষা নিয়ে লোকটির দিকে তাকিয়েছিল। হাঁটুর ইনজুরির তোয়াক্কা না করে এখনো খেলে যাচ্ছেন। আর সে কিনা সুবোধ বালকের মতো ডাক্তারের কথা মেনে নিল?
মখমলের চাদরে শুয়ে নানু মৃত্যু কীভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, অনেকদিন পর এই প্রশ্নটাও তার মনে এলো। সে মনে করতে চাইল, নাতমিশার কথা। নাতমিশা তার ছাত্রী ছিল। দূরের স্মৃতি থেকে আবছাভাবে মনে পড়ল, নাতমিশাদের বাড়ির যে ঘরে সে পড়াতো, সেখানেই জানালার পাশে একটা খাটে নানুর সেই চাদরটা বিছানো থাকত। কখনো সেখানে অবশ্য শোয়া হয় নি। নাতমিশা যদিও কথা দিয়েছিল কিন্তু কথা রাখার আগে রন্টি নিজেই পিছিয়ে এসেছিল। এই ব্যাপারটি রন্টির মা’কে খুলে বললে তিনি বলবেন, ছেলেটা এমনই। কোনো কিছুতেই তার মন টেকে না। এদিকে তার বাবার মৃত্যুর কথাও ভাবা হয় না অনেকদিন। ওটা এমন একটা স্মৃতি যা সে মনে করতে চায় না। বাবাকে কারা মেরে ফেলেছিল এখনো জানতে পারেনি। তার মতো নিরীহ মানুষের শত্রু থাকার কথা নয়, মহল্লার পরিচিত সবাইও রন্টির কথার সঙ্গে একমত হবে। বাবার শার্টগুলো পড়লেই ভয়ের সব স্মৃতি হাজির হতো রন্টির সামনে। তিনি যে লুকিয়ে খেলা দেখতে যেতেন আর রন্টি গোল দিলেই উচ্ছ্বাসে লাফালাফি করে নিজের বয়স কমিয়ে ফেলতেন সেই সত্যটা রন্টি জানত। আর জানত বলেই, একদিন বাবার সব পোশাক, স্মৃতি সে পুড়িয়ে ফেলল। তাতেও মিলল না রক্ষা। আসবাবত্র এমনকি ঘরের বাতাসও যেন তাকে বারবার শৈশবে নিয়ে যেত, কৈশোরে নিয়ে একা রেখে চলে আসত আর রন্টি সেখানে ডাঙায় তোলা মাছের মতো নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ত। তাদের বাসাও বদলাতে হলো। এতদিনের বাসা কেন বদলানো হচ্ছে, সেই প্রশ্ন মা করেননি। হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন কিংবা না বুঝেও চুপ থেকেছিলেন। কিন্তু এবার বাসা বদলানোর পেছনে তেমন কোনো কারণ নেই। মা’র বয়স হয়েছে। সঙ্গে কারো থাকা দরকার, বিয়ের কথাও উঠছে প্রচুর, এজন্য যে সে পালিয়ে আসবে তা নয়। পালিয়ে এসেছে, আসতে ইচ্ছে হয়েছে, তাই। আসতে ইচ্ছে হয়েছে কারণ ইচ্ছের জন্য তেমন কোনো কারণ লাগে না। ইচ্ছের পেছনে কারণ লাগে না কারণ, কারণ শব্দটাই বড় অদ্ভুত।


মাঠে শুয়ে প্রত্যক্ষ স্মৃতির ভেতরে রন্টি শুধু মখমলের চাদরের কথাই মনে করতে পারে আর বাকিসব স্মৃতি দূর থেকে হাতড়াতে থাকে। ঐ মুহূর্তে মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যারা তাকে দেখেছিল সবাই পাগল ঠাউরে এড়িয়ে চলে গেছে। এমন সময়ে শূন্য মাঠে কেতাদুরস্ত পোশাক পরনে কে আর ওভাবে শুয়ে থাকে? শুয়ে থাকে তো থাকেই আবার শূন্যে হাত পা নাড়ায়? তাই কেউ গিয়ে তাকে আর ডাকছিল না। এলাকায় একেবারেই নতুন হবার কারণে একটা জন-উপদ্রবের সম্ভাবনা থাকলেও সেটা মিলিয়ে গিয়েছিল। আর মিলিয়ে যাওয়ার কারণেই হয়ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে রন্টির স্মৃতির ভেতর সাঁতার কাটতে পারে। এই সাঁতার কাটতে কাটতে অনেক সময় পার হতে থাকে। সন্ধ্যা হয়, সন্ধ্যা থেকে রাত হয়, রাত থেকে আবার সকাল হয়। এভাবে দিন পার হয়। দিনের পর দিন পার হতে হতে রন্টির সারা শরীর ঘাস হয়ে যায়। যেদিন ভোরে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটি সর্বশেষ অঙ্গ হিসেবে ঘাসে ঢেকে যায় সেদিন এলাকার কিছু গরু মাঠে চরতে আসে। তারা এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ঘাস খেতে থাকে। এতসব চলমান ঘটনার ভেতরেও রন্টির ধ্যান ভাঙে না। অথচ কেবল এক মখমলি চাদরের স্মৃতি দিয়ে কী এতটা সময় পার করা সম্ভব? সম্ভব হয়ত হতো না, যদি এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে নিজের পুরো জীবনটাই সে দেখতে না পেত। বলা যায়, দীর্ঘক্ষণ একভাবে সাঁতার কাটার ফলে রন্টির ক্ষমতা একটি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ফেলেছিল। এ কারণেই রন্টি তার জীবনের বহু যৌন-সম্পর্কের ভেতর একটি সূত্র খুঁজে পায়। তার কেবল সেইসব মেয়ের কথা ভেবেই মন খারাপ হয়, যাদের সাথে সঙ্গমের পর বুকে জড়িয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে যেতে পেরেছিল। আবার এমন-এমন মেয়েদের কথাও তার মনে হয়, যাদের সঙ্গে সে কিছুই করতে পারেনি। নাতমিশার কথা তো আপনাদের আগেই বলেছিল। নাতমিশাকে দেখে তার মনে হতো, মেয়েটার সঙ্গে গল্প করতে করতেই একটা জীবন হয়ত কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কারো সঙ্গে স্থায়ী কিছু হলো না ভেবে হয়ত রন্টির মাঠ থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। কোথায় যাবে সে? অপেক্ষায় নেই কেউ। এমন নয় যে রন্টি চেয়েছিল, তারপরও বিষয়টিকে আমরা বিবেচনায় রাখতে পারি। রাখতে না চাইলেও যে সমস্যা হবে তাও নয়। ওদিকে যৌনস্মৃতির ভেতরে বেশিক্ষণ আটকে থাকতে পারে না। তার বারবার বাবা-মায়ের সঙ্গমদৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায় এবং সেখান থেকে তাকে সরে গিয়ে খেলার মাঠে চলে যেতে হয়। তার রোনালদিনহোর করা একটি গোলের কথা মনে পড়ে যায়, মাঠের ডানপ্রান্ত থেকে করা ফ্রি কিক থেকে সরাসরি গোলের মতো একটি গোল যখন সেও দিয়েছিল, বাবা দর্শকের সারিতে বসে তখন শিশুর মতো লাফিয়ে উঠেছিলেন। সুতরাং, এই স্মৃতিতেও স্থির হতে না পারে রন্টি তার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে ফিরে যায় যেখানে তার রেজাল্ট ছিল সবচেয়ে ভালো। বন্ধুদের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করে সে কুঁকড়ে যায়। কথা বলছে, আড্ডা দিচ্ছে, ঘুরতে যাচ্ছে, তারপরও কোথাও যেন সে নেই। এভাবে জীবন দেখতে দেখতে রন্টি দেখতে পায়, সে একটি সবুজ মাঠে শুয়ে আছে আর ধীরে ধীরে ঘাস হয়ে যাচ্ছে, তার চারপাশ দিয়ে গরু চষে বেড়াচ্ছে, ছেলেরাও এসে ফুটবল খেলছে, কিন্তু রন্টি উঠে দাঁড়াতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না। ঘাসের যেহেতু হাত-পা-মুখ নেই সেহেতু রন্টি যে এসব পারবে না বলাটা বাহুল্য।

রন্টি ঘাস হয়ে হারিয়ে গেলে আমি কয়েকজনসহ বের হই অনুসন্ধানে। আমরা প্রথমে রন্টির বাড়িতে যাই। শুনি, এই নামে কেউ কখনো ছিলই না। বরং আমাদের দরজা খুলে দেয় নাতমিশা নামের অনিন্দ সুন্দর এক তরুণী, যে জানায়, আমরা ভুল বাসায় এসেছি। রন্টিরা হয়ত ঠিকানা বদলেছিল, তাই খোঁজ নেই প্রতিবেশীদের কাছে, তারাও রন্টির কথা জানাতে ব্যর্থ হয়। স্কুলে যাই। ও যে গোল্ডকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, নিশ্চয় কোনো না কোনো রেকর্ড থাকবে কোথাও। স্কুল কর্তৃপক্ষও আমাদের ফিরিয়ে দেয়। বলে, এই নামে কোনো ছাত্র সেখানে ছিল না। রন্টির ভালো নাম আমার জানা হয় নি, তাই এমন একটি সম্ভাবনাও থেকে যায় হয়ত, রন্টিকে আমরা ভুল নামে খুঁজে চলেছি। এভাবে সব জায়গাতেই রন্টিকে পেতে ব্যর্থ হয়ে আমরা সেই সবুজ মাঠটির কাছে যাই আর গিয়ে দেখি ওখানে মাঠ বলতে কিছু নেই, বরং সেটি বহুকালের পুরোনো কবরস্থান। আমরা করবস্থানের নামফলকে রন্টিকে খুঁজতে থাকি। সেখানেও তার দেখা পেতে ব্যর্থ হই।
এভাবে রন্টি একদিন আমাদের সবার স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যায়। কিন্তু রন্টির গল্পটা আমি বলছিলাম আপনাদের তাই মাঝে মাঝে ঐ কবরস্থানের ঘাসেদের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দেখলে আবার পাগল ঠাউরে বসবেন না। এই অনুরোধটা থাকল।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close