Home ছোটগল্প মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > লিয়ান্তিকা >> ছোটগল্প

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > লিয়ান্তিকা >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ July 30, 2017

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > লিয়ান্তিকা >> ছোটগল্প
0
0

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ > লিয়ান্তিকা >> ছোটগল্প

 

প্রস্তাবনা

জলাবদ্ধতার শহরে ঘরে বসে থাকার সময়ে আপনার নিজেকে বন্দি বলে মনে হতে পারে। নিজেকে মনে হতে পারে কয়েদির মতো। একদিক দিয়ে কয়েদিরা আপনার কিংবা আমার চাইতে বেশি ভাগ্যবান, কেননা তারা তাদের মুক্তির দিনক্ষণ সম্পর্কে জানে। আমি, আপনি যেমন জানি না, লিয়ান্তিকাও তেমন জানে না।

তো, এমন এক জলমগ্ন দিনে যেদিন শহর থেকে পানি শুরু করবে পালিয়ে যেতে,  জমে থাকা বৃষ্টির পানি দুর্গন্ধে পাগল হয়ে মুক্তি চাইবে, সেদিন লিয়ান্তিকা হাসপাতালের উদ্দেশে বের হবে রাস্তায় এবং নিজের অজান্তেই সত্যিকার কয়েদি হবার একটা সম্ভাবনার সূচনা করবে। লিয়ান্তিকা জেনে যাবে, মৃত্যু ছাড়া তার মুক্তি নেই। 

 

যা কিছু সম্ভাবনা

নগরের ব্যস্ত সড়কে তারচেয়েও ব্যস্ত পনের তলা হাসপাতাল। তার ঠিক উলটোদিকে গলিতে দুই পাশে দুই ভ্রাম্যমাণ সিগারেট বিক্রেতার মাঝ দিয়ে ধীরপায়ে ডানে-বায়ে একবার দেখে রাস্তা পার হবে লিয়ান্তিকা।

হাসপাতালের সিঁড়ি বেয়ে সে যাবে চারতলায়, ইচ্ছে করেই লিফট ব্যবহার করবে না। কর্পোরেট পোশাক পরনে কাস্টমার কেয়ার কিংবা অন্যান্য মানুষদের  এড়াতে  পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠবে সে। এক পা দু পা করে এগোবে, খেয়াল করবে সবশুদ্ধ ৩৬টি ধাপ পার হলে এক তালা পার হয়ে আসা যায়। মাথা নিচু করে সে গুনতে থাকবে, পরিচিত কারো চোখে পড়ার ভয়ে আড়ালে রাখবে নিজের মুখ। চারতলায় আসার পর অবশ্য নিজেকে এড়াতে পারবে না মনুষ্যজট থেকে। চেষ্টা হিসেবে মুখে ঘোমটা দিয়ে রাখবে।

পাশাপাশি দুটো ভয়ের নাম- আইসিউ ও করোনারি কেয়ার ইউনিট।  এই করোনারি কেয়ার ইউনিটের সামনে নীল স্টিলের জোড়া লাগানো ট্রিপলেট চেয়ারে বসবে লিয়ান্তিকা।

তারপর লিয়ান্তিকা হয়তো ভাববে ভেতরে শুয়ে থাকা একজন মানুষের কথা, যাকে তার ভীষণ অপ্রয়োজনীয় একটা কিছু একটা বলার ছিল। এতটাই অপ্রয়োজনীয় যে কথাটি না শুনে মরে গেলে তার কিংবা ছেলেটির জীবনে বাড়তি কিছু যুক্ত হবে না, এমনকি বাস্তবতা দুলে উঠবে না এক বিন্দুও।

তবু এসে বসবে লিয়ান্তিকা। ঘড়ি দেখতে চাইবে হাত উলটে, অথচ হাতে নেই তার । কিছুক্ষণ বসে থাকবে। উঠে বার দুয়েক এদিক সেদিক হাঁটবে। চলে যাবার আগে চেনা একজন চিকিৎসককে দেখতে পেয়ে বলে যাবে, আজ তবে আসি।

চিকিৎসক তাকে বলবে, তুমি এক কাজ করতে পার, ওনার পাশে বসে চুপচাপ যা বলার বলে যাও। প্রতিদিন এভাবে এসে ফিরে যাওয়া- ব্যাপারটা কেমন না?

লিয়ান্তিকা চমকে উঠবে,  তার চোখ বড় হয়ে যাবে। কপাল থেকে এক বিন্দু ঘাম তার চিবুক ছুঁয়ে যাবে। সেন্ট্রাল এসির কল্যাণে ঘাম সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে যাবে। চিকিৎসক তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবে ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে হাতে নেবার কথা- কারণ বাইরে প্রচুর গরম।
আমার বাসা কাছেই- লিয়ান্তিকা উত্তরে বলবে। কিংবা জানতে চাইবে, আপনি কীভাবে জানেন, আমি কিছু বলতে চাই?

চিকিৎসক বেশি কিছু বলার সুযোগ পাবেন না। কেননা তাকে বাকিসব রোগীর লোকদেরও ব্রিফ করতে হবে। সুতরাং, উত্তরটা ঠিকঠাকভাবে না নিয়েই লিয়ান্তিকাকে ফেরত যেতে হবে। ফেরত যেতে হবে, একই রাস্তা দিয়ে, একইভাবে। ঠিক যেন ফ্ল্যাশব্যাক।

বাইরে বের হলে রোদ নয় বরং বৃষ্টির সামনে পড়বে, যেহেতু এখন বর্ষাকাল এবং যখন-তখন বৃষ্টি নামে। খানিকটা কিংবা অনেকটাই সে বৃষ্টিতে ভিজে যাবে। দ্রুত পা চালাবে।  তার ভারি ফ্রেমের চশমার ফাঁকে চোখের জল বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যাবে। অশ্রু লুকানোর প্রাচীন পদ্ধতির শরাণাপন্ন হয়ে লিয়ান্তিকা বাড়িতে ঢুকবে।

খুব ভিজে গিয়েছিস। রাহসান কোথায়?

হ্যাঁ, আম্মা। ভিজে গেলাম। রাহসান তো আমার সঙ্গে বের হয় নি।

ছোট কথোপকথনটির শেষে লিয়ান্তিকা শোবার ঘরে চলে যাবে চুলের ক্লিপ খুলতে খুলতে। ভেজা চুলের অস্বস্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে তার ইচ্ছে হবে চুল কেটে ফেলার। ববকাট চুল হলে যেহেতু যখন তখন শুকিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু তা সে করবে না। করবে না তার পেছনে রোমান্টিক কারণ থাকতে পারে। যেমন সিসিইউ বেডে শুয়ে থাকা মানুষটি তার বড় চুল পছন্দ করত কিংবা করে অথবা রাহসান তাকে চুল কাটতে মানা করেছে। রাহসান যদি চুল কাটতে মানা করে থাকে সেক্ষেত্রে সে অনেকটা স্বৈরাচারি মনোভাবের বলে মনে করা যেতেই পারে, আবার সিসিইউয়ের মানুষটির জন্য হয়ে থাকলে নিঃসন্দেহে বিষয়টি সততার কাছে হেরে যাবে যে কেন একজন সম্পর্কহীন মানুষের জন্য লিয়ান্তিকা নিজের ইচ্ছা পূর্ণ করবে না। যদিও সরল চিন্তার মানুষেরা বিষয়টিকে সামান্য  ব্যাপার হিসেবেই দেখবে যে লিয়ান্তিকা আসলে এমনিতেই চুল কাটবে না, সাময়িক বিরক্তির কারণ হলেও সে হয়তো নিজের কেশ সৌন্দর্য নিয়ে বেশ গর্ববোধ করে।

মূলত এভাবেই আরেকটি সাধারণ দিন পার হয়ে যাবে। বৃষ্টি থেমে যাবে সন্ধ্যার পর পর। রাস্তায় এখানে সেখানে আবার পানি জমতে শুরু করবে। বাড়বে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ। রাহসান ফিরে আসবে দশটা নাগাদ।

দেরি হয়ে গেল?

অসুবিধে নেই। খাবে না?

উঁহু, খেয়ে এসেছি।

এরপর গেইম অফ থ্রোনের নতুন সিজনের এপিসোড নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে ল্যাপটপ। ব্যানিংটনের আত্মহত্যার পর নতুনভাবে লিংকিন পার্কের গান শুনবে লিয়ান্তিকা। আলমিরার বড় খোপে লুকানো গিটারটির কথা মনে পড়বে তার- যা আসলে সে কখনোই ভোলেনি কিন্তু কিছুই বলবে না। ডাউনলোড শেষে দুজন মিলে সিরিয়াল দেখবে এবং তারপর ঘুমোতে যাবে। রাহসান তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে, সেও হয়তো ধরবে কিংবা ফিরিয়ে দেবে। ফিরিয়ে দিতে পারে এমনিতেই- সবদিন মানুষের সবকিছু ইচ্ছা হয় না অথবা তার মনে পড়ে যেতে পারে লাভ লেইনে হাঁটার কথা যখন লিয়ান্তিকা সিসিইউতে শুয়ে থাকা মানুষটিকে চাঁদের আলোর নিচে চুমু দিতে চাই- এই কথাটা বলতে ভয় পেয়েছিল। মানুষটি কেবল তার বন্ধু, আর বন্ধুদের ঠিক প্রেমিকের মতো স্পর্শ করা যায় না- চিরন্তন সত্যের মতো এই কথাটি লিয়ান্তিকা নয় কেবল, আমাদের সকলের শৈশবের সঙ্গেই কেন বড় হয়- ভেবে সে রাহসানের পাশেই পুতুলের মতো ঘুমিয়ে পড়বে।

 

যেভাবে সম্ভাবনা তৈরি হবে

একদিন শাহবাগ থেকে বাংলামোটর যাবার পথে মানুষভর্তি হাওয়া-বাতাসহীন একটি বাস আচমকা ফুটপাতে উঠে এসে ভেঙে দেবে জীর্ণ দেয়ালকে। আহত হবে জনাকয়েক মানুষ । আরিশ নামের ছেলেটি যে কয়েকদিন পর নিজেকে খুঁজে পাবে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে সে নিজেকে আবিষ্কার করবে দেয়ালের ধ্বংসস্তূপের পাশে। অল্পের জন্য বেঁচে গেলাম, এই ভেবে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে এবং উদ্ধারে হাত লাগাবে। ঘেমে তার শার্ট যখন ভিজে লেপটে যাবে শরীরের সঙ্গে, তখন তার খুব পানির পিপাসা পাবে। মানুষের স্রোতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকবে আরিশ। পিজির গেটের কনফেকশনারি থেকে এক বোতল পানি নিয়ে ঢুকে পড়বে বটতলায়। বটতলার ছায়ায় বসে এক ঝটকায় বোতলের মুখ খুলে বোতলটি উপরের দিকে তুলে একবারেই সমস্ত পানি ঢেলে দিতে চাইবে। গলা বেয়ে শীতল পরশ নেমে গেলেই দেখতে পাবে লিয়ান্তিকাকে।

লিয়ান্তিকা বলবে, অনেকদিন পর।

আরিশ পুরো বোতল শেষ করবে, বোতলটি পাশে রেখে  বলবে- হ্যাঁ, অনেকদিন পর। তেলেনোপাতা আবিষ্কার করে ফিরলাম যে।

বোতলটি সরিয়ে লিয়ান্তিকা পাশে বসবে। তার হাতের ভেতর সেটি স্থানান্তরিত হতে থাকবে। সামনে দিয়ে এপ্রোন পরনের মানুষেরা হেঁটে যেতে থাকবে, কেউ কেউ তাদেরকে দেখে হাসিও দেবে। সবকিছু অগ্রাহ্য করে লিয়ান্তিকা বলবে- এবার বোকা বানাতে পারবি না। তেলেনোপাতা আবিষ্কার গল্পটি কিন্তু আমি পড়েছি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প। তুই সাজেস্ট করেছিলি অনেক আগে।

বলিস কী? খুব তো বিপদ হয়ে গেল। এবার শব্দ করে হাসবে আরিশ ।

বিপদ তো বটেই। সেই গল্পের মতো কোনো যামিনীকে ফিরে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে এসেছিস?

কিছু না বলে উঠে দাঁড়াবে আরিশ। তার পেছন পেছন লিয়ান্তিকাও। বলবে, আমি চিরকাল যামিনীদের ফেলেই আসি। জানিস তো তুই।

মাতাল পাগলাঘন্টি বেজে উঠবে লিয়ান্তিকার মনে। তাদের দুজনের ভেতর কিছু হলেও হতে পারত, সে চিরকাল যামিনী হয়েই থেকে গেল- দায়টা কার, এমন কথাও সে ভাববে এবং দেখতে পাবে আরিশের মনে কোনোদিনই হয়তো ঘন্টা বাজেনি। ঘন্টাটি হারিয়ে গিয়েছিল নাম না জানা গ্রামে।

ভ্রুক্ষেপ হবে না আরিশের। সে পিজির গেট দিয়ে বের হতে নিলে লিয়ান্তিকা বলবে, এমন পালিয়ে থাকিস কেন?

আরিশে সে কথা শুনবে কি শুনবে না, তার আগেই বসে পড়বে ফুটপাতে, তার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একজন মানুষ পড়ে যাবে, তাকে গালি দিতে গিয়েও দেবে না। আরিশের মুখে ফুটে উঠবে যন্ত্রনা, যেন মরে যাচ্ছে।

ঘাবড়ে যাবে লিয়ান্তিকা। সেও বসে পড়বে। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে মানুষ।

বুকে ব্যথা হচ্ছে। জহির ভাইকে ফোন দাও।

কোন জহির ভাই তাৎক্ষণিক বুঝবে না লিয়ান্তিকা। তারপর মনে পড়বে, আরিশ স্কয়ার হাসপাতালে জব করে , সেখানকার বড়ভাই তুল্য সিনিয়রের নাম জহির ভাই।

আরিশের মোবাইল হাতে নিয়ে সে জহির ভাইকে ফোন দেবে। এদিকে খানিক আগে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনার কারণে জ্যাম। জহির ভাইয়ের পরামর্শমতো সিএনজিতে উঠে যাওয়ামাত্র জাদুবলে, সব জ্যাম ছুটে যাবে। লিয়ান্তিকা নিজেকে আবিষ্কার করবে স্কয়ারের ইমার্জেন্সিতে।

তখন রাহসান তাকে ফোন দেবে। বলবে, তুমি কোথায়?

লিয়ান্তিকা বিস্তারিত কিছু না বলে এড়িয়ে যাবে।

শরীরটা খারাপ লাগছে। ফেরার পথে এন্টাসিড কিনে এনো।

আচ্ছা বলে ফোনটি রেখে ইমার্জেন্সির এক কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। মুহূর্তের ভেতরে তার অস্তিত্ব সেখান থেকে বিলীন হয়ে যাবে, সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে আরিশকে নিয়ে।

 

সম্ভাবনা যখন দেয়ালে আটকে যায়

রাহসান দুদিন বাদেই জানবে, আরিশ লাইফ সাপোর্টে।

এই লিয়ান্তি, তোমার লেখক বন্ধু আরিশ সে নাকি লাইফ সাপোর্টে?

ঘর গোছাতে গোছাতে সে জবাব দেবে- হ্যাঁ, লাইফ সাপোর্টে।

কীভাবে হলো?

হার্ট এটাক।

এত অল্প বয়সে? দেখতে গিয়েছিলে?

বালিশের নিচ থেকে মুরাকামির কাফকা অন দ্য শোর উপন্যাসটি হাতে নেবে লিয়ান্তিকা। তারপর ভাববে, এই উপন্যাসে জোঁকের বৃষ্টি হয়েছিল। সে  অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলবে, তুমি জোঁকের বৃষ্টি দেখেছ কখনো?

সদ্য কেনা ঘড়িটি নেড়েচেড়ে দেখা থেকে মুখ তুলে তাকাবে রাহসান। হাতে মুরাকামির বই দেখবে, তুমি আর তোমার সাহিত্য। আমি তো আরিশ নই, এসব ভালো বুঝি না। ও ফিরলে জানতে বরং ওর কাছেই জানতে চেয়ো।

রাহসানের বলার ভেতরে হয়তো অন্যকিছু থাকবে না, কিন্তু তারপরেও লিয়ান্তিকার ভেতরে আঁচড় কেটে যাবে। সে  ভাববে, কেন তারা একসঙ্গে থাকছে? বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হলে সে যেন নিজের শরীর নয় বরং দেখতে পাবে নিজের মন। আদৌ সে কখনো রাহসানকে ভালোবেসেছিল? ভালোবেসেছিল আরিশকে?

এমন নয় আরিশের সঙ্গে নতুন ভাবে দেখা হবার পর থেকে লিয়ান্তিকার ভেতরে ক্ষণে ক্ষণে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, যে কারণে সে সম্পর্কটা ভেঙে দিতে চাইছে। বরং অনেকদিন ধরেই সে দেখতে পাচ্ছে অন্তরে শ্যাওলা জমছে। কাছের এক বন্ধু জানতে চেয়েছিল, রাহসানকে তোর কেন ভালো লাগছে না আর?

ভালো লাগছে না, ব্যাস। তবে সে বলেনি, সংসারটাকে তার এক লোহার কারাগার বলে মনে হয়। বিনা বিচারে, বিনা ট্রায়ালে এখানে চলে এসেছে আর তার চিরকালীন শখ ছবি তোলা, গিটার বাজানো তুলে রেখেছে আলমিরার গভীরে। এই জেলটা যে সর্বক্ষণ খারাপ লাগে তাও নয়। মায়ায় জড়িয়ে আছে। ‘কোথাও এখনও মায়া রহিয়া গেল’- কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের এই লাইনটা আরিশ প্রায় বলত। মায়া কোথায় রয়ে যায়? এমন প্রশ্নের ভেতরেই শাওয়ার নেয়া শেষ হলেও লিয়ান্তিকা কোনো প্রশ্নের উত্তর পাবে না। বরং দেখতে পাবে আরিশকে তার জানাতেই হবে যে কথাটি সে লুকিয়ে রেখেছে নিজের কাছেও। বলেনি সেই বন্ধুকে, টের পেতে দেয়নি রাহসানকে।

সাতদিন পার হয়ে যাবে কাজে-অকাজে। বিশ মিনিট বের করাও তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।

সাতদিন পর পুনরায় সে রাস্তাটি ধরে যাবে। এই কদিনে একবারও খবর নেয়নি ভয়ে, যদি খারাপ খবরটি শুনতে হয়। ফেসবুকে ঢোকেনি। পাছে, চিরবিদায়ের খবরটি দেখতে হয়। সব শংকা দূরে ঠেলে লুকিয়ে নয়, সরাসরি লিফটে চলে যাবে গন্তব্যে। ভিজিটিং আওয়ারের সময়। ব্রিফিং রুমে উঁকি মেরে সে তার পরিচিত চিকিৎসককে খুঁজবে কিন্তু দেখতে পাবে না। তখন তার মনে পড়বে জহির ভাইয়ের কথা। গার্ডের কাছে জানতে চাইলে সহজে জহির ভাইয়ের সন্ধান পেয়ে যাবে।

আপনি সেই মানুষ? সময় মতো নিয়ে এসে বাঁচিয়েছেন বন্ধুকে। ওর আজকেই ছুটি হয়ে গেল।

সত্যি?

হ্যাঁ, আপনাকে খুঁজেছিল। বলল, ফোন নাম্বার নেই। আপনি দেখতে এসেছিলেন কিনা জানতে চেয়েছিল।

লিয়ান্তিকার কাছে আরিশের ফোন নাম্বার না থাকলেও জোগাড় করতে পারবে। সে জহির ভাইকে বিদায়  দিয়ে নিচে নামার সময় খেয়াল করবে, না বলা কথাটি বলার ইচ্ছা তার ভেতরে আর কাজ করছে না।

প্রাণ ফিরে এলে কথারা মরে যায় তা টের পেয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়বে। আবার খুশিও হতে পারে, এটা ভেবে যে গোপন বিষয় গোপন থাকা ভালো।

 

সম্ভাবনা ফিরে ফিরে আসে

শ্লেষ মাখানো কণ্ঠে রাহসান বলবে, আমাদের এভাবে একসঙ্গে থাকার অর্থ কী?

বাসায় বলতে পারবে তুমি?

না, তা পারব না।

তাহলে, এভাবেই চলুক। তুমিই তো আমাকে মেরে ফেলেছ রাহসান। যেভাবে চালাবে সেভাবেই চলব।

ঠিক ঝগড়া জন্য নয়, এমনিতেই কথোপকথন শুরু করে থাকবে রাহসান। কেননা, তাদের জীবনে বৈচিত্র নেই। মূলত একটা অভ্যাসকে বয়ে বেড়াচ্ছে তারা। তাই বলে, মেরে ফেলার অভিযোগ সে খুব সহজে গ্রহন করতে পারবে না। প্রতিবাদ করতে চাইবে কিন্তু তার আগে থামিয়ে দেবে লিয়ান্তিকা।

তুমি, ফ্যামিলের অজুহাত দিয়ে আমার গিটার বাজানো বন্ধ করেছ। করোনি?

সুতরাং, রাহসান চুপ হয়ে যেতে বাধ্য হবে। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য, সে ফেসবুকে ঢুকবে এবং খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে চিৎকার দিয়ে বলবে, তোমার বন্ধু আরিশ এক্সিডেন্ট করেছে।

লিয়ান্তিকাকে তাই পরদিন আবার ফিরে যেতে হবে  স্কয়ারে। এবার হৃদরোগ নয় , ব্রেন হেমোরেজ। ফলো আপে আসার সময় সড়ক দূর্ঘটনা।

সে অনুভব করবে অপ্রয়োজনীয় কথাটি বলার ইচ্ছা তার মাঝে আবার ফিরে এসেছে। সে দেখতে পাবে আইসিউ বেডে নিশ্চল আরিশের গায়ে নানা ধরনের টিউব লাগানো।  তার মনে হবে, আরিশের খবর দেবার সময় রাহসানের কণ্ঠে ছিল উচ্ছ্বাস। লিয়ান্তিকা আচমকা আরও দেখতে পাবে, আইসিউ বেডে কেবল রোগী নয়, তাদের দাম্পত্য সম্পর্কটাও কেমন লাইফ সাপোর্টে দিব্যি শ্বাস নিয়ে যাচ্ছে।

 

সম্ভাবনার মৃত্যু হলে

আরিশের মৃত্যুর খবরটা কোনোভাবে পেয়ে যাবে লিয়ান্তিকা। তারপর কিছুক্ষণ একা একা হেঁটে বেড়াবে। আরিশ তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সে গিটার বাজাতে পারত, গান গাইতে পারত, ছবি তোলার ছিল অদম্য শখ। যে সে ছবি নয়-ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি। সাঁতরাতে পারত খুব ভালো। প্যারাসেলিং করেছিল কক্সবাজারে। সবাই মানা করেছিল। সে এগিয়ে এসেছিল এটা বলে- অবশ্যই করবি, কেন নয়। বলা যেতে পারে তাকে আবিষ্কার করেছিল আরিশ।

সে সরি বলতে চেয়েছিল আরিশকে । কেননা, নিজের কোনো কিছুই আর সে ধরে রাখতে পারেনি। আরিশের মৃত্যুর পর সেই চাওয়া আর পূর্ণ হবে না। ধানমন্ডির রাস্তায় এক চক্কর বেশি হাঁটা হবে কেবল।

বাড়ি ফিরে চমকে উঠবে।  দেখতে পাবে, তাদের টেবিলের উপরে ব্যাংকের চিঠি। সেখানে নাম লেখা আরিশ আহমেদ রাহসান। তারপর দ্বিধায় পড়ে যাবে, আসলেই কি সে পিজির সামনে গিয়েছিল? আসলেই কি আরিশ নামে কেউ আজ স্কয়ারে মারা গিয়েছে? কয়েকমাসের যাপিত জীবন এক নিমিষে প্রশ্ন হয়ে তাকে আঘাত করবে। তার মনে পড়বে তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পটির কথা। ব্যাপারটা হয়তো তার পুরো জীবনটাই একটা তেলেনাপোতা আবিষ্কারের স্মৃতি, যা বলে আসলে কিছু নেই।

এভাবে সকল সম্ভাবনার মৃত্যু হলে, আর দশজনের মতো লিয়ান্তিকা ও আহমেদ রাহসান তাদের বাকি জীবনটা কাটিয়ে ফেলবে বিনা প্রশ্নে। অপেক্ষা করবে মৃত্যুর জন্য। নাম থেকে আরিশ নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটাও খেয়াল করবে না দুজনের কেউ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close