Home অনূদিত কবিতা ব্যক্তিত্ব মেহরাব হাসান > লোরকার মৃত্যুরহস্য এবং দুটি কবিতা >> প্রয়াণদিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

মেহরাব হাসান > লোরকার মৃত্যুরহস্য এবং দুটি কবিতা >> প্রয়াণদিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রকাশঃ August 19, 2017

মেহরাব হাসান > লোরকার মৃত্যুরহস্য এবং দুটি কবিতা >> প্রয়াণদিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য
0
1

মেহরাব হাসান > লোরকার মৃত্যুরহস্য এবং দুটি কবিতা

একটা ছোট্ট পথ। গ্রানাদার আন্দালুসীয় শহর থেকে উঠে গেছে উঁচু একটা পাড়ারের দিকে। পথের দুই পাশে ঘন বন। পথটা শেষ হয়েছে একটা সমাধিক্ষেত্রে গিয়ে। পৃথিবী এখানে নিশ্চুপ, নিথর, স্তব্ধ। চারদিকে প্রকৃতির লালিমা। অলিভ বৃক্ষের পাতাগুলি ঘন সবুজ, অথবা বুড়িয়ে গেলে যেমন হয়- ধুসর, বিবর্ণ। সমাধিক্ষেত্রের দেয়ালগুলি অনেক উঁচু, মাটির রঙে দেয়ালের রঙ। মাটির চৌকো খণ্ড খণ্ড টাইল দিয়ে গাঁথা। দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে দেয়ালটা প্রায় ২০ ফুট লম্বা হয়ে সরে গেছে উত্তরে। ওই দেয়ালের গায়েই বুলেটের চিহ্ন। চিহ্ন হত্যার, খুনের, রক্তঝরানোর।

১৯৩৬ সাল। একটা খোলা ট্রাকে দিনের পর দিন এখানে হাজারখানেক মানুষকে ধরে আনা হয়। আর দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় তাদের। বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝড়া হয়ে যাওয়ার পর ওই মানুষগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এটা ছিল আসলে ফ্যায়ারিং স্কোয়াড।

এই সমাধিক্ষেত্র থেকে যে পথটা ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে, তার পাশেই ছিল কয়েকটি হোটেল। হোটেলে অবকাশ যাপন করতে এসেছিলেন মার্কিন টুরিস্টরা। সারা দিন পরিভ্রমণে তাদের ভালো কাটলেও ভোরের দিকে ট্রাকের ঘড়ঘড় আর ফ্যায়ারিংয়ের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যেত। ট্রাকগুলি উঠে যেত ওই সমাধিক্ষেত্রের দিকে। তারপরই শোনা যেত মুহূর্মুহু গুলির শব্দ। বহুকাল পরে সেই বীভৎস বিনিদ্র রাত্রিযাপনের এরকমই বর্ণনা দিয়েছেন বেশ কয়েকজন মার্কিন পর্যটক, যারা ওই সময়ে আন্দালুসিয়া ভ্রমণ করছিলেন।

আগস্টের ১৬ তারিখ। তিরিশ জনকে এই সমাধিক্ষেত্রে এনে গুলি করে হত্যা করা হল। আর শহরে, শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে হিস্পানি কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে আটক করে ঢোকানো হলে জেলে। দু’দিন পর দু’জন বুলফাইটার আর একজন স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে খুন করা হল লোরকাকে।

লোরকা ছিলেন সুদর্শন সুপুরুষ। মাথায় তার কালো চুল। লম্বা লম্বা পা ফেলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে পথ হাঁটেন। স্থানীয় এক অভিজাত পিতার সন্তান তিনি। বাবা গ্রানাডার ধনী ভূস্বামী। গ্রানাডাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পুরো পরিবারটাই আবার স্প্যানিশ রিপাবলিক দলের উদারনৈতিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। লোরকার এক বোনের বিয়ে হয়েছে গ্রানাডার সোসালিস্ট মেয়র বা নগরপিতার সঙ্গে। যে-তিরিশ জনকে ১৬ আগস্ট গুলি করে খুন করা হয়, তিনি ছিলেন তাদেরই একজন।

১৯২৮ সালে প্রকাশিত কবিতার বই ‘জিপসি গাথা’ (জিপসি ব্যালাড) আর ১৯৩২ সালে লেখা ও মঞ্চায়িত ‘রক্ত-বিবাহ’ (ব্লাড ওয়েডিং) নাটকের জন্যে কবি ও নাট্যকার হিসেবে লোরকার খ্যাতি তখন তুঙ্গে। প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি এবং চলচ্চিত্র পরিচালক লুই বুনুয়েল। এই দু’জনের সঙ্গেই তাঁর জটিল এক প্রেমের সম্পর্ক। ১৯৩১ সালের পর লোরকা তাঁর নিজের থিয়েটার গ্রুপ ‘লা বারাকা’কে নিয়ে স্পেন ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই কাজে সহায়তা করেছে স্পেনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাঁর বয়স যখন ৩৮ বছর, তখনই রিপাবলিকানদের মধ্যে বহুল আলোচিত এক কবি তিনি। আর এই পরিচিতিই কাল হয়ে ওঠে তাঁর। খুন করার জন্য তার বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়।

১৯৩৬ সালের ১৭ জুলাই। জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো অস্ত্রের জোরে স্পেনের ক্ষমতা দখল করলো। সরিয়ে দিল বাম-ঘেঁষা সরকারকে। তিনি দিন পর তার বিদ্রোহী সেনাদের একটা অংশ গ্রানাডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। স্পেনে শুরু হয়ে গেল গৃহযুদ্ধ। তিন বছর ধরে চলা ওই যুদ্ধে ফ্রাঙ্কো এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যালাঞ্জিস্টদেরকে সহায়তা করেছে হিটলার এবং মুসোলিনি। গৃহযুদ্ধে স্পেনের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে হত্যা করা হল। এসবই ঘটেছে রিপাবলিকানদের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাবার আগেই। চূড়ান্তভাবে ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে স্পেনে শুরু হল ফ্রাঙ্কোর স্বৈরাচারী শাসন, যা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

 

[দুই]

 

নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় কাজ করেন এমন একজন সাংবাদিক- জো লুই অ্যান্ডারসন কয়েক বছর আগে যে সমাধিক্ষেত্রে লোরকাকে খুন করা হয়েছিল, সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি লিখছেন, কোনো এক বিকেলে সমাধিক্ষেত্রে এসে পৌঁছুলাম আমি। চারিদিকটা কী সুনশান। কিন্তু চোখে পড়ল শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপগুচ্ছের একটা তোড়া। বোঝাই যায়, পরম শ্রদ্ধায় কেউ হয়তো বুলেটে ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের পাশে মাটিতে তোড়াটা বিছিয়ে রেখে গেছেন। দেয়ালের কাছে গিয়ে মনে হল, মাথা মাটির দিকে ঝুকে আসার পরই ঘাতকেরা হয়তো লোরকা এবং অন্যদেরকে গুলি করে।

একটু পরেই আমি আবিষ্কার করলাম, দেয়ালের গায়ে একটা ফলক। তাতে লেখা : “ফ্রাঙ্কো-বাহিনির হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া মানুষদের স্মৃতির উদ্দেশে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।” এই একটিমাত্র ফলক ছাড়া ওখানে এমন আর কিছু নেই যা দেখে মনে হবে বহু বছর আগে এখানে কিছু মানুষকে খুন করা হয়েছিল, যাদের একজন ছিলেন বিশশতকের প্রতিভাবান হিস্পানি কবি-নাট্যকার লোরকা। লোরকার কবরটা অবশ্য এখানে নয়, পাশের গ্রামে। তবে সেখানে লোরকাকে পুঁতে রাখা হয়েছিল, তা আজও প্রমাণিত হয়নি। দেখলাম, যে জায়গাটকে কবর বলে মনে করা হয়, সেটি অনেকটা অচিহ্নিত অবস্থায় পড়ে আছে। ওখানেই নাকি গুলি করে মেরে ফেলা দুই বুলফাইটার আর স্কুলশিক্ষককে অত্যন্ত গোপনে আর তড়িঘড়ি করে কবর দেওয়া হয়। বহুকাল জায়গাটি অচিহ্নিত ছিল। ১৯৯৬ সালে লোরকার জীবনীকার ইয়ান গিবসন, কোথায় লোরকাকে ঠিক কবর দেওয়া হয়েছিল, সেটা প্রথম চিহ্নিত করেন। কিন্তু কখনও তাঁর দেহাবশেষ খুঁজে দেখা হয়নি। ২০০৮ সালে স্পেনের একজন বিচারপতি বালতাজার গারজোঁ প্রথম মাটি খুঁড়ে সেটা খুঁজে দেখার নির্দেশ দেন।

গারজোঁ, এই বিচারপতি ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের সম্মুখীন করেছেন। তিনিই ১৯৯৮ সালে চিলির স্বৈরাচারী শাসক অগুস্তো পিনোশেকে গ্রেফতার করার দাবি জানান। এরপর তিনি কয়েক বছর আগে গুন্তানামো দ্বীপে বন্দি কয়েদিদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল কিনা, সেই তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন। স্পেন, তারই নির্দেশের কারণে, ফ্রাঙ্কোর আমলে যে অত্যাচার নির্যাতন হয়েছিল, সে সম্পর্কে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে তদন্ত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই তদন্ত নিয়ে স্পেনে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। আসলে স্পেনের মানুষ ফ্রাঙ্কোর দীর্ঘ স্বৈরশাসনের ফলে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। একপক্ষ ফ্রাঙ্কোর সমর্থক, অন্যপক্ষ তার বিরোধী। স্পেনের এই দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে কখনও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন লোরকার দুই প্রজন্মের পরবর্তী বংশধরেরা এর বিরোধিতা করে। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় এর সমালোচনা হলে, তারা সেই অবস্থান থেকে সরে আসে এবং লোরকার দেহাবশেষ খুঁজে দেখার পক্ষে মত দেয়। কিন্তু তখনই একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, লোরকা সমকামী ছিলেন বলে তার কোনো কোনো আত্মীয় ওই দেহাবশেষ খুঁজে দেখার পক্ষে নন।

ফ্রাঙ্কোর কুখ্যাত স্বৈরশাসনের কালে (১৯৩৯-১৯৪৭) হাজার হাজার মানুষকে রাজনৈতিক কারণে ফ্যায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রায় পাঁচ লাখের মতো মানুষ দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর গণতন্ত্রের পথ উন্মোচিত হলেও নতুন শাসকেরা যে-নীতি গ্রহণ করেন সেটা হচ্ছে- যা ঘটার ঘটেছে, এখন আর ‘অতীতের দিকে ফিরে তাকাবার দরকার নেই’। কিন্তু যারা নির্য়াতিত হয়েছিলেন তাদের উত্তরসুরিরা ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি তুললে সেই সময়ের অনেক নির্মম ঘটনা জনসমক্ষে উন্মোচিত হতে থাকে। মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় অনেকের দেহাবশেষ। তাদের অব্যাহত প্রচারণার কারণে স্পেনের জাতীয় সংসদে স্মৃতি সংরক্ষণ সংক্রান্ত একটা আইন পাশ করা হয়। যারা বিদেশে চলে গিয়েছিল তাদের বংশধরদের স্পেনের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ওই আইনে বলা হয়, মাটি খুঁড়ে কবর চিহ্নিত করা যাবে, তবে তার জন্যে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। স্পেনের একজন ঐতিহাসিক- মেরিবেল ব্রেনেস- এরপর এমন একটি মানচিত্র তৈরি করেন যে মানচিত্রে শুধুমাত্র গ্রানাডাতেই তিনি ১২৫টি গণকবর খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর ওই অনুসন্ধানের কাজটি রাজনৈতিক ছিল না। কেননা, তার বংশেরই একজন প্রভাবশালী সদস্য ফ্রাঙ্কোর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি তার কাজের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নয়, আমি শুধু চাইছি ইতিহাসের এই ঘটনাটিকে তথ্যের দিক থেকে সমৃদ্ধ করতে।

এরপরই এক আবেদনের প্রেক্ষাপটে বিচারক গারজোঁ এই রায় দেন যে, ফ্রাঙ্কো এবং তার চৌত্রিশ জন সহযোগী ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী।’ তারা রাজনৈতিক কারণে মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, হত্যা করেছে। আইনিভাবে ওই হত্যাকারীদের যে অবমুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সেটা তিনি রদ করেন এবং উনিশটি গণকবর খননের নির্দেশ দেন, যার একটিতে লোরকাকে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু স্পেনের সরকার এটা মেনে নেয়নি। লেখক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তখনই মাদ্রিদে আয়োজন করেন এমন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যেখানে এক বৃদ্ধা, যিনি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্যাতিত হয়েছেন, তার ওপর নির্য়াতনের বর্ণনা দেন। লোরকার হত্যা নিয়ে কথা বলেন জীবনীকার ইয়ান গিবসন। তবে ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল লোকগায়ক পেকো ইবানেজের গাওয়া গান। লোরকার কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করে যখন তিনি গাইছিলেন, তখন উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল।

ইতিমধ্যে লেখক-শিল্পীদের দাবির মুখে একজন নয়, লোরকার মতো শত শত মানুষকে মাটি খুঁড়ে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। লোরকার সঙ্গেই হত্যা হয়েছিল যে দুজন বুলফাইটারকে তাদের একজনের নাতি ফ্রান্সিসকো গালাদি, যিনি বিচারের দাবি তুলেছিলেন তাকে স্প্যানিশ সরকার চাকরিচ্যূত করে। তার অপরাধ, তাঁর বাবা, কুকুরের মতো গালাদির পিতামহ কবরে শায়িত থাকবেন সেটা চাননি। গালাদিই বলেছেন, লোরকা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন লোরকার কারণেই গ্রানাডার সবাই গর্ববোধ করতেন।

লোরকাকে যেখানে পুঁতে রাখা হয়, সেই জায়গাটি গ্রানাডা থেকে পাঁচ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। সেটি একটা গ্রাম। গ্রামটির নাম আলফাসার। এখানেই ১৯৩৬ সালে সেনাছাউনি স্থাপন করা হয়। কাছেই একটা সিমেটারি বা গোরস্থান। লোরকার জীবনী-লেখক ইয়ান গিবসন জানাচ্ছেন, ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট খুব ভোরে লোরকা, দু’জন বুলফাইটার আর একজন স্কুলশিক্ষককে বন্দি করে সেনাক্যাম্পে আনা হয়। তারপর ফ্রাঙ্কোর খুনে বাহিনি কাছের একটা পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে তাদের ওই গোরস্থানে নিয়ে যায়। ওই একই পথ দিয়ে হেঁটে গেলে চারদিকে দেখা যাবে বিস্তৃত সবুজ ভূমি ও জলাশয়। লোরকা ১৯২১ সালে এই জায়গাটি নিয়েই লিখেছিলেন :

শুকনো রুক্ষ একটা জায়গা থেকে আমি ফিরছি। কিন্তু নিচেই দেখছি একটা জলাশয়। তার ঝলমলে নীল পানি। গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাসে রাত্রি যেন ভাসছে আর উড়ছে ঝিঁঝিপোকারা।

এলাকায় ছড়িয়ে আছে পপলার গাছ। কিছু বসতবাড়ি আর শিল্পভবন। এসব পেরিয়ে গেলেই পৌঁছুনো যাবে লোরকার জন্মস্থানে- ফুয়েন্তে ভেক্যুরসে। লোরকা মৃত্যুর আগে শিল্পভবনগুলি ছাড়া এইসব দৃশ্যই দেখেছিলেন।

লোরকাকে যেখানে ধরে আনা হয়েছিল, সেখানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পেছনে উঁচু মতো একটা জায়গায় আছে একটা পার্ক। এই পার্কটির লোরকার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নামকরণ করা হয়েছে : ‘লোরকা এবং গৃহযুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশে স্থাপন করা হয়েছে এই পার্ক।’ জীবনীলেখক ইয়ান গিবসন গোরখননকারীর বিবরণ অনুসারে লিখেছেন, একটা ট্রেঞ্চে নিয়ে লোরকা এবং অন্য তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ট্রেঞ্চটির অবস্থান ছিল বাঁক নেওয়া রাস্তার পাশের একটা জলপাই গাছের নিচে। সাংবাদিক লী অ্যান্ডারসন লিখছেন, চারদিকটা দেখলাম নিঝুম, নিস্তব্ধ। দুটি মোটর সাইকেল সমস্ত নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিয়ে রাস্তা দিয়ে উড়ে গেল। পার্কের ভেতরে গিয়ে দেখলাম একটা আন্দালুসীয় নীলাভ সবুজ পাথরফলক। তার গায়ে সেঁটে দেওয়া শাদা পাথরে লোরকার কবিতা খচিত। যে-কবিতাটি এতে উৎকীর্ণ আছে সেই কবিতাটির নাম ‘শরতের গান’ (অটামন সং)। খচিত কথাগুলি হচ্ছে : ‘মৃত্যু যদি মৃত্যুই হয়, কবিদের তাতে কীই-বা আসে-যায়, আর এই যে ঘুম, ঘুমই যদি হবে, কেউ কি মনে রাখবে তাকে?’ কবিতা যিনি ভালোবাসেন, তিনি বিশ্বের যে প্রান্তেরই হোন, লোরকার কবিতা যদি একবার পড়ে থাকেন, তাঁর কবিতা তাকে মুগ্ধ করবেই।

কিন্তু সেদিন লোরকা খুন হওয়ায়, বিমূঢ় বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল তার পরিবার। তাই তাকে যেখানে পুঁতে রাখা হয়, সেই স্থানটি চিহ্নিত করার পক্ষে মত দেননি তার উত্তরসুরিরা। এদেরই একজন লোরকার এক ভ্রাতুষ্পুত্রী লরা গার্সিয়া লোরকা। লরা একজন অভিনেত্রী। তিনিই এখন পরিবারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত লোরকা ফাউন্ডেশনের প্রধান। তিনি বলেছেন, কী হবে লোরকাকে কোথায় পুঁতে রাখা হবে জেনে? এতে তো আমাদের বেদনার প্রশমন হবে না। লোকে বলে আমরা নাকি ইতিহাসকে উন্মোচিত করতে চাই না। কিন্তু এটা ভুল। আমরা চাই তিনি সম্মানের সঙ্গে মানুষের মনে বেঁচে থাকুন। অত্যন্ত অসম্মানের সঙ্গে নির্মমভাবে তাকে খুন করা হয়েছিল। আমরা চাই না তিনি আরও অসম্মানিত হন। কেন লোকে তাঁর দেহাবশের পেতে চায়? কী হবে তাঁর শরীরের হাড়গোড় দিয়ে? ইতিহাসে ওই হাড়গোড় তো নতুন কিছু যুক্ত করবে না।”

“কিন্তু আপনারা কেন তার দেহাবশেষ একটা গর্তে পড়ে থাকুক সেটা চান? কেন তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে চান না?” সাংবাদিক লী অ্যান্ডারসনের এই প্রশ্নের উত্তরে লরা বলেন, “গর্ত বলছেন কেন ওটাকে? ওটা তো একটা পবিত্র স্থান। সব মৃত মানুষই সেখানে পাশাপাশি থাকছে।”

এই কথাগুলি লরা বলেছেন সাংবাদিক লী অ্যান্ডারসনের সঙ্গে যিনি ২০০৯ সালে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। লরার কথা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, লোরকা সমকামী ছিলেন বলে যে খবর বেরিয়েছিল, সেই তথ্যটা আবার মানুষের নতুন করে মনে পড়ুক, তার বংশধরেরা সেটা চান না। মাটি খুঁড়ে লোরকার দেহাবশেষকে ঠিক ঠিক চিহ্নিত করার পাশাপাশি এই তথ্যটা বেরিয়ে এলে, সেটা হবে লোরকার জন্য অসম্মানজনক। কিন্তু স্পেনের মানবাধিকার কর্মী আর লেখক-শিল্পীরা মনে করেন, এটা ঠিক নয়। ফলে, পরে লোরকার পরিবার এই খননকাজে সম্মতি জানায়। কিন্তু প্রত্মতাত্ত্বিকেরা সেখানে যে হাড়গোড় খুঁজে পেয়েছিলেন, তার সঙ্গে পরিবারের ডিএনএ-র মিল না পাওয়ায় লোরকার দেহাবশেষের কী পরিণাম ঘটেছিল, সেটা আজও জানা সম্ভব হয়নি। তবু এত কিছুর পরেও ২০১২ সালে গ্রানাডার একজন ঐতিহাসিক মিগুয়েল কাবালেরো পেরেজ ওই স্থান থেকে আরও আধা কিলোমিটার দূরের আরেকটা জায়গায় খননের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তিনি খননের অনুমতি পাননি। গত বছর নটিংহাম বিশ্ববিদ্যায়ের হিস্পানি সাহিত্যের অধ্যাপক স্টিফেন রবার্টস দাবি করেন, লোরকাকে যে একটা গর্তের মধ্যে পুঁতে ফেলা হয়েছিল তার কোনো প্রমাণ নেই। লোরকা, যার জীবন ছিল বহুবর্ণিল কিন্তু কিছুটা রহস্যময়, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল জানা গেলেও, কোথায় রয়েছে তার দেহাবশেষ, আজও সেই রহস্য উন্মোচিত হয়নি।

কিন্তু এত কিছুর পরও তার স্মৃতিতর্পণে কবিরা কখনও কার্পণ্য করেননি। পৃথিবীর বহু কবি, তার এই নির্মম মৃত্যুকে ঘিরে লিখেছেন অনেক কবিতা, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, নাটক। এখানে আমরা এরকমই দুই বাঙালি কবির লেখা দুটো কবিতা তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি। এর একটির লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আরেকটির সিকদার আমিনুল হক। কবিতা দুটি অনেকের পড়া থাকলেও আজ লোরকার প্রয়াণদিবসে আরেকবার প্রকাশ করা হল :

 

কবির মৃত্যু : লোরকা স্মরণে > সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী
কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে
কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন?
সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না;
সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা।
অস্পষ্ট গোধুলি আলোয় তাদের পায়ে ভারী বুটের শব্দ
তাদের মুখে কঠোর বিষণ্নতা
তাদের চোখে বিজ্ঞাপনের আলোর লাল আভা।
মেটে রঙের রাস্তা চলে গেছে পুকুরের পাড় দিয়ে
ফ্লোরেসেন্ট বাঁশঝাড় ঘুরে-
ফসল কাটা মাঠে এখন
সদ্যকৃত বধ্যভূমি।
সেখানে আরও চারজন সিপাহী রাইফেল হাতে প্রস্তুত
তাদের ঘিরে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ
কেউ এসেছে বহু দূরের অড়হর ক্ষেত থেকে পায়ে হেঁটে
কেউ এসেছে পাটকলে ছুটির বাঁশি আগে বাজিয়ে
কেউ এসেছে ঘড়ির দোকানে ঝাঁপ ফেলে
কেউ এসেছে ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম ভরে
কেউ এসেছে অন্ধের লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে
জননী শিশুকে বাড়িতে রেখে আসেননি
যুবক এনেছে তার যুবতীকে
বৃদ্ধ ধরে আছে বৃদ্ধার কাঁধ
সবাই এসেছে একজন কবির হত্যাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে।
খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হলো কবিকে,
তিনি দেখতে লাগলেন তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো-
কনিষ্ঠায় একটি তিল, অনামিকা অলঙ্কারহীন
মধ্যমায় ঈষৎ টনটনে ব্যথা, তর্জনী সঙ্কেতময়
বৃদ্ধাঙ্গুলি বীভৎস, বিকৃত-
কবি সামান্য হাসলেন,
একজন সিপাহীকে বললেন, আঙুলে রক্ত জমে যাচ্ছে হে,
হাতের শিকল খুলে দাও!
সহস্র জনতার চিৎকারে সিপাহীর কান সেই মুহূর্তে বধির হয়ে গেল।
জনতার মধ্য থেখে একজন বৈজ্ঞানিক বললেন একজন কসাইকে,
পৃথিবীতে মানুষ যত বাড়ছে, ততই মুর্গী কমে যাচ্ছে।
একজন আদার ব্যাপারী জাহাজ মার্কা বিড়ি ধরিয়ে বললেন,
কাঁচা লঙ্কাতেও আজকাল তেমন ঝাল নেই!
একজন সংশয়বাদী উচ্চারণ করলেন আপন মনে,
বাপের জন্মেও একসঙ্গে এত বেজম্মা দেখিনি, শালা!
পরাজিত এমএলএ বললেন একজন ব্যায়ামবীরকে,
কুঁচকিতে বড় আমবাত হচ্ছে হে আজকাল!
একজন পকেটমারের হাত আকস্মাৎ অবশ হয়ে যায়
একজন ঘাটোয়াল বন্যার চিন্তায় আকুল হয়ে পড়ে
একজন প্রধানা শিক্ষয়িত্রী তাঁর ছাত্রীদের জানালেন
প্লেটো বলেছিলেন…
একজন ছাত্র একটি লম্বা লোককে বললো,
মাথাটা পকেটে পুরুন দাদা!
এক নারী অপর নারীকে বললো,
এখানে একটা গ্যালারি বানিয়ে দিলে পারতো…
একজন চাষী একজন জনমজুরকে পরামর্শ দেয়,
বৌটার মুখে ফোলিডল ঢেলে দিতে পারো না?
একজন মানুষ আর একজন মানুষকে বলে,
রক্তপাত ছাড়া পৃথিবী উর্বর হবে না।
তবু একজন চেঁচিয়ে উঠলো, এ তো ভুল লোককে এনেছে।

ভুল মানুষ, ভুল মানুষ।
রক্তগোধূলির পশ্চিমে জ্যোৎস্না, দক্ষিণে মেঘ
বাঁশবনে ডেকে উঠলো বিপন্ন শেয়াল
নারীর অভিমানের মতন পাতলা ছায়া ভাসে পুকুরের জলে
ঝমঝুমির মতন একটা বকুল গাছের কয়েকশো পাখির ডাক
কবি তাঁর হাতের আঙুল থেকে চোখ তুলে তাকালেন,
জনতার কেন্দ্রবিন্দুতে
রেখা ও অক্ষর থেকে রক্তমাংসের সমাহার
তাঁকে নিয়ে গেল অরণ্যের দিকে
ছেলেবেলার বাতাবি লেবুগাছের সঙ্গে মিশে গেল

হেমন্ত দিনের শেষ আলো
তিনি দেখলেন সেতুর নিচে ঘনায়মান অন্ধকারে
একগুচ্ছ জোনাকি
দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হলো চুল, তিনি বুঝতে পারলেন
সমুদ্র থেকে আসছে বৃষ্টিময় মেঘ
তিনি বৃষ্টির জন্য চোখ তুলে আবার
দেখতে পেলেন অরণ্য
অরণের প্রতিটি বৃক্ষির স্বাধীনতা-
গাব গাছ বেয়ে মন্থরভাবে নেমে এলো একটি তক্ষক
ঠিক ঘড়ির মতন সে শতবার ডাকলো :
সঙ্গে সঙ্গে ছয় রিপুর মতন ছ’জন বোবা কালা সিপাহী
উঁচিয়ে ধরলো রাইফেল-
যেন মাঝখানে রয়েছে একজন ছেলেধরা
এমনভাবে জনতা ক্রুদ্ধস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
কবির স্বতঃপ্রবৃত্ত ঠোঁট নড়ে উঠলো
তিনি অস্ফুট হৃষ্টতায় বললেন : বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!
মানুষের মুক্তি আসুক!
আমার শিকল খুলে দাও!
কবি অত মানুষের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি মানুষ
নারীদের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি নারী
তিনি দু’জনকেই পেয়ে গেলেন
কবি আবার তাদের উদ্দেশ্যে মনে মনে বললেন,
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! মিলিত মানুষ ও

প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিপ্লব!
প্রথম গুলিটি তাঁর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল-
যেমন যায়,
কবি নিঃশব্দে হাসলেন
দ্বিতীয় গুলিতেই তাঁর বুক ফুটো হয়ে গেল
কবি তবু অপরাজিতের মতন হাসলেন হা-হা শব্দে
তৃতীয় গুলি ভেদ করে গেল তাঁর কন্ঠ
কবি শান্ত ভাবে বললেন,
আমি মরবো না!
মিথ্যে কথা, কবিরা সব সময় সত্যদ্রষ্টা হয় না।
চতুর্থ গুলিতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তাঁর কপাল
পঞ্চম গুলিতে মড় মড় করে উঠলো কাঠের খুঁটি
ষষ্ঠ গুলিতে কবির বুকের ওপর রাখা ডান হাত
ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল
কবি হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলেন মাটিতে
জনতা ছুটে এলো কবির রক্ত গায়ে মাথায় মাখতে-
কবি কোনো উল্লাস-ধ্বনি বা হাহাকার কিছুই শুনতে পেলেন না
কবির রক্ত ঘিলু মজ্জা মাটিতে ছিট্‌কে-পড়া মাত্রই
আকাশ থেকে বৃষ্টি নামলো দারুণ তোড়ে
শেষে নিশ্বাস পড়ার আগে কবির ঠোঁট একবার
নড়ে উঠলো কি উঠলো না
কেউ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেনি।
আসলে, কবির শেষ মুহূর্তটি মোটামুটি আনন্দেই কাটলো
মাটিতে পড়ে থাকা ছিন্ন হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে চাইলেন,
বলেছিলুম কিনা, আমার হাত শিকলে বাঁধা থাকবে না!

 

লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো > সিকদার আমিনুল হক  

যেদিন তোমাকে ওরা নিয়ে গেলো, বেশ মনে আছে

রাত্রি ছিল মাঝপথে। স্পেনের স্বভাব-জ্যোৎস্না নয়-

সেদিন কেন যে ছিলো অন্ধকার,, যে-অন্ধকার থাকে

শামুকের ঠাণ্ডা বুকে! উপরন্তু জলপাই বনে

ছিলো না বাতাস তত আক্ষরিক!….রান্না খুঁটে খেয়ে

বিড়ালেরা অবসন্ন,…অন্যদিকে নগরী নিদ্রিত।

নিঃশব্দে জন্তুরা এলো। এই বাড়ি জানি ততদিনে

অতি পরিচিত আর ভয়ঙ্কর; যেহেতু এখানে

 

এমন মানুষ থাকে, যার ক্বাসিদার এক খণ্ড

বিপ্লবের তৃষ্ণা আনে। যার যত্নে এখন কবিতা

স্পেনের উড়ন্ত মেঘ; পথে পথে বেদেনিরা রাতে

রক্তে আনে ঘুর্ণিঝড় : জিব্রাল্টারে থামে নাবিকেরা;

তাকেই আমরা চাই আজ রাতে, যাঁর নাম লোর্কা।

…এমন নিঃশব্দে হলো সব কাজ; স্পেনও জানলো না

আজ থেকে গান নেই;…যদিও থাকবে তার বন

কমলা-বাগান আর জিপসিরা; জলপাই গাছে

 

বিকেলের ঠাণ্ডা রৌদ্র, পথে পথে রাত্রির বাতাস।

এটা কোনো গল্প নয়; এই অন্ধকার বহুদিন,

পাহাড়ে নিদ্রিত ছিলো, সমুদ্র কাঁদতো তাঁর জন্যে

একদিন নয়, বহুদিন!…আজও যদি তুমি মধ্যরাতে

নীরবে রাস্তায় হাঁটো মাদ্রিদের, দেখবে ওখানে

ভিক্ষুকের কালো কান্না!- গিটারে গাইবে শেষ গান

পেশাদার বালিকা গায়িকা,- আমাদের কণ্ঠস্বর

তোমরা ছিনিয়ে নিলে হে, দস্যুরা, রাতের আঁধারে

 

লোর্কা এমন কী ভয়ানক আর দুর্বিসহ ছিলো

তোমাদের কাছে?…ক্ষুধা, একাকীত্ব, ভয়; কর্দমাক্ত

অত্যাচার ভুলে মানুষের জন্যে একটি ট্রাউজার

সাথে ছিন্ন জামা, কিছু শুষ্ক রুটি, আঙুরের মদ

এই তো স্বপ্নের ভাষা ছিলো তাঁর গানে।…কবিতায়

প্রিয় স্পেন তাঁর হয়ে যেত স্বপ্ন; যেন এই দেশ

ছবি ও বাতাস থেকে উঠে আসা! এর চেয়ে বেশি,

লোর্কা কি বলেছে কিছু উত্তেজক, তোমরাই বলো?…

 

বালিকা গায়িকাই নয় শুধুমাত্র; আর স্পেনও নয়-

পৃথিবীর যেখানেই রাত্রি হয়, অন্ধকার নামে;

গলায় পিপাসা চায় অবিরাম গান; যারা কাঁদে,

ক্লান্ত জনসাধারণ নামে যারা পরিচিত, তারা,

রাত্রির নাবিক কিংবা যারা বৃদ্ধ, তাঁবুতে ঘুমায়

যেই শিশু, কিন্তু স্বপ্ন দ্যাখে; উষ্ণ কারখানা-ফেরা

ঘামের শরীরে যারা মহৎ নিদ্রার দিকে যায়-

তারা বলে, ‘ভুলে গেছি, আর্তনাদ আর কবিতাকে

 

এখন দেখছো যেই মৃত স্পেন, তার জন্ম হয়েছিলো রাতে

যেদিন লোর্কাকে ওরা নিয়ে গেলো, সেদিন বাতাসে

ছিলো না গভীর যুক্তি।– হঠকারী ক্ষমতার মোহ

আমাদের বললো, থাকো, স্তব্ধ আর চাপচাপ রক্তে।

ধর্ষিত দেশের সেই শেষ দিন। তারপর থেকে

আলো-ঝলমল কোনো রাত্রি আর ফেরে নাই। গন্ধে

এলো একমাত্র শব, অবজ্ঞার কুটিল বারুদ

বললো, এই তো স্পেন! লোর্কা নেই। নেই কোনো ঋতু।

 

এখন তোমরা শুধু করুণার পাত্র। নারী আর

পাবে না নাচের ঘূর্ণি তার ঘাগরায়।…মরে গেছে

ফ্লেমিঙ্গোর অহঙ্কার। ক্বাসিদার সব ধার শেষ।

গোলাপ থাকবে মৃত, বাতাসেরা গুমোট নিস্তেজ;

থাকলেও বাতিহীন প্রতিটি জানালা হবে মর্গ।

…হায় রে স্পেন মেঘ! তুমি চলে যাও অন্যদিকে

সাগরে গর্জন নেই, হতবাক নদী!- দেখলাম

ভয় কত হিংস্র।– লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।পাঠ করে ভালো লাগলো।লোরকা সবসময়ের প্রিয়…তাঁর জন্যে শ্রদ্ধা।আর ধন্যবাদ লেখককে।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close