Home ছোটগল্প মোসাব্বির আহে আলী > লালসা ও ধ্বংসস্তূপ >> ছোটগল্প

মোসাব্বির আহে আলী > লালসা ও ধ্বংসস্তূপ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ August 22, 2017

মোসাব্বির আহে আলী > লালসা ও ধ্বংসস্তূপ >> ছোটগল্প
0
0

রাত সাড়ে চারটা। নিস্তব্ধ তক্তার মত শুয়ে হয়ে আছে শহর। কে যেন আকাশ থেকে কুয়াশার স্প্রে মারছে অবিরাম। ঘাসের পাশে আরেক লম্বা প্রতিবেশী ঘাসের মত বিল্ডিংগুলো গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। মাড়াইয়ের মত কোন মানুষের কিংবা দানবের পা নেই। খুব নির্ঝঞ্ঝাট লোকালয়। এই নৈঃশব্দই এ নিরালা রাতের গর্ব। এবং তা চুরমার করে একটু আগে একটা ভুমিকম্প হালকা নাড়িয়ে দিল এই ঘুমন্ত শহরকে। আর সাথে সাথে দাবানলের ছোবলে ছুটন্ত বুনো বাসিন্দাদের ত্রস্ত চিৎকারের মত শোরগোলে ভরে গেল শহর। এবং তাতেই গভীর সেই রাতে, যে যে-ই পজিশনে ছিল রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। মৃত্যুর দাবড়ানি বলে কথা। কি সেই দৃশ্য! বয়ঃসন্ধির গ্যাঁড়াকলে পড়া ছেলেগুলি কিংবা মন্নাফের মত প্রায়-পয়ত্রিশ কিছু ব্যাচেলর মরদ ভূকম্পনের এই উত্তেজনা ফেলে আবছা বাতির আলোয় গলিতে নেমে আসা এলোমেলো কাপড়ের শিপু ভাবীর দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তাদের মস্তকে তখন রিখটার স্কেল ছিল না, ছিল বক্ষ ও নাভির মাপ।

এই অবস্থায় কিছুক্ষণের জন্য পুরো শহরের সমস্ত ঘুম পথে নেমে আসে। গলিগুলোতে এত ভীড় যেন সবাই রথের মেলায় রওয়ানা দেয়ার অপেক্ষায়। তারপর ভয় আর উৎকন্ঠা মিইয়ে গেলে মানুষগুলো আবার তাদের খোপে খোপে ঢুকে দরজা লাগায়। কেউ কেউ সিড়িঁ বেয়ে উঠতে উঠতে বলতে থাকে- ‘মইষ একবার শিং লাড়া দিলেই সব রং শেষ রে বেডা, এই সব চিপা দিয়া কোন গাড়িই ঢুকবার পারবো না মিয়া, পঁইচা গইলা ভাগাড় অইবো, হুদায় বেকতে টাইলসের, মার্বেলের মহল বানাইতাছে।’

আধঘণ্টা পর।

মন্নাফ টের পায় তার পায়ের গোড়ালির দিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কি যেন একটা জ্বালাপোড়া করছে। এই জ্বলুনিটা ওর পরিচিত। একবার সে তার গ্রামে ইন্দির বিলে মাছ ধরতে গিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুলের চিপা শামুকে কেটে গেলে এমন জ্বলুনি উঠেছিল। রক্ত ও পানির কাদায় অন্য একটা রঙ ধরেছিল পায়ের পাতায়। মন্নাফের মনে পড়ে। ব্যথাটা মৃদু যন্ত্রণার কিন্তু বিরক্তিকর ছিল। কিছু ব্যথা পরিমাণে হালকা কিন্তু স্বভাবে বেশ বিরক্তিকর ও মনোযোগ নষ্টকারী হয়। যাই হোক- এই অবস্থায় আরও দু-এক মুহূর্ত পার হলে মন্নাফ তার চারপাশে কালো আলোর ব্যপারটা ঠাহর করতে থাকে। ধুলার মত কিছু তার নাকে এসে লাগে তখন। নাসারন্ধ্রের চারপাশে জমা ঘামবিন্দুতে এই উড়ন্ত ধুলা লুটিয়ে ভিজে যাচ্ছে। ধুলা ভিজে গেলে ঘ্রাণ হয়। মন্নাফ খেয়াল করে এই ধুলার ঘ্রাণ গ্রামের মেঠোপথের ধুলাভেজা ধোয়াটে ঘ্রাণটার মত নয় বরং এটাতে সিমেন্ট-কংক্রিটের একটা ঘ্রাণ। হাত-পা নাড়া দিলে এই ধুলাঘ্রাণ আরও তীব্র হচ্ছে। পায়ের গোড়ালির দিকে যেদিকে জ্বলছে সেখানে বালির আস্তরণে শরীর কিটকিট করছে, যন্ত্রণাটা বিদঘুটে আকার নিচ্ছে। মন্নাফ এবার চুলে হাত দেয়। ভারী ধুলার ঝুল চুলে। চারদিকে আঁটসাঁট সীমানা, সংকীর্ণ আলো-স্থান-বাতাস। মন্নাফ এবার মাথায় সত্যি সত্যি মনোযোগ দেয় মানে স্মরণ করার চেষ্টা চালায়। সে কেন এখানে?চ ারদিকে কালো আলো কেন? যতটুকু তার মনে পড়ে সে ভুমিকম্পের ঝাঁকুনিতে মহল্লার গলিতে নেমে এসেছিল শেষবার। এবং তার কিছু পর আর সবার মত উৎকণ্ঠাসহ ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল। ঘরে এসে ভাবছিল রাস্তায় নেমে আসা আলুথালু বেশের ভয়ার্ত দৃষ্টির শিপু ভাবীর কথা। তার পেট ছিল উদম, অবিন্যস্ত ব্লাউজের নিচ দিয়ে দু’দিন বয়সী জোড়া চাঁদের মত স্তনদ্বয় বন্ধনিচ্যুত হয়ে বেরিয়েছিল। মনে পড়ে সব।

ঘ্রাণেন্দ্রিয় সচল হওয়ার পর ধীরে ধীরে এবার মন্নাফের শ্রবণেন্দ্রিয় সচল হতে থাকে। সে শুনতে পেতে থাকে আশপাশের রোদনকা-। অনেক দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্স আর ফায়ার সার্ভিসের পরিচিত ইমারজেন্সি হর্নের আওয়াজ কানে এসে লাগে।

‘আমারে পানি দেন একটু, আমার মানিকটা কই? ’- বলে একটা ব্যথাভারি চিৎকার তখন ভিতরের এই আঁধারকে হঠাৎ লজ্জায় ফেলে দেয়। মন্নাফ তার একটা হাতের কনুই দিয়ে কয়েক ইঞ্চি নড়ার চেষ্টা করে- পারে না। চিৎকারটা তার পরিচিত। তৃতীয়তলার শিপু ভাবির। বাচ্চাসহ সে গলিতে নেমে এসেছিল শেষবার। কাপড়ের ঠিক ছিলো না। পিচ্চি ছেলেটা মায়ের কোলে ঝুলে ছিল। ওর বাবা আজ বাড়িতে ছিল না। মন্নাফের সব মনে আছে।

‘পানি দেন’- বলে চিৎকারটা দিয়েই বেচারি চুপ করে গেল। মন্নাফের মনে হল তারও তো এতক্ষণে একটা চিৎকার দেবার কথা। সেও তো এই ভুমিকম্পের শিকার। তার মতই তো চাপা পড়ে আছে সব। আশেপাশে, কিছু দূরে, খুব দূরে পুরো নগরীর নিচে তার মতন চাপা পড়ে আছে নাগরিকগণের এলোপাথাড়ি অসহায় চিৎকারসমূহ। শিপু ভাবি আবার হঠাৎ অস্ফুট গোঙানি ছাড়ে- এবার মন্নাফ খুব কষ্টে আবছা খেয়াল করে তার সামনে একটা দেয়ালের বিম বাঁকা হয়ে আছে এবং এই বিমের শেষ মাথার দিকে শিপু ভাবির গোঙানিটা বোঝা যাচ্ছে। মন্নাফ ভাবে- এই শিপু ভাবি কত যে দিন তার ঘুম হারাম করেছে তার হিসাব নাই। উপরতলায় মন্নাফের রুমের বরাবর ঠিক উপরের রুমে থাকতো এই ভরাটদেহি মহিলা। শিমুল নামের মাঝবয়েসী একটা লোক যখন তার বউকে নিয়ে তিনতলায় রুম ভাড়া নেয়, সেদিন সন্ধ্যায় মন্নাফ ছাদে গিয়েছিল। লম্বা-চওড়া হিন্দু দিদিদের মত সুন্দও মাথাভরতি চুল- দুধের সরের মত গায়ের রঙ মন্নাফের এই প্রায় পঁয়ত্রিশের অবিবাহিত জীবনের জন্য ফ্যান্টাসি নিয়ে এসেছিল। কত না চেষ্টা করা হল ভাবির সুনজর পাবার- কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছিলো না। ইচ্ছে করে ইলেকট্রিক সার্কিট ডাউন করে ভাবির ঘরে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে সে। গিয়েছেও কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। পানি খেতে চেয়েছে এমনি, তার ছোট পিচ্চিটাকে আদরের ছলে ঘরে ঢুকতে চেয়েছে কিন্তু আখেরে কাজ হয় নি। অথচ আজ এই শিপু ভাবিই অসহায়ের মত তার কাছে পানি চাচ্ছে। আর কাকতালীয়ভাবে আজ মন্নাফ তারই পাশে। উভয়েই ঘোর বিপদ্গ্রস্ত।

এবার মন্নাফের সব ভালোমত মনে পড়ছে। প্রথম ঝাঁকুনির সময় রাত ছিল ৩টা। তার মানে এখনও আলো ফোটেনি আকাশে। তার মানে ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। ঘটনা হল- মাথায় বাড়ি খেয়ে ও কিছুক্ষণ অজ্ঞান ছিল।  চিৎকারে অতিরিক্ত ভারী হতে হতে, এই গভীর রাত এখন কিছুটা শান্ত হয়ে ভোরের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। অথচ এখনো ভয়ের প্রথম চিৎকারটাই দেয়নি মন্নাফ। সে দীর্ঘকালের বেকার। তার কাছে বিয়ে- বেঁচে থাকা বিস্বাদেরই আরেক ঢং। শিপু ভাবির গোঙানি এতক্ষণে থেমে এসেছে। এখন আর তিনি ‘পানি দেন-‘ বলে চিৎকার করছেন না। শক্তিতে বোধ হয় আর কুলচ্ছে না। মন্নাফ এবার প্রস্তুতি নেয়। ঠোঁটের উপর থেকে গেঞ্জির হাতা দিয়ে ধুলো মুছে নেয় সে। এই বিপদের ঘোর ক্রান্তিকালে মন্নাফের কোন কিছু আসে-যায় না যেন। মন্নাফের চোখে কেবলই অস্বাভাবিকভাবে ভাসে ভরাট শরীরের এক শিপু ভাবী।

‘ভাবি, আমি মন্নাফ, দু’তলার। ভয় পাইয়েন না ভাবী। সকাল হোক, ধৈর্য ধরেন। রাবিশ সরায়া আমগোরে বাইর করব তিন বাহিনীর লোকজন। হেলিকপ্টারের আওয়াজ পাইতেসেন তো?’ বলতে বলতে ধূলা ঢোকে তার মুখে।

শুনে একটা অস্ফুট স্বর জোরালো হবার চেষ্টা করে তখন। জোরালো হয়ে আওয়াজ আসে- ‘একটু পানি দেন। এবার মন্নাফ আর ভোরের অপেক্ষা করে না। মন্নাফের সব মনে পড়ে। ভ্রু কুঁচকে সামনের বিমের পাশে আটকা ভাবির অবয়ব পরিষ্কার দাঁড় করাতে চায়। তার মাথায় একটাই প্রশ্ন– পানি কোত্থেকে পাবে?

মন্নাফের খুব মনে চায় এই সুযোগে ভরাট ভাবিকে সে পানি দেবে। পানির এক ঢোক খেয়ে ভাবি শক্তি ফিরে পাবে। শক্তি পেলে হয়তো সে নড়াচড়া করে তারই মত করে বীরের মত বেরিয়ে যাবে এই ধংসস্তুপ থেকে। তারপর তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর ছেড়ে পালাবে অরণ্যময় গ্রামের দিকে। ধসে পড়া ইমারতে আটকে থেকে এসব এলোমেলো ভাবতে থাকে মন্নাফ। ভাবতে ভাবতে ততক্ষণে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের কথা মনে পড়ে। তার বাবা বৃদ্ধ মানুষ। ভাইয়েরা যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মনে মনে তার গ্রামের বাড়ি চলে যায় মন্নাফ। সবার কথা ঘুরে ঘুরে খেয়াল করতে থাকে সে। আচ্ছা, গ্রামে তো একচালা টিনের ঘর আছে তাদের। আজকের এই ভূমিকম্প কি সেই ঘরকে আস্ত রেখেছে? তার বাবা, বৃদ্ধা দাদি আর তার ভাইয়েরা কেমন আছে, কে জানে।

ড্রিল মেশিনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সাথে মানুষজনের চিৎকারও। মন্নাফ বুঝতে পারে যে সে কোন রকম জখম পায়নি। দিব্যি আছে, শুধু একটু নিঃশ্বাসে ঝামেলা হচ্ছে, এই যা। বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটিয়ার কথা মন্নাফের মাথায় আসছে না এখন, হয়তো তার আশেপাশেই সবাই মরে আটকে আছে, কেউ কেউ হয়তো অজ্ঞান হয়ে আছে, আবার অনেকেই হয়তো তার মত উদ্ধারের  অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এতকিছু ছাপিয়ে মন্নাফের কেবল শিপু ভাবীর দিকেই মনোযোগ বাড়ছে। যেন সমগ্র দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিকার এই শিপু ভাবী।

মন্নাফ ঘাড়ের চটচটে ধূলা মুছে দুই আড়াই গজ দূরের ভাবীকে ডাক দেয়। ‘ভাবী, কিছু সময় কষ্ট করে থাকেন, শুনেন বাইরে হেলিকপ্টারের আওয়াজ সাথে ড্রিল মেশিনের শব্দ, পাইতাছেন না?

‘এতক্ষণ বাচমু না মনে হয়, একটু যদি পানি পাইতাম রে ভাই! আমার বাচ্চাটা কই? আমার বাবাটা কই?’

মন্নাফের খেয়াল হয় শিপু ভাবীর পিচ্চি ছেলে জিয়নের কথা। ওকে কোলে নিয়েই তো সে আলুথালু নেমে এসেছিল বাসার নিচে গলিতে। আহা, বেচারি। মন্নাফ ব্যাগ্র হয়ে ভাবীকে সান্ত¡না দেয়- ‘ ভাবী, পুরো শহর বিপদে পরছে, ধৈর্য ধরেন। যারা বাইচা আছে তারা নিশ্চয়ই আমগোরে উদ্ধার করনের চেষ্টা করতাছে।‘

‘আরে মিয়া, পিচ্চিটার কোন কান্দনও হুনি না, ও তো আমার সাথেই আছিল, কৈ গেলো জান আমার, ওর বাপরে আমি কি কমু? হাই আল্লাহ!’

এই করুণ আর্তনাদে মন্নাফ এবার চুপসে যায়। একদম চুপসে যায়। খুব চুপসে যায়।

অনেকক্ষণ হল অনেক দুর থেকে কেবল অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজই কানে আসছে কিন্তু তা তীব্র হচ্ছে না। এর মানে কি? মন্নাফ ভাবে। গাড়িগুলো কি তাইলে ঢোকার মত পরিস্কার পথ পাচ্ছে না? মন্নাফের এবার দুশ্চিন্তা লাগে হালকা। শরীরে শক্তি নেই তেমন। বীমটা পার হয়ে শিপু ভাবীর কাছে কি যেতে পারবে ও? গেলে কি হবে? তার সৌন্দর্য সৌষ্ঠব কি ঠিক আছে- নাকি বিপদগ্রস্ত পরিবেশ তার আগুনধরা রূপে ধস নেমেছে শহরের মত? তার পিচ্চি ছেলে জিয়ন কি বেঁচে আছে, বেচারি কি ওর নাড়িকাঁটা ছেলেকে ফিরে পাবে?

এগুলো ভাবতে ভাবতে উপরে সামান্য আটকে থাকা পিলারটা সজোরে ধসে পড়ে মন্নাফের মাথায়। পাকা কদবেল ফাটার মত একটা আওয়াজ হয় এবং একদম সাথে সাথে একটা বাচ্চাকণ্ঠ প্রচ- শব্দে কেঁদে ওঠে। এই শুনে শিপু ভাবী সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে, বলে- ‘ও আমার মানিক ধন, আমার বাবা কই রে? ও মন্নাফ ভাই, কই আপ্নে? আমার কলিজাডা কই কান্দে, একটু দেহেন না? আমার এহন আর পানি লাগব না।’

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close