Home কবিতা মিহির মুসাকী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

মিহির মুসাকী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ February 8, 2017

মিহির মুসাকী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ
0
0

কেন্দ্র

 

কুয়াশা-কোকিলে আলো-পায়চারি,

সময় স্থির বকশাদা জলে

নড়েচড়ে মৎস্য, নড়ে না মানুষ

ছিপ খেয়ে বসে আছে প্রাচীন কাছিম

শুনি কোলাহল, নয় সঙ্গীত

ধরণিতে এসে গেছে পোকা-খাওয়া শীত।

 

দূরবীনে রাখা আছে একজোড়া চোখ,

দূরবস্তু কাছে এলে কেটে যায় শোক।

আসলে কি কাটে? নাকি বেদনাস্থায়ী দাগ

ঢেকে দেয় অবাস্তব মেঘ,

সকলে কাঠামো দেখে, দেখেনা আবেগ।

আলো পায়চারি আলো পায়চারি

পরিধি ছুঁয়েছে মন, কেন্দ্রে আছে নারী।

 

মায়া হরিণী

 

পত্রালি রাগিণী শুনে কেটে যায় রাত

নিঃশব্দ অন্ধকার নামে হৃদয়-কার্নিশ বেয়ে,

মায়া হরিণীর চোখে আহা কী সুন্দর তৃষ্ণা

স্বপ্নপান করে এই যে বেঁচে থাকা, যাপিত জীবন

মনে হয় অপাংক্তেয় সব, মূল্যহীন।

 

ক্রমশ শান্ত হলে ধাবমান ঘোড়া

নিরব চাঁদের নিচে নিরিবিলি মন,

খোঁজে অবয়ব, শ্রম-নুনে মাখামাখি প্রসন্নতা

এনে দেয় অন্যরকম এক আনন্দ ভ্রমণ।

 

কাছে দূরে কেউ নেই, বাস্তবতা ফুলে

দূরাগত ভ্রমর কী যে করে পান, মধু নাকি বিষ?

যদিও বধির কান, তবু শুনি বাতাসের ফিসফিস

কেউ একজন বলে, ভাল থাক, নিয়মিত চিঠি দিস।

 

কষ্ট কল্পনা

 

অষ্টপ্রহর কষ্ট বাজে

বুকে নষ্ট ঝড়,

আজকে আমি কাড়তে যাবো

তোমার অবসর।

 

তুমি মানে-তুমিই জানো

এই শহরে থাকো,

পদ্য পড়তে ভালোবাসো

ছদ্ম নামে আঁকো।

 

তোমার ছবির প্রদর্শনী

দেখেছিলাম কবে?

এই মনে হয়- সেদিন বিকেল,

অনেক বছর হবে!

 

স্বপ্ন যেন হাওয়াই মিঠাই

স্মৃতির মধ্যে গলে,

বলেছিলাম, এসব ছবি

আঁকছেন কি কৌশলে?

 

দাওনি জবাব, ঠোঁটে ছিল

রহস্যময় হাসি,

আহা, আমি ছবি

নাকি তোমায় ভালোবাসি?

 

শিল্পী নাকি অন্তর্যামী,

বুকের মধ্যে খুন-

ঝরেছিল, বোঝোনি তা?

নীলাভ আগুন!

 

আজ তোমাকে দেখতে যাবো

আজো বুকে খুন,

অলস বেলায় পড়ছো নাকি

নির্মলেন্দু গুণ?

 

কলিঙ বেলে পাখির আওয়াজ

ভাঙলো নিরবতা!

জীবননাট্যের মধ্যযামে

হারিয়ে ফেলি কথা।

 

মনে হলো, না দেখাটাই

হয়তো ছিল ভালো,

স্মৃতির চোরাগলি দিয়ে

ঢুকছে ক্ষীণ আলো।

 

সেই আলোতেই যেতে হবে

বাকিটা পথ চিনে,

ভাঙছি যখন সময়-সিঁড়ি

ব্যথাটা রিনরিনে!

 

 

অষ্টপ্রহর কষ্ট বাজে

কষ্ট বাজে, কষ্ট

সেই জীবনও নষ্ট ছিল

এ জীবনও নষ্ট।

 

আলোযাত্রা

 

আলোযাত্রায় কেটে গেছে দিন

মনের মাচায় ছিল স্থির বিশ্বাস

বেড়ে উঠেছিল আশাসবুজ লতা

পাবো-একদিন পাবো তারে

রোদের ঘুঙুর পায়ে সে দাঁড়াবে স্বপ্নউঠোনে।

 

পূর্ণিমাসঙ্গ পেয়ে দিঘি মৎস্য এক কোণে

নাচে রহস্যগীতে শীতল পানিতে

যার তরে বেঁচে আছি, সে শোনায় মৃত্যুমরমী

আমি তবে কার লাগি করি শোক

ঘৃণারক্ত চুষে খেয়ে-

কী দ্রুত মরে যায় বয়সের জোঁক।

 

কুয়োচিহ্ন দেখে হতাশা খাদের পাশে

হঠাৎ বাতাস নামে যখন পাখির ডানায়

একটা লালটিপ কী অপূর্ব দ্বিভ্রƒর মাঝখানে

আলোযাত্রা শেষে কাঙ্ক্ষিত গ্রহণ।

 

গৃহস্থ বিস্তার

 

নীলাচলে নীলাঞ্জনা,

খঞ্জনা পাখির মত তুমি নেচেছিলে ইন্দ্রের সভায়

ভৈরবী রাগিনী শুনে এসেছিলে উড়ে ভেলানগরে

তোমার দু-চোখ ছিল উদ্বৃত্ত হাসিতে উজ্জ্বল

তোমার রঙিন অস্তিত্ব জুড়ে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের গতির বিচ্ছুরণ।

 

তোমার অপার ডানাজোড়া মেলে দেখিয়েছিলে স্বপ্নময় উড়াল

মেঘময় আশীর্বাদ ছুঁয়ে দিলে তোমার কপাল, সময়ের রক্ততিলক

তুমি হারিয়ে গেলে নিজস্ব দিগন্ত আর আপন গৃহস্থ বিস্তারে।

 

বহমান নদী ও সমুদ্রে বেড়ে গেল জলঋণ

বৃক্ষেরা বদল করলো পোশাক-সবুজ থেকে হলুদ, আবারো সবুজে

ফিরে পেল আস্থা; গঙ্গারিডির প্রত্মপাখি উড়ে এলো উয়ারি-বটেশ্বরে

শীতনিদ্রা শেষে আড়মোড়া ভেঙে সজাগ হলো ইচ্ছেসর্প

 

পৃথিবীর ওপারের নীলাঞ্জনা, তুমি কি বয়ে যাচ্ছো নদীর মতো রক্তের শিরায়?

যে সমুদ্রে তুমি মিশে যেতে চাও, তাকে কি পাবে কখনো হায়!

 

 

 

দুঃখিত হে দুঃখ

 

দুঃখগুলোকে তালাবদ্ধ করলাম স্টোররুমে, বুঝলে হে কপাল?

তুমি চাপড়াতে থাকো তোমার পিঠ, ফুঁসতে থাকো রাগে

আমি হেঁটে যাবো সন্ধার নীলাভ বাতাসে আজ, ধুলোশহরের প্রান্তে

যেখানে শিস দেয় পাথুরে দোয়েল। আমি আজ খুব অবসর আছি

পিঠব্যাগে ভরে নিয়েছি বিরহের নীলমাছি। জানি, স্টোররুমে দুঃখগুলো

দমবন্ধ হয়ে আছে, না খেতে পেয়ে রোগা হচ্ছে ক্রমাগত…

 

আমাকে দেখছে মেঘ, পর্বতের মাথা ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া চিল

আমি অংক ভুল করি তাই আমাকে মাস্টার মশায় শাস্তি দিয়েছিল

আর আমি শাস্তি দিচ্ছি তোমার অহংকার, তোমার সন্দেহকে

তুমি আর আমাকে পাবেনা তোমার অন্তর্গত আলোতে

আমি সেখানে মিশিয়েছি গরল; সাপের দংশনে যারা মরেছিল

তাদের রক্ত দিয়ে আমি বানিয়েছি মমি, চারপাশে দেখি মুখোশমিছিল

আমি সেই মিছিলে যোগ দেয়া বিশ্বাসী পাতক!

 

 

উনিশে ফেব্রুয়ারি

 

আমার কাছে উনিশে ফেব্রুয়ারি মানে বাবার শেষ নিঃশ্বাস

বারডেমের সিসিইউ, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট, বাতাসে মৃতের গন্ধ

মনে পড়ে ভীষণ কোমল এক মনোরম রাত, যখন পাখির পালকের নিচে

ঘুমিয়ে পড়েছে শাবক; আর জোনাকি পথ হারিয়ে অন্য পথে বিলিয়ে চলেছে আলো।

সেই আলোচুরি রাতে শাহবাগী রাজপথ  জ্বলছে-প্রতিবাদে, ঘৃণায়

ঘৃণা পশুদের প্রতি, যারা ভুল করে বনবাস ছেড়ে চলে এসেছে শহরে, ভদ্র পাড়ায়।

ঘৃণা হায়েনাদের প্রতি, যারা ইঁদুরের মতো থেঁতলে দিয়েছে মানুষের পবিত্র শরীর

পান করেছে ড্রাকুলার মতো মানুষের রক্ত; ঘৃণা সেইসব জানোয়ারের প্রতি

যাদের লোলুপ দৃষ্টিতে ঝলসে গেছে তরুণী কিংবা গৃহবধুদের নিষ্পাপ শরীর।

 

কালো বেড়ালের মতো নিকষ রাতের চোখে জ্বলছে তসবির দানা,

আম্মার বিশ্বাসী হাত যেন মৃত্যুর নরোম শরীরে পবিত্র উচ্চারণের আদরে

খুঁজে ফিরছে সান্ত্বনা। কুয়াশা নিবিড় জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে

শেষ প্রহরের নদীতে; বৈঠাহীন নৌকোয় আমি চিৎকার করে মাঝিকে ডাকছি

ছিঁড়ে যাওয়া পালে আমার নিঃশ্বাস; হাত-দূরত্বের স্মৃতিরাও দৃষ্টির ওপারে চলে যাচ্ছে।

 

আমাদের উৎকন্ঠা তখন সমর্পিত অলৌকিক ইচ্ছের দিকে; লাবণ্যময় জীবনকে

সপে দিতে হয়েছে ঘুমের দরিয়ায়; চেতনা নাশকে আছে কষ্টের নির্বাণ

বাবা এখন নির্বাণে। আমাদের প্রার্থনা আয়ুর শুশ্রুষার মত তাঁর রক্তে সাঁতার কাঁটছে।

বাবা, শুধু এই শব্দটি আছে, আর আছে উনিশে ফেব্রুয়ারি

বাবাকে কি ভুলিতে পারি?

 

 

রক্ষণশীল দূরবীন

 

দূর থেকে তোমাকে দেখতে চাইনা আমি,

দেখতে চাই কাছ থেকে-এত কাছ থেকে

যেন তোমার খুঁতগুলো নিখুঁতভাবে ধরা যায়।

 

চশমার কাঁচে কুয়াশা মেখে একবার তোমাকে দেখেছিলাম,

মনে হয়েছিল তুমি ভীষণ ঝাপসা হয়ে গেছ,

তোমার কন্ঠ শুনে তোমার গন্ধ শুঁকে

তোমাকে চিনতে হয়েছিল। দূরন্ত প্রজাপতি হয়ে

তুমি যখন উড়ে বেড়াতে আমি পিছু নিতাম,

ধরতে চাইলে তুমি ছুটে পালাতে ভীরু কাঠবেড়ালির মত

তোমার নিজস্ব আড়ালে বিমূর্ত পৃথিবীতে বিশুদ্ধ একাকিতায়।

 

আমার কাছে দূরত্ব মানে-চোখ বন্ধ করলে যাকে দেখা যায়না

মন বন্ধ করলে যাকে ভাবা যায়না

কান বন্ধ করলে যাকে শোনা যায়না

তেমন দূরত্বে চলে গেলে আমি আর তোমাকে পাবোনা-কখনো পাবোনা।

 

আজকাল রক্ষণশীল দূরবীনে চোখ রেখে সবকিছু দেখতে হয় বলে

তোমাকে দেখতে পাইনা। ভেতরে আলো জ্বেলেও

সবকিছু কেমন অস্পষ্ট। যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে

একবার মনে হয় বুনো হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছি

অথচ কৌতুকপ্রিয় মানুষগুলো আমাকে দেখছে না।

 

আমার শব্দেরা হিংস্র পর্যবেক্ষণে কাতর,

আমার ভালোবাসা নিষিদ্ধ,

আমার গতিতে বসানো হয়েছে প্রতিবদ্ধক,

আকাশ নামিয়ে আনা হয়েছে দৃষ্টিসীমায়

দিগন্ত ঢেকে দেয়া হয়েছে বিষাক্ত ধুলিকণায়

 

পরমাত্মার মত তোমার কাছে যেতে চাই

আমি জানি, ওরা তোমার জ্যামিতিকেও ভেঙে টুকরো টুকরো করেছে,

আমাকে বলছে, দেখ, তোমার জীবনদেবতা, তোমার প্রেয়সী, মানসপ্রতিমা

আমি কিছুই দেখতে পাইনা

 

মানচিত্রে দেশ

 

দেশ দেখছি

তোমার গালের তিলের মত কালো আর ক্ষুদ্র,

অথচ আমার মানচিত্র এমন ছিলনা,

হাতের তালুতে বিচিত্র রেখার মত অজস্র নদী ছিল

ছড়ানো ছিটানো-আঁকাবাকা-স্রোতস্বিনী

এখন আর খুঁজে পাচ্ছিনা,

হয়তো আমার ফ্ল্যাটের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্রোতের প্রতœধারা

প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের পুত্র-কন্যারা চলেছে নায়রে,

কোনো এক ভাটিয়ালি রাতে আমি শুনেছি তাদের কান্না ।

 

দেশ দেখছি

শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ভিখেরির থালা

পয়সার সাথে মাঝেমধ্যে নিক্ষিপ্ত  ঘৃণা

কোথায় এগুলাম তাহলে? শিশুরা এখনো ঘুমের মধ্যে

দুঃস্বপ্ন দেখে আর্তনাদ করে উঠছে

সুউঁচু দালানের ফাঁকে আটকে গেছে চাঁদ

পূর্ণিমার আলো টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ছে পথে।

 

দেশ দেখছি

স্বরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত আর মন্দাক্রান্তায়

মেলাতে পারছিনা তোমাতে আমাতে

মনে হচ্ছে আমার দু’হাত দু’দিকে বেঁকে গেছে

দু’পা দু’দিকে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত

আমি শত চেষ্টা করেও শরীরটা ঠিক রাখতে পারছিনা

চোখ দুটো দু’দিকে সরে যাচ্ছে

 

মানচিত্রে একটাই তো দেশ

অথচ ভেতরে এতগুলো টুকরো!

 

 

মৃত্যুবিধি

 

হঠাৎ সে মারা গেল,

যারা তার কাছের মানুষ

বলতে শুরু করলো, হায় হায়

কেন এমন অসময়ে কিছু না বলেই মানুষটা চলে গেল?

যেন মানুষ মারা যাবার আগে সব অসমাপ্ত কথা বলে যাবে,

করে যাবে অসমাপ্ত কাজ;

 

দেখেছি বাবা মারা গেলেন ঘুমের মধ্যে,

খালাম্মা মারা গেলেন সকালে আম খেতে খেতে,

খুব জোরে কাশি দিয়ে থেমে গেলেন চাচা,

এভাবে একেকজন একেকভাবে;

কেউ তো বলে না-আমি চলে যাচ্ছি,

অতএব তোমরা যা বলার বলো,

বলে না, শেষ চেকটা সই করে দিচ্ছি

বলে না, যে পাপগুলো করতে পারিনি, সেগুলো এবার করে নিই

 

মৃত্যুরতো কোন ব্যকরণ নেই যে

তাকেও মানতে হবে নিয়ম কানুন,ণত্ব ষত্ব বিধান,

মৃত্যু নিয়ম না মানা যন্ত্রবিহীন এক সুর

জীবনের চিরšতন এক গান।

 

রক্তপাত ভাল্লাগেনা

 

রক্ত ছুটে আসছে ফিনকি দিয়ে

দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে,

আমি প্রতিবারই চোখ বেঁধে ফেলি বিবেকের শাদা ফিতায়,

আমি রক্তপাত সহ্য করতে পারিনা।

জীবনে তাই একটিবারের জন্যও রক্ত দিতে পারলাম না-

এমনকি মানুষের জন্যেও।

আমি জানি, ধারালো ছুরিতে সমান কষ্ট মানুষ ও পশুর

ওদের চোখেও দেখেছি অশ্রু, নিরব বেদনা-

 

তবু যেন অনিবার্য এ রক্তপাত,

স্বপ্ন থেকে দূরে, জীবনের কোমল পেলবতা থেকে

খসে পড়া পাতা মাড়িয়ে মাড়িয়ে

হলুদ হয়ে আসা এক জগদ্দল পাথর-

বসে থাকে বুকের ওপর,

আমি তাতে হাত রেখে

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে

কেবলি দুলতে থাকি

আমার রক্তপাত ভাল্লাগেনা, ভাল্লাগেনা।

 

 

তুমি চলে যাচ্ছ

 

পুড়ে যাচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে যাচ্ছে সব পুড়ে,

তুমি চলে যাচ্ছ দূর থেকে দূরে।

নিয়ে যাচ্ছ মেঘ, রেখে যাচ্ছ জল

রেখে যাচ্ছ পরানের গহীন ভেতরে এক ফোঁটা কেমন অনল।

 

নিয়ে যাচ্ছ গান নিয়ে যাচ্ছ সুর,

রেখে যাচ্ছ ব্যথা অকূল সমুদ্দুর,

নিয়ে যাচ্ছ বাতাসের ঘ্রাণ, বসন্ত দিন

সবুজ ভালবাসা-হৃদয় নিঙরানো

রেখে যাচ্ছ বিরহ ঋণ।

 

নিয়ে যাচ্ছ নদী, দুকূল উপচানো ঢেউ

রেখে যাচ্ছ কষ্ট , কেউ দেখলোনা, কেউ।

নিয়ে যাচ্ছ স্বপ্ন, ফেলে যাচ্ছ রাত

অপেক্ষার সীমাহীন নিষ্ঠুর অভিঘাত।

নিরিবিলি গল্পের রূপোলি বিকেল

খুনসুটি আর আনন্দ অঢেল।

নিসর্গ পাহাড় আদিগন্ত ছবি

নিয়ে যাচ্ছ ছন্দ,কবিতার কারুকাজ

পড়ে আছে ব্যথাতুর কবি।

 

পুড়ে যাচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে যাচ্ছে সব পুড়ে

তুমি চলে যাচ্ছ চলে যাচ্ছ মায়াহীন দূরে।

 

সূর্য ডুবলেও স্বপ্ন ডোবেনা

 

স্বপ্ন দেখে অনেকটা রাত নষ্ট হলো,

কেটে গেল অনেক সময়; মায়াবি ঘোড়ার পিছূ

ছূটতে ছুটতে কিংবা সবুজ পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে

ঘুমই তো ভেঙে গেল-স্বপ্ন সফল হলোনা।

স্বপ্নের বাদামি বনে হেঁটে হেঁটে একদিন আমি

তোমার কোমল হাত ধরে দেখিয়েছিলাম মায়াবি ময়ূর,

আনন্দিত পেখমের নিচে কামনার ভঙিতে নেচে উঠেছিল কাঙ্ক্ষিত সময়,

স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্নের মধ্যেই হেঁটে গেছি অস্পষ্ট দিগন্তরেখায়,

দেখেছি রঙধনু ফুটে আছে তোমার লজ্জিত মুখে।

 

আমার কিশোর স্বপ্নে এক অপ্সরা সারারাত বাজাতো ঘুঙুর,

আকাঙ্ক্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়তে থাকলো আমার বয়স,

স্বপ্নরাগ শেষ হলে আনন্দ ও ভয় একসাথে আমাকে জড়িয়ে নিত,

জীবনের এ চিরন্তন সত্য জানা হয়ে গেলে

বুঝেছি সব সত্য প্রকাশ্য নয়, নয় আরাধ্য।

সত্যকে লুকোতে গিয়ে আমি একদিন সত্য হারিয়ে ফেলেছি,

তবে স্বপ্ন হারাতে পারিনি। স্বপ্ন জেগে বসে থাকে সময়-শিয়রে

পড়ন্ত বেলায় সূর্য ডুবলেও স্বপ্ন ডোবেনা।

 

আমরা ছোট হয়ে গেছি

আমরা আবার ছোট হয়ে গেছি,

যে মাঠে একদিন আমাদের শিশুরা খেলা করতো

সেই মাঠে এখন আমরা খেলা করছি,

শিশুরা বিদায় নিয়ে চলে গেছে দূর অজানায়।

 

একদিন আমরা সবাই শিশু থেকে বড় হয়েছি

সবুজ মাঠে খেলা করতে করতে, নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে

সাপ আর হাঙরের বিষাক্ত ও ধারালো দাঁতের মোকাবিলা করতে করতে

আমরা বড় হয়ে উঠছিলাম;

বীজ থেকে পুষ্পময় বৃক্ষ হয়ে ডালপালা মেলে

খুব শক্তভাবে দাঁড়াতে শিখছিলাম।

 

একদিন হঠাৎ কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি এসে

খুব মনোযোগ দিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ করলেন,

তাঁরা অনেক অংক কষলেন, নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করলেন,

তর্ক-বিতর্ক শেষে খুব বিজ্ঞের মতো বললেন,

এভাবে বড় হতে থাকলে এখানে তোমাদের আর জায়গা হবেনা।

তোমরা বেড়ে উঠেছ অপরিকল্পিতভাবে নির্লজ্জের মতো

একথা বলে তাঁরা আমাদের ডালপালা, শাখা-প্রশাখাগুলো কাটতে শুরু করলো,

তাঁরা আমাদের একজনকে আরেকজনের কাঁধে বসিয়ে দিলো,

ভেঙে টুকরো টুকরো করলো ঘরদরজা, শোবার জায়গা

এমনকি আমাদের নামগুলোকেও কেটে দুই-তিন ভাগ করে দিল,

আমাদের বেড়ে ওঠা তারপর থেমে গেল,

উঁচু গাছ থেকে সুস্বাদু ফল খেতে হলে এখন

আমাদের একজনকে আরেকজনের কাঁধে উঠতে হয়।

 

বড় হবার পরিবর্তে আমরা আবার ছোট হতে থাকি,

বিজ্ঞজনদের পরিকল্পনা সফল হয়;

তার মুগ্ধ নয়নে আমাদেরকে দেখে,

আমাদের পাগুলো ছোট হয়ে ফুলে গেছে

আমরা বামনত্ব পেয়েছি;

যেখান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল

সেখানেই ফিরে এসেছি আবার!

 

কিন্তু আমরা খুশি!

অল্প জায়গায় অনেকগুলো বামন থাকতে পারে,

আমরা একজনের খাবার অনেকে ভাগ করে খাই

আমাদের কোন দুঃখ নেই

আমরা খুব সুখি বামন

আমরা সানন্দে বেছে নিয়েছি এ বামন জীবন।

 

আগামীর নিঃশ্বাস

 

একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি,

মেঘের আড়ালে সূর্যের মতো

ঢেকে যাচ্ছে মুখ,

বর্মের আড়ালে পোশাকের অন্তরালে

হারিয়ে যাচ্ছে আমার আজন্ম সরলতা।

 

যেভাবে ধুলো জমে রাস্তায়

আমার আত্মায় জমছে ধুলো,

কুয়াশা নামছে চুলে, দুশ্চিন্তার

মোড়ক খুলে আমি শুধু হতাশাই দেখছি।

 

একটু একটু করে নষ্ট হচ্ছে জল,

হারিয়ে যাচ্ছে নদী, জীবনের বহতা স্বপ্ন

নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে দেখি দুঃসময়

কেউ একজন ভেঙে ফেলছে প্রথার দেয়াল,

হয়তো চিৎকার করে কাউকে ডাকছি

কেউ একজন আছে আলোপিয়াসী।

 

একটু একটু করে হেরে যাচ্ছি,

ঘৃণার সলতে উঁচু করে ধরে চেষ্ট করছি অগ্নি জ্বালাতে,

যদি পুড়ে যাই, ভস্ম হই, ক্ষতি নেই

আমাকে ধারণ করবে বায়ু

নিঃস্ব হলেও মিশে যাবো আগামীর নিঃশ্বাসে।

 

তুমি অনেক দূরের জাহাজ

 

আমি যখন পুড়তে থাকি তোমার আঁচে,

জল চাইতে সাগর গেল নদীর কাছে।

ভালোবাসার তৃষ্ণা যখন বুক অবধি,

মুখ লুকালো ঈর্ষাকাতর কৃপণ নদী।

 

হৃদয় যখন ছারখার হয় নীল অনলে,

আমি তখন ভাসতে চাই তোমার জলে।

তুমি তখন অনেক দূরের একটা জাহাজ,

লাল আলোতে বলছো, ওহে, এসোনা আজ।

 

রক্তচোষা হাঙর তখন ডাকছে আমায়,

ঢেউয়ের ফণা উগড়ে দিলো মাঝ-দরিয়ায়।

আতর মাখা কাতর বুকের কাঁপন শুনে,

মৎস্যকন্যা চোখে দিলো স্বপ্ন বুনে।

 

ডুব সাঁতারের খেলায় ছিলাম ভীষণ কাঁচা,

তোমার হাতেই তখন আমার মরা-বাঁচা।

জলের কাছে গিয়ে দেখি জীবন নোনা,

ব্যর্থ হলো হায়রে আমার স্বপ্ন বোনা।

 

থাকুক রাতের তারা দিনের গভীরে

 

আমার নায়িকা আজ দূর মফস্বল,

দুপুরের ঝিম ধরা শাদা এক বাড়ি।

একদা উড়েছে যার শাড়ির অঞ্চল,

আজ সে নিজেই যেন বিধবার শাড়ি।

 

বাতাস ছড়ালো ঘৃণা হয়ে হতবাক!

হৃদয়কে টুকরো করে ঈর্ষার ছুরি,

মরা নদী ভুলে গেছে নিতে তার বাক,

দু’পারে ছড়িয়ে আছে বিষাদের নুড়ি।

 

যখন জোয়ার ছিল ভাসাইনি তরী,

আজ আর পালে নেই মনোরম হাওয়া।

ছিঁড়েছে ব্যথার ভারে গুন টানা দড়ি

উতল উজানে তাই শুধু দাঁড় বাওয়া।

 

কোথাকার ঢেউ তাই কোনখানে লাগে?

জাহাজ ভিড়েছে কোন্ অচেনা বন্দরে?

বেদনার ভাঙা চাঁদ রাতভর জাগে,

অভিমানী মেঘ যেন ফিরবেনা ঘরে।

 

নিখোঁজ সময় আর আসবেনা ফিরে,

থাকুক রাতের তারা দিনের গভীরে।

 

প্রেমতরিকার জিকির

 

ঠোঁটের কথা বন্ধ যখন হৃদয় কথা বলে,

অন্তঃআগুন জ্বালিয়েছিলাম অপাংক্তেয় জলে।

দ্বিধার আড়াল সরিয়ে তুমি এলে আমার কাছে,

বুঝতে পারি আকুল হলে জল ছাড়াও মীন বাঁচে।

 

ছিলে তুমি দূরবর্তী এক আকাশের তারা,

সান্ধ্যভাষায় কথা বলে পাইনি কোনো সাড়া।

চর্যাপদে ছিলে তুমি পদাবলীর পদে,

ভাবনগরের রসিকা গো ছিলে ভবনদে।

 

টেরাকোটায় তোমার ছবি আছো নৃত্যরত,

চৌষট্টি কলায় আছো শিল্পসম্মত।

প্রাত্যহিকের ধনুক ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়া তীরে,

ভেদ করেছ লক্ষ্য তুমি নির্বাচিতার শিরে।

 

দীর্ঘদিবস দীর্ঘরাতের বিরহকাল শেষে,

যখন কানু সমর্পিত তোমার কাছে এসে,

তখন তোমার মনের ভেতর কি জানি কি হয়?

জনম জনম পাশে তবু হারিয়ে ফেলার ভয়!

 

তোমার স্বরূপ উদ্ভাসিত দেহের কাঠামোতে,

আত্মনিবেদনের পুষ্প ভাসে রসের স্রোতে।

প্রেম তরিকার জিকির শুনি লক্ষ লক্ষ যুগ,

হিয়ার মাঝে হিয়া তবু জুরায় না এ বুক!

 

ধারণাগত সুখ

 

যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেই সিঁড়িতেই আছি

গড়িয়ে পড়ছে পাথরগুলো উঁচু থেকে, বুড়ো পাথর

মাথার ওপর পড়ছে পাথর, থেঁতলে দিচ্ছে মুখ।

দেখছি চেয়ে অনিবার্য প্রস্তরিত সুখ।

 

পাহাড়চূড়োয় উঠবো বলে কবে থেকে দাঁড়িয়ে আছি,

নদীর জলে গা ধুয়েছি

আগুন মেখে পুড়ে পুড়ে খাঁটি হয়েছি,

মরুভূমির ধুলো-ঝড়ে অন্ধ হতে হতে

যখন এলাম হৃদের ধারে,

দেখি আমার সামনে শুধু মরিচিকা!

পাহাড়টাও অনেক দূরে,

লতাগুল্ম  হাতে ধরে পতন থেকে বাঁচতে চেয়েছি

হায়রে আমি পাহাড়কে কেন কাছের ভেবেছি?

 

বোকার মতো এক সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে আছি,

বললো ওরা, ওটাই তোমার জীবনের শেষ উচ্চ সোপান

ভাবো, তুমি শীর্ষদেশে পৌঁছে গেছ,

ভাবো, তুমি দূর পাহাড়ের চূড়োয় যেন পা রেখেছ,

ভাবো, তুমি সব পেয়েছ,

ভাবতে থাকো, ভাবতে থাকো

ভাবো, তোমার স্বপ্ন সফল হয়ে গেছে

ভাবো, কেবল ভাবতে থাকো।

এটাই তোমার ধারণাগত সুখের জীবন!

 

প্রকাশিতব্য গ্রন্থ তুমি আমি আর ঈশ্বর থেকে / প্রকাশক পাঠক সমাবেশ ঢাকা / মূল্য নির্ধারিত হয়নি

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close