Home অনুবাদ মিলান কুন্ডেরা / ৬৩টি শব্দ > রেশমী নন্দী অনূদিত

মিলান কুন্ডেরা / ৬৩টি শব্দ > রেশমী নন্দী অনূদিত

প্রকাশঃ April 9, 2017

মিলান কুন্ডেরা / ৬৩টি শব্দ > রেশমী নন্দী অনূদিত
0
1

 

[সম্পাদকীয় নোট : মিলান কুন্ডেরা- প্যারি-প্রবাসী এই চেক বংশোদ্ভুত ঔপন্যাসিককে মনে করা হয় এইসময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বা সেরা ঔপন্যাসিক। শুধু ঔপন্যাসিক নয়, ভাবুক বা চিন্তাবিদ হিসেবেও ভীষণ খ্যাতিমান। বিশেষ করে, শিল্পসাহিত্য (উপন্যাসসহ) নিয়ে গভীর ভাবনা আছে তাঁর। “৬৩টি শব্দ” (Sixty-three Words) শীর্ষক প্রবন্ধটিও এরকমই একটা প্রবন্ধ। তাঁর ভাবনা যে কত গভীর, প্রবন্ধটি পড়লেই তা বোঝা যায়। এই প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছে কুন্ডেরার The Art of Novel বইতে। তিনি ৬৩টি পারিভাষিক শব্দকে ধরে যেভাবে তাঁর ভাবনাকে বিস্তার দিয়েছেন, এককথায় তা অভাবনীয়। আমরা সেই ৬৩টি শব্দের নয়, নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ পারিভাষিক শব্দের অনুবাদ এখানে উপস্থিত করছি।]

১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যেই পশ্চিমা প্রায় সব ক’টি ভাষায় আমার ”The Joke” লেখাটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়।  কিন্তু কি আশ্চর্য!

ফরাসি দেশের অনুবাদক আমার লেখার ধরন ঠিক রেখে উপন্যাসটির পূনর্লিখন করেন। ইংল্যান্ডে বইটির প্রকাশক ভাবনার জন্ম দিতে পারে এমন সব অনুচ্ছেদ ছেটে, সুধাময় অধ্যায়গুলো বাদ দিয়ে, লেখার নানান অংশ এদিক-সেদিক সরিয়ে নতুন করে জন্ম দেন উপন্যাসটির। অন্য আরেক দেশে আমার বইয়ের এমন এক অনুবাদকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল যিনি এক-অক্ষর চেক ভাষা জানেন না। ”আপনি তাহলে আমার লেখার অনুবাদ কি করে করলেন?” ” হৃদয় দিয়ে,” বলেই তিনি তাঁর মানিব্যাগ থেকে আমার ছবি বের করে দেখালেন। এতটা স্বাভাবিকভাবে তিনি কথাটা বলেছিলেন যে আমি প্রায় বিশ্বাস করে ফেলছিলাম, আসলেই কারো পক্ষে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে হৃদয়ের কথা জেনে তা অনুবাদ করে ফেলা সম্ভব।  অবশ্য পরে দেখা গেলো বিষয়টা আসলে আরো সহজ। আর্হেন্তিনার অনুবাদকের মতো তিনিও ফরাসি ভাষা থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন। যেহেতু সত্যিকার অর্থেই চেক ভাষায় আমার লেখার কোন পাঠক নেই, আমার জন্য অনুবাদ-ই সব। সেজন্যই কয়েক বছর আগে আমি ঠিক করি, বিদেশী ভাষায় অনুদিত আমার লেখায় কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবো। কিন্তু কাজটা নানা দ্বন্দ্ব আর অবসাদে আমাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। যে তিন-চারটি বিদেশী ভাষা আমি পড়তে পারি, সেগুলোতে অনূদিত নতুন পুরাতন লেখাগুলো পড়া, ঠিকঠাক আছে কিনা মিলিয়ে নিয়ে সংশোধন করা- এসব কাজ আমার সবটুকু সময় নিয়ে নিচ্ছিল।

যে লেখক নিজের লেখার অনুবাদের কাজ তত্ত্বাবধান করার সিদ্ধান্ত নেন,  তিনি অনেকটা রাখালের বন্য ভেড়ার পাল সামলানোর মতো করে তাঁর নিজের লেখা অক্ষরের দঙ্গল তাড়িয়ে বেড়ান, যা তাঁর নিজের পক্ষে শোচনীয় আর অন্যদের জন্য হাস্যকর। আমার মনে হয় আমার বন্ধু  “লা দিবা” ম্যাগাজিনের সম্পাদক পিয়েরে নোরাও আমার দুঃখের দিকটা ধরতে পেরেছিলেন। একদিন ও সমবেদনা জানানোকে আড়াল করার তেমন কোন চেষ্টা না করেই বললো, “দেখো, এই যন্ত্রণা বাদ দাও, বরং আমার জন্য কিছু একটা লেখো। এই অনুবাদগুলো তোমাকে বাধ্য করেছে তোমার লেখা প্রত্যেকটা শব্দ নিয়েল আলাদাভাবে চিন্তা করতে। বরং তুমি তোমার নিজের জন্য একটা অভিধান লেখো। তোমার উপন্যাসের জন্য একটা অভিধান। তুমি তোমার উপন্যাসের মূল শব্দগুলো, যেসব শব্দ তোমাকে ঝামেলায় ফেলছে সেগুলো, যে শব্দগুলো তুমি ভালোবাসো, সেগুলো, সব লিখে ফেলো।”

এগুলোই সেই শব্দ।

APHORISM। গ্রীক শব্দ aphorismos থেকে এর উৎপত্তি যার অর্থ ‘সংজ্ঞার্থ’ (definition)। Aphorism : সংজ্ঞার কাব্যিক রূপ (দ্রষ্টব্য DEFINITION)।

BEAUTY (এবং জ্ঞান)। হারমান ব্রোখের  চেতনা মর্মে ধারণ করে যারা জ্ঞানকে উপন্যাসের একমাত্র সারবস্তু ধরে নেন, তারা  শব্দটির নিজস্ব দীপ্তিকে অস্বীকার করেন। এটা এমন একটা শব্দ যা বিজ্ঞানের সাথে যোগসূত্রের কারণে তার নিজস্বতার অনেকটুকু হারিয়েছে। কাজেই আমাদের যোগ করতে হচ্ছে : একটি উপন্যাসে অস্তিত্বের যতগুলো দিক-ই উন্মোচিত হোক না কেন, সবই সৌন্দর্যের নানা প্রকরণ। শুরুর দিককার ঔপন্যাসিকরা তুলে এনেছিলেন দুঃসাহসিকতাকে। কৃতজ্ঞতার সাথে বলতে হচ্ছে যে, তাঁদের কারণেই আমাদের মনে হয়েছে দুঃসাহসিকতা মানে চমৎকার কিছু একটা আর আমরা এর প্রেমে পড়ে যাই। কাফকা মানুষকে বর্ণনা করেছেন দুঃখের জালে জড়িয়ে পড়া পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। কাফকা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘদিন তর্ক ছিল যে লেখক পাঠককে আদৌ কোন আশা দিচ্ছেন কিনা। না, কোন আশা নয়, অন্য কিছু। কাফকার বর্ণনায় জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া পরিস্থিতিও অদ্ভুত, ভয়ংকর সৌন্দর্যময়। যে-মানুষের সামনে কোন আশা নেই,  সৌন্দর্যই তার শেষ ভরসা । Beauty in art: হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো উদভাসিত  কিছু একটা যা আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি। অসাধারণ উপন্যাসের এই দ্যুতি সময়ের ফেরে ম্লান হয় না, কারণ চিরদিনই মানুষ তাঁর নিজস্ব অস্তিত্ব ভুলে থাকে, সেজন্যেই ঔপন্যাসিকের এ সত্যানুসন্ধান যখন তার সামনে চলে আসে, যত পুরোনোই  হোক, মানুষ বিষ্মিত না হয়ে পারে না।

সত্তা (BEING)। আমার অনেক বন্ধুই আমাকে ”The Unbearable Lightness of Being” বইটির নাম বদলাতে উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি কি অন্তত ”being” শব্দটা বাদ দিতে পারি না? এই শব্দটা নিয়ে অনেকে বেশ অস্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যখনই এটা অনুবাদ করার প্রয়োজন হয়, তখনই বিকল্প নানা ধরনের শব্দ যেমন ”existence,” ”life,” ”condition” ইত্যাদি এই শব্দটার বদলে বসিয়ে দেন অনুবাদকেরা। এক চেক অনুবাদক একবার শেক্সপীয়রকে অনুবাদে হালনাগাদ করার চেষ্টা করে লেখেন, ”To live or not to live…”। এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমেই  “living” আর “being” এর পার্থক্যটা স্পষ্ট ধরা পড়ে। যদি মৃত্যুর পরও আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি, যদি মরে যাওয়ার পরও থেকে যায় কিছু একটা, তবে জীবনের এই সমাপ্তি আমাদের অস্তিত্বের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দেবে না। হ্যামলেট সেই অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, জীবন নিয়ে নয়। The horror of being- ”মৃত্যুর দুটি রূপ। এক, অস্তিত্বের বিলুপ্তি, অন্যটি ভয়জাগানিয়া মৃত শরীরের জাগতিক অস্তিত্ব।” (”The Book of Laughter and Forgetting” থেকে উদ্ধৃত)।

মধ্য-ইউরোপ (CENTRAL EUROPE)। সপ্তদশ শতাব্দী : বারোকের (baroque) প্রচণ্ড প্রভাব এই অঞ্চলে একধরনের সাংষ্কৃতিক ঐক্যের জন্ম দেয়, যা একই সাথে বহুজাতিক ও বহুমুখী এবং ক্রমাগত অনির্ধারিত দিক বদলকারী। এর প্রলম্বিত অস্তিত্ব ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতেও : ভলতেয়ার নেই, ফিল্ডিংও নেই। শিল্পের শ্রেণিবিভাজনে সঙ্গীতের অবস্থান সবার উপরে। হেইডেন থেকে শুরু হওয়া (শোয়েনবার্গ এবং বার্টক পর্যন্ত) ইউরোপীয় সঙ্গীতের মূল কেন্দ্র ছিল সেখানে। ঊনবিংশ শতাব্দী : কয়েকজন মহান কবির অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু ছিলেন না ফ্লবেয়ার; বিইডারমাইয়ার (Biedermeier) ভাবাদর্শ : বাস্তবতাকে কাল্পনিক শান্তির আড়ালে ঢেকে রাখা। বিংশ শতাব্দী, দ্রোহী। সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদরা (ফ্রয়েডসহ অন্য ঔপন্যাসিকরা) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকৃতি ও বিস্তৃতির আড়ালে চাপা পড়ে থাকা বিষয়কে তুলে আনেন; করে তোলেন যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রাঞ্জল; উপন্যাসে দেন বাস্তবতার অনুভব। ফরাসি আধুনিকতাবাদের মতো অযৌক্তিক, বাস্তব-বর্জিত, ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া (অনেক ভুল বোঝাবুঝির কারণ এটি) বিপ্লবের পুরোপুরি বিপরীত এই বিদ্রোহ।

ইউরোপীয় সাহিত্যের সাত দিকপাল ঔপন্যাসিক : কাফকা, হাজেক, মুসিল, ব্রোখ, গমব্রোভিচ (Kafka, Hasek, Musil, Broch, Gombrowicz): প্রেমাবেগময়তা থেকে তাঁদের দূরে থাকার প্রবণতা; বালজাকপূর্ব সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার প্রতি তাঁদের ভালবাসা  (ব্রোখ “kitsch”-কে দেখেছেন দীপ্তিময়তার বিপরীতে অতিনৈতিক একমুখি চক্রান্ত হিসেবে); ইতিহাস এবং মহিমান্বিত ভবিষ্যতের প্রতি তাঁদের অবিশ্বাস; তাঁদের আধুনিকতা যার সাথে অগ্রগামিতার বিভ্রম কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়।

হাবসবার্গ সাম্রাজ্যের পতন এবং ১৯৪৫ সালের পর অস্ট্রিয়ার সাংষ্কৃতিক প্রান্তিকতা, সেই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনস্তিত্বের ফলে মধ্য-ইউরোপে উদ্ভুত পরিস্তিতি সমগ্র ইউরোপকে জানিয়ে দেয় যে সম্ভাব্য ভবিতব্যটা কী হতে পারে। মধ্য-ইউরোপ: সন্ধিক্ষণের পরীক্ষাগার।

কৌতুক (COMIC)। জীবনের দুঃখজনক পরিণতিতে মানবজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের বোধে বিভ্রম আনে প্রবোধ। প্রহসন নির্দয় : সমস্ত কিছুর অর্থহীনতাকে তুলে ধরে নির্মমভাবে। আমি মনে করি মানুষের যা কিছু আছে সবকিছুরই একটা হাস্যকর দিক রয়েছে, যেগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে উন্মোচিত হয়, স্বীকৃত হয়, ব্যবহৃত হয় আর অনেকক্ষেত্রে চাপা পড়ে থাকে। কৌতুকের প্রকৃত প্রতিভা সবচেয়ে বেশি কে হাসাতে পারলো তাই দিয়ে নয়, বরং অন্তর্গত অজানা কোনো সত্যকে উন্মোচিত করতে পারলো কিনা তাই দিয়ে বিচার্য। ইতিহাসকে সবসময়ই গুরুগম্ভীর বিষয় বলে ধরা হয়, কিন্তু ইতিহাসেরও রয়েছে কিছু অনাবিষ্কৃত কৌতুককর দিক, যেমনটা রয়েছে যৌনতায় (মেনে নিতে কষ্ট হলেও)।

সংজ্ঞার্থ  (DEFINITION)। উপন্যাস-ভাবনার জমিন কয়েকটি বিমূর্ত পরিভাষার  অধীন। আমি যদি এই ধরনের গাড্ডায় পড়তে না চাই যেখানে প্রত্যেকেই ভাববে যে সে সবটুকু বুঝেছে- কোনো কিছু না বুঝেই, আমাকে কেবলমাত্র স্পষ্ট করে সেসব শব্দ উচ্চারণ করলেই হবে না, আমাকে অবশ্যই শব্দগুলোর ব্যাখ্যা এবং পুনর্ব্যাখ্যা করতে হবে। আমার কাছে মনে হয়, উপন্যাস প্রায়শই কিছু অধরা সংজ্ঞার দীর্ঘ খোঁজ বা অনুসন্ধান ছাড়া আর কিছুই নয়।

আভিজাত্যবাদ (ELITISM)। ১৯৪৭ সালে ফ্রান্সে শব্দটি আবির্ভুত হলেও ১৯৬৮ সালের আগে ”elitist” শব্দটির দেখা মেলে না। ইতিহাসে প্রথমবার “অভিজাত” ধারণাটিতে প্রখর নেতিবাচকতা, এমনকি অবিশ্বাসের দাগ লাগলো।

সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরকারি অপপ্রচার একইসঙ্গে আভিজাত্যের বোধ এবং  অভিজাতদের তুলাধুনা করতে লাগলো। এই শব্দ দিয়ে কোনো কারখানার মালিক কিংবা বিখ্যাত ক্রীড়াবিদ বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে চেনানো হতো না, এর আওতায় ছিল কেবলমাত্র সাংষ্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা : দার্শনিক, লেখক, অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ কিংবা সিনেমা থিয়েটারের অভিনেতারা।

কী অসামান্য সুসংহতি। মনে হয় সারা ইউরোপ জুড়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাই অন্য অভিজাতদের পথ দেখাচ্ছে। ওখানে, শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরাও এলিট, এখানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। “elitism”-এর আওতাধীন নব্য এইসব অভিজাতদের দোষারোপ করার কেউ নেই। আর তাই খুব শীঘ্রই শব্দটা সবাই ভুলে যাবে।  (দেখুন : EUROPE)

ইউরোপ (EUROPE)। মধ্যযুগে ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয়দের একতা। আধুনিককালে ধর্মের প্রভাব পড়েছে সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতার এরকম অনন্য মান দিয়ে ইউরোপীয়রা নিজেদের চিনছেন, জানছেন, ব্যাখ্যা করছেন, নিজেদের খুঁজে নিচ্ছেন। আমাদের সময়ে এসে সাংস্কৃতিক অবস্থানের পালাবদল ঘটছে। কিন্তু সেটা কী এবং কার জন্য?  কী এমন পাওয়া যাবে যা ইউরোপকে আবার এক করবে? প্রযুক্তি? বাজার? গণতান্ত্রিক আদর্শ, সহনশীল রাজনীতি? কিন্তু উন্নত সৃজনশীলতা বা এই ধরনের কোনো শক্তিশালী ভাবনা ছাড়া এই সহনশীলতা কী অসার এবং অপ্রয়োজনীয় নয়? নাকি সংস্কৃতির এই প্রত্যাখানকে আমরা একধরনের নিষ্কৃতি হিসেবে ধরে নিয়ে আনন্দচিত্তে একে স্বাগত জানাতে পারি? আমি জানি না। আমি কেবল বিশ্বাস করি যে আমি জানি, সংস্কৃতি এরই মধ্যে সবটুকু উজার করে দিয়েছে। আর তাই ইউরোপীয়দের একতা পালিয়ে যাচ্ছে অতীতে। ইউরোপীয় : ইউরোপ নিয়ে যার আকুলতা রয়েছে।

উত্তেজনা  (EXCITEMENT)। আনন্দ, উৎকন্ঠা, আবেগ কিংবা আসক্তি নয়। উত্তেজনাকে বলা চলে কামানুরাগের ভিত্তি, এর সবচেয়ে রহস্যময় দিক এর মূল স্তম্ভ।

প্রবহমানতা (FLOW)। একবার চিঠিতে শোঁপ্যা তাঁর ইংল্যান্ড-বাসের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন। নানা বয়সের নারীরা যে-বাক্য দিয়ে তাঁকে তারিফ করতেন, তা হলো : ”Ah, how beautiful! If flows like water!” শোঁপ্যার কাছে ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর মনে হয়েছিল, যেমনটা লাগে আমার কাছেও যখন কোন অনুবাদ ঠিক এই ধরনের বাক্য দিয়ে প্রশংসিত হয় : ”It really flows.” ”flowing” শব্দের পক্ষাবম্বনকারীরা প্রায়ই আমার অনুবাদকদের প্রতি অভিযোগ জানান : ”জার্মানিতে এভাবে কথাটা বলা হয় না ( ইংরেজি, হিস্পানিসহ অন্য অনেক ভাষার ক্ষেত্রেও তাই)!” আমি বলি : ”চেক ভাষায়ও তাই!” আমার ইতালীয় প্রকাশক রবার্টো কালাসোর মতে : ”ভালো অনুবাদের মূল সাক্ষ্য তার স্বচ্ছন্দ্য ভাষায় নয়, বরং সবধরনের অপ্রচলিত এবং মৌলিক গাঁথুনিকে শক্ত হাতে সামলানো এবং সংরক্ষণ করার মধ্যে।” অপ্রচলিত বিরামচিহ্নও এর অন্তর্ভুক্ত। একবার আমি একজন প্রকাশককে শুধু এই কারণে বর্জন করেছিলাম যে তিনি আমার সেমিকোলনকে এদিক-ওদিক করার চেষ্টা করেছিলেন।

বিস্মৃতি (FORGETTING)। ”ভুলে যাওয়ার বিপরীতে স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা মানুষের রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রাম।” মিরেকের ”The Book of Laughter and Forgetting” বইয়ের এক চরিত্রের এই ভাষ্যকে বইটির মূল বক্তব্য ধরে নেয়া যায়। কারণ কোনো উপন্যাসে একজন পাঠক প্রথমে যা উপলব্ধি করে তা হলো “আগে থেকেই চেনা” বিষয়ের অনুভব। উপন্যাসের এই “আগে থেকেই চেনা” অনুভব ওরয়েলের বিখ্যাত একটা বিষয় : এই ভুলে যাওয়াই স্বৈরতন্ত্রের জবরদস্তি। কিন্তু আমার কাছে মিরেকের গল্পের মৌলিকত্ব সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়। এই মিরেকই সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছেন যাতে মানুষ তাকে ভুলে না যায় (তিনি, তাঁর বন্ধু এবং তাঁদের রাজনৈতিক যুদ্ধ), কিন্তু সেই সাথে অন্য একজনকে যাতে সবাই ভুলে যায় (তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা যাকে নিয়ে তিনি খুব লজ্জিত ছিলেন) সেই চেষ্টাও ছিল। রাজনৈতিক হয়ে ওঠার আগে এই ধরনের ইচ্ছা মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য : মানুষ বরাবরই নিজের জীবন নতুন করে লেখার ইচ্ছা অন্তরে ধারণ করে, অতীতকে বদলে দিয়ে, নিজের এবং অন্যদের চিহ্ন মুছে দিয়ে। প্রতারণার ইচ্ছার সাথে ভুলে যাবার ইচ্ছার পার্থক্য অনেক। সাবিনার কোন কিছুই ছিল না লুকিয়ে রাখার মতো, তবু মানুষকে ভুলে যাবার প্রবণতা তাড়িয়ে নিচ্ছিল তাকে। বিস্মৃতিময়তা : একইসাথে চরম অবিচার ও পরম সান্ত্বনা। ভুলে যাওয়া নিয়ে উপন্যাসের এই অনুসন্ধানের না আছে সমাপ্তি, না আছে পরিণতি।

ভাবচিন্তন (IDEAS)। যারা ভাবনার পিছনে শ্রম দিতে নারাজ, তাদের প্রতি আমার রয়েছে চরম বিতৃষ্ণা। অসহ্য লাগে এমন কোন কিছুর মুখোমুখি হতে যখন লোকে বলে, “ভাবনা নিয়ে আলোচনা” করছি। এরকম যুগে ভাবনা এবং কাজের প্রতি উদাসীনতা দেখলে রীতিমত হতভম্ব হয়ে যাই আমি।

অনভিজ্ঞতা (INEXPERIENCE)। ”The Unbearable Lightness of Being”-এর মূল শিরোনাম হতে পারতো ”The Planet of Inexperience”। মনুষ্যজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই অনভিজ্ঞতা। আমরা একবারই জন্মাই, এই জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে আরেকটা জীবন আমরা কখনোই শুরু করতে পারি না। শৈশব পার করি, যৌবন কী তা না জেনে, বিয়ে কী না-বুঝেই বিয়ে করি, এমনকি যখন আমরা বৃদ্ধ বয়সে পা রাখি, আমরা জানি না আমরা কোন দিকে এগুচ্ছি। বয়স্করা আসলে বার্ধ্যকের অভিজ্ঞতায় অবোধ শিশুমাত্র। সেই অর্থে, মানুষের ভুবন আসলে অনভিজ্ঞতার আবর্তন।

সাক্ষাৎকার (INTERVIEW)। সেই লেখকদের উপর অভিশাপ নেমে আসুক যারা প্রথমে নিজেদের মতামতের পরিবর্তে সাংবাদিকদের স্বাধীনতাকে যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন! সাংবাদিক ব্যক্তিরা এমন একটা প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন যার ফলে লেখকদের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছিল : যার প্রত্যেকটি শব্দের জন্য তারাই দায়ী। তারপরও আমি এসব কথোপকথন বেশ পছন্দ করি। (অন্যতম এক সাহিত্যধারা)- এরকম বেশকিছু আলোচনা আমার বেশ ভালো লেগেছে যেগুলো একইসাথে ভাবনা উদ্রেককারী, সুলিখিত এবং সফলভাবে সম্পাদিত। দুঃখজনক হলো, সাধারণভাবে যেসব সাক্ষাৎকার নেয়া হয় তার সাথে কথোকথনের কোন সম্পর্ক থাকে না : (১) আপনার আগ্রহের কথা কোনভাবেই বিবেচনায় না এনে প্রশ্নকর্তা নিজের আগ্রহের বিষয়েই প্রশ্ন করে যান; (২) আপনার উত্তরগুলোর মধ্যে সেটুকুই শুধু তিনি ব্যবহার করেন যেটুকু তাঁর কাছে উপযুক্ত মনে হয়; (৩) নিজের ভাষায়, নিজের চিন্তাক্ষমতার সক্ষমতা অনুযায়ী তিনি আপনার কথোকথনকে উপস্থাপন করেন। মার্কিন সাংবাদিকদের অনুকরণে, তিনি আপনার কথা যে উপস্থাপন করলেন তার জন্য অনুমতি নেয়ার অনুগ্রহটুকুও করেন না। সাক্ষাৎকার ছাপা হয়ে যায়। আপনি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেন : লোকে খুব তাড়াতাড়ি এসব কথা ভুলে যাবে! কিন্তু একেবারেই না : লোকজন এর উদ্ধৃতি দেবে! সবচয়ে খুঁতখুঁতে শিক্ষাবিদও লেখকের নিজের লেখা ও স্বাক্ষর করা ভাষ্য আর যে-ভাষ্য সংবাদ আকারে প্রকাশিত হয়েছে- এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করেন না। ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসে, আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম : আর কোনো সাক্ষাৎকার দেবো না, যদি না সেই সব সাক্ষাৎকার সম্পাদনে আমাকে অন্তর্ভুক্ত রাখার পাশাপাশি এর স্বত্ত্ব আমার না থাকে। এরপর থেকে আমার সব পরোক্ষ উক্তি ভিত্তিহীন হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

আয়রনি (IRONY)। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল? এমা বোভারি আসলেই কী অসহ্য ছিলেন? নাকি ছিলেন সাহসী ও স্পর্শকাতর? আর আর্থার? আসলেই কী তিনি উদার ও সংবেদনশীল ছিলেন? নাকি ছিলেন মারমুখি রকমের ভাবপ্রবণ, নিজেকে নিয়ে মোহাচ্ছন্ন একজন? যত মনোযোগ দিয়ে আমরা উপন্যাসটা পড়বো, তত বেশি অসম্ভব হয়ে পড়বে এর উত্তর দেয়া, কারণ উপন্যাসমাত্রই,  এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, এক পরিহাসপ্রবণ শিল্প : এখানে সত্য থাকে লুকিয়ে, অঘোষিত, অপ্রকাশিত। ”মনে রেখো, রজোমভ, নারী, শিশু আর বিপ্লবীরা পরিহাসকে ঘৃণা করে, এর সবই সহজাত প্রবৃত্তি, সব বিশ্বাস, সব ভক্তি, সমস্ত কাজকে নাকচ করে দেয়,” জোসেফ কনরাডের ”Under Western Eyes” বইতে একজন নারীবিপ্লবী একথা বলেছিলেন। পরিহাস বিরক্তিকর। কেবল এজন্য নয় যে এটা সবকিছুকে বিদ্রুপ কিংবা আঘাত করে, বরং এই জন্য যে এটা আমাদের জগতের রহস্য উন্মোচনের নিশ্চয়তাকে বাতিল করে দেয়।  লিওনার্দো শাশা : ”পরিহাসের মতো এমন কঠিনবোধ্য, এমন অমোচনীয় আর কিছুই নেই।” রচনাশৈলী দিয়ে কোনো উপন্যাসকে জটিল করে তোলার চেষ্টা বৃথা, যে-কোনো উপন্যাস, যদি তা উপন্যাস হয়ে থাকে, যতই স্পষ্টভাষী হয়ে থাকুক না কেন, তার নিজস্ব পরিহাসময়তার জন্য যথেষ্ঠ দুর্বোধ্য লাগবে।

অতিরঞ্জন (KITSCH)। ”The Unbearable Lightness of Being” লেখার সময়টাতে এই ”kitsch” শব্দটাকে আমার উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ধরতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও ফ্রান্সে শব্দটি প্রায় অপরিচিত বা অপর্যাপ্ত রকমের পরিচিত।  হারমান ব্রোখের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলোর ফরাসি অনুবাদে ”kitsch” শব্দের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে “অনুল্লেখযোগ্য শিল্প” বা “বর্জিত শিল্প” বলে।  ব্রোখের বক্তব্য অনুযায়ী শব্দটি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, কারণ তাঁর মতে ‘অতিরঞ্জিত’ অর্থ খারাপ রুচিসম্পন্ন কোনো কিছুর চাইতে আলাদা কিছু। অতিরঞ্জিত দৃষ্টিভঙ্গি, অতিরঞ্জিত আচরণ, অতিরঞ্জিত মানুষের দরকার অতিরেক কিছু : সুশোভন মিথ্যার আয়নায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজস্ব প্রতিফলনে পরিতৃপ্তির অশ্রু বিসর্জন। ব্রোখের কাছে, অতিরঞ্জন শব্দটি উনিশ শতকের ভাবাবেগপূর্ণ রোমান্টিকতার সাথে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। কারণ, জার্মানি এবং মধ্য-ইউরোপ এই সময়ে অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে বেশি রোমান্টিক (এবং কম বাস্তববাদী) ছিল এবং এখানেই এই শব্দের প্রস্ফুটন, জন্ম এবং এখানেই এখনো শব্দটি ব্যবহৃত হয়। প্রাহায় আমরা  অতিরঞ্জনকে দেখি শিল্পের একনম্বর শত্রু হিসেবে। কিন্তু ফ্রান্সে নয়। ফ্রান্সে সত্যিকারের শিল্পের উল্টো দিকে আছে বিনোদন। গুরুগম্ভীর শিল্পের  বিপরীতে আছে হালকা কিছু গৌণশিল্প। কিন্তু আমার দিক থেকে, অগাথা ক্রিস্টির রহস্যোপন্যাসে আমি কোনো আপত্তি দেখি না। অন্যদিকে পিয়ানোতে চাইকোভস্কি , রাহমানিনফ, হরউটস, ক্রেমার বনাম ক্রেমার, ডক্টর জিভাগোর (পাস্তেরনায়েকের জন্য দুঃখ হয়) মতো হলিউডি ফিল্ম আমি মন থেকে সত্যিকার অর্থেই অপছন্দ করি। আধুনিক হয়ে ওঠার নামে এই অতিরঞ্জিত ভাবযুক্ত শিল্প আমাকে বিরক্ত করে। (এর সাথে যুক্ত করি : ভিক্তর হুগোর “চমৎকার শব্দচয়ন” আর “আনুষ্ঠানিক পোশাক”-এর প্রতি নীৎসের যে ঘৃণা ছিল, তাহলো এই- শব্দ দিয়ে প্রকাশের আগেই অতিরজ্ঞনের আশ্রয় নেয়াটা যৌক্তিক নয়।

ফূর্তি (LAUGHTER European)। র‌্যাবেলের কাছে ফুর্তি আর ভাঁড়ামি এক। স্টার্ন ও ডিডেরটের কৌতুক মানেই আঠারো শতকের র‌্যাবেলীয় ফুর্তির দরদী ও স্মৃতিকাতর সংকলন। উনিশ শতকের গোগোল এক বিষন্ন কৌতুকাভিনেতা : তিনি বলেন,”যত বেশি সময় ধরে আর যত বেশি সতর্কতার সাথে আমরা হাসির গল্পকে দেখবো, ততই আবিষ্কৃত হবে এর করুণ রূপ।” ইউরোপ এত বেশি সময় ধরে নিজের অস্তিত্বের তাগিদে হাস্যরসাত্মক গল্পের খোঁজ করেছে যে বিশশতকে র‌্যাবেলের রসপূর্ণ মহাকাব্য আয়ানেস্কোর উচ্চারণে হয়ে ওঠে নৈরাশ্যবাদী প্রহসন, যেখানে বলা হয়, ”ত্রাস এবং প্রহসনের মাঝখানের ব্যবধান খুবই সূক্ষ।” ইউরোপের হাসির ইতিহাস শেষ হয়ে আসে।

বর্ণমালা (LETTERS)।  বইয়ের পাতায় তারা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। আমার কল্পনায় সাহিত্যের মৃত্যু ঘটছে : একটু একটু করে, কারো মনোযোগ আকর্ষণ না করে, অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়।

পৌরুষ (MACHO and misogynist)। প্রবল পুরুষরা নারীবন্দনা করে এবং যার প্রশংসা করে তার উপরই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। নিজেদের আয়ত্বে রাখা নারীদের ‘স্ত্রীসুলভ’ গুণাবলীর প্রশংসা করে (মাতৃত্ব, উর্বরতা, কমনীয়তা, সংসারী মনোভাব, ভাবাবেগ ইত্যাদি) তারা আসলে নিজেদের পুরুষত্বকে মহিমান্বিত করে। অন্যদিকে, নারীবিদ্বেষীরা নারীত্বকে প্রতিহত করতে চায়; যেসব নারী ‘স্ত্রীসুলভ,’ তাদের তারা তাড়িয়ে ছাড়ে। পৌরুষের আদর্শ :  পরিবার। নারীবিদ্বেষী ভাবাদর্শ : অসংখ্য রক্ষিতা পরিবেষ্টিত হয়ে অবিবাহিত জীবনযাপন। অথবা : কোনো নিঃসন্তান নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।

ধ্যান (MEDITATION)। ঔপন্যাসিকের ৩টি প্রাথমিক সম্ভাবনা বিদ্যমান : তিনি গল্প বলবেন ( ফিল্ডিং), তিনি গল্প বর্ণনা করবেন (ফ্লবেয়ার), তিনি গল্প ভাববেন (মুসিল)। উনিশ শতকের উপন্যাস ছিল সেই সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ (আশাবাদী, বিজ্ঞানভিত্তিক)। বিশশতকের ক্ষেত্রে তা সময়-বিরুদ্ধ, এই সময় কিছু ভাবতে ভালোবাসে না।

খবর (MESSAGE)। পাঁচ বছর আগে একজন স্ক্যা্ন্ডেনেভিয়ার অনুবাদক আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন যে তাঁর প্রকাশক ‘দ্য ফেয়ারওয়েল পার্টি’ বইটি ছাপার ব্যাপারে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন : ”এখানে সকলেই বামপন্থী। তারা আপনার বইয়ের বার্তাটি পছন্দ করেনি।” ”কি বার্তা?” ”এই উপন্যাসটা কি গর্ভপাতের বিরুদ্ধে নয়?” অবশ্যই না। ভিতরে ভিতরে আমি যে কেবল গর্ভপাত সমর্থন করি তাই না, আমি চাই আইন করে এটা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হোক!  তারপরও এই ভুল বোঝাবুঝি আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি বেশ সফল। সফলভাবে আমি পরিস্থিতির নৈতিক বিচারের দিকটি অস্পষ্ট রাখতে সক্ষম হয়েছি। শিল্প হিসেবে আমি উপন্যাসের মূল উপাদানে বিশ্বস্ত থেকেছি : সেটা হলা পরিহাস। আর পরিহাস বার্তার ধার ধারে না!

আধুনিক : আধুনিক হওয়া (MODERN: being modern)। ”নতুন, নতুন, নতুন কিছু সাম্যবাদ, এর চেয়ে আধুনিক আর কিছু নেই,”  লিখেছেন চেক ভাষার পুরোধা ঔপন্যাসিক  ভ্লাদিসলাভ ভ্যানকুরা, ১৯২০ সালের দিকে। আধুনিক হওয়াটা যাতে ফসকে না যায় সেজন্য তাঁদের পুরো প্রজন্মই ছুটেছিল কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে। কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক পতন তখনই নিশ্চিত হয়েছিল যখন বাহ্যিক আধুনিকতা প্রকট হয়ে উঠেছিল। র‌্যাঁবোর আদেশ ছিল, ”পুরোপুরি আধুনিক হবার কোনো বিকল্প নেই।” আধুনিক হবার ইচ্ছা বহু পুরোনো, যুক্তিহীন এই অলঙ্ঘনীয় ভাবনাটি আমাদের গভীরে শেকড় গেড়ে আছে, নাছোড় এই  ইচ্ছাটা পরিবর্তনশীল ও অনির্ধারিত : যা নিজেকে আধুনিক ঘোষণা করতে পারে তা-ই আধুনিক এবং সেভাবেই সর্বজনগ্রাহ্য। গমব্রভিচের ‘ফারদিদুরক’-এ মিসেস  ইয়ুথফুল আধুনিকতার এক নিদর্শন রেখেছিলেন, ”খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যখন অন্যরা চুপিসারে তা সারে।” ফারদিদুরক : অসামান্য উপায়ে আধুনিকতা নিয়ে কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে।

উপন্যাস ও কবিতা (NOVEL and poetry)। ১৮৫৭, শতাব্দীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটা বছর। ‘ল্য ফ্লুর দু মল’ : গীতিধর্মী কবিতা যথার্থ স্থান খুঁজে পায়, খুঁজে পায় নিজস্ব সত্তা। ‘মাদাম বেভার ‘ : প্রথমবারের মতো একটি উপন্যাস কবিতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে রাজি হলো (সবকিছুর আগে সৌন্দর্য খুঁজে পাবার সংকল্পে; প্রত্যেকটা শব্দের গুরুত্ব আবিষ্কারে; রচনার ভিতর গভীর সুর খুঁজে পেতে; প্রত্যেক বর্ণনায় মৌলিকত্বের বাধ্যতামূলক প্রয়োগে)। ১৮৫৭ সাল থেকে উপন্যাসের ইতিহাস “কবিতা” হয়ে ওঠার ইতিহাস। কিন্তু কবিতার প্রয়োজনীয়তা মেনে নেয়া উপন্যাসে পদাবলী থাকার বিষয়টি অনেক আলাদা (এর অবশম্ভাবি পরিহাসের দিকটি বর্জনের, বাইরের পৃথিবী থেকে মুখ সরিয়ে নেয়ার,  উপন্যাস থেকে ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিতে বদলে যাওয়ার, আলঙ্কারিক বর্ণনায় এর ভার কমানো)। “ঔপন্যাসিক থেকে কবি” হয়ে ওঠা অন্যতম মহৎ ঔপন্যাসিকের রচনা সাংঘাতিকভাবে পদরচনা থেকে আলাদা : ফ্লবেয়ার, জয়েস, কাফকা, গমব্রোভিচ। Novel = গীতিকবিতাহীন কবিতা।

ঔপন্যাসিক ও লেখক (NOVELIST and writer)।  সার্ত্রের ‘লেখা আদতে কী?’ আমি আবারও পড়েছি। একবারও তিনি “উপন্যাস” কিংবা “ঔপন্যাসিক” শব্দ দুটি ব্যবহার করেননি। তিনি উল্লেখ করেছেন গদ্যলেখক বলে। যথার্থ প্রভেদ। লেখকের নিজস্ব ধারণা এবং অনুকরণ অযোগ্য উচ্চারণ থাকে। তিনি যে-কোনো ধরনের লেখাই লিখতে পারেন (উপন্যাসসহ) এবং তিনি যা লেখেন- তাঁর চিন্তা, তাঁর উচ্চারণের বৈশিষ্ট্যসহ-  তা তাঁর কাজেরই অংশ।  রুশো, গেটে, শঁতেব্রিয়াঁ, জিদ, মালরো, কামু, মঁতেলঁ এরাই। একজন ঔপন্যাসিক তাঁর ভাবনাকে বড় করে তোলেন না। একজন আবিষ্কারকের মতো তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে অস্তিত্বের কিছু অজানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি কী বলছেন তা নিয়ে নয়, বরং যা তিনি খুঁজে পেতে চাইছেন তাতে অভিভূত হন এবং যে বিন্যাস তার স্বপ্নপূরণের সঙ্গী হয়, কেবল সেটুকুই হয়ে ওঠে তাঁর কাজের অংশ। ফিল্ডিং, স্টার্ন, ফ্লবেয়ার, প্রুস্ত, ফকনার, সেলিন, কেলভিনো এরকমই। লেখক নিজেকে তাঁর সময়ের, তাঁর দেশের আত্মিক মানচিত্রে প্রোথিত করেন, জায়গা করে নেন ইতিহাসের বিস্তারে। উপন্যাসের প্রকৃত মূল্য বুঝতে হবে ইউরোপীয় উপন্যাসের ইতিহাসের পটভূমিতে। কেবল সারভেন্তাসের কাছ থেকেই ঔপন্যাসিকেরা এর উত্তর পেতে পারেন।

ঔপন্যাসিক ও তার জীবন (NOVELIST (and his life)।  একবার একজন ঔপন্যাসিক কারেল চাপেকের কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কেন কবিতা লেখেন না। তাঁর উত্তর ছিল : ”কারণ আমি নিজের সম্পর্কে বলাটা ঘৃণা করি।” মুসিল, কাফকা ও তাঁর নিজের সম্পর্কে হারমান ব্রোখ বলেছিলেন : ”আমাদের তিন জনের কোন প্রকৃত জীবনী নেই।” এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের জীবন কম ঘটনাবহুল, বরং তাঁদের জীবন সাধারণের দৃষ্টিগোচরের জন্য নয়, জীবনী হয়ে ওঠার জন্য নয়। নভোকভ বলেছিলেন, ”মহৎ লেখকের মূল্যবান জীবন নিয়ে অনৈতিক হস্তক্ষেপ আমি ঘৃণা করি এবং কোনো জীবনীকারকেই আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি মারতে দেবো না কখনো।” ফকনারের ইচ্ছা ছিল, “একেবারে সাধারণ মানুষের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার, ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই না নিয়ে, মুদ্রিত কোনো কিছুতে ছাপ না রেখে।” খুব পরিচিত একটি রূপক রয়েছে : একজন ঔপন্যাসিক তাঁর নিজের ঘর ভেঙে সেই পাথর দিয়ে গড়েন তাঁর উপন্যাসের ঘর।” একজন জীবনীকার ঔপন্যাসিকের করা সবকিছুকে বাতিল করে দিয়ে নতুন করে আবার সেটাই করেন যা সেই ঔপন্যাসিক নিজেই বাতিল করে দিয়েছিলেন। তাদের সমস্ত চেষ্টা দিয়েও উপন্যাসের মূল্য কিংবা অর্থ কোনটাই খুঁজে বের করা সম্ভব নয়, বড় জোর কয়েকটি গাঁথুনির সন্ধান পেতে পারেন জীবনীকার।  যে মূহূর্ত থেকে কাফকার চেয়ে জোসেফ কে. বেশি মনোযোগ পেতে শুরু করলো, সেই মূহূর্ত থেকে শুরু হয়ে গেল কাফকার মরনোত্তর মৃত্যু।

পুনর্লিখন (REWRITING)। সাক্ষাৎকার, অনুলিখন, মঞ্চ, চলচ্চিত্র কিংবা টেলিভিশনের জন্য পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত। পুনর্লিখন সময়ের প্রতিফলন। ”কোন একদিন অতীতের সব সংস্কৃতিই পুরোপুরি পূনর্লিখিত হবে এবং এর আগের সবকিছু পুরোপুরি ভুলে যাবে”-  (”Jacques and His Master”এর ভূমিকা) এবং ” লিপিবদ্ধ বিষয়কে যারা পুনর্লিখন করে, তাদের মরণ হোক! তাদের বিদ্ধ করা হোক আর ধিকিধিকি আগুনে ঝলসানো হোক! তাদের খোজা করে দেয়া হোক, কেটে নেয়া হোক তাদের কান!” (”Jacques and His Master”)।

ধ্বনিমূর্ছনা (RHYTHM)। নিজের হৃদয়ের শব্দ আমি শুনতে চাই না; সারাক্ষণ এই ধুকপুকানি আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমার বেঁচে থাকার দিন সীমিত। আর তাই সুরের মূর্ছনারেখার মধ্যেও আমি সেই ভয়জাগানিয়া বিষয়টাকেই দেখি।  কিন্তু ছন্দের মহান গুরুরা জানেন কী করে সেই একঘেয়ে আর পূর্বানুমিত শৃঙ্খলার মধ্য থেকে নীরবতা বের করে আনতে হয়, কিভাবে সঙ্গীতকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো সময়ের বাইরে কোনো এক সময়ে নিয়ে যেতে হয়। বহুসুরমূর্ছনা তৈরি করার গুরু : সুরের মিশ্রণ, একঘেয়ে চিন্তাকে দুর্বল করে দেয়। বেটোভেনের ছন্দ এতটাই জটিল, বিশেষ করে  বিলম্বিত লয়ের কাজগুলো, যে এর থেকে সমান্তরাল রেখা খুঁজে বের করাই দুষ্কর। অলিভিয়ের মেসিয়োঁর প্রতি আমার মুগ্ধতা : তাঁর ছন্দের ছোট ছোট সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে তিনি এক ধারণাতীত সময়ক্ষেপণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন যা একেবারে স্বশাসিত (তাঁর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, সমাপ্ত সময় ছাপিয়ে আরো যে সময়ে প্রলম্বিত) ধারণা :  কোলাহলপূর্ণ, জোরালো শব্দের নিয়মিত ধ্বনি দিয়ে ছন্দের জাদুময়তা ফুটে ওঠে। ভুল। রকের ক্লান্তিকর আদিম নিয়মিত বিরতির ছন্দ : মানুষের হৃৎযন্ত্রের শব্দের চাইতে শতগুণ বাড়িয়ে শোনানো হয় যাতে মানুষ কখনো ভুলতে না পারে তারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সোভিয়েত (SOVIET)। একটা বিশেষণ আমি ব্যবহার করি না। Union of Soviet Socialist Republics:  সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাজ্যপুঞ্জ : ”চারটি শব্দ, চারটিই মিথ্যা’।”  সোভিয়েত জনগণ (The Soviet people) : শব্দ দিয়ে তৈরি একটা পর্দা, যার পেছনে থাকা রুশকৃত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জাতিগুলির কথা ভুলে যাওয়াই উচিত। সোভিয়েত শব্দটি কেবল যে বৃহত্তর অর্থে রাশিয়ার উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিলে যায় তাই নয়, এটা একইসঙ্গে ভিন্নমতাবলম্বীদের জাতীয় স্মৃতিকে বহন করছে। এটা তাদের বিশ্বাস করতে সাহায্য করে যে কোন জাদুবলে তথাকথিত সোভিয়েত রাষ্ট্র থেকে রাশিয়াকে (সত্যিকারের রাশিয়া) ছেটে ফেলা হয়েছে, কিন্তু তারপরও ঠিক ঠিক টিকে গেছে, অক্ষত, অকলঙ্ক আবমূর্তি নিয়ে। জার্মান নীতি-নৈতিকতা : নাৎসী যুগের কলঙ্ক নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত; টমাস মান : জার্মান চেতনা-বিরোধী নিষ্ঠুর ভাষ্যকার। পোলিশ সংস্কৃতির শীর্ষ সময় : গমব্রভিচ বেশ আনন্দিত চিত্তেই “পোলিশময়তার” (Polishness) তীব্র সমালোচনা করেছেন, রাশানদের পক্ষে “রাশিয়ানকৃত” (Russianness) কোনো কিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অচিন্তনীয় ব্যাপার। রাশিয়ানদের টমাস মান নেই, গমব্রভিচ নেই।

ক্ষণকালের আধুনিকতা (TEMPS MODERNES: Modern Era)। আধুনিক যুগের শুরু। ইউরোপীয় ইতিহাসের গুরূত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সপ্তদশ শতকে ঈশ্বর ফেরার হয়েছে আর মানুষ হয়ে উঠেছে সবকিছুর মূল। ইউরোপে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্ম হয়েছে আর এ থেকেই শুরু হয়েছে শিল্প, সংস্কৃতি , বিজ্ঞানের নতুন যুগ। মার্কিন মুলুকে এই শব্দের ব্যবহার নিয়ে আমি বিপাকে পড়েছি। আক্ষরিক অনুবাদে “আধুনিক কাল” (ব্যাপক অর্থে আধুনিক যুগ )  একজন মার্কিনী ধরেই নেয় যে এর অর্থ হলো বর্তমান মুহূর্ত, আমাদের এই শতক। আমেরিকায় ক্ষণকালের  (Les Temps Modernes) ধারণার অনুপস্থিতি দুই মহাদেশের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য তৈরি করেছে।  ইউরোপে, আমরা এই ধারণার শেষ দিকে আছি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের শেষাংশে; ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মৌলিকত্বকে অবশ্যাম্ভাবীভাবে ভাবা শিল্প-জমানার শেষ দিকে : এমন এক সমাপ্তির দিকে যা সূচনা করছে অতুলনীয় অভিন্নতা। আমেরিকা এর সুর ধরতে পারবে না, কারণ তারা আধুনিকতার জন্মের সাথে পরিচিত নয়, অনেক পরে এই আধুনিকতাকে তারা গ্রহণ করেছে। আমেরিকার আছে শুরু ও শেষের ভিন্ন মানদণ্ড।

[সংক্ষেপিত]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. নিঃসন্দেহে প্রবন্ধটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ! লেখালেখি সম্পর্কিত বেশ কিছু জানতে পারলাম। পুরো প্রবন্ধটি পড়ার খুব ইচ্ছে জাগছে। পরবর্তীতে কি বাঁকি অংশটুকু প্রকাশিত হবে স্যার?

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close