Home ছোটগল্প মোহিত কামাল > ঈশ্বরকণার ত্রিমাত্রিক কাব্য >> ছোটগল্প

মোহিত কামাল > ঈশ্বরকণার ত্রিমাত্রিক কাব্য >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ November 19, 2017

মোহিত কামাল > ঈশ্বরকণার ত্রিমাত্রিক কাব্য >> ছোটগল্প
0
0

মোহিত কামাল > ঈশ্বরকণার ত্রিমাত্রিক কাব্য >> ছোটগল্প

 
আকাশ থেকে নীল জলরাশিকে মনে হলো সংগীতের রাগ-রাগিণীর স্বতঃউৎসারিত সুরতরঙ্গ- যেন কেবলই সাগরের ঊর্মিমালা নয়; ছন্দের ঢেউ তুলে বিস্তৃত সুরঢেউ ছড়িয়ে আছে নীচে, সমুদ্রে। আকাশে ভাসমান এমএইচ ৩৭০ মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের স্বচ্ছ গ্লাসের ভেতর থেকে সেরকম দৃশ্য দেখে উল্লসিত হয়ে কনুইয়ের গুঁতোয় রবির নজর ফেরানোর চেষ্টা করল অধরা। মালয়েশিয়ার লঙ্কাউই দ্বীপ থেকে হানিমুন শেষে নিজ দেশে ফেরার পথে নববধূ অধরার রোমান্টিক উচ্ছ্বাসের দিকে মোটেই নজর দিল না রবি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল ককপিটের দিকে। বিজনেস ক্লাসের প্রথম সারিতেই ওদের সিট। পাইলট-রুম, ককপিট খুব কাছে। রবির মনে হলো ককপিটের ভেতর কিছু একটা ঘটছে! বিষয়টি বুঝতে না পেরে ককপিটের বাইরে দাঁড়ানো মিষ্টি মেয়ে, ক্যাবিন ক্রুর দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে মূল ঘটনা বোঝার চেষ্টা করল। মেয়েটি ইতিমধ্যে যতবার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে, মিষ্টি করে হেসেছে। এখন সেই হাসিতে হঠাৎ বয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার ঝড়, এই উষ্ণতায় যেন গলে যাবে মেরুর বরফ-পাহাড়, প্লাবিত করে দেবে পৃথিবীর সাগর-মহাসাগর, বিলীন হয়ে যাবে মাটি ও সবুজ প্রকৃতি!
অধরা বলল, ওইদিকে কী দেখছ? এদিকে তাকাও। দেখো স্রোত আর ঢেউয়ের উল্লাস; জীবনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি…নমনের গহনে লুকিয়ে থাকা মায়া আর রাগের মধ্যে দূরত্ব নেই; জড়াজড়ি সহাবস্থান থেকে আচমকা মায়া থেকে ঝংকার দিয়ে উঠল রাগ। রবির সাড়া না পেয়ে টংকার দিয়ে অধরা প্রশ্ন করল, ওই তেতোমুখো ক্যাবিন ক্রুর মুখে কী দেখছ? কথার বান ছাপিয়ে হঠাৎ ব্রহ্মাণ্ড-বিধ্বংসী শিঙার আওয়াজ ভেসে এল, কাঁপতে শুরু করল মাধ্যাকর্ষণ-টানমুক্ত আকাশে ভাসমান এয়ারবাস। চোখের আলো নিভে গেল মুহূর্তে, কানের ভেতর আছড়ে-পড়া শব্দতরঙ্গ, শানিত হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আঁধারে ঢাকা আলোশূন্য চোখে এবার শুনল মরাগঙ্গার ঢেউয়ের নতুন সুর-রাগ; শাস্ত্রীয় সংজ্ঞার বাঁধন ছিঁড়ে আচমকা ঝাঁকি খেল এমএইচ ৩৭০। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থির হয়ে গেল বিমানের উড়াল-পতন। ভূকম্পনের মতো আকাশকম্পনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠল যাত্রীদের চোখে-মুখে। শূন্য সেকেন্ডের ত্রিমাত্রিক বিন্দুতে বসেই অধরা আঁকড়ে ধরল রবিকে।
এখন ভাবনার পাত্র শূন্য হয়ে গেছে। ব্রেনের সার্কিটের ভেতর বিশৃঙ্খলা নয় কেবল, জট তৈরি হয়ে গেছে। ভাবনাশূন্য বলা যাচ্ছে না, ভাবনার সুর-লয়-ছন্দ হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে উভয়ে। আঁকড়ে-ধরা হাতের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। সে-চাপ অনুভব করছে না রবি। মুক্ত বাঁ-হাত দিয়ে সেও জড়িয়ে রেখেছে অধরাকে।
কী ঘটেছে বিমানের! চারপাশে তাকিয়ে যাত্রীদের মুখ আর আতঙ্ক দেখার সুযোগ নেই। নিজেদের আতঙ্কের তীব্রতা কেড়ে নিয়েছে চোখের আলো। কেবল অধরার আঁকড়ে ধরার হাতের চাপ ছাড়া পৃথিবীর সব চাপ থেকে মুক্ত হয়ে গেছে রবি। অসীম শূন্যে কী হারিয়ে গেছে তারা? ব্ল্যাকহোলের আলোহীন নিবিড় আঁধারের প্রবল টানে কি ঘুরছে এখন?
আচমকা ডান হাতে ব্যথা টের পেল রবি। উড়ন্ত বিমানটিও সোজা হয়ে উড়তে লাগল আবার। একটা বড় শ্বাস বেরিয়ে আসার পর ডানপাশে তাকিয়ে দেখল অধরার খামচে-ধরা হাতের অংশে শার্ট ভিজে গেছে রক্তের ফোঁটায়। সেদিকে দেখার সময় নেই। অন্য জগতে চলে গেলেও সহস্রকোটি মাইল ভ্রমণ শেষে যেন তারা স্থির দাঁড়িয়ে গেছে বর্তমানের ভরহীন অদৃশ্য বিন্দুতে। শূন্যতার ভেতর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে আতঙ্কের বৃষ্টি আর তখনই হঠাৎ শ্রাবণের বৃষ্টিধারার মতো আকাশ ভেঙে বিস্ময়ের উড়ালমেঘ ঝরতে ঝরতে পরিষ্কার হয়ে গেল আপন মনের আকাশ। চোখ খুলে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে অধরা চিৎকার করে বলল, রক্ত!
অধরার ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর শুনে রবির মনে হলো এই মুহূর্তে রক্তের ফোঁটা বেয়ে ঝরে গেছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আনন্দদ্যুতি খেলে গেল মুখে। কারণ বিমান উড়তে শুরু করেছে আবার। নিশ্চয়ই যান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটেছিল, নিশ্চয় কেটে গেছে দুর্যোগ, নিশ্চয়ই বিপদও উধাও হয়ে গেছে- এমনি আত্মবিশ্বাসের পর সহজ হয়ে আবার অধরা তাকাল বাহিরপানে। এ-যে আকাশ নয়, সাগরজলের অল্প ওপর দিয়ে উড়ছে বিমান! আবার সে খামচে ধরল রবির বাহু। ফোঁটায় ফোঁটায় রক্তকণা টগবগ করে ফুটতে লাগল। উষ্ণ স্পর্শ থেকে নিজের অজান্তে হাত সরিয়ে নিয়ে দেখল, রবি কথা বলছে তেতোমুখের ক্যাবিন ক্রুর সঙ্গে।
কোনো বিপদের সিগনাল এটি?
বাম্পিং হচ্ছে। হতে পারে এমন। তবে উড়াল জাহাজে যে একদম বিপদ থাকবে না, সেকথা কি বলা যায়? রবির প্রশ্নের জবাব দিল ক্যাবিন ক্রু। তেতোমুখীর কণ্ঠ মিঠা মনে হলো অধরার। মিঠা শব্দের উত্তরে সাড়া দিয়ে সেও প্রশ্ন করল, বিপদ থাকবে, সেটা ঠিক; কিন্তু কী রকম বিপদ হতে পারে?
হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে যেকোনো বিমান। এমন ইতিহাস রয়েছে- ১৯৩৭ সালে বিমান চালনায় দক্ষ অ্যামেলিয়া আরহার্ট ও তার সঙ্গে থাকা নেভিগেটর ফ্রিড নোনান বিশ্বপরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আটলান্টিক পেরিয়ে প্যাসেফিক ওশানের ওপর আসার পর বিমানটি অজানা গন্তব্যে উড়ে যায়।
‘উড়ে যায়’! মানে কি হারিয়ে যাওয়া? প্রশ্ন করল অধরা।
হ্যাঁ। ওই বিমানটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আকাশ থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিল।
কথাটার অর্থ কী? আবারও অধরার আতঙ্কিত প্রশ্ন।
অর্থ সহজ, বিমানটি উধাও হয়ে গিয়েছিল আকাশ থেকে।
রবি প্রশ্ন করল, স্যাবোটাজও তো হতে পারে, তাই না?
না। তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিধ্বংস হওয়ারও প্রমাণ মেলেনি।
আচমকা আবারও কেঁপে উঠল বিমান- ২২৭ যাত্রীর মধ্যে আবারও বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে গেল ভয়াল আতঙ্ক, ১২জন ক্রুর সবাই নতুন অভিজ্ঞতার ঝাঁকি খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। রবির সামনেই ককপিট-ঘেঁষা ক্যাবিন ক্রুর জন্য সংরক্ষিত আসনে বসে পড়ল বিমান-সেবিকা। কিছুক্ষণ পর আবার স্বাভাবিক হয়ে উড়তে লাগল বিমান। তবে ওড়ার মধ্যে সহজবোধ টের পাওয়া যাচ্ছে নাÑ যাত্রীরা টের পেতে লাগল বিমান হাওয়ায় ভাসছে না, সাগরজলে ওত পেতে থাকা মহাশক্তিধর কোনো আকর্ষণে দেবে যাচ্ছে নিচে; চুম্বকীয় টান ছেড়ে মুক্ত হয়ে বেরোতে পারছে না বিমানটি।
অধরার চোখে ভেসে উঠল মালয়েশিয়ার লঙ্কাউই দ্বীপের ক্যাবল-কারে চড়ার কথা। কল্পচোখে দেখতে লাগল ছোট ছোট দ্বীপ আর ঘনবনের পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সেই সহজগতিময় ভ্রমণ-দৃশ্য। ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল ‘রবি’র কিরণে ছুঁয়ে যাচ্ছে মন, অন্তরের আলোয় নিজেকে সে আবিষ্কার করেছিল নতুনভাবে। সবুজ বন-বনানি আর দূরের সাগরজলের শ্বেতশুভ্র ঢেউ আছড়ে পড়ছিল দুজনের মনসমুদ্রের কিনারে। প্রকৃতির নির্মলতা আর আদর জমে জমে পাহাড়সমান হয়েছিল ভালোবাসার অমোঘ টান। ওই প্রাপ্তিই কি মধুচন্দ্রিমার মূল উদ্দেশ্য? এমনি চিন্তার উদয় হয়েছিল, ভাবনার জগতে উড়ে উড়ে হাজির হয়েছিল সুখের অযুত অণুকণা, তার নির্যাস শুষে ভেবেছিল সাদা মেঘ থেকেও বৃষ্টি ঝরে, পাহাড়ের সবুজ ঢেউও এসে আছড়ে পড়ে চোখে… সাদা আর সবুজ শক্ত গিঁট বেঁধে দিয়েছিল দুজনের বন্ধনের মর্মমূলে।
ভাসমান উড়োজাহাজে ক্যাবিন ক্রু বসে থাকে- এমন অভিজ্ঞতা তাদের কখনও হয়নি- সাধারণত যে-কোনো বিপদে যাত্রীদের পাশে থাকে হাসিমুখে। সেই মুখে হাসি নেই এখন। উদ্বেগের ঢেউ জোয়ারের ঢেউয়ের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠছে। বিষয়টি লক্ষ্য করে ক্যাবিন ক্রুর উদ্দেশে অধরা প্রশ্ন করল, আমাদের বিমানটি ঠিক আছে তো? ঠিকমতো উড়ছে তো? ক্যাবিন ক্রুর নেমপ্লেটে লেখা আছে ‘শ্যামন্তি’। প্রশ্ন করে উত্তর শোনার আগেই ‘শ্যামন্তি’ শব্দটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল অধরার চোখ। প্রায় চিৎকার দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল, হেই! এটা তো বাংলা নাম! তোমার তো দেখছি বাংলা নাম! তুমি কি বাঙালি?
শ্যামন্তি জবাব দিল, শ্যামন্তি অর্থ ‘সাদা গোলাপ’- ‘হোয়াইট রোজ’। এটা সবারই; সব জাতির নাম হতে পারে ‘শ্যামন্তি’।
ওঃ! সুন্দর নাম! জবাব দিল রবি।
অধরা আর রবির মধ্যে আবার ফিরে এসেছে নতুন প্রাণ। প্রাণের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রাণকণা আবার প্রাণফোঁটায় বদলে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু শ্যামন্তির প্রাণের মধ্যে উৎকণ্ঠার ঘূর্ণিমালার ঘূর্ণন আরও স্ফীত হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে বাইরে- খেয়াল না করে রবি আবার প্রশ্ন করল, আমরা কি এখন সাগর না পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ছি?
রবির প্রশ্ন শুনে শ্যামন্তির উত্তর পাওয়ার আগেই গোলাকার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল অধরা, বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না এখন- না আকাশ, না সাগর, না পাহাড়, কিছুই না। দৃশ্যহীন-দৃশ্যময় অচেনা এক জগতে ঢুকে গেছে বিমানটি। এই অনুভবের ঝড় এল তার মনে। আকস্মিক প্রশ্ন করল, আমরা কি পৃথিবীর আকাশে নেই? নতুন কোনো জগতে ঢুকে গেছি? কী প্রশ্ন করছ? ধমক দিয়ে রবি নিজেই প্রশ্ন করে বসল অধরাকে। শ্যামন্তির গোলাপের সাদা পাপড়ি যেন ঝরে গেছে, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে সে, বিমানের কন্ট্রোল সিস্টেমের সিগনাল বাতিগুলো ঠিকমতো জ্বলছে না। ঝড়ের চেয়েও বড় মহাঝড় বয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সুইচবোর্ডে। এলোমেলো সংকেত আসছে। সেই সংকেতের অর্থ জানা নেই তার। এখন শ্যামন্তির মুখের গোলাপের পাপড়ি ঝরে যাওয়ার এটাও একটা বড় কারণ। তবে কি সমুদ্রের তলে ওত পেতে থাকা কোনো মহাশক্তিধর বৈদ্যুতিক শক্তির টানে বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে বিমানের নিয়ন্ত্রণ সার্কিট? উড়ালভাবনায় সেঁটে যাওয়ার পর মনে হল তারা আকাশে ভাসমান নেই। কোনো এক শক্তিধর মেঘদূতের গহিনে ঢুকে গেছে তাদের বিমান, অথবা চুম্বকশক্তির কেন্দ্রীয় টানে স্থির হয়ে গেছে উড়ন্ত বিমানটি। অধরার প্রশ্নের প্রতিটি শব্দ শ্যামন্তির করোটিতে বুলেটের মতো আঘাত হানছে। মাথার মধ্যে উড়তে লাগল প্রশিক্ষণের সময় পঠিত বহু বিমান নিখোঁজ হওয়ার কাহিনি… হঠাৎ রবি প্রশ্ন করল, আসলে আমরা কোথায়? বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি না তো?
উত্তর দিতে পারল না শ্যামন্তি। কেবল মনের ডানায় ঝাপটা দিল বহু উড়োজাহাজ, যুদ্ধজাহাজ, নৌ-তরীর রহস্যময় বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলে হারিয়ে যাওয়ার রোমহর্ষক কাহিনি। লিজেন্ডারি ব্যান্ডতারকা ও গিটারিস্ট প্লেন মিলার ১৯৪৪ সালে এক গ্রীষ্মকালে ইউএস এয়ারফোর্সের সদস্যদের আনন্দদানের উদ্দেশ্যে আকাশ পথে যাওয়ার সময় উধাও হয়ে ঐতিহাসিক খবরে পরিণত হয়েছিলেন। আটলান্টিক মহাসাগরে হারিয়ে যাওয়া বিমানের সংখ্যাও কম নয়, যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াও এভাবে আগে রহস্যজনক উধাও হওয়ার ঘটনাগুলো এই মুহূর্তে বিচলিত করে তুলল শ্যামন্তিকে। উদ্বেগ কাটিয়ে যাত্রীদের সাহস দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও উঠতে পারল না সে।
এমন সময় রবি আবার প্রশ্ন করল, আন্দিজ পর্বতমালার দিকে যাচ্ছি না তো আমরা?
হঠাৎ এসব কী প্রশ্ন করছ? একবার বলছ বারমুডার কথা আবার বলছ আন্দিজ পর্বতমালার কথা, মাথা ঠিক আছে তো তোমার? প্রশ্ন করল অধরা।
না। না। ঠিক আছে। একবার মনে হচ্ছে বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের ঘূর্ণির প্রবলটানে আমাদের বিমানের উড়ালক্ষমতা হারিয়ে গেছে, আবার মনে হচ্ছে আন্দিজ পর্বতমালায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছি আমরা। আবার মনে হচ্ছে এই বিমানের কেউ বেঁচে নেই। এমন মনে হচ্ছে কেন?
ওদের কথোপকথন শুনে শ্যামন্তির মনে হলো ‘শুধুমাত্র আলোর বর্ণালিতে জলের চিহ্ন না খুঁজে সাগরের তলে জল থেকে আলোর সন্ধান শুরু করেছে ওরা।’
অধরা হঠাৎ চিৎকার জুড়ে দিল- দেখো, দেখো, ওই যে, মহাশূন্যে ভাসমান অচেনা গ্রহ থেকে ধূমকেতুর মতো গ্যাসীয় পুচ্ছঝলক ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে!
রবি তাকাল সেদিকে। শ্যামন্তিও। দেখল আলোর পুচ্ছঝলক ছড়ানো গ্রহটি মূল নক্ষত্রের গা ঘেঁষে অবস্থান করছে। নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজের অল্প আলো। দূরে চারপাশে লাটিমের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে ছোটছোট আলোর বিন্দু। ঘূর্ণায়মান ওই আলোর কণাগুলো কি আঁধারে ডুবে থাকা গ্রহপুঞ্জ? নক্ষত্রের চারপাশে কি পরিবারের সদস্যদের মতো ঘুরে বেড়ায় ওরা? অন্তরে অন্তরে আলোরবিন্দু কি গিঁট দিয়ে দিয়ে নিঃসঙ্গ রহস্যের জাল বুনে চলেছে মহাশূন্যে? শূন্যের ভেতরও আলো! আলোর মধ্যেও বিষাদ! বিষাদের মধ্যেও আনন্দ! জীবনের পাতায় পাতায় কাঁপন তুলে প্রকৃতির আলো বিশ্বভুবনে কি এঁকে দেয় এমন রহস্যের লাবণ্য! আচমকা লাবণ্যের স্তর খসে যেতে লাগল। অধরার কণ্ঠ থেকে বের হলো নতুন শব্দমালা! এই শব্দ তো পরিচিত নয়! অপরিচিত স্বরে কথা বলছে কেন অধরা? অধরাকে বুকে চেপে ধরতে দুবাহু বাড়াল রবি।
অধরার দেহ নেই, রক্তমাংসের অধরা কি আঁধারকণায় বিলীন হয়ে গেছে, শূন্যে-মহাশূন্যের অস্তিত্বহীন অস্তিত্বের পরমাণুর ভরে মিলিয়ে হিগস্ বোসন বা ‘ঈশ্বরকণা’য় রূপ নিয়েছে? রবি একবার চিৎকার করে ডাকল, অধরা! অধরা!
শব্দ বেরোল না তার মুখ থেকে। শব্দহীন শব্দের তরঙ্গে ভেসে যেতে লাগল তার চিৎকার, কণ্ঠস্বর… আঁধারের বিশাল পাকে তবে কি হারিয়ে গেছে তারা? ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ টানে কি ডুবে গেছে সীমাহীন অতল আঁধারে? হকিংস রেডিয়েশন কণার মতো কি বেরিয়ে আসতে পারবে কৃষ্ণগহ্বরের গিলে খাওয়া টান উপেক্ষা করে? ঈশ্বরকণার বিশাল ভুবনেই কি স্থির হয়ে অনন্তকাল পরিভ্রমণ করতে থাকবে তাদের লঙ্কাউই দ্বীপের সাতদিনের মধুচন্দ্রিমার সময়কাল? হানিমুনের জন্য এত বড়, এর চেয়ে বিশাল, সুন্দরভুবন কি আছে সৌরমণ্ডলে? অথই জলের গভীরে কিংবা নীল সমুদ্রের সীমাহীন তলে?
আচমকা রবি অনুভব করল কণাতরঙ্গের ওপর ভাসতে থাকা নিজের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার ত্রিমাত্রিক দেহকাঠামো। খুব কাছেই দেখল অধরার দেহকাব্যেরও ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্ব। হাত বাড়াল রবি। ছুঁতে পারল না অধরাকে। ঝলমল আলোকতরঙ্গে বিলীন হয়ে ছন্দের তালে সে দুলছে, এগিয়ে যাচ্ছে নৃত্যের তালে তালে। রবিও এগোচ্ছে… আকুল হয়ে অধরাকে ধরতে চাচ্ছে। পারছে না ধরতে। এগোচ্ছে… সামনে এগোচ্ছে উভয়ে অথচ বরাবরই ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক সমদূরত্ব থাকছে দুজনার মাঝখানে। কণাতরঙ্গমালার এ অসীম স্রোতে ভেসে ভেসে নবরূপের ত্রিমাত্রিক যুগল কি এ মহাদূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে কোনো কালে?

 
মোহিত কামাল : কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক, শব্দঘর ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close