Home পঠন-পাঠন মুহিম মনির > ইশিগুরোর গল্পানুবাদ অথবা অনূদিত সৃজনশীলতা >> পঠনপাঠন

মুহিম মনির > ইশিগুরোর গল্পানুবাদ অথবা অনূদিত সৃজনশীলতা >> পঠনপাঠন

প্রকাশঃ March 30, 2018

মুহিম মনির > ইশিগুরোর গল্পানুবাদ অথবা অনূদিত সৃজনশীলতা >> পঠনপাঠন
0
0

মুহিম মনির > ইশিগুরোর গল্পানুবাদ অথবা অনূদিত সৃজনশীলতা >> পঠনপাঠন

 

‘সেতারে যেমন বেহালার স্বর নেই, সানাইয়ে নেই পিয়ানোর স্বর, তেমনি এক ভাষায় নেই অন্য ভাষার স্বর।’
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সূত্র ধরেই বলি, ইতালীয়রা হয়তো এ কারণেই বলে, ‘traduttore, traditore’ অর্থাৎ ‘translator, traitor’, মানে ‘অনুবাদক, প্রতারক’ আরকি। তার পরও বিশ্বাসপ্রবণ জাতি বলেই কিনা জানি না, অনুবাদকর্মের আগেও ‘বিশ্বস্ত’ শব্দটা যোগ করি আমরা। করে একরকম সুখ পাই। কিন্তু শেষ বিচারে এই সুখ আবার অসুখ হয়ে দাঁড়ায় না তো? কী জানি; ভাববার বিষয়। তবে উত্তরটা ‘না’-ই হবে হয়তো। কেননা, অনুবাদ বলতে একরকম সৃজনশীলতা বোঝালেও এমন ধরনের সৃজনশীলতা বোঝায় যাতে সহজেই বিশ্বাস অর্জন করতে পারে লক্ষ্য ভাষার লোকগুলো। অনূদিত জমিনটা যাতে পাঠকের এগুনোর উপযোগী হয়, শিল্পের স্বাদ পাওয়া যায়, শেষ পর্যন্ত এমনটাই প্রত্যাশা থাকে পাঠকের। আর যখন কোনো অনুবাদকর্মে এমন সৌকর্যের সন্ধান মেলে, তখনই হয়তো অমন করে বলি, ‘বিশ্বস্ত অনুবাদ’।

এখন একটা গল্প বা গল্পাংশ পড়া যাক! ‘জাপানের প্রশান্ত উপকূলে ফুগু মাছ ধরা হয়। এই মাছ খেয়ে আমার মা যখন মারা যান তখন থেকেই এই মাছ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই মাছের বিষটা থাকে এর যৌনগ্রন্থির দুটো পলকা থলের ভেতরে। কাটার সময় খুব সাবধানে এই থলে দুটো অপসারণ করতে হয়, তা না হলে সামান্যতেই ফুটো হয়ে বিষ শিরা-উপশিরায় মিশে যায়। মুশকিল হলো যে তারপরও বলার উপায় নেই, কাজটা সাফল্যের সঙ্গে করা গেছে কি না। খেয়েই যেন তার প্রমাণ দিতে হয়।’

এটিকে খুব সহজেই কোনো একটি বাংলা গল্পের অংশ বলে চালিয়ে দেয়া যেত, যদি ‘জাপান’ ‘প্রশান্ত মহাসাগর’ এখানে না-থাকত; আর ‘ফুগু’ যদি হতো রুই-কাতলার মতো আর দশটা পরিচিত মাছ। কিন্তু কাজুও ইশিগুরোর এ-বাক্যগুলো- ‘Fugu is a fish of the shores of Japan. The fish held a special significance for me ever since my mother died through eating one. The poison resides in the sexual glands of the fish inside two fragile bags. when preparing the fish, these bags must be removed with caution, for any clumsiness will result in the poison, leaking into the veins. Regrettably, it is not easy to tell whether or not this operation has been carried out successfully. The proof, as it were, in the eating.’- পড়া থাকলে বিপত্তি বিস্ময় দু-ই ঘটত। বিপত্তিটা ঘটত এ কারণে যে, ওটুকু যে অনূদিত গল্পাংশ, সেটা আর ধামাচাপা দেয়া যেত না। আর একইসঙ্গে এমন চমৎকার অনুবাদে চমকেও উঠতেন পাঠক। উদ্দিষ্টের মোহনায় উৎসের এমন অবগাহনে পাঠক আকর্ষিত হন; মুগ্ধ হন। একজন কৃতী অনুবাদকের সার্থকতাও হয়তো এখানেই।

সদ্য নোবেলজয়ী ডায়াস্পোরা কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরোর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প A family supper গল্পটি শুরু হয়েছে ফুগু মাছে কথকের মায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। উক্ত গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদটুকুই উল্লিখিত হয়েছে ওপরে। উল্লিখিত হয়েছে সেই অংশটুকুর অনুবাদও। গল্পটির চমৎকার বাঙলায়ন করেছেন রাজিয়া সুলতানা, ‘পারিবারিক নৈশভোজ’ নামে। গল্পটি সংযুক্ত হয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘কাজুও ইশিগুরো তিনটি বড়গল্প’ বইটিতে। এতে আছে ইশিগুরোর আরো দুটি আলোচিত গল্প, ‘ক্রুনার’ ও ‘চেলোবাদক’। যেটি বলছিলাম, বিশ্বস্ত অনুবাদ, তেমনটিরই দেখা মিলেছে বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। রাজিয়ার অনূদিত গদ্য যেমন ঝরঝরে, তেমনই সহজ-সাবলীল-প্রাঞ্জল। পাঠক অনেক সময় বুঝে ওঠেন না, এটি ঠিক অনুবাদ নাকি মূল টেক্সট। সুন্দর শব্দচয়ন আর সুনিপুণ বাক্যবুননে অনুবাদেও প্রাণসঞ্চার করেছেন তিনি। যাতে তাঁর মমত্ব আর পরিশ্রমের ছাপ সহজেই চোখে পড়ে পাঠকের। ‘অনুবাদ বলতে সমার্থবোধক প্রকাশ করা বোঝায়, একই অর্থ প্রকাশ করা নয়’- নিডা ও টাবের এ-কথাও খাটে রাজিয়ার অনুবাদের বেলায়।

বোর্হেস তো বলেছেন, ‘আমরা যখন কোনো অনুবাদ পড়ি, তখন কতই না ভালো হতো যদি আমরা না জানতাম যে কোনটা মূল আর কোনটা অনুবাদ। তখন দেখা যেত অনেক সময়ই আমাদের যেটা বেশি ভালো লাগছে সেটা মূল নয়, বরং মূলের ভাষান্তর।’ আর তাই যখন পড়ি- ‘আমরা ঝোঁপঝাড় লতাগুল্মের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ একটা পথে ধরে যাচ্ছিলাম। এইপথ কুয়োর কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা হাঁটছি, কিকুকো অপ্রয়োজনীয়ভাবে নাটকীয় ভঙ্গিতে সিগ্রেট ফুঁকছে আর বলছে- ‘জানো, ওসাকায় এখন আমার অনেক বন্ধু। জায়গাটা আমার পছন্দ। এখনই আমি ওদেরকে ছেড়ে আসব কিনা জানি না। আর সূচিকে তো আমি পছন্দ করি। শুধু বলতে পারিনা ওর সঙ্গে কতটা সময় কাটাবো।’ (পারিবারিক নৈশভোজ; রাজিয়া সুলতানা অনূদিত)। কিংবা এই বাক্যগুলো- ‘আমার কথা শুনে তোমাদের মনে হতে পারে, আমি ব্যান্ডের নিয়মিত একজন সদস্য। আসলে আমি মিউজিশিয়ানদের জন্য জিপসির কাজ করি। ওরাই আমাকে এই নাম দিয়েছে। এই চত্বরের তিনটি ক্যাফের অনুষ্ঠানে যখন যেখানে প্রয়োজন হয় আমি ওদেরকে সাহায্য করি’ (ক্রুনার; রাজিয়া সুলতানা অনূদিত)।- তখন অনূদিত সৃজনশীলতায় মুগ্ধ না-হয়ে পারি না।

আরেকটু আগবাড়িয়ে বলা যায়, যে liberal মানে ফ্রান্সে হয় ডানপন্থী, সে-শব্দের অর্থই আবার আমেরিকায় বামপন্থী। যুক্তরাজ্যে fag মানে সিগারেট হলেও যুক্তরাষ্ট্রে সেই fag বলতে আবার হোমোসেক্সুয়াল পুরুষকে বোঝায়। তাই অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎস ভাষার আভিধানিক অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়- এ আমরা জানি। এ-কারণেই অঞ্চলভেদে এমনকি সময়ভেদে শব্দের প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক অর্থও জানতে হবে। ঠিক এসব কারণে এও বলা যায় :

‘সবচেয়ে ভালো হয়, অনুবাদক যে দেশের সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করছেন সে দেশে কিছুকাল যাপন করতে পারলে। অর্থাৎ ভাষা শেখাটাই এখানে সব না। গ্লোবাল ইংরেজি আর স্থানিক ইংরেজি সবসময় এক হয় না। যে কারণে অভিধানের অর্থ সর্বত্র চলে না। নিশ্চয় ভাষা সবসময় কনটেক্সচুয়াল। অনুবাদককে সেটা ধরতে হবে। না হলে জীবনানন্দ দাশের ‘হয়তোবা হাঁস হবো- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়’- এর অনুবাদ করতে গিয়ে হাঁসের লাল পায়ের ঘুঙুর উঠে যাবে কিশোরীর পায়ে, যেমনটি কিছু কিছু অনুবাদে হয়েছেও (অনুবাদের তত্ত্ব ও প্রসঙ্গ কথা; বিশ্বসাহিত্যের কথা; মোজাফফর হোসেন)।’

এদিক থেকেও বেশ অভিজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা। ব্যক্তিগতভাবে ১৯৯২ সাল থেকে আমেরিকায় বসবাস করছেন তিনি। একইসঙ্গে শিক্ষকতাও করছেন সেখানে। ইংরেজি পরিমণ্ডলে থাকায় ইংরেজি সাহিত্যের বিশ্বস্ত অনুবাদের আশাও করা যায় তাঁর কাছে। আর আস্থার প্রশ্নে এ যাবৎ বিভিন্ন ওয়েবজিনে প্রকাশিত তাঁর অনূদিত গল্প-কবিতা ইতোমধ্যে আশ্বস্তও করেছে অনেক পাঠককে।

জানামতে, এ বইমেলায় কাজুও ইশিগুরোর অনূদিত গল্প আর তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি সমৃদ্ধ ভূমিকাসহ এটিই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বই। আর একইসঙ্গে বাঙালি পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে গেছেন ইশিগুরো। সবমিলিয়ে বইটির একজন পাঠক হিসেবে আমার বিশ্বাস, অচিরেই পাঠকনন্দিত হবে রাজিয়া সুলতানার এই মহার্ঘ্যটি। যদিও তাঁর বয়ানশৈলী আরেকটু প্রাঞ্জল হতে পারত, বাক্যবুনন হতে পারত আরেকটু সাবলীল, তবুও এ-কথা বেশ জোর দিয়েই বলা যায় যে, পাঠকমাত্রেই এ বইটি থেকে পাবেন চমৎকার সৃজনশীলতা আর শিল্পশৈলীর স্বাদ । পরবর্তী মুদ্রণে, আরও কিছু গল্প যুক্ত করে বইটি পুনঃমুদ্রিত হবে বলে আশা করি। আমাদের অনুবাদ জগতে তাঁর স্বচ্ছন্দ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। সবশেষে বহুল প্রচারণা কামনা করছি রাজিয়া সুলতানার অনুবাদকর্ম- ‘কাজুও ইশিগুরো তিনটি বড়গল্প’ বইটির।

 

আলোচিত বই : কাজুও ইশিগুরো তিনটি বড়গল্প
ভূমিকা ও ভাষান্তর : রাজিয়া সুলতানা
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০ টাকা

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close