Home অনুবাদ মিয়া কুতো > দেবতার পাখিরা >> ছোটগল্প >> রোখসানা চৌধুরী অনূদিত

মিয়া কুতো > দেবতার পাখিরা >> ছোটগল্প >> রোখসানা চৌধুরী অনূদিত

প্রকাশঃ October 2, 2017

মিয়া কুতো > দেবতার পাখিরা >> ছোটগল্প >> রোখসানা চৌধুরী অনূদিত
0
0

মিয়া কুতো > দেবতার পাখিরা >> ছোটগল্প

[সম্পাদকীয় নোট : পর্তুগীজ বংশোদ্ভুত মিয়া কুতো মোজাম্বিকের প্রখ্যাত ছোটগল্পকার, কবি ও সাংবাদিক। তাঁর প্রথম উপন্যাসটিই অর্জন করে ‘জিম্বাবোয়ে ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার’ পুরস্কার। ২০১৪ সালে তিনি অর্জন করেন ‘নিউস্টাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটেরেচার’। প্রায় কুড়িটি দেশে তাঁর লেখা বিভিন্ন সময়ে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।]

‘আপনাদের কাছে বিনীত ক্ষমা প্রার্থনা করে বলছি, একজন তীর্থযাত্রীর চাইতে এই নদী সম্পর্কে আমি বেশি কিছু বলতে পারবো না। এর ঢেউগুলো অন্তহীনভাবে বয়ে চলেছে, জানিনা কতদূর পর্যন্ত এই জল তার কীর্তি দেখিয়ে যাবে।’

– আর্নেস্তো টিমবা তার গাছের গুঁড়ি কুঁদে বানানো পুরোনো নৌকাটাতে বসে এভাবেই তার জীবনকে মেপে দেখেছিলো। বারো বছর বয়সে যখন সে প্রথম স্কুলে যায় তখন এই নদীতে তার মাছ ধরার কাজের শুরু। গত ত্রিশ বছর ধরে তার ছায়া একইভাবে মৃদু ঢেউয়ের তরঙ্গে জলের প্রবাহে প্রতিফলিত হয়েছে। আর তার প্রতিফলটা কী পেয়েছে সে? খরায় মাটি শুকিয়ে চৌচির হয়েছে, শস্যবীজ সঠিক সময়ে ফসল দেয়নি।

যখন সে মাছ ধরে নদী থেকে ফিরত, তখন স্ত্রী-পুত্র পরিবারের আর্তদৃষ্টির সামনে কিছুই করার থাকতো না। তাদের চোখগুলো লোভার্ত কুকুরের মতো দেখাতো, মন না মানলেও সত্যটা এই যে, অভাব মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। ম্যাফোরিয়া গাছের নিচে নদীর তীরবর্তী স্থানে সে তার নৌকাটি ভেরালো, যাতে সে তার বেদনাদায়ক চিন্তাগুলো দূর করতে পারে। সে তার বৈঠা দিয়ে পানিতে সজোরে ধাক্কা দিলো, যদিও নৌকাটির তাতে কোনো নড়চড়ই ঘটলো না। একই সাথে তার ভাবনাগুলোও থেমে রইলো না।

– ‘কী জীবন আমি পার করলাম? জল, জল, জল ছাড়া আর কিছুই নাই।’

তার তীব্র মনোকষ্টের কারণেই হয়তো নৌকাটি ইতস্ততভাবে এদিক ওদিক দুলছিলো। ‘একদিন তারা আমাকে মাছ ধরবার সময় পানি থেকে সর্বাঙ্গ ভেজা অবস্থায় টেনে তুলেছিলো।’ তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা কাদা থেকে তাকে তোলার পর এমনভাবে দেখছিলো যেন পানির গভীরমূল থেকে তাকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে তোলা হয়েছে।

উপরন্তু মেফোরিয়া বৃক্ষটিও আর ছায়া দিতে ব্যর্থ হচ্ছিলো। কিন্তু টিমবা গাছের দিকে ভ্রুক্ষেপ করছিলো না, তার দৃষ্টি অনুসরণ করছিলো তার আত্মাকে। আর বিষয়টি এমনই ছিলো যে তারা অন্ধ হলেই কেবল তার বেদনা ধূলিকণার মতো হালকা হয়ে আসতো। অথচ আজো পর্যন্ত সকাল হলেই জলের নীলাভ তীব্র ঘ্রাণ তাকে আচ্ছন্ন করে ডেকে নিয়ে যায়।

‘যদি আমি কেবল আকাশে উড়তে পারতাম।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে সে বলে এবং অনুভব করে দীর্ঘ ত্রিশ বছরের ক্লান্তি তার সমগ্র জীবনে ভর করে আছে। সে তার পিতার বলে যাওয়া কথাগুলোকে মনে করতে থাকে, যা একসময় তাকে সাহস জোগাতো।

‘শিকারীদের দেখ, তারা কি করে? তারা হরিণটিকে দেখতে দেখতে তাদের বর্শাটি শিকারের জন্য প্রস্তুত করছে। কিন্তু একজন ধীবর নদীর ভেতরে থাকা মাছকে দেখতে পায় না। মৎসজীবীকে বিশ্বাস রাখতে হয় এমন কিছুর উপর যা সে দেখতে পায় না।’ এই শিক্ষা তার পুরো জীবনকে আবিষ্ট করে রেখেছে। আর ঠিক এই মুহূর্তে সে যেন সেই বচনামৃত আবারো স্মরণে আনতে চাইছিলো, কিন্তু ইতোমধ্যে দেরি হয়ে যাচ্ছিলো। সে ছিলো ক্ষুধার্ত, তাই বাড়ি ফেরার জন্যই তাগিদ অনুভব করলো।

তার হাত আবারো সচল হয়ে উঠলো যেখানে সে ঠিক আগ মুহূর্তেই থেমে ছিলো। মেঘ বয়ে যাচ্ছিলো, আর বিশাল এক পাখি সেটিকে অতিক্রম করছিলো। তার মনে হচ্ছিলো, পাখিটি যেন রাজাধিরাজ, রাজকীয় ভঙ্গিতে সে দয়ার প্রকাশ ঘটায়। বিশাল ডানায় ভর দিয়ে সে চোখের দিকে তাকিয়েই সমস্ত দুঃখ-দুর্দশাকে সমূলে বিনাশ করতে পারে।

‘ইশ্, যদি পাখিটি আমার ছোট্ট নৌকোটাতে এসে পড়ত।’

সে সজোরে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করছিলো। বলতে না বলতেই অকস্মিকভাবে সেই পাখিটি চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে তার নৌকায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশাল ডানা মেলে। চকিত আঘাতে পাখিটি এমনভাবে ছিটকে পড়ল যেন জীবন থেকেই বিচ্যূত হয়ে গেলো। টিমবা পাখিটির রক্তাক্ত দেহটি তুলে নিলো হাতে, দেখলো তখনো রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। পাখিটি সেরে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ানো আর ওড়ার মতো সক্ষম হওয়া পর্যন্ত টিমবা পাখিটির যতœ করলো। সুবিশাল পাখিটির ওজন আন্দাজ করে তাকে খাওয়া-দাওয়া করালো। আর সবশেষে তাকে উড়তে সাহায্য করলো। বললো,

‘পাখি তুমি ফিরে যাও, আমার কাছ থেকে,

যেখান থেকে এসেছিলে তুমি।’

কিন্তু কিসের কি! পাখিটা নড়লও না। মাছ শিকারীর বিস্ময় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলো, যখন সে অনুভব করলো এটি সাধারণ কোন পাখি নয়। বরং দেবতাদের সংকেত চিহ্নিত ছদ্মবেশী পাখি। স্বর্গ থেকে আসা এই সতর্কবাণীতে তার মনের শান্তি চিরতরে মুছে গিয়েছিলো।

পাখিটিকে সঙ্গে নিয়ে সে যখন বাড়িতে ফিরলো তার স্ত্রী সাদরে অভ্যর্থনা জানালো। ‘চলো পাখিটিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা লাঞ্চ করি।’ খুশি মনে সে বাচ্চাদেরও পাখি দেখবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করে দিলো-

‘কোথায় আমরা পুঁচকে ছানারা, দেখে যাও তোমাদের বাবা একটা দুর্বল-রোগা পাখি নিয়ে এসেছে।’

টিমবা এসব কথায় কোনো সাড়া না দিয়ে বাড়ির পেছনে চলে গেলো পাখির খাঁচা বানাবার জন্য কাঠের তক্তা, তার, খড় ইত্যাকার উপাদান যোগার করতে। টিমবা পাখিটির জন্য ইয়া বড় একটা খাঁচা বানালো যেখানে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষও ঢুকে যেতে পারতো। পাখিটিকে খাঁচায় রাখা হলো এবং প্রতিদিন তাকে টিমবার শিকারকৃত মাছ খাবারের জন্য দেয়া হতো। তার স্ত্রী বিস্মিত হতভম্ব হয়ে যাচ্ছিলো লোকটার কাণ্ড-কারখানা দেখে। টিমবাকে ক্রমেই উন্মাদনায় পেয়ে বসছিলো। যতই সময় যাচ্ছিলো পাখিটির যত্ন নেয়াই তার একমাত্র কাজ হয়ে উঠছিলো।

তার স্ত্রী পাখিটিকে উদ্দেশ্য করে তাকে জিজ্ঞেস করতো :

‘তুমি কি আমাদের ক্ষুধার কামড় টের পাওনা, পাখিটাকে তুমি মেরে ফেলতে পারো না?’ টিমবা তার হস্ত প্রসারিত করে দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করত: ‘যে-ই পাখিটাকে স্পর্শ করবে, সেই দেবতার অভিশাপে সারা জীবনের জন্য শাস্তি বয়ে বেড়াবে।’ কাজেই দিন বয়ে যেতে লাগলো এক অজানা অন্তহীন প্রতীক্ষায়। নদীর ধারে আরো অসংখ্য ঘামে-ভেজা গরম বিকেলে সে আশান্বিত দৃষ্টিতে পথ চেয়ে রইলো পূতপবিত্র সেই সংকেত বাস্তবায়িত হওয়ার মুহূর্ত গুনতে গুনতে। সূর্য অস্ত গেলেই সে পাখির খাঁচাটার কাছে ছুটে যেতো কোনো পরিবর্তন দেখবার আশায়, যেখানে পাখিটি কেবলি খেয়েদেয়ে স্থুল আকার ধারণ করছিলো। একটু একটু করে সে পাখিটির মুখের উপর শোকের আভাস লক্ষ্য করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো পাখিটি নিঃসঙ্গ, সঙ্গীর অভাবেই তার এই মলিনতা। এক রাতে, সে কায়মনোবাক্যে পাখিটির জন্য একটি সঙ্গীর প্রার্থনা করলো। আশ্চর্যজনকভাবে পরদিনই পাখিটিকে একটি মেয়ে পাখির সঙ্গে দেখা গেলো। টিমবা নীরবে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালো দেবতাকে, স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এই উপহারের জন্য। এই আনন্দিত অনুভূতির সাথে এক ধরনের পুলকিত অথচ শঙ্কিত ভাবনাও তার মনে দানা বাঁধলো, এই ভেবে যে, দেবতাদের তরফ থেকে তার জন্য বিশেষ কোনো বার্তা কি বহন করে নিয়ে আসছে এই পক্ষী রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়ে?

সে ভাবে আর ভাবে, পাখির পালকে ওঠা সেই সাদা আলোর দ্যুতি, যা একমাত্র তার ভাগ্য পরিবর্তনেরই সংকেত দেয়। ‘আসলে মানুষ যদি তাদের মনের উদারতা, দয়া-মায়াকে বিলিয়ে দিতে পারতো সবার মাঝে তাহলে সবার জন্যই স্বর্গ থেকে বার্তাবাহক আসতো। পৃথিবীতে খরা কেটে গিয়ে শস্যে ভরে উঠতো।’-দরিদ্র ধীবরটি দেবতার বার্তাবাহকদের আপ্যায়নে রত হয়ে ভাবতে থাকে, মানুষের মনুষ্যত্ব এখনো হারিয়ে যায়নি। তবে সেই মনুষ্যত্ব বাধাহীনভাবে জেগে উঠতে পারে যতক্ষণ না ক্ষুধারা পেটের ভিতর নৃত্য করতে থাকে। তার স্ত্রী মাচাম্বা গ্রাম থেকে ফিরে এলে টিমবার ভাবনা প্রবাহে বাধা পড়ে।

‘ও, এখন তাহলে দুটোকে পোষা হচ্ছে?’ সে তার স্বামীর পাশে বসে দীর্ঘসময় পাখি দুটোকে দেখলো, তারপর বললো :

‘স্বামীজী, চুলায় হাঁড়ি বসিয়েছি, কেবল একটা, অন্তত একটা পাখিকে তুমি খাবারের জন্য দাও।’ এই আবদার সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু ছিলো না। টিমবা গোঁ ধরে বসেছিলো তার প্রতিজ্ঞা নিয়ে, যে-ই পাখিকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে স্পর্শ করবে সে-ই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।

এরই মাঝে, পাখি দুটো বাচ্চা-কাচ্চার জন্ম দিলো। এর মধ্যে তিনটি ছানা ছিল ভয়ংকর রকম অলস আর কুৎসিত। খাওয়ার জন্য তাদের মুখের হা কখনো বন্ধ হতো না, কারণ নদীর বাতাস তাদের অতিরিক্ত ক্ষুধা বৃদ্ধি করত। যথার্থ অভিভাবকের মতই টিমবা তাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতো। বাড়ি-ঘরের অবস্থা ততোদিনে কতোটা সঙ্গীন হয়ে পড়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমন সময় গ্রামে গুজব রটে গেলো আর্নেস্তো টিমবা পুরোদস্তÍর পাগল হয়ে গেছে। তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তার মাত্রাছাড়ানো পাগলামি সহ্য করতে না পেরে। টিমবা অবশ্য তার পরিবারের অনুপস্থিতিটুকু অনুধাবন পর্যন্ত করতে পারলো না। সে বরং ব্যস্ত ছিলো তার পোল্ট্রির যত্নআত্তি বিষয়ে ব্যস্ত থাকতে। সে তার চারপাশ জুড়ে এক ঈর্ষাকাতর অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারছিলো। প্রতিহিংসা আপনা থেকেই বিস্তার ঘটছিলো। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, এই অবস্থার জন্য সে নিজে দায়ী কিনা? বিবেকের প্রশ্নে সে নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে যে, ঈশ্বর নির্ধারিত আত্মারা সর্বদাই পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।

এমনই এক নিরাক-পড়া বিকেলে সে নদীতে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলো, হঠাৎই সে দূর থেকে আগুনের শিখা দেখতে পায়। মনের ভেতর থেকে তৎক্ষণাৎ একটি চিন্তাই তীব্রগতিতে আলোড়িত হয়ে উঠলো- ‘আমার পাখিগুলো!’ সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে দেখতে পেল গাছপালার ভিতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাড়িটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। দ্রুত বৈঠা ঠেলে তার নৌকাটি তীরে ভিরতেই সে লাফ দিয়ে নেমে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বাড়ির পথ ধরলো। এমনকি নৌকাটিকে না বেঁধেই। যখন সে নির্মম দৃশ্যের কাছে পৌঁছালো, সবকিছু ততক্ষণে ছাইভস্মে পরিণত। খাঁচার কাঠপাট আগুনে পুড়ে দুমড়ে মুচড়ে গেছে। বোর্ডের একটি অংশ যেখানে আগুন স্পর্শ করতে পারেনি, সেখানে অভ্রান্তভাবে দেখা যাচ্ছিলো গল্পের শেষাংশ। পাখিগুলো ভীতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো নিজেদের বাঁচাতে, এবং অবশ্যই সেই ধংসস্তূপের ভিতর। এখানে কোন দোদুল্যমানতা ছিলো না, নদী ও নৌকার মতো। বরং তা ছিলো মৃত্যুর মতো নিশ্চিত, সত্যের মতো কঠিন! টিমবা পিছু হটলো। আতঙ্কে, মর্মাহতভাবে চিৎকার করলো, করতেই থাকলো, স্ত্রীর জন্য, ছেলে-মেয়েদের জন্য, মুহূর্ত পরেই টের পেলো তার চিৎকার শোনার মতো কেউ আর অবশিষ্ট নেই। অনিঃশেষ কান্নায় তার চোখ ফুলে ব্যথা হয়ে গিয়েছিলো।

‘কেন, কেন তারা পাখিগুলোকে মেরে ফেললো, আগুন আর ছাই কি পাখির চেয়ে সুন্দর হতে পারে?’-ছাই আর ধোঁয়াকে উদ্দেশ্য করে আর্তনাদশেষে স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতি তার অভিযোগ বর্ষণ শুরু হলো-

‘তুমি রেগে গিয়েছিলে, আমি জানি তুমি তোমার সন্তানদের শাস্তি দিতে চাও, কিন্তু দেখো, আমি তোমাকে বলছি তাদের ক্ষমা করে দিতে। আমাকে সেই মৃতদের একজন হতে দাও, আমার বদলে তুমি তাদের দুর্দশা থেকে মুক্ত করো, যারা দুর্দশার ভেতরেই বাস করছে। তুমি বৃষ্টি দিতে ভুলে যেতে পারো, কিন্তু এই পৃথিবীর মানুষগুলোকে তুমি শাস্তি দিও না।’ পরদিন গ্রামবাসী আর্নেস্তোকে খুঁজে পেলো নদীর ঢেউয়ে মাখামাখি অবস্থায়। ভোরের কুয়াশায় ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে আছে। সে এতটাই ভারি হয়ে ছিলো যে তাকে পানি থেকে তুলে আলাদা করাটা ছিলো প্রায় অসম্ভব।

গ্রামের সবচাইতে শক্তিধর মানুষেরা মিলেও তাকে তুলতে গিয়ে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলো। মৃত দেহটি নদীর গভীরে প্রায় আটকে ছিলো যেন। অদ্ভুত ভয়ের এক শিরশিরে অনুভূতি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়লো। ভয় কাটাতে একজন বলে উঠল: ‘তার স্ত্রীকে খবর দাও। বলো যে, গ্রামের পাগল মানুষটি মারা গেছে।’ এবং তারা অবশেষে হাল ছেড়ে দিলো। যখনই তারা তাকে রেখে তীরের কাছে পৌঁছালো ঠিক তখনই মেঘে জমে কালো হয়ে এলো, আকাশকে দেখাচ্ছিলো যেন রোষ কষায়িত রুদ্রমূর্তির মত। সম্পূর্ণ অদ্ভুত বিপরীত এক পরিবেশে সেই অঞ্চলের মানুষ বৃষ্টিকে স্বাগত জানালো। এই প্রথমবারের মতো তাদের সমবেত বিশ্বাস বৃষ্টির কাছে নয় বরং এক মহাপরাভব শক্তির কাছে নতজানু হলো। নদী বয়ে চলে নির্বিকারভাবে, মানুষের হাসি-কান্নাকে ভ্র~ক্ষেপ না করে। আর্নেস্তো টিমবা, শান্তভাবে নদীর ঢেউয়ে মিশে গেছে ভাটির দিকে, ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া ছায়াচ্ছন্ন স্বপ্নের ভেতর।

[এখানে গল্পটির সংক্ষেপিত অংশ প্রকাশিত হলো।]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close