Home ছোটগল্প মেহেরুন্নেছা > সন্দেহ >> ছোটগল্প

মেহেরুন্নেছা > সন্দেহ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ September 1, 2018

মেহেরুন্নেছা > সন্দেহ >> ছোটগল্প
0
0

মেহেরুন্নেছা > সন্দেহ >> ছোটগল্প

 
মাকসুদ ডাক্তার হয়েছে। কিভাবে ডাক্তার হলো, সে এক বিরাট ইতিহাস। আজ সে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাটে থাকে। তার স্ত্রী আছে, পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটি ছেলে আছে। ছেলেটির নাম আকাশ। তার স্ত্রী নীরার অবশ্য এ নাম পছন্দ হয়নি। মাকসুদ এই একটা ব্যাপারে নীরার কাছে হার মানেনি। চিরকাল মাকসুদ তার কষ্টের দিনগুলোতে আশ্রয় নেয় ঐ দূর আকাশে। যেদিন সে বাবা হলো সেদিনই সে মনে মনে ঠিক করলো এই সন্তান হবে তার দ্বিতীয় আশ্রয়। এই সন্তানের নাম দেবে সে আকাশ।
প্রত্যন্ত এক অজপাড়াগাঁয়ে মাকসুদের জন্ম। বাবা ইদ্রিস আলী অন্যের জমিতে বদলা দিতেন। মা আমেনা বেগম ছিলেন ধাত্রী। তার মায়ের অনেক গুণ ছিলো। তিনি গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী পুষতেন। ঘরের আশে-পাশে শিম, লাউ, কুমড়া, শসা, চিচিন্দা, ঝিঙা, পরুলের মুড়া করতেন। বাঁশ ও বেত দিয়ে ডুলা, চাঁই, চালুইন, ওঁড়া, জোংরা, পাটি, ফাতলা কতকিছু বানাতে পারতেন।
দিনভর জাল বুনতেন। মাকসুদের মনে আছে, জাল বোনার পর সুতা পাকা করার জন্য কাঁচা গাবের রসে মাটির তৈরি নাইন্দাসহ জাল ভিজিয়ে রাখতেন।
আমেনা বেগমের সন্তান এই একজনই ছিলো। বহু তালাফি করেও তিনি আর কোনো সন্তানের মুখ দেখতে পারেন নি। তার অনেক আদরের ছেলে মাকসুদ।
এক সন্তান হলেও মাকসুদের মাথায় ছিলো দশ-দশটি সন্তানের মেধা। আচার-আচরণে এমন সুবোধ বালক দশ গ্রামেও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
মায়ের অদম্য চেষ্টায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতায়, পাড়া-পড়শীর দান-খয়রাতে মাকসুদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করে এবং বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান করে নেয়।
এরপর সে ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দু’জায়গায় পড়ার সুযোগ পায়। বিদ্যালয়ের স্যারদের পরামর্শে সে ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ডাক্তারি পড়া তো চাট্টিখানি কথা নয়।
অর্থের অভাবে ঢাকা শহরে গিয়ে ডাক্তারি পড়ার আশা মাকসুদ একরকম জলাঞ্জলি দিয়ে দিয়েছিলো। চোখে-মুখে কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিলনা। এমন সময় তাদের গ্রামের আকবর চাচা যেনো দেবদূতের মত আশার বাণী নিয়ে আসলেন।
তিনি ঢাকা শহরে নীরার বাবার অফিসে পিয়ন ছিলেন। নীরার বাবা মোস্তাফিজ সাহেব বড় ব্যবসায়ী। সবাই জানে মোস্তাফিজ সাহেব ভালো মানুষ, কঠোর পরিশ্রমী। একসময় তার ব্যবসা ক্ষুদ্র ছিলো। শ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। ছেলের আশায় আশায় তার ছয়-ছয়টি মেয়ে হলো। মেয়েরা সবাই অপরূপা।
বড় তিনজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন দেখে-শুনে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ী পরিবারের সাথেই আত্মীয়তা করেছেন। চতুর্থ এবং পঞ্চমজনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের জন্যও প্রস্তাব আসছে। একসময় তাদেরও বিয়ে দিয়ে দিবেন। তবে ষষ্ঠ কন্যা নীরা যেনো তার পরিবারে ব্যতিক্রম। এই মেয়েটিকে নিয়ে তিনি বড় দুঃশ্চিন্তায় আছেন।
কলেজে ভর্তি হয়ে সে এক বখাটে ছেলের সাথে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে বহু কষ্টে তাকে ফেরানো হয়। এখন তার কলেজে যাওয়া বন্ধ। বাসায় শিক্ষক রেখে দিয়েছেন, তাদের কাছেই পড়ে। এ মেয়ের জীবনের কী গতি হবে তিনি ভেবে ভেবে অস্থির।

মোস্তাফিজ সাহেব প্রায়সময় আকবরের সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করেন। বেঁচে থাকার জন্য চিত্তবীণায় ভরসা জাগাতে পারার মত মানুষ এই আকবর। সেদিনও তারা সুখ-দুঃখের আলাপ করছিলেন।
সরাসরি আকবর, মোস্তাফিজ সাহেবকে বললেন, “স্যার, অভয় দিলে একটা কথা বলি?”
“এতো দ্বিধা করছো কেনো আকবর, বলে ফেলো!”
“আমার গ্রামে মাকসুদ নামে এক গরীব মেধাবী ছেলে এবার ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। টাকার অভাবে বোধহয় ছেলেটির পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।”
মোস্তাফিজ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “গরীবের সন্তানরাই মেধাবী হয়। আমার একটা মেয়েকেও পারলাম না ডাক্তার বানাতে।”
“চাইলে এই ছেলেটিকে নিজের ছেলে বানাতে পারেন।”
“তা কি করে সম্ভব?”
“নীরা মামনির সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। তারপর ছেলেটির পুরো দায়িত্ব আপনার। এতে নীরা মামনিকে নিয়ে যেমন আপনার চিন্তা দূর হলো; তেমনি মাকসুদ বাবাজীরও ডাক্তারি পড়া হলো।
আপনার ছেলের অভাবও পূরণ হলো।”
তারপর ডাকাতিয়া নদীতে অনেক পানি গড়িয়ে গেলো। নীরার সাথে মাকসুদের বিয়ে হলেও মাকসুদ মেডিকেল হোস্টেলে থাকতো। মাঝে-সাঝে আসতো নীরাদের বাসায়। কেন জানি নীরা তাকে সহজভাবে নিতো না। মাকসুদের দারিদ্র্য, মাকসুদের গেঁয়ো আচরণ, এগুলো নিয়ে নীরা প্রায়সময় তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতো। যদিও আজকের মাকসুদ আর সেই সময়ের মাকসুদের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। কীভাবে কীভাবে যেনো নীরাও অবশ্য এমএ পাশ করে ফেলে।
মাকসুদ গ্রামে তার বাবা-মায়ের জন্য নতুন বাড়ি করেছে। বাবা-মাকে নিজের কাছে আনতে চাইলেও নীরার জন্য পারেনি। মাকসুদের সাথে নীরা মানিয়ে নিলেও তার বাবা-মাকে সে সহজভাবে কোনোদিনই গ্রহণ করেনি। আভিজাত্য আর অর্থের মোড়কে বন্দি নীরা মাকসুদের পরিবারকে করুণার চোখে দেখতো।
শান্ত স্বভাবের মাকসুদ নীরার সবকিছুই মেনে নিয়েছে। সে ভাবে এই করুণা মেনে নেয়ার মাঝেই পৌরুষত্ব, মহত্ব; প্রতিবাদ করাটা বরং কাপুরুষতা এবং নির্বুদ্ধিতা।
মোস্তাফিজ সাহেবের নির্দেশ, তার নিজের মেয়ে নীরা যাক বা না যাক, মাকসুদ যেনো প্রতিটা ঈদ তার বাবা-মায়ের সাথে করে। সে মোতাবেক প্রতিটা ঈদ মাকসুদ তার বাবা-মায়ের সাথে করে বটে; কিন্তু নীরা আর আকাশ সাথে না থাকাতে কোনো ঈদের আনন্দই তার পূর্ণতা পায়না।


বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বাবুটা ঘুমিয়ে পড়েছে। মাকসুদ ছেলের পাশে শুয়ে শুয়ে জার্নাল পড়ছিলো। এরই মাঝে সাদা ধবধবে নাইটি পরে নীরা এলো ঘুমোতে। জার্নাল পাশে রেখে মাকসুদ নীরার দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইলো, নীরাকে আজ কাশবনের কাশফুলের মতো লাগছে। মুচকি হেসে মাকসুদ লাইট নিভিয়ে দিয়ে নীরাকে কাছে টেনে নিলো।
“আজ তোমাকে অপরূপ লাগছেগো! আমিতো পাগল হয়ে গেলাম!”
আহলাদি কণ্ঠে অভিমান নিয়ে নীরা বললো, “উঁহু! তোমারতো জীবন কেটে গেলো পড়তে পড়তে। আমাকে দেখার সময় কোথায়?”
মাকসুদ নীরাকে আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বললো, “এই যে দেখছি তোমাকে।”
নীরাও তুলতুলে শরীর নিয়ে মাকসুদের রোমশ বুকের ভেতর আরো ঢুকে যায়, শরীরের পুরুষালী গন্ধ নেয়, আবেশে চোখ মুঁদে রাখে।
“নীরা! আমার মহারাণী! তুমি কি জানো, আমি তোমাকে কত ভালোবাসি! আমার-না এবার খুব ইচ্ছে করছে তুমি আর বাবুসহ গ্রামের বাড়িতে আব্বা-আম্মার সাথে ঈদ করি।”
আদর আর রোমাঞ্চের স্পন্দনে হোক আর খেয়ালের বশে হোক নীরা রাজি হয়ে গেলো।
“আচ্ছা! তুমি যখন বলছো তবে তাই হোক!”
মাকসুদের যেনো বিশ্বাস হচ্ছিলো না। বিস্ফারিত চোখে নীরাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, “সত্যি বলছো?”
নীরা তার শরীরে ঝংকার এনে মাকসুদের বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে বললো, “হ্যাঁ গো, হ্যাঁ!”
মাকসুদের আবারো বেয়াড়া প্রশ্ন, “মনে কোনো কষ্ট নেই তো?”
নীরা আরো ঘনিষ্ঠ হলো মাকসুদের, রিনরিনে কণ্ঠে বললো, “একদম না!”
এবার মাকসুদের কণ্ঠে গভীর ভালোবাসার ব্যাকুল আকুতি, “আসো লক্ষীটি! আরো কাছে আসো! আজ আমরা ভালোবাসার ভেলায় চড়বো, প্রেমের মহাসমুদ্রে অবগাহন করবো!”
বাইরে তুমুল বৃষ্টি, সেইসাথে ঝড়। আশ্চর্য! বিয়ের এতো বছর পরে আজকে যেনো মাকসুদ আর নীরার জীবনেও প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেলো। এ ঝড় শীৎকারের ঝড়, এ ঝড় দুটি দেহ-কম্পনের ঝড়। এতোকাল ধরে যেকথা দুজন দুজনকে শোনাতে চেয়েছে; আজ যেনো তা একে অপরকে শোনাতে পারেছে। তাদের জীবনে ভালোবাসা এলো ঠিক বাদলদিনের প্রথম কদম ফুলের মতো।

দেখতে দেখতে ঈদ ঘনিয়ে এলো। মোস্তাফিজ সাহেব দারুণ খুশি। তার অহংকারী রগচটা মেয়েটা এতকাল বাদে শ্বশুরবাড়িতে নাতিসহ ঈদ করতে যাবে। তিনি গাড়ির ব্যবস্থা করলেন।
এদিকে মাকসুদের বাড়িতে সাজ-সাজ রব। মনে হচ্ছে মাকসুদ বিয়ে করা নতুন বউ নিয়ে প্রথমবারের মতো বাড়িতে আসবে। আকাশকে দেখা-শোনার জন্য চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সের মরিয়মকে আনা হলো। রান্না-বান্নার জন্য পূরাণ বাড়ির জ্যাঠিমাতো আছেই।
মাকসুদরা শ্বশুরের গাড়ি করে গঞ্জ পর্যন্ত আসলো। এরপরের পথ নৌকায় যাওয়াই ভালো। সুতরাং কেরায়া নৌকা ভাড়া করে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। ছোট্ট আকাশ বাবার কোলে। নীরা দুচোখ ভরে বর্ষা দেখছে। কেরায়া নৌকার মাঝি কখনো লগি, কখনো বৈঠা দিয়ে নৌকা বাইছে।
আকাশের মুখ বেশ ভার হয়ে আছে। একটু পরপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। এভাবে বৃষ্টি নামলে দুর্গতির সীমা থাকবে না। মাঝি চাচারে মাকসুদ তাড়া দিলো বটে, কিন্তু তার ইচ্ছে করছে নীরা আর আকাশ মিলে নৌকায় কেবলি ভাসতে।
রেললাইনের পুলের নীচ দিয়ে নৌকা আসার সময় পানির ঘূর্ণি দেখে নীরা ভীষণ ভয় পেলো। এখানে পড়লে ভয়ানক মৃত্যু হবে। মাকসুদকে বললো, বাবুকে শক্ত করে ধরে রাখো।
কী সুন্দর পানির উপর বাঁশের সাথে ছইয়ের ঘর!
নীরার অবাক করা প্রশ্ন, “এ ঘরগুলোতে কী মাছ ধরছে যারা, তারা থাকে?”
মাকসুদ বুঝিয়ে দেয়, “এগুলোকে বলে বেলজাল। আর ঘরগুলো বাঁশ আর বেত দিয়ে বানানো ছইয়ের ঘর! এ জাল দিয়ে তারা দিনরাত মাছ ধরে। পর্যায়ক্রমে এ-ঘরে বিশ্রাম নেয়, ঘুমায়, বাড়ি থেকে আনা ভাত খায়।”
ভাত খাওয়ার কথা শুনে, ঘুমানোর গল্প শুনে, নীরার চোখে-মুখে কৌতূহল উছলে পড়ছে। সে মাকসুদের দিকে তাকিয়ে বললো, “সত্যি সত্যি এখানে ঘুমায়? আবার ভাতও খায়?”
স্ত্রীর এমন উৎফুল্ল ভাব মাকসুদের মনে প্রশান্তি এনে দিলো। মনে হলো এ মুহূর্তে তার মতো সুখী এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সেতো জীবনটা এভাবেই কাটাতে চায়। মানুষ বাঁচে কদিন? যতটা সময় প্রিয়জনকে নিয়ে সুখে থাকা যায় ততটুকুই জীবনের প্রাপ্তি।
নৌকা পানি কেটে কেটে দুধারে তরঙ্গ সৃষ্টি করে এগিয়ে চলে। খালের সাথে লাগোয়া জমিতে কোথাও ধনচে গাছের হলদে ফুল, কোথাও বেগুনি বর্ণের কচুরি ফুল, দুপাশের গাছ-গাছালিতে ভরা সবুজ গ্রাম, নীরা প্রাণভরে দেখতে থাকে।
“আরে! আরে! ওগুলো কি?” নীরা হাত দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে।
“ওগুলোকে বলে বাডা মাছ! পানিতে নাক জাগিয়ে ভাসতে থাকে। নারকেল দিয়ে রান্না করলে বেশ স্বাদ!” এমনভাবে মাকসুদ বললো, যেন নীরাকে সে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এই বাডা মাছের তরকারি নিশ্চিত খাওয়াবে।
বাবার কোলে আকাশ ঘুমিয়ে পড়লো। ভাগ্য ভালো বৃষ্টি আর জোরে-সোরে এলো না। একসময় নৌকা ঘাটে ভিড়লো। কতজন এলো বউ দেখতে। মাকসুদ শহর থেকে যেন কোনো এক রাজকন্যা নিয়ে এসেছে। মাকসুদের বাবা-মায়ের মুখে গর্বের হাসি। নাতিকে তারা কোলে তুলে নিলো। এ যে তাদের উত্তরসুরি, তাদের রক্ত মিশে আছে ফুটফুটে এই শিশুটির শরীরে। স্নেহ সর্বদা নিম্নগামী। তাদের পুত্রের চেয়েও এতকাল যাবত অদেখা নাতির জন্য মনটা খুব বেশি উতলা হয়ে উঠেছিল। এই নাতিকে দেখার জন্য মনটা তাদের কত আনচান করতো! দাদা-দাদী আদরে আদরে যেন নাতিকে কলিজার ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলবে। নাতির মাঝে তারা দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আত্মজার প্রতিলিপি খুঁজে পেলো। তাদের নাতি তাদের সন্তানের মতই চুপচাপ। ফ্যালফ্যাল করে সে দাদা-দাদীর আদর উপভোগ করছে। যেন হৃদয় ধাবিত হয় হৃদয়ের দিকেই। তপ্ত মরুতে সবুজের সতেজতা। ধরণীতে বইছে সুখের ফোয়ারা।
তবে মরিয়ম দুচোখ ভরে দেখছে নীরার রূপ। সে হাত ধরে অতি যত্নে মাকসুদ ভাইয়ের বউকে নৌকা থেকে নামতে সাহায্য করলো। নীরার পরিপাটি জুতা হাতে নিয়ে একজোড়া স্যান্ডেল দিলো পরার জন্য। নীরা যাতে পিছল খেয়ে পড়ে না যায় সেজন্য মরিয়ম দেখিয়ে দিচ্ছে নীরাকে, কাদামাটিতে কোথায় কীভাবে পা ফেলতে হবে।
মরিয়মের দায়িত্ব যদিও আকাশকে রাখা; বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে সে আগবাড়িয়ে নীরার দেখাশোনাও করছে। সর্বক্ষণ আকাশকে কোলে নিয়ে নীরার কাছাকাছি ঘুরঘুর করে। নীরার কাছাকাছি থাকতে চায়। নীরার সাজ-সজ্জার জিনিসের প্রতি তার অতি আগ্রহ। বিশেষ করে লিপস্টিকের প্রতি সে লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
মাকসুদ টের পায়, মরিয়মের প্রতি নীরা ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। মাকসুদ কাকে কী বলবে বুঝে উঠতে পারেনা। বহুকষ্টে সে নীরা ও তার বাবুকে বাবা-মায়ের কাছে এনেছে। সুতরাং নীরা বিরক্ত হোক এটা মাকসুদ চাইছে না। আবার মরিয়ম যা করছে সেটাতে যে কতটা আন্তরিকতা আছে তা নীরা না বুঝলেও মাকসুদ বোঝে।
শেষমেষ অনেক ভেবে মরিয়মকে বললো, “মরিয়ম, তোর বুঝি সাজতে মন চায়? তুই আকাশকে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আয়। পরের বার আসলে তোর জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবো।”
মরিয়মের মুখের হাসি ধপ করে মিলিয়ে গেল।
মাকসুদের মনে হলো, মরিয়ম কিছুটা হলেও লজ্জা পেয়েছে। আকাশকে নিয়ে সে গটগট করে বের হয়ে গেল। মরিয়মের গমনপথের দিকে চেয়ে নীরা একটা শব্দ উচ্চারণ করলো, “বিরক্তিকর!”
শব্দটা মাকসুদের মনে তীরের মত বিঁধলো।
“নীরা, ওরা গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে। ওদের ভেতরে এতো জটিলতা নেই।”
“আমি বুঝি জটিল?”
“না ঠিক তা নয়! মরিয়মতো এতো ঝকমকে জিনিস আর কখনো দেখেনি!”
“যথেষ্ট হয়েছে! এবার চুপ কর!”
মাকসুদ আর কথা বাড়ায় না।
মরিয়মের মন খারাপ বেশিক্ষণ রইলো না। সে আকাশকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
মাকসুদের গ্রামের বাড়িতে আসার খবর পেলেই লোকজন এবাড়িতে লাইন ধরে। বিনা পয়সায় চিকিৎসা নেয়। আবার কিছু ওষুধও পায়। মাকসুদ তার এলাকার লোকজনের জন্য যতটা পারে ততটা করার চেষ্টা করে।
নীরা জানতো না তার স্বামী গ্রামে এসেও এতোটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাকসুদের প্রতি সামান্য ক্ষেদভরা সুরে বলে, “ঢাকায় ব্যস্ততা, বাড়িতেও ব্যস্ততা! ভেবেছিলাম বাড়িতে কটা দিন তোমাকে কাছে পাবো।”
“আমিতো তোমার কাছেই আছি।”
“দূরর! বুঝেছি! এজীবনে তোমার ব্যস্ততা আর শেষ হবে না।” নীরার কথায় মাকসুদ হাসে।
মরিয়ম মেহদি বাটছে। ঘরের মধ্যে আকাশ তার বাবার কোলে বসে আছে। নীরা একটা বালিশে হেলান দিয়ে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে। বাবার সাথে আকাশের কথা বলা আর ফুরায় না।
“বাবা! আমি বৈঁচি ফল চিনি। তুমি চেনো?”
“ওরে ব্বাস! কে চেনালো তোমায়?”
“মরিয়ম আপু! বাবা! বাবা! মরিয়ম আপুকে আমাদের সাথে নিয়ে চলো না।”
নীরা আকাশকে ধমকের সুরে বললো, “এতো পাকামো করা লাগবেনা!”
আবার মাকসুদের মন খারাপ হয়ে গেলো। ঘর থেকে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘাটলার কাছে এগিয়ে গেলো। মরিয়ম তখনও পাটায় মেহেদি বাঁটছে। আজ নাকি আকাশের হাতে সে মেহেদি লাগিয়ে দেবে। তাই একমনে, একদৃষ্টে, কঠিন যত্নে, পরম মমতায়, মরিয়ম মিহি করে কেবলি মেহেদি বাঁটায় ব্যস্ত।
আকাশের বাবাকে আবারো জিজ্ঞাসা, “বাবা! তুমি কাউ গাছ চেনো? পাকা কাউ? আমি কিন্তু কাউয়ের ভর্তা খেয়েছি।”
অবাক হয়ে মাকসুদ তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে। মরিয়ম কত সহজে তার ছেলেকে প্রকৃতি চেনানোর কাজটা সেরে ফেলছে। অথচ শহরে ইট-কংক্রিটে বন্দি তার ছেলে কেবল কার্টুন দেখে আর সময় কাটায়।
“বাবাতো এই গ্রামের ছেলে। বাবাতো সবকিছু চেনে। আমার লক্ষ্ণী বাবু, আর কি কি চিনিয়েছে তোমার মরিয়ম আপু?”
“বুতি জাম চিনেছি।”
বুতি জামের কথা শুনে মাকসুদ পিক করে হেসে দিল। সে জানে তার পাঁচ বছরের বাবু বুতি জাম বলতে কি বোঝাতে চেয়েছে। গ্রামের বাড়িতে ছোট ছোট জামগুলোকে বুতি জাম বলে।
“বাবা চলো পুকুর পাড়ে। তোমাকে বাইলা মাছ দেখাবো।”
“ওরে! ওরে! আমার বাবা সোনাটা বাইলা মাছও চেনে!”
“বাবা, মরিয়ম আপু আমাকে আরো কতকি চিনিয়েছে! আমি না পুঁটি মাছ চিনি, গড়ুইর পোনা চিনি, ঢেউয়া চিনি! বাবা, এখন থেকে আমরা গ্রামে থাকবো! মমকে বলোনা, আমরা আর ঢাকায় যাবোনা।”
“বাবু শোনো, আমরা মাঝে মাঝে এখন থেকে দাদুবাড়ি আসবো। তখন তোমার মরিয়ম আপু তোমাকে আরো কতকিছু চেনাবে!”
এর মাঝে ভিতর বাড়ি থেকে নীরার উঁচু কণ্ঠস্বর মাকসুদের কানে এলো। মরিয়ম নীরাকে লক্ষ করে বারবার বলছে, “ভাবী, আমি নেই নাই। কইলামতো আমি চুরি করি নাই।”
মাকসুদের বুকের ভেতর ধক্ করে উঠলো। হন্তদন্ত হয়ে ঘটনাস্থলে মাকসুদ ছুটে গেলো। আকাশকে কোলে নিয়ে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বললো, “কি হয়েছে, নীরা? আস্তে কথা বলো!”
নীরা ভীষণ উত্তেজিত। বাড়ির অন্যেরা হতবাক, নির্বাক, নিশ্চুপ। প্রকৃতিও আজ বড্ড গুমোট হয়ে আছে। একটা গাছের পাতাও নড়ছেনা। যে কোনো মুহূর্তে প্রকৃতি যেন ক্রোধে ফেটে পড়বে। নীরা মরিয়মের দিকে ক্রোধান্বিত হয়ে বললো, “আমার সোনার চেইনটা হীরার লকেটসহ পাচ্ছিনা।”
সাথে সাথে মাকসুদ বললো, “মাথা ঠাণ্ডা করো। খুঁজে দেখো।”
“অনেক খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। এই মেয়েকে জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে মুখে-মুখে বলে, আমরা কি চোরনি! আমনেরা বড়লোক দেইখ্যা আমাগোরে ক্যান চোর বানাইবেন! কত সাহস তার!”
মাকসুদ রেগে গেলো নীরার উপর। সে নীরাকে ধমক দিয়ে বললো, “প্লীজ, তুমি আর কথা বাড়াবেনা। আমি তোমাকে চেইন আর হীরার লকেট কিনে দিবো।”
নীরা দ্বিগুন উত্তেজিত হয়ে বললো, “চেইন আর লকেট আমার চাইনা। আগে এই বেয়াদবটাকে এখুনি আমার চোখের সামনে থেকে সরাও।”
মরিয়ম তার স্বভাববশত পাল্টা জবাব দিলো, “আঁইও আর ইয়ানো একদণ্ড থাকতাম না। আন্ডা
গরীব, আন্ডা চোর না।” বলতে বলতে মরিয়ম চলে যায়। বাড়ির কেউ তাকে আটকানোর সাহস করলোনা।
বাবার কোলে থেকে আকাশ কেবল চেঁচিয়ে উঠলো, “মরিয়ম আপু, তুমি যেওনা, তুমি যেওনা।”
চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সী কিশোরী আগে-পিছে না তাকিয়ে রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে-অপমানে স্নেহ-মমতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে সোজা নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল।
রাতে মাকসুদ ঘরের দাওয়ায় বাবুকে কোলে নিয়ে তার চিরদিনের আশ্রয় সেই দূর আকাশের পানে তাকিয়ে রইলো। জীবন এমন কেনো? নিজেকে কত সুখী মনে হয়েছিলো! অথচ কাঁচের টুকরার মতো সুখ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলো।
“বাবা! মরিয়ম আপু আর আসবেনা?”
“নাহ!”
“বাবা! আমি না মরিয়ম আপুদের বাড়ি চিনি।
একটা বাঁশের হাঁক্কা পার হতে হয়। চলোনা বাবা, আমরা মরিয়ম আপুকে নিয়ে আসি।”
মাকসুদ ছেলের কথার জবাব দিলনা। মরিয়মের শেখানো বুলি ‘হাঁক্কা’ শব্দটাই আকাশ উচ্চারণ করলো। মাকসুদ এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা, মরিয়ম চুরি করেছে। কিন্তু নীরার দৃঢ় বিশ্বাস, মরিয়ম ছাড়া একাজ আর কেউ করেনি।

পরশুদিন তারা ঢাকা চলে যাবে। আকাশ বেশিরভাগ সময় মাকসুদের কাছে আর নীরার কাছে থাকে। থেকে থেকে আকাশ মরিয়ম আপুর কথা বলে। নীরা কড়া করে আকাশের দিকে তাকায়। তখন সে চোখ টলটল করে চুপ করে মায়ের দিকে চেয়ে থাকে।
বিকেলে বসার ঘরে মাকসুদ রোগী দেখছে। নীরা আকাশকে নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ পাশ ফিরে দেখে আকাশ পাশে নেই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।
সবাই দুপুরে ভাত খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে কখন যে চোখ লেগে গেলো কেউ টের পেলোনা।
ধড়মড় করে নীরা উঠে বসলো।
“শুনছো! শুনছো! আকাশ কি তোমার কাছে?”
মাকসুদ তাড়াতাড়ি ভিতরে আসলো, “আবার কি হয়েছে?”
“আকাশ কি তোমার কাছে?”
“নাতো!”
“দেখোতো ছেলেটা কোথায় গেলো?”
চারদিকে খোঁজ পড়ে গেলো। নেই! নেই! নেই! আকাশ কোথাও নেই! হঠাৎ মাকসুদের মনে হলো মরিয়মদের বাড়ি গেলো কিনা! সেখানে লোক পাঠানো হলো। ওখানেও যায়নি! পুকুরে জাল ফেলে বহু সময় ধরে খোঁজা হলো। নাহ, আকাশকে পাওয়া গেলো না!
স্তব্ধ নীরা! স্তব্ধ মাকসুদ! কোথায় তাদের সন্তান!
পুরো গ্রাম জুড়ে শোকের মাতম! চারদিকে পুকুর-খাল-বিল পানিতে টইটুম্বুর। মাকসুদ ভাবতেই পারছেনা তার ছেলে নেই। মসজিদে বলা হলো, বাজারে ঘোষণা হলো, কিছুতেই কিছু হলোনা।
রাত প্রায় বারোটার দিকে পাশের গ্রামের লোকজন আকাশের লাশ নিয়ে এলো। সে এক মর্মান্তিক, করুণ দৃশ্য! এমন শোক এ গ্রামে আর কেউ কোনোদিন দেখেনি। গগনবিদারী কান্নার রোল পড়ে গেলো! বাবা-মা দুজনেই ছেলের লাশ দেখে মুর্ছা গেলো।
মরিয়মদের বাড়ি যেতে যে খাল পড়ে, সেই খালের মুখে ভেসে উঠেছিল আকাশের লাশ। রাতের বেলা মাছ ধরতে গিয়ে লোকেরা এই লাশ দেখতে পায়। সবাই বুঝে গেলো এই সেই ডাক্তার মাকসুদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের লাশ।
বছরখানেক পরের কথা। মাকসুদ শুয়ে-শুয়ে বই পড়ছে। নীরা আলমারি থেকে তার হাতব্যাগগুলো একএক করে নামাচ্ছে; এখান থেকে কিছু পুরনো ব্যাগ সরিয়ে ফেলতে হবে। তবে ব্যাগগুলোর ভেতরটা ভালো করে দেখে নিচ্ছে সেখানে প্রয়োজনীয় কিছু আছে কিনা।
হঠাৎ একটা ব্যাগের ভিতর নাড়াচাড়া করতেই ভেতরে কি যেন বাজলো। কিন্তু ভেতরটা হাতড়িয়ে, উৎ-চিৎ করে কিছুই পেলোনা। আবার ব্যাগটাকে নাড়া দিলো। আবার কেমন যেনো বেজে উঠলো।
ভগ্নমনোরথ হয়ে নীরা মাকসুদকে বললো, “দেখোতো, ব্যাপারটা কি? ব্যাগে কিচ্ছু নেই, অথচ নাড়াচাড়া করলে কেমন একটা শব্দ হচ্ছে!”
“তুমি দেখো, আমার ভালো লাগছেনা!”
আকাশের মৃত্যুর পর মাকসুদ একদম নীরব হয়ে গেছে। সংসার কিংবা নীরা, কারো প্রতি মাকসুদের কোনো আগ্রহ নেই।
এবার নীরা ব্যাগের ভেতর আবার হাত ঢুকালো। হাতড়াতে গিয়ে মনে হলো ব্যাগের ভেতরে লাগানো কাপড়ে একটা জায়গায় খানিকটা ছেঁড়া। সদ্য আবিষ্কৃত ছেঁড়া স্থান দিয়ে সে হাত ঢুকিয়ে হাতড়িয়ে যে জিনিস বের করে আনলো, তারপর তার মুখে কোনো কথা সরছেনা। কে যেন হাজারো হাতুড়ি দিয়ে তার হৃৎপিণ্ডটাকে পিটিয়ে চুরমার করে দিচ্ছে!
এবার নীরা প্রচণ্ড জোরে উদভ্রান্তের ন্যায় প্রলাপ বকতে লাগলো, “ওরে আল্লারে! আমি কী করলামরে! ওরে আল্লারে! আমি কি করলাম রে!”
মাকসুদ নীরার আচরণে হতচকিত হয়ে গেল। নীরার হাতের দিকে তাকিয়ে সেও হতবাক, কারণ, নীরার হাতে যে সেই হারিয়ে যাওয়া সোনার চেনখানা চকচক করছে, আর হীরার লকেট থেকে দ্যুতি বেরুচ্ছে!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close