Home পঠন-পাঠন মাহ্ফুজা শীলু > আমার জীবনানন্দ >> জীবনের এইসব নিভৃত কুহক!

মাহ্ফুজা শীলু > আমার জীবনানন্দ >> জীবনের এইসব নিভৃত কুহক!

প্রকাশঃ October 27, 2017

মাহ্ফুজা শীলু > আমার জীবনানন্দ >> জীবনের এইসব নিভৃত কুহক!
0
0

মাহ্ফুজা শীলু > আমার জীবনানন্দ >> জীবনের এইসব নিভৃত কুহক!

“জীবনানন্দকে আমি তুলে তুলে পড়ি। প্রতিদিনের ঘরকন্নায়, অতি ব্যবহারে তাঁকে ক্লিশে করতে মন চায় না কেন যে!  সে আমার আকাঙ্ক্ষার ধন। ভালো কবিতা, মন্দ কবিতা বলে আমার কাছে কিছু নেই। আছে ভালোলাগা কবিতা, ভালো না লাগা কবিতা। জীবনানন্দের সব কবিতাই কি আমার ভালো লাগে? সব বুঝি? তা হয়তো নয়। তবে বেশিরভাগই ভালোলাগে। ভালোবেসে পড়ি।”

আমি যদি হতাম বনহংস;
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে
ধানখেতের কাছে
ছিপছিপে শরের ভিতর
এক নিরালা নীড়ে;
তাহলে আজ এই ফাল্গুনের রাতে
ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে
আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে
আকাশের রূপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম।

এই আমার জীবনানন্দ। আমার জীবনের আনন্দ। ওঁকে আমি এভাবেই চিনেছি। ভীষণ রোমান্টিক। কখনও কখনও এতটাই রোমান্টিক যে একেবারে এক ধাক্কায় প্রতিদিনের জীবনের বাইরে ফেলে দেয়।
‘আমি যদি হতাম’ কবিতাটি এত অসংখ্যবার আবৃত্তি করেছি যে এটা অনেকটা আমার সিগনেচার আবৃত্তি। আমি সংগোপনে কবিতার একটি লাইন কিছুটা বদলে আমার করে নিয়েছি।
আমি যদি বনহংসী হতাম
বনহংস হতে যদি তুমি!
কবিতাটির এই নারীকরণ কেউ কখনও ধরতে পেরেছে বলে মনে হয় না! তবে লাইনটি এরকম করে বললে আমার ভাবতে সুবিধে হয়।
‘তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন।’- আবৃত্তি করতে গিয়ে সেই স্পন্দন কত, কতবার নিজের মধ্যে অনুভব করেছি। এখানেই জীবনানন্দ আমার কাছে অনন্য। সদ্য কৈশোর পার হওয়া একটি সাধারণ মেয়ের মনে ঝড় তুলেছিল বনলতা সেনের জনক! না প্রেমিক!

কতবার নিজেকে সুরঞ্জনা ভেবেছি। ভেবেছি আমার হৃদয় আজ ঘাস! প্রকৃতির অন্যরকম পাঠ নিই জীবনানন্দের কবিতার শরীর ছেনে-
কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা
কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস-তেমনি সুঘাণ
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে!
আমারো ইচ্ছে করে ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে গেলাসে পান করি,
এই ঘাসের শরীর ছানি- চোখে চোখ ঘষি
ঘাসের পাখনায় আমার পালক
ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার
শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।
পৃথিবীর যত দেশে গেছি আমি, একবার হলেও সে দেশের কোনো একটি নদীতে পা ভেজাই আর খালি পায়ে ঘাসে হাঁটি! ‘ঘাসের শরীর ছানি- চোখে চোখ ঘষি।’
আর ভালোবেসেছিলাম ‘আট বছর আগের একদিন।’
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়
আরও কোন বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে।
ক্লান্ত, ক্লান্ত করে।
বিপন্ন বিস্ময়ের চেহারাটা আজও তেমন করে সনাক্ত করতে পারিনি, তবে ক্লান্তিটা অনুভব করি। সেই বয়সে যৌবনের আনন্দে কোনো ক্লান্তি ছিল না আমাদের। তবু শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে শোনা এই কবিতার ক্লান্তির উচ্চারণ আমাকে কী ভীষণ বেদনার্তই-না করেছিল একদা। এখনও আমি স্মৃুতি থেকে এই কবিতা মাঝে মাঝে পড়ি। জীবনানন্দকে যতবার পড়ি, ততবার নতুন মনে হয়, ততটাই প্রাসঙ্গিক।
যেখানেই যাও চলে, হয় নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা-বিচ্ছেদের কাহিনি ধূসর
ম্লান চুল দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্ক্ষার ঘর!
যখনই গভীর কোনো সংকটে পড়ি জীবনানন্দ এসে আমার হাত ধরেন। আমি তাঁর কাছ থেকে পাঠ নিই, ‘হয় নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর।’
কবুল করি, রবীন্দ্রনাথের গানে যা পাই, তাঁর কবিতায় তা পাই না। ‘তোমার আমার বিরহের এই অন্তরালে, কত আর সেতু বাঁধি!’ রবীন্দ্রনাথের এই গান আমার সঙ্গেও এক সেতু তৈরি করে, তবে তখন আমার নায়ক রবীন্দ্রনাথ নন, জীবনানন্দ!
আমরা স্মৃতির মধ্যে বাঁচি। অথচ জীবনানন্দ যখন বলেন, ‘স্মৃতিই মৃত্যুর মতো-।’ আমরা কী তাহলে মৃত্যুর মধ্যে বাঁচি! তাঁর মৃত্যুচেতনায় কী একটু বেশিই আবীর মেশানো!
আমি ঝরে যাবো- তবু জীবন অবাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর পরে
আমার সকল গান তবু তোমারে লক্ষ্য করে।
বা
আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো
খড়ের চালের’ পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার;
পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ:- অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো’
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ- মাঠে মাঠে
ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা: অশথের ডালে ডালে ডাকিয়াছে বক;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক।

জীবনানন্দকে আমি তুলে তুলে পড়ি। প্রতিদিনের ঘরকন্নায়, অতিব্যবহারে তাঁকে ক্লিশে করতে মন চায় না কেন যে! সে আমার আকাক্সক্ষার ধন।
ভালো কবিতা, মন্দ কবিতা বলে আমার কাছে কিছু নেই। আছে ভালোলাগা কবিতা, ভালো না লাগা কবিতা।
জীবনানন্দের সব কবিতাই কি আমার ভালো লাগে? সব বুঝি? তা হয়তো নয়। তবে বেশিরভাগই ভালোলাগে। ভালোবেসে পড়ি।
শেষ কথাটি চির প্রণম্য রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে বলি-
কিছু তার বুঝি না যে
কিছু তার আভাস মেলে!

মাহফুজা শীলু : কথাসাহিত্যিক। সাতরং পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close