Home ছোটগল্প মেঘ অদিতি > স্বাতী নক্ষত্র ও এক পাখিজীবন >> ছোটগল্প

মেঘ অদিতি > স্বাতী নক্ষত্র ও এক পাখিজীবন >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ January 28, 2018

মেঘ অদিতি > স্বাতী নক্ষত্র ও এক পাখিজীবন >> ছোটগল্প
0
0

মেঘ অদিতি > স্বাতী নক্ষত্র ও এক পাখিজীবন >> ছোটগল্প

 

পাখি জীবনের ইতিবৃত্ত 

রুমু

যেভাবে তথাগত সাধনায় নিজেকে পৃথক করে নিয়েছিলেন সমাজ-সংসার থেকে, সেভাবেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছি জাগতিক সমস্ত আলো অন্ধকার থেকে। কিছু পেতে গেলে তার জন্য সঠিক সাধনা চাই।  তবেই না তা মেলে। আর এ সাধনা তোমাকে পাবার। তাই এ এক আনন্দ উৎসব।

সে আনন্দে কখন যে জলরঙে আঁকছি সবুজ আদিগন্ত ভূমি। নীলে আঁকছি নদী। নদী ছাড়া কি করে বাঁচবেই বা আমার রাজ্যপাট। ভাবছি তোমার চোখের পাতা থেকে কিছুটা বাদামী সরিয়ে ছুঁয়ে দেবো আকাশের গায়ে। তারপর  ভূমি আকাশ বাতাস নদী এক হয়ে করে শান্তির পীঠস্থান হয়ে উঠবে আমাদের পৃথিবী।

অয়ন

[পুনশ্চ: পাখি জন্মের একাল সেকাল নিয়ে কখনো লেখা হলে সে লেখায় অয়ন বলে কেউ কখনো থাকবে না তবু আজ তোমাকে জানাতে চাই অপেক্ষা ছাড়া এ জীবনে আমি সত্যি তেমন কিছু শিখে উঠতে পারিনি।]

মেসেজ। না না একটা চিঠি। চিঠিই কি আদতে? একে প্রেমের চিঠি কি বলা যায়? বৈদ্যুতিন এইসব বার্তাকে রুমুর কিছুতেই চিঠি বলতে ইচ্ছা করে না। প্রেমের চিঠি তো আরও নয়। চিঠিদের গায়ে তো অদৃশ্য ডানা থাকবে বলো! চিঠির গায়ে লেগে থাকবে প্রেমিকের গাঢ় শ্বাস। প্রতি শব্দ থেকে শ্রাবণ ধারার মতো ঝরে ঝরে পড়বে বিরহ.. যেমনটা ছিল অনেক অনেক কাল আগে। সেইসব নীল খাম, সেইসব প্রেম বিরহের কথন। একটা নীল খামের আফসোস তার রয়ে যাবে হয়তো আজন্ম। তবে সেসব দিনে প্রেম নাকি ছিলো ভীষণতর অপরাধ। সেসব দিন মানে পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে দেবার যুগ নয় ,সে যুগ পেরিয়ে কত শত সময় চলে গেছে তবু মা যখন আঠরো কুড়ি তখনও নাকি সামরিক শাসনের যুগই ছিলো, মা-ই বলেছে। এসব শুনলে রুমুর কেমন অস্থির অস্থির লাগে। এ সময়টা কি আগের চাইতে ভালো নয় রুমু? একটা নীল খামের বাসনাকে বুকের গোপন কুঠুরিতে চালান দিয়ে নিজের কাছে করা প্রশ্নের উত্তরে শেষ অবধি সে স্বীকার করে, এ বরং আগের চাইতে ঢের ঢের ভালো। প্রেম নিয়ে অহেতুক ট্যাবু ও স্টিগমার দিন শেষ। চিঠিটা না হয় আগের মতো আর নীল খামে আসে না.. কিন্তু বৈদ্যুতিন বার্তা হিসেবে যা আসে তা শুধুই প্রেরক আর প্রাপকের। মধ্যবর্তী সব রকমের বিপত্তি এড়িয়ে টুপ করে প্রাপকের হাতে এসে পৌঁছানো এ কি কম স্বস্তির!

কিন্তু… রুমু রুমু! আবার কেন অয়ন। এতদিন পর অয়ন চিঠিতে কী লিখেছে তোমায়!

মণিকাকে মনে পড়ে যায়। ঘুরে ফিরে আবার ইনবক্সে ফেরে রুমু। পড়া চিঠি আবার পড়ে। পড়তে পড়তে হাসে। বাবা…কী সব আবেগ। যেন পড়লেই রুমু তার প্রেমে হাবুডুবু খাবে। অয়ন তার ঠিকানা পালটেছে। আগের একাউন্ট তো কবেই রুমু আটকে দিয়েছিল। এবার কী মনে করে নতুন করে পাঠানো অয়নের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট সে এক্সেপ্ট করে নিল। তারপর গুনগুন। মা-র ফাঁকা ঘরে বড় আয়নাটার সামনে অনেকক্ষণ। আয়নার রুমুটা আজ তাকে দেখে মিটিমিটি হাসে। কী দেখো রুমু? আর সবার মতো তুমিও সেই নার্সিসিস্ট? এই যে এতদিন পর অয়ন নামের একটা ছেলে আবার তোমাকে ডাক পাঠালো চিঠি দিয়ে সেই চিঠিটা পাবার পর তোমার কেমন লাগছে সত্যি করে বলো তো! ছেলেটার জন্য মন কেমন করছে না করুণা হচ্ছে? বলো…নিজের কাছে নিজেকে লুকিও না রুমু। এই তো নিজেকে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখতে গিয়ে ভাবছো এই এক বছরে কতটা বদল ঘটেছে তোমার। বদল তো ঘটেই রুমু। সময় বদলে দেয় কত কী! কিন্তু ভাবো, অয়নকেও একটু ভাবো। ভাবাটাও একটা কাজ। ভাবো, অয়ন নামের ছেলেটা কেন একটা বছর পার করে আবার তোমাকেই লিখছে?

 

অদ্ভুত নীরবতা ব্যথাগুলো যেন সঙ্গীত!

 

দ্বিতীয় সেমিস্টার। এবার রুমু যাদের সাথে তারা একেবারেই ওর অচেনা। আগের সেমিস্টারে চপলকে রুমু পেয়েছিল বন্ধু হিসেবে। অয়ন চপলের আগে থেকে চেনা। চপলই রুমুকে পরিচয় করিয়ে দিল অয়নের সাথে। অর্থাৎ অয়ন আর রুমুর কোর্স ম্যাচ করে গেছে। সেবন্তী চপল হয়ে গেছে আলাদা। অতএব চেনা বা সামান্য পরিচয় সে এক অয়নের সাথেই। রুমু ইউনিভার্সিটির এই সিস্টেমটাকে বেজায় অপছন্দ করে। প্রতিবার কোর্স বদলালে কে যে কার সাথে পড়বে। যদিও অন্যরা বলে- এই তো ভালো ,নতুন নতুন মুখ, বন্ধু বাড়াবার এই তো সুযোগ। এটা একটা সোশালাইজেশন প্রসেস…যাহ্…বন্ধু চাইলেই কি বন্ধু হয় না কি! আর রুমু তো মুখচোরা। স্কুল থেকে কলেজে বার বছরে বন্ধু পেয়েছিল সে শেষের চারবছর তাও সাকুল্যে চার। এবার আবার বন্ধুহীন জীবন। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর অল্পবিস্তর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে চপল আর সেবন্তীর সাথেই কিন্তু প্রথম সেমিস্টারের পর আবার ওরা বিচ্ছিন্ন। চপলদের সাথে রুমুর সময় মেলানো কঠিন, ক্লাসের সময় এক নয়। রুমু তাই একা।

ক্লাস শেষে এক পা দু পা সিঁড়ি ভাঙে আর শামুক খোলের ভেতর নিজেকে ঢুকিয়ে ফেলে। বাড়ি ফিরে সেই এক বই, গান আর বাকি অল্প, খুব অল্প সময় মা-র সাথে। মাও বন্ধু। কত কী শেখায়। যে বয়সটায় রুমু দাঁড়িয়ে মা-র সে বয়সের গল্প বলে মা। রুমুর ভালো লাগে। কিন্তু কতক্ষণই বা মাকে সে পায়। পুরনো বন্ধুদের মনে পড়ে। সবাই যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে। হয়তো আস্তে আস্তে আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে এসব বন্ধন। আজকাল সাইবার বন্ধু হয়েছে তার দু চারজন। কিন্ত এই দুনিয়ার পায়ে পায়ে না কি বিপদ। মা-ই শিখিয়েছে। অচেনা কাউকে বন্ধু করতে আগে দশবার অন্তত ভাবো। ধুত্তোর অত ভেবে কে বন্ধু বানাতে যাবে। তার থেকে একা থাকা ঢের ভালো। আর একা থাকাটা না কি একটা অভ্যেস। যেমন ঈশ্বর, মুলত একাই। রুমু গান শোনে একা। শুনতে শুনতে বিষণ্ণ হয়। কবিতা পড়ে কাঁদে।  বারান্দা বা আকাশ ছোঁয়া ছাদ রুমু একা হাঁটে বা দাঁড়ায়, একাই তো। স্টাডিরুমের দরজা বন্ধ করে একা একা ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একা। একা থাকা কি সত্যিই এক অভ্যেস? তাহলে থেকে থেকেই এত কান্না কেন পায়? কদিন সে ক্লাসেও যাচ্ছে না। মাসের বিশেষ ক’টা দিন তার ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়। আগে স্কুল কলেজে বন্ধুরা ক’দিনের পড়াগুলো বুঝিয়ে দিত। এখন কে দেবে? অয়ন? আলাপই হলো কই তেমন করে! অয়ন নাকি মণিকা নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়ে আছে। সেবন্তীই বলেছে রুমুকে। মণিকা নামের মেয়েটা আগে পড়তো নর্থসাউথে সেখান থেকে আটমাস আগে এই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে চলে এসেছে।  আর সেমিস্টার ড্রপ করে অয়নও নাকি এবার ওর পিছে পিছে। মণিকা রুমুর চেনা নয়। তবে সেবন্তী একদিন দেখিয়েছিল ক্লাসের পরে, গ্রাউন্ডের ওয়াই ফাই জোনে অয়ন আর মণিকা কথা বলছে।

এক সপ্তাহ পর রুমু আজ ক্লাসে এলো। ক্লাস শেষে সিঁড়িতে পা রাখবে, শুনতে পেলো পিছন থেকে কেউ ডাকছে.. রুমু এ্যাই রুমু..  উত্তরের তোয়াক্কা না করে জুড়েও গেল রুমুর সাথে । ঘাড় না ফিরিয়েও রুমু বুঝেছে এ অয়ন। কখনও সেভাবে কথা হলো না অথচ আজ শুরুই করলো যেন কতকালের চেনা। রুমুর অস্বস্তি হচ্ছে।

–          কী ব্যাপার কোথায় ডুব মেরেছিলে কদিন? ফেসবুকে মেসেজ রেখেছি, রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি।

 তুমি কি ফেসবুকে বসো না?

–          বাড়িতেই ছিলাম

–          তাই! চলো ক্যান্টিনে বসি। না কি গ্রাউন্ড প্রেফার করো?

কেমন গায়ে পড়া যেন..রুমুর উত্তর করতে ইচ্ছে করছে না। মাথা নেড়ে মিষ্টি করে হেসে না বলে দিলো। তারপর ঢুকে গেল নিজের ভেতর।

 

আজ যেমন করে গাইছে আকাশ

তোমাকে লিখেছিলাম সেই ছেলেটার কথা মনে আছে? সেই যে ছেলেটা কথা বললে, মেয়েটা চুপ করে শুনত। মেয়েটা গাইলে ছেলেটা কবিতা শোনাতো। হয়তো অনেক কিছু মেয়েটার ছিলো। ছিলো কেন বলি আজও আছে। তবে তেমন কিছু কি সত্যি থাকে কারও!

এই যে তোমার একা থাকা, একার সাথে একার বসবাস, এ তো আর আজকের নয়, সে কবেকার অভ্যেস। চুপকথাগুলো কবেই জমে পাথর, আর কে যেন, তেমন কেউ নয়, হয়তো নিতান্ত সধারণ কেউ একটু একটু করে এসে হাত ধরলো, সে দেখতে তেমন নয়, শিক্ষা দীক্ষাও তেমন নয়। এক দুই তিন চার পাঁচের মধ্যে সে হারিয়েই যাওয়া এক লোক। যাকে তুমি ভাবতেই পারো নিতান্ত মাঝারি  কিন্তু জানো পৃথিবীর ইতিহাসে যা কিছু ব্যাপক বদল, তা বদলেছে নিতান্ত সাধারণই… 

কী বলতে চায় আবার অয়ন? মুখোমুখি তো কথা হয় না কতদিন। অথচ এক বছরের নীরবতার পর অয়নের লেখা এই চিঠিগুলো তো অর্থবহ। ধরে ধরে উত্তর রুমু যে দেয় তাও না। মাঝে মাঝে হাসির ইমোটিকনে চিঠির প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়ে দেয়। কখনও দু চার লাইন লিখে ফেলে। তাতে রুমুর মনটাকে ধরা পড়তে দেয় না কিছুতেই। কিন্তু মন। তার কখন যে কী হয়। সারাটাক্ষণ মনে ভেতর কত কিছু ঘটে। ঘটেই চলে। ফোন নাম্বার, না দেয়নি অয়নকে। গতবছর না বুঝে দিয়ে ফেলার পরপরই ভুলের খেসারত দিতে পরে সিমটাই পালটাতে হয়েছিল ওর। আপাতত ফেসবুকই সই। সেমিস্টার ব্রেকের ছুটিতে একা বাড়িতে বই পত্র মুখ থেকে সরিয়ে আপাতত বাড়তি অক্সিজেনের জোগান যেমন অয়নের এই চিঠিগুলো তেমন ভাবনার জোগানও বটে। দুপুরগুলো এখন আর একঘেঁয়ে নয় , কারণ ওই যে কোথাও কেউ একজন আছে, তারই অপেক্ষায়, তাকেই লিখে চলেছে পাখি জীবনের ইতিবৃত্ত.. তেমন কেউ থাকলে কী করে যেন সব শান্ত হয়ে আসে। স্থির।  দুপুরের আলো কেমন কমে এসে হালকা হয়ে যায়, এ আলো রুমুর চেনা। আর আলোটা জ্বলে উঠলেই কি একটা অলৌকিক ঘটে যায় ভেতরে ভেতরে। তেমন করে রুমুর কেউ ছিল না কখনও। আগেরবার যখন অয়ন এসেছিল ঠিক এই অনুভূতিগুলো রুমুর ভেতর ছিলো না। এবার যেন অয়ন রুমুর ভেতরের ইচ্ছেগুলোকে জলরঙে এঁকে দিচ্ছে আর রুমুর সব অন্ধকার কেটে জেগে উঠছে আলো। মনের ভেতরটা এখন বড় অদ্ভুত। বিশাল আকাশের ক্যানভাসে কেবলই থেকে থেকে ভেসে ওঠে অয়নের মুখ।

 

প্রাণের পরে চলে গেল কে…

 

সময় কী দ্রুত দৌড়ুচ্ছে। আজকাল রুমু সময়ের পিছু পিছু দৌড়ে অস্থির। ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট, ক্যাম্পাস, বাড়ি উফফ.. রুমু হাঁপিয়ে ওঠে। কোনোদিক দিয়ে যে গ্রীষ্ম বর্ষা পেরিয়ে শীত এসে যায় জানতেও পারে না। হঠাৎ উত্তরে হাওয়া এসে একদিন ওর চুল উড়িয়ে দিলে রুমু অবাকচোখে দেখে ঋতুবদল ঘটে গেছে কবে যেন..তবে কেবল কি ঋতুবদলই ঘটেছে? রুমুটাও তো থার্ড সেমিস্টারে এসে আর আগের মতো শামুক খোলে আটকে রাখা সেই মানুষটা নেই আর। দিব্যি হাসিখুশি একটা মেয়ে। আর থার্ড সেমিস্টারে এসে কোর্সগুলো এক হয়ে গেছে  চপল, সেবন্তী, অয়ন আর ওর। আর বদল ঘটে গেছে একজনের চোখ। রুমু খুব বুঝতে পারে সে চোখ ঘুরেফিরে রুমুর কাছে এসে স্থির হয়ে যায়। বুঝলেই বা কি, রুমু অত মাথা ঘামায় না সেদিকে। আর ও তো জানে এ দৃষ্টি অন্য কোথাও আর কারুর দখলে ছিল। আজ হঠাৎ তার মুখে থেমেছে হয়তো কিছু সময়ের জন্য। সময় বদলে গেলে সম্পর্কও বদলে যায়। মণিকা আর অয়নের না কি ব্রেক আপ হয়ে গেছে সেবন্তী এমনটাই বলেছিল। ও তার বেশি জানে না। জানতে চায়ওনি।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ক্লাস শেষে বের হয়েই রুমু বুঝলো আজ দিনটা অন্যরকম। দিনের আলো তার উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলেছে শীতের দাপটে। ব্যাগ থেকে একটা অতিরিক্ত শাল বের করে ও গায়ে জড়ালো। গ্রাউন্ডে বসার কথা বলছিল চপলরা, শুনেই ওর শীতবোধ বেড়ে গেলো আরও। তোরা যা বলে ও ক্যান্টিনে ঢুকে গেল। এক কাপ গরম কফি অর্ডার করে কোণের একটা টেবিল বাছলো ও। আজ ক্যান্টিন ফাঁকা। দু চারটে টেবিলে ছেলেমেয়েরা খাবার ফাঁকে আড্ডা দিচ্ছে। রুমু ওর সেলফোনে খানিক খুটখাট করতে করতে কফি এসে গেলো। তবে এক কাপ নয় দু কাপ।

মাথা তুলো তাকাবার আগেই চেয়ার সশব্দে টেনে রুমু খানিকটা কাছে এনে অয়ন বললো, এই ওয়েদারে এক কাপ কফি আমরা একসাথে খেতেই পারি, কী বলো…

কফি, হ্যাঁ সেদিন কেবলই কফি। তবে প্রথমদিকে গায়ে পড়া অয়নকে এবার তার মনে হলো কিছুটা উদ্ধতও বুঝি। সৌজন্যতার ধার ধারে না এ কেমন ছেলে.. তবে প্রথমবার কফির পর সামান্য বিরতি দিয়ে কবে থেকে যেন ওরা ঘনঘনই কফি খেতে শুরু করেছিল। একটু একটু করে ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া। ফেসবুকে এড করে নেওয়া। আর কোনো এক শীতবিকেলে রুমুকে সে বলেছিল যদি বন্ধু হও তবে বাড়াও হাত..

রুমু কী করে। কোথায় মণিকা। কী হয়েছিল তার সাথে? এসব প্রশ্নে সে অয়নকে বিব্রত করতে পারে না কিন্তু নিজের কাছেও তো উত্তর মেলে না। ভেতর ভেতর কেমন এক অন্যায় বোধ তাড়া করে বেড়ায়। অয়ন তাকে খুলেও বলেছে কথায় কথায়।  মণিকা অয়নের বন্ধু ছিলো। কিন্তু মণিকা এখন আর কোথাও নেই জেনেও মন থেকে তবু গ্লানি কি দূর হয় রুমুর? একবার অয়নের জন্য মন কেমন করে আবার মণিকার কথা মনে হলে সিঁটিয়ে যায়। উপায়ান্তর খুঁজে না পেয়ে কোনো এক ছুটির সকালে রুমু মা-র সামনে এসে দাঁড়ায়। আর মা? আত্মজার ভেতর দেখতে পায় তার ফেলে আসা অতীত। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, রুমু যে ছেলেটা একটা মেয়ের জন্য এক ক্যাম্পাস ছেড়ে অন্য ক্যাম্পাসে তার পিছু নিয়ে আসে, আবার তার সাথে ব্রেক আপে যেতেও সময় নেয় না, সে নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেও তার ওপর আস্থা রাখতে পারবে কি… তুমি… তোমার সাথে এমন ঘটলে সেটা পরে সামলাতে পারবে তো?

 

পথে বা নিরুদ্দেশে… কখনও আলো জ্বলবেই…

 

ভালবাসা এক বিশুদ্ধ নির্মাণ। এক অনন্য বোধ যা বাঁচতে শেখায়। একটি সিদ্ধান্ত অথবা সামগ্রিক তুমির মধ্যে বেছে নিতে দিলে আমি তোমাকেই চাইব। আর তো কিছু জানি না আলাদা করে। অন্যায়, অসততা ভালবাসতে শেখায় না, ভালোও রাখে না। জীবনে মুগ্ধতা বড় অকৃত্রিম বস্তু। তোমার সম্মন্ধে যা আছে আমার প্রবল মাত্রায়।

আমার এসব এলোমেলো জবানবন্দীর তুমি যখন উত্তর কর না সাময়িক অস্বস্তিতে পড়ি। আবার ভালোও লাগে। ভাবি এই ঠিক। গান পাঠালাম কদিন আগে, তুমি কিছুই বললে না, ভাবি হয়তো তোমার গানগুলো ভালো লাগেনি। অজান্তেই কি করে যেন আমার ভাল বা মন্দের এক নির্ধারক হয়ে উঠেছো কেবল তুমিই।

ভালবাসাই দিলাম। বদলে নিলাম অপেক্ষা।

 

অয়ন

 

দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রুমু অয়নের মেসেজটা খুলে চুপ করে বসে। সে ঘটনার পর থেকে গত এক বছরে  সে নিজেকে আবার ঢুকিয়ে নিয়েছে শামুক খোলে। ক্লাসে যায়, বাড়ি ফেরে। বাড়তি সময় সে ক্যাম্পাসে কাটায় না তা নয়। কিন্তু অয়নকে এড়িয়ে কাটায়। পরের সেমিস্টারগুলোতে সে অর্থে দেখাও হয়েছে কম। আর রুমুর এড়িয়ে যাওয়াটুকু বুঝে অয়নও তাকে আর বিরক্ত করেনি। অয়নের চিঠি অধ্যায় শুরু হবার পরও সামনাসামনি খুব কথা তো ওরা আজও বলেনা। হয়তো অস্বস্তিটুকু দুজনকেই বিঁধে রাখে। রুমু ভাবে রুমুর যা কিছু অপেক্ষা তা কেবল অয়নের মেসেজ বা মেইলের ভেতর সীমাবদ্ধ। যত গভীরতা নিয়ে ও চিঠি লেখে ততটা গভীর ওকে বাস্তবে মনে হয়নি কেন কে জানে। অয়নের মুখোমুখি ও পড়েও যায় যখনতখন। চোখে চোখ পড়লে একটু চেনা হাসি, কখনও হ্যালো, তার বাইরে তাই কথা নয়।

নিজেকে প্রশ্ন করে মনে মনে ও ভার্চুয়াল অয়নকেই কি চায়? কেবল চিঠিই? উত্তরটা অয়ন দেয়। হঠাৎ একদিন কথা হয়ে যায় মুখোমুখি।  অয়ন বলে, অনেক তো হলো। আর কত নিজেকে লুকিয়ে রাখা রুমু? এবার তো নিজের ভেতর থেকে বেরোও। বেরিয়ে এসো প্লিজ। অয়ন কি এবার আরেকটু বেশি ডেসপারেট! রুমু বোঝে না। ও কি ছাই বোঝে এত..কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে ..ভাবতে গেলে সব যে এলোমেলো লাগে! রুমু কেবল ভাবে গান ভালবাসলে বুঝি গান হয়ে ওঠা যায়? কবিতা লিখতে চাইলে কি কবিতা হওয়া যায়! ভালবাসার মানুষ, ভালবাসতে চাইলেই তা কেন প্রকাশিত হবে!

একটু আগেই অয়নের আরেকটা মেসেজ এলো, কাল সাড়ে দশটার পর ক্যান্টিনে থেকো। বিশেষ দরকার।

ক্যাম্পাসে আসতে যেতে চেনামুখগুলোর সাথে কতবার দেখা হয়। অয়নের সাথে এর মাঝে কথাও হয়েছে। অয়ন কেন ঘটা করে ডাক পাঠাচ্ছে.. তাহলে?  সেই থেকে বুক ঢিপ ঢিপ রুমুর। থেকে থেকে গা শিউরে উঠছে যেন শরীর ভরা জ্বর। কেন এমন হচ্ছে? আড়ষ্ট হাতে ফোনটা শেষে করেই ফেললো ..

–          রুমু!

–          হুম। তুমি কি ব্যস্ত? একটু কথা বলা যাবে?

–          হোয়াট আ সারপ্রাইজ রুমু! তুমি আমাকে ফোন করেছো!! বলো বলো কী বলবে, আমার কোনো ব্যস্ততা নেই।

–          কাল ডেকেছো কেন?

–          কেন বল তো? ডেকে কি অন্যায় করলাম কিছু?

–          না না, তা কেন! জানতে চাইছিলাম কাল কোনো বিশেষ দিন কি না। আমি তো এমনিতেও ক্লাসে যেতামই। ডাকলে কেন..

–          হুঁ!! কাল কী জানো না!

–          না তো!

–          কাল আমার জন্মদিন রুমু। এসো প্লিজ!

যাক! ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো রুমুর। জন্মদিন। একটা নিরীহ জন্মদিনের জন্য এতক্ষণ ও এত চিন্তা করছিলো তবে…

 

এক পাশে সাগর এক পাশে বালি

 

ক্যাম্পাসে পা রাখতেই আজ চারদিকে লালের মেলা বসেছে মনে হলো ওর। ব্যাপারটা কী! সেবন্তীর সাথে দেখা। দেখে মনে হলো বেশ ঘাবড়ে আছে। আসলে একটা এসাইনমেন্ট নিয়ে রুমু আর সেবন্তী লড়ে যাচ্ছে বেশ কদিন। সেবন্তী খুব ইনফো কালেক্ট করতে পারেনি। এ নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লাসরুম এসে গেলো। ক্লাসে বসতে না বসতেই ম্যাম এসে গেলো। লাল একটা শাড়িতে কী ভালো দেখাচ্ছে ম্যামকে। মুগ্ধচোখে তাকে কিছুক্ষণ দেখলো রুমু। আর তখনই লাব…ডুব…লাব…মিস…ডুব…মিস…বিট মিস…এই রে আজ তারিখটা কত! অয়ন কি এজন্যই? কিন্তু কই ক্যাম্পাসে ঢোকার পর থাকে চোখে পড়েনি তো ওর। বললো আজ জন্মদিন। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে খেয়াল হলো আরে ম্যামের লেকচার তো দৌড়ে চলেছে.. উফ.. খাতায় তুলতে গিয়ে আলগোছে ঘড়ি দেখে ও।

ক্যান্টিনে এখন তেমন কেউ নেই। নাহ অয়নও নেই। দশটা সাঁইত্রিশ।

রুমুর মনটা কেমন মেঘে ঢেকে যেতে লাগলো..

দশটা পঁয়তাল্লিশ…

রুমু উঠে দাঁড়িয়েছে। বাড়ি ফিরবে।

এক পা দু পা… দু পা… চারদিক কেমন শুনশান হয়ে আছে।

রুমুর হঠাৎ কেমন কান্না পেল। গতবার অয়নকে ফিরিয়ে দেবার প্রতিশোধ আজ এভাবে নিল ও.. কিন্তু কেন? আজকের দিনেই কেন… আর তখুনি কে খুব কাছ থেকে গাইলো, আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়…

কে?

কে নয়?

সেবন্তী, চপল হৈ হৈ করে উঠলো কে আবার … অয়ন!

সেবন্তীরা রুমুকে চেপে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে কখন। আর অয়ন!

হাঁটু মুড়ে বসেছে রুমুর সামনে। ওর একটা হাতে থেকে থেকে হেসে উঠছে একটা রুপোর নূপুর।

রুমু সহসা চোখ বন্ধু করে ফেললো।

ওর ডান পায়ের পাতায় অয়নের স্পর্শ… কী হচ্ছে অয়ন!

নূপুর পরিয়ে দিলাম…

চোখ খোল! আরে রুমু চোখ খোল! তোদের এখন শুভদৃষ্টি হবে।

চোখ খুলছে রুমু…

অয়ন কিছু একটা বলছে…রুমু কিছু শুনতে পাচ্ছে না…

ঝাপসা চোখদুটো আবার বন্ধ হয়ে যাবার আগে দেখতে পেলো ওর সামনে ধরা কেকটার গায়ে অর্ধবৃত্তাকারে লেখা-

রুমু…

বি মাই ভ্যালেন্টাইন…

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close