Home কবিতা মেহরাব হাসান > মোস্তফা হামেদীর ‘তামার তোরঙ্গ’ : রৌদ্রস্নিগ্ধ হাওয়ার সেতার

মেহরাব হাসান > মোস্তফা হামেদীর ‘তামার তোরঙ্গ’ : রৌদ্রস্নিগ্ধ হাওয়ার সেতার

প্রকাশঃ February 14, 2018

মেহরাব হাসান > মোস্তফা হামেদীর ‘তামার তোরঙ্গ’ : রৌদ্রস্নিগ্ধ হাওয়ার সেতার
0
0

মেহরাব হাসান > মোস্তফা হামেদীর তামার তোরঙ্গ : রৌদ্রস্নিগ্ধ হাওয়ার সেতার

 

একটা ঝর্ণা। দূর থেকে যেমন ভেসে আসবে সেই ঝর্ণার জলপতনের শব্দ, তেমনি সিক্ত আর্দ্র স্পর্শ। সেই স্পর্শ যতটা-না শরীরী, তার চেয়ে অনেক বেশি হানা দেবে ইন্দ্রিয়-ইথারে। বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার ঘোরলাগা ঘুমে পাঠক মগ্ন হয়ে মিশে যাবেন শব্দযাপনে। কবিদের কবিতা লেখাকে আমি শব্দযাপনই বলবো। পাঠকের সঙ্গে সংযোগের কতটা কূটাভাস। সেই বইয়ের একটা কবিতার কিছুটা অংশ আজও মনে করতে পারি :

জ্বরটর হলো না তো

জলপট্টি দেবে সে বর্ষা, জারুলের জামা ধুতে ধুতে

অতীতালয়ে গেল না

ভাইরাস বিরোধী বায়ু আটকালো জ্যামে

আমি তাই শরৎস্টেশনে নেমে

একখান প্ল্যাকার্ড নিয়া বসি- একাসনে

নিজের-ই সমীপে লিখি-

কবির নিজেকে লেখা এই চিঠি আমিও পেয়েছিলাম ২০১৫ সালে। সে বছরই মোস্তফার কবিতা প্রথম পড়ি। বেরিয়েছিল ছিল ‘মেঘ ও ভবঘুরে খরগোশ’ নামের কবিতার বইটি। বইটার নাম আমাকে খুব টেনেছিল।শুরু থেকেই দেখছি, গ্রামীণ অনুষঙ্গে ওর কবিতা কী দারুণভাবে ঘনীভূত হয়। তবে সেই বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই ছিল দীর্ঘ। কথা বলার একটা ঝোঁক ছিল হামেদীর। কিন্তু এবার ‘তামার তোরঙ্গ’-এর কবিতাগুলি ছোট ছোট, কিন্তু মর্মভেদী। শব্দবন্ধ যদি দ্যুতি ছড়ায়, হামেদীর এই বইয়ের কবিতাগুলি তেমনি। ইঙ্গিতময়, তীক্ষ্ণ, পরিশীলিত, স্মার্ট। অনেকেই ভাবেন, নাগরিক অনুষঙ্গই বুঝি একজন কবিকে স্মার্ট করে। কিন্তু তা নয়। কবিতার স্মার্টনেস নির্ভর করে তার ভাষায়। অনেক নাগরিক কথাও ভাষার গ্রাম্যতার কারণে জোলো মনে হয়। কিন্তু হামেদীর কবিতার ভাষায় কোনো গ্রাম্যতা নেই। গ্রাম্যতা এখানে আনাড়িপনার সমার্থক। কিন্তু যে যাপনের ছবি নতুন বইতে পাচ্ছি, সেই প্রতিবেশ গ্রামীণ, কিন্তু কবিতা আধুনিক। কবিতা মানে এর ভাষা ও নির্মাণ।

এই বইয়ে হামেদীর বলা কথাগুলি অনেক নিবিড়, তীক্ষ্ণ, ঝকঝকে। টুকরো-টুকরো, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন পঙক্তি, লজিকাল সিকোয়েন্স মেনে এগোয় না, কিন্তু বাক্যের পর বাক্য যেন কারো গহন-চোখের ইশারা, ঝলক। ভালো লাগলো যে হামেদী ক্রমশ না-বলা কথাকেই মুখর করে তুলতে পারছেন। দেখুন কী নম্র সান্দ্র ছবি :

চিমনির নরম আলোয়

গড়িয়ে গড়িয়ে যায়

দূরাগত কোনো সাইকেল আরোহী

 

অথবা আরেকটা কবিতার কিয়দংশ :

ঘামছে পত্রাবলি

অরণ্যের ঢালু পেটে

জ্বরের ঘোরে কাঁপছে

মহুয়া

এই ছায়া অরণ্যে ঢুকে পড়তে পাঠকদের ভালই লাগবে নিঃসন্দেহে। আমার অন্তত তাই লেগেছে। কী সহজ নির্ভার তার কবিতার পঙক্তিগুলির চলা :

ভিতরে ভিতরে পেকে উঠছে কল্পনাফল

একে ফাটিয়ে দে

অমৃত লাভে সমুদ্র পাড়ি

আর কত

পরান্ধ কথকেরা

চুপ যাও

হাত দূরত্বেই শত ফুলকি

বটের উঁচু ডাল ছুঁয়ে

এবার গ্রীষ্মে নিজেই গল্প হই

[আমিও]

একটা সম্পূর্ণ কবিতা তুলে দিলাম এখানে। বলবার ভঙ্গিটার কারণে প্রিয় হয়ে উঠেছে। হামেদীর কল্পনাশক্তি তার কবিতাকে গভীর করে তোলে।

এই বইমেলায় তার বইটি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে বলে ধারণা করছি। তীরন্দাজের পাঠকদেরও বইটি কিনে পড়ার আহ্বান জানাই আর শুভকামনা হামেদীকে।

এখানে হামেদীর কয়েকটি নির্বাচিত কবিতা প্রকাশ করা হলো, যে-কবিতাগুলি তিনি নিজেই বেছে তীরন্দাজের পাঠকদের পাঠের জন্য দিয়েছেন। পাঠক, পড়ুন হামেদীর বাছাই করা নিচের কবিতাগুলি :

 

মোস্তফা হামেদী >> কবিতাগুচ্ছ

 

কয়েন

 

কে যেন লক্ষ লক্ষ কয়েন ছিটাচ্ছে হাইওয়ের উপর

 

কালো মোজাইকের ফ্লোরে

মেঘোত্তমার নাচ

 

তার ঘাঘরার ভিতর

উপচে উঠছে

 

তরঙ্গের রাগ

 

বাজছে সন্তুর

 

পত্র-পল্লবের পাশে

 

 

ছাঁট

 

মিরসরাইয়ে আটকে আছে

সাতসকালের বৃষ্টিবাস

আগাচ্ছে না একটি গ্রামও

সান্ত্বনা দেয় ছাঁট পাঠিয়ে

বন্য হাওয়া আচম্বিতে

সব হারানোর রসদ নিয়ে

ঝিরির পথেই হড়কে গেছে

নীল সাগরের মোজায় মোড়া

ঠান্ডা জোড়া পা

 

তার আভাসে

 

চায়ের দোকান বন্ধ রেখে

মেঘের ডাকের মর্ম বুঝে

রসিক নাগর কাঁথার নিচে

বউয়ের শাড়ির আঁচল ধরে

আটকে থাকল একটা বেলা

প্রেমের কদর যাদের কাছে

চার পেয়ালা চায়ের থেকে

নিদেনপক্ষে অনেক দামি

 

হঠাৎ হঠাৎ কয়েক ফোঁটা

ছাঁট বাতাসে তার পোষাবে?

 

সায়াহ্ন

 

চিরচুপ মানুষের বাড়ি

কবরখোলার গাছে বায়ু

পাতা কাটাকুটি খেলা শেষে

অতল ঘুমের গহ্বরে

সায়াহ্ন একমাত্র ঋতু

ভ্রমণের মেয়াদ ফুরিয়ে

কেবলি বেকার বেসে থাকা

যেন নষ্ট ফিতার ক্যাসেট

অথবা ফাঁপা ট্রানজিস্টার

কেউ খুলে নিয়ে গেছে গান

মহা আসরে বাজাবে বলে

ফুসফুস থেকে উবে গেছে

হাওয়া, বাক্যের প্রয়োজন

 

সঙ্গলিপ্সা

 

সে রকম ইশারা

 

ধ্বনি

 

কোথায়

 

বলো, ঝরা পাতার বুক,

আর্দ্রতা

 

 

…………..

তামার তোরঙ্গ / মোস্তফা হামেদী

প্রচ্ছদ রাজীব দত্ত / জেব্রাক্রসিং, মূল্য ১৩০ টাকা

 

 

 

 

 

 

 

 

মধুলগ্ন

 

দুপুরের জন্ম আফিম বাগানে

 

হারিয়ে যাওয়ার বাসনারা জড়ো হয়

কোথাও ডাকছে তিলা ঘুঘু

 

পুরনো সাইকেলে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে

কেউ হারিয়ে যায় নিজের ছায়ায়

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close