Home অগ্রন্থিত মিখাইল কুরগানেৎসেভ > রুশ অনূবাদে নজরুল ও তাঁর কবিতা >> ভূমিকা-প্রবন্ধ >>> মেহরাব হাসান অনূদিত

মিখাইল কুরগানেৎসেভ > রুশ অনূবাদে নজরুল ও তাঁর কবিতা >> ভূমিকা-প্রবন্ধ >>> মেহরাব হাসান অনূদিত

প্রকাশঃ May 25, 2018

মিখাইল কুরগানেৎসেভ > রুশ অনূবাদে নজরুল ও তাঁর কবিতা >> ভূমিকা-প্রবন্ধ >>> মেহরাব হাসান অনূদিত
0
0

মিখাইল কুরগানেৎসেভ > রুশ অনূবাদে নজরুল ও তাঁর কবিতা >> ভূমিকা-প্রবন্ধ >>> মেহরাব হাসান অনূদিত

 
[সম্পাদকীয় নোট : এটি একটি অসাধারণ দুষ্প্রাপ্য বিরল রচনা । মূল রুশ থেকে এই প্রথম বাংলায় অনূদিত হলো। মূল লেখাটি লিখেছেন রুশ ভাষায় নজরুল রচনাবলীর একজন প্রখ্যাত অনুবাদক-সম্পাদক মিখাইল কুরগানেৎসেভ। লেখাটি ছোট, কিন্তু এত গভীর যে, বাংলা ভাষাভাষি কোনো সমালোচক নজরুলের কবিতা বৈশিষ্ট্য এভাবে সনাক্ত করতে পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এখানে উল্লেখ্য, অন্যান্য অনেক ভাষার মতো রুশ ভাষাতেও কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা অনূদিত হয়েছে। এটি ছিল রুশ ভাষার পাঠকদের কাছে একটি সুখপ্রদ ঘটনা। রুশ পত্র-পত্রিকায় এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই অনন্য সাধারণ বাঙালি কবির প্রতিটি অনূদিত বই বা রচনা-সমগ্রের জন্য রুশসহ প্রাচ্যদেশীয় কবিতার ভক্তমাত্রই প্রতীক্ষা করে থেকেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের নাম সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নেও ছিল বেশ সুপরিচিত। ১৯৬৩ সালে তাঁর কবিতার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পর জনপ্রিয় সাময়িকীগুলোতে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো নিয়মিত ছাপা হতে থাকে এবং ১৯৬৫ সালে লেনিনগ্রাদ থেকে প্রকাশিত বাংলা কবিতা সংকলনে স্থান পায়। নজরুলের অনূদিত কবিতার এক-একটি খণ্ড প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়। নজরুলের কবিতার অধিকাংশই তখন “এশিয়া অ্যান্ড আফ্রিকা টুডে” পত্রিকার সাহিত্য ও চিত্রকলা বিভাগের প্রধান মিখাইল কুরগানাৎসেভ কর্তৃক রুশ ভাষায় অনূদিত হয়। তিনি প্রথম খণ্ড অনুবাদের পর দ্বিতীয় খণ্ড অনুবাদেও হাত দেন। সেই দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকা হিসেবে তিনি যে লেখাটি লেখেন, সেই ভূমিকাটি তীরন্দাজে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।]

 
১৯৫৮ সালে এশিয়া ও আফ্রিকার লেখকদের তাশখন্দে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আমি প্রথম নজরুলের কবিতার আবৃত্তি শুনি। কবিতাগুলোর মৌলিক সুরেলা প্যাটার্ন ও গতিময় ছন্দ আমার মন কেড়ে নেয়। আমি এই কবির গভীর প্রেমে পড়ে গেলাম এবং রুশ ভাষায় তাঁর কবিতা অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিলাম, যাতে আমার দেশের মানুষ তাঁর অসাধারণ ও মৌলিক প্রতিভার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে এবং তাঁর সুন্দর কবিতা আমাকে যে অপার আনন্দ দিয়েছে, তার রস গ্রহণ করতে পারে।
নজরুল ইসলামের বহুমুখী সাহিত্যকর্ম বিশেষ করে তাঁর কবিতার গভীর সামাজিক আবেদন আমাকে আকর্ষণ করে। সমসাময়িক ঘটনা প্রবাহে তিনি তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছেন, অত্যাচারিতদের প্রতি তিনি গভীর সহানুভূতি পোষণ করেন এর উন্নততর ভবিষ্যৎ এবং অসুন্দরের ওপর সুন্দরের বিজয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী।
নজরুল বিশ্বাস করেন যে, মানুষের সুখের জন্য সংগ্রাম সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সামগ্রিক মুক্তি-সংগ্রামেরই নামান্তর। স্বদেশের মানুষের জন্য হৃদয় তাঁর বেদনাবিদ্ধ। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পবিত্র সংগ্রামে নিজ নিজ মেধা ও সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করার জন্য তিনি তাঁর সমসাময়িক কবি ও লেখকদের প্রতি আহ্বান জানান।
নজরুলের আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য যা তাকে লক্ষ লক্ষ পাঠকের অতি আপনজনে পরিণত করেছে সেটি হলো তাঁর দীপ্ত মানবিকতা, মানুষের বিপুল ক্ষমতায় তাঁর অগাধ বিশ্বাস। নজরুলের কবিতাকে মানুষের স্তবগীতি বললে অত্যুক্তি হবে না। মানুষকে তিনি সর্ব রকমে বড় করে তুলেছেন। মানুষের মর্যাদাবোধকে তিনি সুদৃঢ় করেন, তার আত্মার মুক্তি-প্রয়াসকে জোরদার করেন, গোঁড়ামি কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের নিন্দা করেন এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা দাবি করেন।
নজরুল ইসলামের কবিতা বহুমুখী এবং ‘স্টাইলে’র দিক থেকে নিখুঁত। তিনি নতুন নতুন ছন্দ ও কাব্যরীতির এক আশ্চর্য প্রবর্তক। তিনি কবিতার কতিপয় মান্ধাতা আমলের নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে সাহসের সঙ্গে নতুন নতুন ছন্দ ও রূপকল্প প্রবর্তন করেন, যা তাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর সমসাময়িক কালের মানুষের ধ্যান-ধারণা ও অনুভূতি ব্যক্ত করতে সক্ষম করেছে। জনস্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে শিল্পকে একটি হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য এবং ব্যাপক জনগণের নিকট শিল্পকে বোধগম্য করে তোলার জন্য তিনি যে চেষ্টা করেছেন, তার দরুন তাঁকে প্রখ্যাত রুশ কবি মায়াকোভস্কির সঙ্গেও তুলনা করা যায়।
নজরুলের কবিতার এই দ্বিতীয় খণ্ডটিতে প্রথম খণ্ডের প্রায় দ্বিগুণ কবিতা স্থান পেয়েছে। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের মধ্যে যে পার্থক্য সেটা হলো এই যে, প্রথম বইটিতে নজরুলকে আমাদের পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে গণ-অধিকারের একজন প্রবক্তা হিসেবে। একজন কবি-মানবতাবাদী রূপে, আর নতুন খণ্ডে তাঁর কবিতায সূক্ষ্ণ গীতিময়তার সঙ্গেও পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার এই উজ্জ্বল দিকটি আবিষ্কার করার সময় আমি নিজে তাঁর গভীর প্রত্যয়শীল গীতিধর্মিতার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে যাই।
নজরুলকে অনুবাদ করা ভীষণ দুরূহ কাজ, কারণ তিনি সেইসব কবিদের অন্যতম, যাঁদের কবিতা সরলীকরণের সইতে পারে না। তাঁর কবিতার গভীর মর্মবাণীকে বিকৃত করার ঝুঁকি না নিয়ে তাঁর কবিতা থেকে কোনো কিছু ছেঁটে ফেলা বা তাতে কোনো কিছু জুড়ে দেয়া সম্ভব নয়। আমি নজরুলের কবিতার লৌহকঠিন যুক্তি, বলিষ্ঠ রূপকল্প এবং অন্তর্নিহিত সততার ভূয়সী প্রশংসা করি।
রুশ শব্দ ও অভিব্যক্তির সাহায্যে নজরুল ইসলামের বাণীকে প্রকাশ করতে গিয়ে আমি তার কবিতার সাংগীতিক ছাঁচ, মৌলিক ছন্দ ও শ্রুতিমাধুর্য অক্ষুন্ন রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কবি যে বাংলায় লিখেছেন সেকথা যাতে আমাদের পাঠকদের মনে না হয়, তারা যাতে তাঁর কবিতার প্রতি স্তবকের প্রাণমাতানো মাধুর্য উপভোগ করতে পারেন, সেটাই চেয়েছি আমি। কতটা কৃতকার্য হয়েছি সে বিচারের ভার আমার পাঠকদের উপর।
নজরুলের কবিতা অনুবাদ করে বিপুল সৃষ্টিশীল আনন্দ পাই। একের পর এক কবিতা অনুবাদ করতে করতে আমি এই বহুমুখী কবির শক্তিশালী প্রতিভার দ্বারা গভীর থেকে গভীরতরভাবে মোহিত হয়ে পড়ি। নজরুল ইসলাম দার্শনিক কবিতা, বিপ্লব-বন্দনা বা বিপ্লবী কবিতা, কোমল ও অন্তরঙ্গ গীতিকবিতা এবং কৃষকদের গান রচনা করেছেন। তিনি একজন বিদ্রোহী, একজন নাগরিক এবং এক অবিচল সত্যসন্ধানী পুরুষ এবং সুন্দরের উৎসাহী অনুরাগীও বটে।
নজরুলের অসাধারণ কবিত্বগুণ, তাঁর শৈল্পিক রুচি কবিতায় আনায়নের ক্ষমতার একজন বিশেষ অনুরাগী বলে আমি তাঁর কবিতা অনুবাদ করে যাবো এবং আমার প্রিয় কবির চমৎকার কবিকর্মের সঙ্গে রুশ পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবো।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close