Home মুক্তগদ্য মেঘ অদিতি / ঘুমিয়ে পড়া হৃৎকথন

মেঘ অদিতি / ঘুমিয়ে পড়া হৃৎকথন

প্রকাশঃ November 15, 2016

মেঘ অদিতি / ঘুমিয়ে পড়া হৃৎকথন
0
4

মেঘ অদিতি / ঘুমিয়ে পড়া হৃৎকথন

[সম্পাদকীয় নোট : মানবিক সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতিই আমাদের সংস্কৃতি। এই মুহূর্তে যে সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা, সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কলম বা কীবোর্ডের মাধ্যমেই কবি-লেখকেরা জানাতে পারেন প্রতিবাদ এবং আবাহন জানাতে পারেন সম্প্রীতির। আর এই লক্ষ্যেই তীরন্দাজের বিশেষ আয়াজন ‘ধাবমান ইতিহাসযান’। আমাদের ইতিহাসে যেমন আছে এই ইতিবাচক সম্প্রীতির কথা, তেমনি আজকের কবি-লেখকেরাও সম্মিলিত কণ্ঠে তীরন্দাজের মাধ্যমে উচ্চারণ করলেন মানবিক সংহতি আর সম্প্রীতির। কয়েকটি গুচ্ছে তীরন্দাজে প্রকাশিত হবে কবি-লেখকদের এসব কথা। সেই আয়োজনের প্রথম পোস্টটি পড়ুন।]

 মেঘ অদিতি / ঘুমিয়ে পড়া হৃৎকথন

অনেককাল আগের কথা –

 

আমাদের হৃদয় ভরা আলো

আমাদের আলো ছিল ভালো

 

ঔজ্জ্বল্য কম অথচ বড় স্নিগ্ধ ছিল সে আলো

সাদা, কালো, লাল, নীল, হলুদে, সবুজে বোনা আমাদের ভালবাসার সে সাতকাহন –

 

সে-সব বৃষ্টিদিনে কোথা দিয়ে জল এসে জুড়তো কাচে। বহু দূর থেকে তাকে দেখলে আজো বড় মসৃণ দেখি সব। চোখের নিচে তখন অবধি কোনো ফাইন লাইনস, রিঙ্কলস বুড়োদের নেই। প্রতিযোগী নয় বন্ধু, হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যেত তারা পথ। সম্পর্কায়ন ও সাম্যে আজ চিত্রাঙ্গদা, কাল সাজু রূপাইয়ের বিচ্ছেদগাঁথায় পূর্ণ ছোট্ট মহকুমা। ভালবাসায় পূর্ণ ছিল মানুষ। ছিল মানবতা।  পুজো তো সার্বজনীন, ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি তাই সক্কলে। আর ঈদ মানে আনন্দ, সেও কোর্মা পোলাও, মিঠাইয়ের সুবাসে সবাইকে আমোদিত রাখতো। পিসি এসেছিল টিফিনকেরিয়ার ভর্তি ইফতার নিয়ে। সিঁথিতে জ্বলজ্বলে সিঁদুর, একপ্যাঁচে-পরা শাড়ির ঘোমটা থেকে বেরিয়ে এসেছে সদ্য স্নান করা চুল। তখনও বিন্দু বিন্দু জল। বড্ড লোভী তো, বয়সটাও নেহাতই সাত বা আট, পিসির টিফিন ক্যারিয়ার না খোলা পর্যন্ত আমায় ঠাঁইনাড়া দেওয়া সহজ অত! বাটির ঢাকনা খুলতে ফোঁস করে বেরিয়ে এলো কষা ছোলায় আটকেপড়া ধোঁয়া। আরেকটা বাটিতে বেগুনি। অন্যটাতে পিঁয়াজু, আরো আরো আরো… বেরুচ্ছেই খাবার… পিসি বলছে, দাদা রোজা, আজ ইফতার করবে আমার তৈরি করা খাবারে।

বাবা নিয়ে এল হোয়াইট আংকলকে সাথে করে তার দেওয়া কার্ড মেকার নিয়ে। এ পোড়ার দেশে দই বানানো মেশিনের কথা তখন কেউ জানত কি না জানি না। তবে হ্যাঁ, ওই যে বড্ড লোভি ছিলাম, হোয়াইট আংকলদের বড় দিনে কুকিজগুলো জানতাম খেতে কেমন। আন্টি তো সোজা ডেকে টেবিলে বসিয়ে দিত। তো দই বানাবার মেশিনের দিকেও জুলজুলে চোখে তাকিয়ে ছিলাম প্রথমে। পর আবার কান্না পেল। আংকলরা চলে যাচ্ছে আমাদের ছেড়ে।

তারপর যা হয়- আমাদের রূপকথার গল্পে রাক্ষসগুলো, যাদের বড় হতে হতে মিথ্যে ভাবতে শিখছিলাম, হঠাৎ দেখি ওমা সত্যি ওরা আছে। আর শহরগুলো খুব দ্রুত গ্রামে ঢুকে পড়ছে। পাকা রাস্তাগুলো কাঁচা রাস্তায় মিশে যাচ্ছে। আর দ্রুত বদলে যাচ্ছে সঞ্চিত অভিজ্ঞান।

মানুষ ও মানুষ, এত কি বদলাতে আছে বলো!

আধুনিক হলে বুঝি অত অত বিদ্বেষ, অপরিচয় আসে। শিক্ষা বুঝি প্রান্তিক মানুষকে পর করে দেয়! ধর্ম বুঝি মানুষের চেয়ে বড় হয়ে চাপাতি উঁচিয়ে আসে! কতদিন আয়ু? কতটুকু সম্পূর্ণ তুমি-আমি? যাদের হাত ধরে পথ চললে তাদেরই হাত থেকে হাত সরিয়ে নিচ্ছো নিজের হাত। কষ্ট হয় না? নিজের শ্বাসটুকু আটকে দেখো তো তুমি কী, কতটুকু?

ওরা ভূমিপুত্র! তাই মানুষ বুঝি নয়?

ওরা সংখ্যালঘু, ওরা মানুষ বুঝি নয়?

তুমিই কেবল মানুষ!

দেখো তবে পড়ে থাকা ভূমিপুত্রের নিস্পন্দ শরীর দেখে তুমি আজ  উল্লাস কর

ও মানুষ তুমি ভেঙে চুরমার করে দাও কেন সংখ্যালঘুর উপাসনালয়, বাসস্থান…

ও মানুষ, দশদিকে যে অসীম হাহাকার…

হাঁড়িতে ভাত পুড়ে ছাই

আগুনে ঘর পুড়ে ছাই

ও মানুষ তুমি ঘুমিয়ে পড়ছো কেন!

 

জীবন থমকে যাওয়া এমন দহনে

মানুষের মতো তুমিও কি

ঘুমিয়ে পড়লে সম্প্রীতি?

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(4)

  1. পালপাড়ায় বাড়ি হবার জন্য আমার শৈশবও পুজার গন্ধে ভরা।কিন্তু এখন দুএকটি পাল পরিবার রয়ে গেছে বলে শুনেছি।তীরন্দাজকে সাধুবাদ জানাই যথাসময়ে আমাদের ঘুম ভাঙানোর আয়োজন করবার জন্য।

  2. মানুষের ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হোক। লেখক ও তীরন্দাজকে ধন্যবাদ।

  3. মন ছু্ঁয়ে যায় এমন একটা লেখা।মুগ্ধ। কতবার পড়লাম!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close