Home গদ্যসমগ্র গল্প মোজাফফর হোসেন / ছোটগল্প
4

মোজাফফর হোসেন / ছোটগল্প

প্রকাশঃ November 7, 2016

মোজাফফর হোসেন / ছোটগল্প
0
4

একজন সংখ্যালঘুর বেঁচে থাকা

বেশ কদিন পর আজ বের হলেন সমীর পাল—এলাকার শ্রদ্ধেয় সমীর স্যার। মাসকয়েক পর এভাবে ঘটা করে বাড়ি থেকে বের হলেন তিনি। এমনিতে সুস্থই আছেন, তবুও বের হন না আজকাল। হন না মানে স্ত্রী হতে দেন না। ছেলেমেয়েরা দেন না। একদম তালাবন্দি করে রাখার মতো করে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সমীর স্যার বাধ্য হয়ে এই বন্দিদশা মেনে নিয়েছেন। মেনে নেয়াটাই তার কাছে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হয়েছে।

সেদিন ঘরের বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়াটাই ছিল সময়ের দাবি। সমীরের মা তাকে খুব সকালে ছেলের প্রিয় আলুভর্তা আর মুরগি-ভুনা নিজের হাতে তুলে খাইয়ে বলেছিলেন, ‘তাড়াতাড়ি বের হ, বাবা!’ নিঃশব্দে বলেছিলেন, ‘সাবধানে যাস।’ সমীর সেটা বুঝে নিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘যে-কাজে যাচ্ছি সেখানে সাবধানে থাকা যায় না, মা। সাবধানে থাকতে আমরা যাচ্ছি না। যুদ্ধে যাচ্ছি দেশ স্বাধীন করতে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। তবে কথা দিচ্ছি, সফল হয়ে বীরবেশে তবেই ফেরত আসবো।’ কথা রেখেছিলেন সমীর। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করে সত্যি সত্যি বীরের বেশে বাড়ি ফিরেছিলেন সেদিন। মাকে আর পাননি ফিরে এসে। ঘরে তাকে তালাবন্দি করে রাজাকাররা নাকি আগুন দিয়েছিল বাড়িতে! কিন্তু নতুন দেশ পাওয়ার আনন্দ দিয়ে সেদিন সেই না-পাওয়াটার তীব্র আর্তিটা চাপা দিয়েছিলেন তরুণ সমীর।

এখন যদি সমীর পাল চলে যান ঘাতে-অপঘাতে, তাহলে সন্তান ও স্ত্রীদের এমন কোনো প্রাপ্তিযোগ ঘটবে না যার আনন্দ দিয়ে তারা তাদের প্রিয়পাত্রকে হারানোর শোক সামাল দেবে। এটা বুঝেই সমীর মাস্টার দমে গেছেন। ধর্মকর্ম তিনি খুব বেশি মানেন না। মানবতার পূজারি তিনি। তাই ধর্মের নিজের মতো করে একটা ভার্সন তৈরি করে নিয়েছেন। যতটুকু দৃশ্যত পালন করেন ওটা পৈতৃক দায়িত্ব জ্ঞান করে। বাবার অবর্তমানে এখানে হিন্দুসমাজের ভালো-মন্দের সব সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়। শহরে শেষ যে ক’ঘর হিন্দু আছে তাকে বেশ মান্য করে, আঁকড়ে ধরে থেকে টিকে থাকার মন্ত্র খোঁজে। নেতৃত্ব দেওয়ার লোভ যে কারো মধ্যে জাগে না তা নয়, কিন্তু সমীর মাস্টারের এলাকায় যে লোকপ্রিয়তা, গোত্রের বৃহত্তর স্বার্থে সেটিকে সকলে কাজে লাগাতে চান।

জনপ্রিয়তার কারণ সমীর মাস্টার এই এলাকার তুখোড় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এই ছোট্ট শহরে তাকে ছাড়া একটা পাখিও যেন গান গায় না। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে যে-ই একটু আধটু গাইতে পারে, সমীরকে দেখলে দু’কলি গেয়ে দিয়ে অতি উৎসাহ নিয়ে বলে, দেখেন তো স্যার ঠিক আছে কি-না! নৃত্যকলা ও অভিনয়েও সমীরকে তেমনি গুরু মানে সকলে। আর সমস্যাটাও এখানেই। সমীর স্যার একে তো পদবিতে পাল তার ওপর আবার গান-বাজনার গুরু। জেলায় জেলায় এখন হিন্দু-পুরোহিত, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অথবা কথিত নাস্তিক হত্যার ধুম পড়ে গেছে। আশেপাশের জেলাগুলোতে অন্তত একজন করে হত্যা করেছে ঘাতকেরা। নির্মম হত্যা। সমীর স্যারের জেলায় এখনো এধরনের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি। পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের ভয়টা এখানেই। মুসলমান শুভাকাঙ্ক্ষিরাও ঘুরতে ফিরতে সমবেদনা জানিয়ে বলে যাচ্ছে, তোমরা তো সংখ্যালঘু, বুক ফুলিয়ে না থেকে একটু চুপেচাপে থাকা ভালো।

‘সংখ্যালঘু’ শব্দটার মানে সমীর স্যার ভালো করেই জানেন। ঘৃণাও করেন। এই ঘৃণাটা তার নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে এভাবে মিশে যাবে এটা তিনি ভাবেননি কখনো। ভাবতে চাননি বলেই সেদিন সাতপাঁচ না ভেবে একা মাকে রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। ভাবতে পারেননি বলেই হয়ত স্বাধীনতার পর সমীরের কাকারা ওপারে চলে গেলে সমীর তাদের বোকা ভেবেছেন। আজ মনে হচ্ছে, ওরা ভবিষ্যৎটা দেখতে পেয়েছিল। বোকামি তারা করেনি। এটা তিনি বোঝেন যে সেদিন দেশ ছেড়ে চলে না যাওয়ার জন্যে সমীরের খুব আফসোস হচ্ছে তা নয়। মোটেই তা নয়। সমীর পাল যত যা-ই ঘটুক, নিজ দেশেই আমৃত্যু থেকে যাবেন। এটা তার দেশ, এ দেশ ছেড়ে তিনি কিছুতেই যাবেন না। তার প্রাণবায়ু একদিন এ দেশের বাতাসেই মিশে যাবে, শেষ ভষ্মটুকু মিশে যাবে প্রিয় ভৈরবের জলে। তিনি যে একদিন এলাকার আদর্শ শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন এবং আজ কিছুটা পেরেছেন বলে মনে হয়—এটা তার গর্ব নয়, এটা তার দেশের প্রতি কমিটমেন্ট।

আজ সমীর পাল বের হয়েছেন বেশ যুদ্ধ করে। কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে নয়; তিনি বেরিয়েছেন শহরের প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে আসা পার্কের প্রিয় বেঞ্চটিতে খানিকটা সময় বসে থাকতে। এখানে যে বটগাছটা কেবল ডানা বিস্তার করতে শুরু করেছে, সেটি তিনি নিজের হাতে লাগিয়েছেন, প্রয়োজনীয় যত্নও নিয়েছেন নিয়ম করে। আজ তিনি গাছটার নিচে খানিকক্ষণ বসে ওর সঙ্গে নিশ্বাস লেনাদেনা করতে চান। গাছের নিচে ছোট্ট করে একটা মাচান পাতা আছে। দুজন বসা যায় এমন। তিনি আর তার প্রাণের বন্ধু-সহকর্মী আবদুল্লাহ মাস্টার সকালে হাঁটতে এসে একটু বসে জিরিয়ে নেবেন বলে মাচাটা বসিয়েছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল কমিটির নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার করে উঠেছিলেন বলে মাঝরাতে কারা যেন নিঃশব্দে গলাটা টিপে দিয়ে আসল। স্ট্রোক করে মারা গেছেন বলে সকলে জানল। সমীর নির্ঘাৎ প্রতিবাদ করবেন ভেবে একদিন দরজার আড়াল থেকে কারা যেন ফিসফাস করে শুনিয়ে গেল, ‘হেঁদু মানুষের গলা টিপতে রাতের অন্ধকার লাগে নাকি! কিন্তু মেয়েটার জন্যে একটু অন্ধকার হলে ভালো হয়!’ সমীর মাস্টার বুদ্ধিমানের মতো ইঙ্গিতটা বুঝে নিয়ে চুপ মেরে গেলেন।

সমীর মাস্টার গাছের নিচে বসে আছেন আনমনে। বাড়ি থেকে ঘনঘন ফোন আসছে এটা-সেটা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় বিষয় জানতে চেয়ে—বাবা, মুড়ির ঢোপটা কোথায় বলতে পারো? বাবা, তোমার প্রেসক্রিপশনটা কোথায় বলো তো, ওষুধটা কেনা দরকার! আসলে তারা ফোনের এপারের কণ্ঠস্বর শুনে আশ্বস্ত করছে নিজেদের। ছোট ছেলে নামিয়ে গেছে, হয়ত আশপাশ থেকে চোখও রাখছে। অদৃশ্য চোখ যে আরো দু-চারটা নেই সেটা বলা যাবে না।

সমীর যখন গাছ থেকে মাথাটা পৃথিবীর সমান্তরালে নামিয়েছেন তখনই চোখে পড়ল—চারটি ছেলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। দুজন আগে, দুজন পিছে। দুটো ছেলের মুখভর্তি দাড়ি। একজনের ক্লিন শেভড, অন্যজনের খোঁচা খোঁচা—কাটবে কাটবে করে হয়ত সময় পায়নি। দুজনের পরনে জিন্স আর শার্ট, দাড়িওয়ালা দুজনের একজনের প্যান্ট-পাঞ্জাবি, অন্যজনের ফোর কোয়ার্টার টিশার্ট। সুদেহী তিনজন, একজন বেশ রোগা। চারজনেরই বয়স কাছাকাছি হবে। সমীর একটু গুটিয়ে গেলেন। এতদিনে এই প্রথম তার শরীরটা অজানা এক শঙ্কায় কেঁপে উঠল। শীতল বাতাসেও শরীরটা ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠছে বলে তার মনে হল। ছেলেগুলো আরো কাছে এলো। একেবারে সন্নিকটে। কয়েক পা দূরে মাত্র। কী যেন নিজেদের ভেতর বলাবলি করছে। শব্দ শোনা যাচ্ছে, পুরো বাক্য না। সমীর একবার ভাবলেন আওয়াজ দেবেন। চেষ্টাও করলেন, গলা থেকে কোনো শব্দ বের হল না। মনে হল কতগুলো অদৃশ্য হাত যেন গলাটা চেপে ধরে আছে! নিজের ছোট ছেলেকে খুঁজলেন দৃষ্টি দিয়ে, আশেপাশে আছে বলে মনে হল না। ছেলেটা যে আশেপাশে নেই, এটা ভেবে স্বস্তিও পেলেন—কী এমন বয়স হয়েছে ওর! সেনাবাহিনিতে চাকরি করছে, কদিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। সামনের মাসে সুদানে যাচ্ছে, শান্তি মিশনে। শান্তি মিশন থেকে ফিরে বিয়েটা সারবে বলেছে। মেয়ে ওর পছন্দ করাই আছে। ভারি মিষ্টি মেয়ে। ওর এখন এখানে না আসাটাই উচিত হবে। সমীর এখন এমন কিছু করবেন না যাতে তার ছেলেটা টের পেয়ে ছুটে এসে বিপদটা নিজের মাথায় তুলে নেয়। সমীর ভাবনার কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না বলেই হয়ত ভাবনাটা ছেলের ওপর নির্দিষ্ট হয়ে থেমে যায়।

আসসালামু আলাইকুম স্যার, দুজন একসঙ্গে বলে।

আদাব স্যার, অন্য দুজনের একজন বলে। বাকিজন তখন এক লাফ দিয়ে বটের একটা পাতা ছেড়ে।

সমীর কি উত্তর দেবেন ভেবে পান না। চারজনের একজন অতি কাছে এসে, সমীরের একেবারে বুকের কাছে, মাথা নিচু করে। সমীর মাস্টার চোখ বন্ধ করে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটা নেবেন বলে প্রস্তুতি নেন। আলতো করে পায়ের পাতা স্পর্শ করে ছেলেটি। পাঞ্জাবি-প্যান্ট পরিহিত, পাতলা দাড়িওয়ালা ছেলেটি মাথা তোলে—দোয়া করবেন স্যার। আমি চাকরিতে জয়েন করেছি। আপনার দোয়া নিতে বাসায় যেতাম, এখানে পেয়ে গেলাম, ভালোই হল। তবে বাসায় যাবো, কাকিমার হাতের চা না খেয়ে এই শহর ছাড়ছি না।

বেশ। কি চাকরি বাবা? সমীর মেঘটা কেটেছে কিন্তু ঝড়ের সম্ভাবনা এখনো যায়নি এমন একটা ভাব থেকে প্রশ্নটা করেন।

স্যার, আপনি বোধহয় আমাদের চেনেননি। আমরা সকলেই আপনার ছাত্র। কত বকেছেন-মেরেছেন আমাদের! তবেই না মানুষ হয়েছি। ভুলে গেলেন?

সমীর এবার ভালো করে ছেলেগুলোর মুখের দিকে তাকান। এতক্ষণে যে চিনতে পারেননি এটা ভেবে লজ্জা পায় তার। এবার একটু স্মিত হাসার চেষ্টা করে বলেন, চিনেছি তো। স্কুল পাশ করেছ কম দিন তো হল না; তারপরও তোমাদের কথা আমি একটুও ভুলিনি, বাবা। তোমরাই কি ভুলতে পেরেছ এই বুড়ো মানুষটাকে! দোয়া করছি, তোমরা চারজনই অনেক বড় মানুষ হও। মানুষের মতো মানুষ।

ছেলেগুলো অতি বিনয়ের সঙ্গে সমীর স্যারের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যায় আরো কিছুক্ষণ। সমীর ভয় আর নির্ভয়ের মাঝামাঝি অনুভূতিহীন স্থানের বাসিন্দা হয়ে ওঠেন ক্ষণকালের জন্য। বিশ্বাস তিনি করছেন, কিন্তু করা উচিত কিনা সেটা নিয়েও ভাবছেন। ছেলেগুলো যাওয়ার সময় একজন পেছনে ফিরে কয়েক কদম এগিয়ে এলো সমীর মাস্টারের দিকে। কিছু বলল সে, স্যার আপনি আমাদের এলাকার গর্ব। এভাবে একা একা বের হয়েন না, যে দিনকাল পড়েছে। বলা তো যায় না, আপনি তো সংখ্যালঘু! ছেলেটি এবার চলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়। যাওয়ার সময় বলে কিছু, রাতে একবার আসবো নাকি? আপনার বাসার কুকুরটাকে গতকালই কারা যেন মেরে ফেলেছে! ইস, এভাবে কেউ কুকুরকে খুন করে নাকি? ছেলেটি দ্রুত পা চালিয়ে বন্ধুদের ভেতর মিশে যায়।

যে ভয়টা এতক্ষণে কেটে গিয়েছে বলে মনে হয়েছিল, সেটি আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(4)

  1. প্রিয় গল্পকার আশা করি ভালো আছেন। গল্পটি ভালো লাগেনি। আপনার কাছে এক্সপেক্টেশান অনেক বেশী তাই হয়তো। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে আপনার উপস্থাপন ভঙ্গি মোটেও ভালো লাগেনি। সত্যিকার অবস্থা মনে হয় না এমন খারাপ। হ্যাঁ হয়তো বর্তমান সময়টা খারাপ যাচ্ছে। এমন বিষয় নিয়ে আরো ভালো গল্প আপনার কলম থেকে বেরুবে এই প্রত্যাশা করি। ভালো থাকবেন। সমালোচনা করলাম, রাগ করবেন না আশা করি। ভালো থাকুন, ভালোর সঙ্গে থাকুন। আর তীরন্দাজ কে ধন্যবাদ।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close