Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ মো. মেহেদী হাসান > হুমায়ূন আহমেদের গল্পবয়ন কৌশল : প্রসঙ্গ হাস্যরস >> প্রবন্ধ

মো. মেহেদী হাসান > হুমায়ূন আহমেদের গল্পবয়ন কৌশল : প্রসঙ্গ হাস্যরস >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ July 20, 2018

মো. মেহেদী হাসান > হুমায়ূন আহমেদের গল্পবয়ন কৌশল : প্রসঙ্গ হাস্যরস >> প্রবন্ধ
0
0

মো. মেহেদী হাসান > হুমায়ূন আহমেদের গল্পবয়ন কৌশল : প্রসঙ্গ হাস্যরস >> প্রবন্ধ

[এক]
হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক। মৃত্যুর ছ’বছর পরও বইমেলাগুলোতে তাঁর পূর্ব-প্রকাশিত বইগুলো বেস্টসেলারের মর্যাদা পাচ্ছে। বই পড়ুয়াদের কাছে জনপ্রিয়তার কমতি চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো এতো প্রবল যে, সৃজনশীল বইয়ের দোকানগুলোতে তাঁর গ্রন্থের কাটতি সর্বাধিক। জনপ্রিয় সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের প্রথাগত ধারণা এখন পরিবর্তিত হতে চলেছে। জনপ্রিয় সাহিত্য শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কিনা, এই বিতর্ক না গিয়েও বলা যায়, জনপ্রিয় সাহিত্য গণসাহিত্য। জনমনস্তত্ত্বের গভীরে এর অধিষ্ঠান। খুব সোজাসাপটা ভাষায় বলতে গেলে, জনপ্রিয় সংস্কৃতি হলো, গণমানুষের বা সমাজের অধঃস্তনদের সংস্কৃতি। পুঁজিবাদী শিল্পসমাজের সৃষ্টি এটি। উচ্চ-সংস্কৃতির (high culture) বিপরীতে এর অবস্থান। এবারক্রম্বি চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। হলিউডের সিনেমা, বেশির ভাগ টেলিভিশন অনুষ্ঠান, জনপ্রিয় গান কিংবা রোমান্টিক কোনো উপন্যাস যদি জনপ্রিয়-সংস্কৃতি হয় তাহলে উচ্চ-সংস্কৃতি হলো ফরাসি চলচ্চিত্র, থিয়েটার, ধ্রুপদী সংগীত কিংবা কবিতা। জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে এখন তাই আদর্শিক লড়াইয়ের অবস্থান থেকে দেখতে হয় যেখানে উচ্চ-সংস্কৃতি একধরনের আধিপত্য তৈরি করে রেখেছে।
হুমায়ূন আহমেদের রচনাকে আমরা জনপ্রিয় সংস্কৃতির সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে দেখি। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তার রহস্য কি তা আমরা ভাবি না। প্রথাগত সেই আধিপত্যের সংস্কৃতিগত ধারণা থেকে আমরা তাঁর রচনাকে দূরে সরিয়ে রাখি। কিন্তু তাঁর আপাত সরল-তরল বর্ণনাভঙ্গির ভেতরে হাসির যে ঝর্ণাধারা, তার গভীরে আমরা আসলে আমাদের সমাজটাকে পেয়ে যাই।
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে এ বিষয়ক বিতর্ক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। উচ্চ এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির পার্থক্য করতে গিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল যেভাবে দেখেছে তাতে গভীর ও হালকা, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, অবাণিজ্যিক ও বাণিজ্যিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নকল — এই ধরনের বিশেষণগুলো প্রযুক্ত হয়েছে। জনপ্রিয়-সংস্কৃতি শিল্পকলার পৃথক বিষয় (discipline) হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে আদরণীয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের থিওডর আডোর্নোর মতে, সংস্কৃতি-শিল্প (cultural industry) পুঁজিবাদী আধিপত্য (hegimony) নিশ্চিত করে বৈশিষ্ট্যহীন ও অপ্রয়োজনীয় জনপ্রিয়-সংস্কৃতির মাধ্যমে। হাল আমলে জনপ্রিয়-সংস্কৃতিকে এরকম একতরফাভাবে দেখা হয় না। জনপ্রিয়-সংস্কৃতি পরস্পর বিপরীতমুখী ভূমিকা পালন করে। এর কোনো কোনো উপাদান আধিপত্যবাদী, আবার কোনো কোনোটি প্রতিরোধমূলক। আমরা যদি মার্কিন জনপ্রিয়-সংস্কৃতির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মার্কিন সমাজের বহুমাত্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদের ভাষা। আমরা মনে রেখেছি, হুমায়ূন আহমেদ এই বিতর্কিত সময়ের সন্তান এবং তিনিও জনপ্রিয়। তাই আমাদের দেখতে হবে, হুমায়ূন আহমেদ কতটা প্রতিরোধের আর কতটা আধিপত্যের।

[দুই]
হুমায়ূন আহমেদের গল্পনির্মাণ কৌশলের একটি উপাদান হাস্যরস (humur), বাগবৈদগ্ধ্যের (wit) প্রয়োগ। সাধারণ হাস্যরসের সঙ্গে যখন উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার সংযোগ ঘটে, তখন তা বাগবৈদগ্ধ্যে পরিণত হয়। আমরা মনে করি, হুমায়ুন আহমেদের জনপ্রিয়তার একটা কারণ তাঁর গদ্যে ছড়িয়ে থাকা হাস্যরস ও বাগবৈদগ্ধ্যের প্রয়োগ। ছোটো-ছোটো বাক্যে কথ্যভঙ্গির গদ্যে তিনি সংলাপ ও বর্ণনার সংক্ষিপ্ত রূপে ছড়িয়ে দেন হাসির ফোয়ারা। বাখতিন হাস্যরসকে খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি মনে করতেন, মধ্যযুগের ইউরোপে র্যা বেলের রচনাখ্যাতির মূল কারণ আমোদ, প্রমোদ ও মজা। হাস্যরস সাধারণ বিনোদন নয়। এর আড়ালে রয়েছে মহৎ সাহিত্যে উপস্থাপিত চিরন্তন সমস্যার গুরুতর ইঙ্গিত। হাস্যরসের উপস্থাপনে বাখতিন র্যা বেলের অতিকথনের (exaggeration) বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। বাখতিন মনে করতেন, অতিকথন ব্যঙ্গকৌতুকে (caricature) পরিণত হয়। হুমায়ূন আহমেদ প্রত্যক্ষ বাস্তবতকে উপস্থাপন করতে গিয়ে অতিকথনের আশ্রয় নিযেছেন অনেক সময়। এটা তাঁর উপন্যাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর মধ্য দিয়ে আমরা সামাজিক বাস্তবতার অন্যরূপটাও খুঁজে পেতে পারি। দলছুট বা খাপছাড়া যে চরিত্রগুলো প্রায় উপন্যাসে একটি বা দুটি দেখা যায়, এগুলোর পরিকল্পনায় এই বৈশিষ্ট্যটিই বেশি ফুটে উঠতে দেখি।
বাখতিনের ব্যাখ্যায় পাগলামীকে হাসির মধ্য দিয়ে দার্শনিক তাৎপর্যকে আভাসিত করে দেওয়া সম্ভব। হুমায়ূন আহমেদের ‘ফেরা’য় দেখা যায়, আমিন ডাক্তার ‘হতদরিদ্র’। এর কারণ তার পেশা নয়, বরং পেশাগত অদক্ষতা। চিকিৎসাবিদ্যা সে আয়ত্ত করতে পারেনি, রোগ নির্ণয়ে সে ব্যর্থ। পাশের গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ডাক্তার পদে পদে আমিন ডাক্তারের ভুল ধরে। এ কারণে আমিন ডাক্তার যে খুব উদ্বিগ্ন এমন নয় :

আমিন ডাক্তার বলল, নৌকার জোগাড় দেখেন হাসপাতালে নেওন লাগবো। দিরং করন যাইতো না। ডাক্তারদের জন্য পান তামাক দেয়া হয়েছে বাহির বাটিতে। সিরাজুল ইসলাম কিছুই স্পর্শ করবেন না। তিনি এক ফাঁকে আমিন ডাক্তারকে বললেন হাসপাতালে নেওয়ার চিন্তা বাদ দেন। এই রুগি ঘণ্টা পাঁচেকের বেশি বাঁচবে না। টাকা পয়সা যা দেয় সরে পড়েন। রুগী মরলে এক পয়সাও পাবেন না। আপনাকে কেউ দিয়েও আসবে না। ছোটলোকের দেশে কেউ ডাক্তারি করে?
আমিন ডাক্তার থেমে বলল, ‘ওর হইছে কি?’
কিছু বুঝতে পারছেন না?
না
হুঁ। ওর কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। শরীরে পানি এসেছে, হাসপাতালেও কিছু করতে পারবে না।

এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মুমূর্ষু কিশোর রোগীকে ফেলে ভিজিট নিয়ে সিরাজুল ইসলাম ডাক্তার যখন পালিয়ে যায়, একই পরামর্শ সে আমিন ডাক্তারকেও দেয় তখন, “বাড়ির সামনে একটি কাঁঠাল গাছের নিচে দুপুর পর্যন্ত বসে রইল আমিন ডাক্তার।’’ এটা সাধারণ চোখে নিছক পাগলামি। রোগীর মৃত্যু হলে ডাক্তারকে আস্ত রাখবে না এটা সবাই বোঝে, কেবল আমিন ডাক্তার বোঝে না। অন্য একটি বর্ণনায় পাচ্ছি :

আষাঢ় মাসের গোড়াতেই আমিন ডাক্তার মহা মুসিবতে পড়ল।
না খেয়ে থাকার জোগাড়। একদিন চৌধুরী সাহেব এসে দেখেন আমিন ডাক্তার দুপুরবেলা শুকনো চিড়া চিবাচ্ছে। তিনি বড়ই অবাক হলেন। ভাটির দেশে ভাতের অভাব নাই আর এখন সময়টাই হচ্ছে ফেলে ছড়িয়ে খাবার। চৌধুরী সাহেব গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রোজগারপাতি কেমুন ডাক্তার?
ইয়ে আছে কোন মতো।
হুঁ।
কলেরা শুরু হইলে বাড়ব ওখন কম।

এখানে আমিন ডাক্তারের জবাবে মনে হতে পারে বন্যায় যে কলেরা হয় তিনি তার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু আগের দৃষ্টান্তে আমরা রোগনির্ণয়ে ব্যর্থ কিন্তু মানবিক বোধে উজ্জ্বল ডাক্তারকে পাচ্ছি। এই হাসি আসলে ভাটি অঞ্চলের জীবনকেই আমাদের সামনে মূর্ত করে।
“খাদক” গল্পের মতি মিয়ার পেশা খাওয়া। খেয়ে মানুষকে খুশি করে মতি যা আয় করে তা খোন্দকার সাহেবের ভাষায় ‘…খারাপ না। হায়ার করতে হলে তার রেট কুড়ি টাকা।” লেখক অবাক হয়ে যখন বলেন, “এটাই কি প্রফেশন নাকি”, তখন মতি মিয়া খুব স্বাভাবিকভাবে বলে, “আল্লাহতালা একটা বিদ্যা দিছে। খাওনের বিদ্যা, অন্য কোন বিদ্যা দেয় নাই।” গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি খোন্দকার সাহেবের ভাষায় : “ও ইচ্ছা করলে হাতী খেয়ে ফেলতে পারে। বিরাট খাদক। অতি ওস্তাদ লোক।” এই অতিরঞ্জন আসলে আমাদের আরেক সুগভীর নিষ্ঠুর বাস্তবতায় নিয়ে যায়। আমরা দেখি, গ্রামের এই ক্ষমতাবান ব্যক্তি, স্থ্ানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, প্রতিমন্ত্রী এমনকি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টও যে তাকে খাদক হিসেবে লিজেন্ড বানিয়ে তুলবে তার সব আয়োজন চলে।
এই বিচিত্র পেশায় আসার কারণ হিসেবে মতি মিয়া নিজে নিম্নবর্গের স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দৈব নির্ভরতাকে দেখালেও লেখক তুলে ধরেন ভিন্নতর বাস্তবতাকে। লেখক নিজেও কাহিনির বর্ণনাকারী হিসেবে একটা চরিত্র এখানে। যুক্তিশীল শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন প্রযুক্ত হয়েছে গল্পে। শ্লেষ-বিদ্রুপে ছিন্নভিন্ন করে দেন গ্রামীণ ক্ষমতা-কাঠামোয় উচ্চবর্গীয় সমাজের নিষ্ঠুরতাকে। ‘দেশের অবস্থা খুব খারাপ’ হলেও মতি মিয়াকে খাওয়ানোর জন্যে তিন হাজার টাকায় গরু কেনেন খোন্দকার সাহেব। মতি মিয়ার সর্বভুকত্ব দেখলে মনে হয় দেশটা মনে হয় খাদ্যে ভরে গেছে। সে জন্যে উৎসব করে আস্ত গরু খাওয়াতে হবে একজনকে। কিন্তু এই ‘বড় খাদকে’র ছেলে-মেয়ের যে বিবরণ দেন লেখক, তাতে হতাশ না হয়ে উপায় থাকে না : “ধ্যানস্থ মূর্তির মতি মিয়ার ছেলেমেয়েগুলিকেও দেখলাম। পেট বের হওয়া হাড় জিরজিরে কয়েকটি শিশু। চোখ বড় বড় করে বাবার খাবার দেখছে। শিশুগুলি ক্ষুধার্ত। হয়তো রাতেও কোন কিছু খায় নি।” ‘কুৎসিৎ’ এই অনুষ্ঠানের বর্ণনা দেন মাত্র দুটো বাক্যে : “একদল ক্ষুধার্ত মানুষ একজনকে ঘিরে বসে আছে। সে খেয়েই যাচ্ছে।” নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে আকালের দিনে তিনি কেন মতি মিয়াকে খাওয়ান তার জবাব পেতে বেশি দেরি হয় না। খাওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি স্কুলের হেডমাস্টার, গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার, ওসি সাহেব, পোস্টমাস্টার সাহেব প্রমুখকে দাওয়াত দেন। অর্থাৎ গ্রামীণ ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে জড়িত কাউকেই তিনি বাদ দেন না। এই আয়োজনের ‘উপলক্ষ’ সম্পর্কে লেখকের স্বভাবসুলভ মন্তব্য : “খোন্দকার সাহেব ইলেকশনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন।” মতি মিয়ার খাওয়াটা হয়ে যায় খোন্দকার সাহেবের নির্বাচনে প্রচারণার উপলক্ষ।

[তিন]
‘আকাশ জোড়া মেঘ’ উপন্যাসের একটা অংশ আমরা উদ্ধার করেছি এখানে। খুব ধনী পরিবারের একটি কক্ষের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতে গেছে ফিরোজ। বাংলাদেশের ধনী একটি সমাজের জীবনটাকে দেখছে ফিরোজ। তার ভাবনায়; ম্যানেজার নামক জীবটির এখনো কোনো দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটি খবর দিয়েছে কিনা কে জানে। নিজের ঘরে গিয়ে হয়তো গান শুনছে কিংবা ভিসিআরে ‘আকালের সন্ধানে’ চালু করে সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টের চিন্তায় মগ্ন।
ফিরোজ কাপ হাতে নিয়ে জানালার পশে এসে দাঁড়াল। ছাগলদাড়ির এক লোক দুটি আলসেসিয়ানকে গোসল দিচ্ছে। সাবান দিয়ে হেভি ডলাডলি। কুকুর দুটি বেশ আরাম পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। নড়াচড়া করছে না। লোকটি কুকুর দুটির সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় কথা বলছে। কাম কাম, সিট ডাউন, নটি বয়, বি কোয়ায়েট জাতীয় শব্দ শোনা যাচ্ছে। কুকুররা বিদেশী ভাষা এতো ভালো বোঝে কেন কে জানে। দেশী ঘিয়ে ভাজা কুত্তাকেও কাম হিয়ার বললে কুঁই কুঁই করে এগিয়ে আসে। ফিরোজের বাথরুম পেয়ে গেল। কোনো বাড়িতে গিয়ে ফট করে বলা যায় না ভাই আপনাদের বাথরুম কোথায়? মালদার পার্টিদের ড্রইং রুমের পাশেই ব্যবস্থা থাকে। এখানে নেই। ড্রইং রুম নাম দিয়ে কুৎসিৎ একটা জিনিস বানিয়ে রেখেছে। ছাদ পর্যন্ত উঁচু শো-কেসে রাজ্যের জিনিস। যেন একটা মিউজিয়াম। পয়সার সঙ্গে রুচি বলে একটা বস্তু নাকি চলে আসে। ডাহা মিথ্যা কথা। এ জিনিসটি সঙ্গে নিয়ে জন্মাতে হয়।
এখানে শুরুতে কী ঘটছে তার কথা বলছেন না লেখক। ফিরোজের ভাবনায় কী ঘটতে পারে তা-ই বলছেন লেখক। একটা চটুল ভঙ্গি আছে। এতে ধনী মেয়েটি সম্পর্কে ফিরোজের ধারণা প্রকাশিত। ম্যানেজার শব্দটির পরিচিতিতে জীব শব্দের ব্যবহার লক্ষ করার মতো। সবটাই ঘটছে ফিরোজের মতো অর্ধ-বেকার শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে। সে ধনীদের যেভাবে দেখে সেভাবেই বলছে। বলা বাহুল্য, এই ধারণা উপন্যাস শেষ হতে হতে ঠিক থাকবে না। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। আমরা যা ভাবি সেটা আদর্শ রূপ হতে পারে, কিন্তু বাস্তব-রূপ নয়।
‘সবাই গেছে বনে’ উপন্যাসের একটা চরিত্র রুনকি। আমেরিকায় থাকে। আশির দশকের গোড়ার দিকের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস। সফিকের সঙ্গে কথোপকথনের সরল বিবরণ কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু পাঠক হেসে উঠবেন আর যে মেসেজটা দিতে চান লেখক পাঠকের কাছে তা পৌঁছে যায় ঠিকই :

সফিক এলেই অনেক খবর পাওয়া যায়। সমস্তই বাংলাদেশের খবর।
বুঝলে রুনকি, জিয়াউর রহমান সাহেবের নাম হয়েছে এখন ‘জিয়াউর রহমান খাল কাটি’। শুধুই খাল কাটছেন।
জিয়াউর রহমান কে?
মাই গড! আমাদের প্রেসিডেন্ট। ফেরেশতা আদমি।
তাই নাকি।
বেচারার একটা হাফশার্ট দুটো ট্রাউজার আর কিছুই নাই।
কী যে বলো তুমি সফিক ভাই!
এই তো বিশ্বাস হলো না। মিথ্যা বলবো কেন খামোখা! এক টাকা বেতন নেয় না গভমেন্টের কাছ থেকে।
বেতন না নিলে চলে চলে কী করে?
চলে আর কোথায়? কিছুই চলে না। দেশ লোকটার জান। নিজের দিকে তাকাবার লোকটার সময় আছে?

এ সংলাপ পারস্পরিক। একটা বাউণ্ডুলে চরিত্রকে তুলে ধরতে লেখক রাজনৈতিক বিষয় টেনে নিয়ে আসেন, যা উপন্যাসের বিষয় নয়। প্রাসঙ্গিকও নয়। কিন্তু এই বিবরণে বক্তার বক্তব্য, শ্রোতার উপলব্ধি আর পাঠকের বোঝাপড়া সব একজায়গায় এসে শেষ হয়। এই হাসির আড়লে লুকিয়ে থাকে অর্থের সামাজিক ব্যঞ্জনা। সে যা বলে পাঠক তার অর্থ করে ভিন্নরকম।
‘কৃষ্ণপক্ষ’ উপন্যাসে লীনা নামের ছোট মেয়েটি তার মামা মুহিবের সঙ্গে পিকআপে যাচ্ছে। লীনার শিশুসুলভ আচরণকে বোঝাতে লেখক বলছেন, মহসিন অনিচ্ছায় গাড়ি থামাল। মুহিব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে চা খেল। লীনাও মুহিবের সঙ্গে নেমেছে। সেও চা খাবে। তাকে পিরিচে করে চা দেয়া হয়েছে। সে চা খাচ্ছে। লম্বা ঘুম দেয়ায় তার নিজস্ব ব্যাটারি চার্জ হয়ে গেছে। সে ক্লাস টুর বাংলা বইয়ের সব ছড়া একের পর এক শুনিয়ে যাচ্ছে। ছড়া বলছে হাত-পা নেড়ে।
এই শিশুটির ভ্রমণক্লান্তি ও তার সহজ প্রকাশ একটি শব্দ ব্যাটারি চার্জ-এর মধ্যে প্রকাশিত। গাড়ির ভ্রমণ ব্যাটারি আর শিশুর সজীব হয়ে ওঠাকে ঘুমের সঙ্গে মিশিয়ে কথ্যভঙ্গির একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন লেখক।
হিমু একটি উদ্ভট চরিত্র। হুমায়ুন আহমদের ভাষায় হিমু চলে ‘এন্টি লজিকে’। ‘হলুদ হিমু কালো র্যা ব’ (২০০৮) উপন্যাসে র্যা ব হিমুর উদ্ভট আচরণে বিভ্রান্ত হয়। পুলিশ হিমুকে ‘ধমক ধামক দিয়ে ছেড়ে’ দিতে পরামর্শ দিলেও র্যা ব তাকে ছাড়ে না। বরং র্যা বের এক কর্মকর্তা তার আচরণে বিরক্ত হয়ে গায়ে হাত তুলতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। র্যা বের হাতে বন্দী অবস্থায় তার পরিচয় হয় মুরগি ছাদেকের সঙ্গে। হিমু অযৌক্তিক আচরণ করলেও র্যা বের হাতে ধৃত মুরগি ছাদেকের ক্রসফায়ারের মৃত্যুসংবাদ তাকে বিচলিত করে। সে যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করে তাতে হিমুর অস্বাভাবিকতার আবরণও খসে পড়ে যেন :

আজকের খবরের কাগজের প্রধান খবর
শীর্ষসন্ত্রাসী মুরগি ছাদেক
ক্রসফায়ারে নিহত
গোপন খবরের ভিত্তিতে কাওরানবাজার এলাকা থেকে র্যা ব সদস্যরা মুরগি ছাদেককে গত পরশু ভোর পাঁচটায় গ্রেফতার করে। তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। তার দেয়া তথ্যমতো গোপন অস্ত্রভাণ্ডারের খোঁজে র্যা ব সদস্যরা তাকে নিয়ে গাজীপুরের দিকে রওনা হয়। পথে মুরগি ছাদেকের সহযোগীরা তাকে মুক্ত করতে র্যা বের প্রতি গুলিবর্ষণ শুরু করে। র্যা ব সদস্যরা পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই সুযোগে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে পালিয়ে যাওয়ার সময় ক্রসফায়ারে মুরগি ছাদেক নিহত হয়। তার মৃতদেহের সঙ্গে পাঁচ রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল পাওয়া যায়।
মুরগি ছাদেকের বিরুদ্ধে এগারোটি হত্যা মামলাসহ একাধিক ছিনতাই, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মামলা আছে।
তার মৃত্যু সংবাদে এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়। এলাকাবাসীরা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন।

সংবাদটি পাঠের পর হিমুর মনে যেসব প্রশ্ন জেগে ওঠে তা এমন :

আমি খবরটা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। সবই ঠিক আছে, একটা শুধু সমস্যা। মুরগি ছাদেক পাঁচ রাউন্ড গুলি এবং পিস্তল নিয়ে র্যা বের সঙ্গে গাড়িতে বসেছিল? এত জিজ্ঞাসাবাদের পরেও কেউ বুঝতে পারেনি মুরগি ছাদেকের সঙ্গে গুলি ভরা পিস্তল আছে?

এখানে হিমু লজিকের পথ ধরেই প্রশ্নটা করে যার জবাব কেবল পাঠকের মনেই আসে। এই উপন্যাসের শেষ দিকে ক্রসফায়ার সম্পর্কে হিমুর খালু সাহেব একটা সিদ্ধান্তে আসেন। তাঁর মতে, “ক্রসফায়ার বাংলাদেশের জন্য মহৌষধ। যারা ক্রসফায়ারের বিপরীতে কথা বলে তাদেরকেও ক্রসফায়ারের আওতায় আনা উচিত।” কিন্তু হিমুর সঙ্গে একজন র্যা ব কর্মকর্তার যে সকল কথা-বার্তা হয় তাতে হিমুর অযৌক্তিক উচ্ছৃ্ঙ্খর আচরণেও যৌক্তিক তর্কের এক বাস্তবতা তৈরি হয় :

মধ্যমণি আবার নীরবতা ভঙ্গ করলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, তোমার মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে রিডিকিউল করার একটা প্রবণতা লক্ষ করছি। ডয়ু?
আমি বললাম, আপনারা মানুষের জীবন নিয়ে রিডিকিউল করেন, সেই জন্যেই হয়তো।
শুভ্র’র বাবা বললেন, (তিনি আপনি আপনি করা কথা বলছেন) আপনি কেন আমাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন না বলুন তো? আপনার যুক্তিটা শুনি। আপনি কি চান না ভয়ঙ্কর অপরাধীরা শেষ হয়ে যাক? ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করতেই হয়। ধ্বংস না করলে এই সেল সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আমি বললাম, স্যার, মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে। একটা ভ্রুণ মায়ের পেটে বড় হয়। তার জন্যে প্রকৃতি কী বিপুল আয়োজনই না করে! তাকে রক্ত পাঠায়, অক্সিজেন পাঠায়। অতি যত্নে তার শরীরের এক-একটা জিনিস তৈরি হয়। দুই মাস বয়সে হাড়, তিন মাসে চামড়া, পাঁচ মাস বয়সে ফুসফুস। এত যত্নে তৈরি করা একটা জিনিস বিনা বিচারে ক্রস ফায়ারে মারা যাবে — এটা কি ঠিক?
পিশাচের আবার বিচার কী?
পিশাচেরও বিচার আছে। পিশাচের কথাও আমরা শুনব। সে কেন পিশাচ হয়েছে এটাও দেখব।

এখানে যে চরিত্রগুলো আমরা পাচ্ছি এরা র্যা বের কর্মকর্তা। শুভ্রর বাবা র্যা বের সেই কর্মকর্তা যিনি হিমুকে মারতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে ‘সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে’ চিকিৎসা নেন। আর মধ্যমণি হিমুর দেওয়া নাম। হিমু এদের নাম দিয়ে দেয় নিজের সুবিধা মতো। এ নামেই সে এদের পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। হিমুর আপাত নিরীহ দার্শনিক উচ্চারণগুলোতে গণতন্ত্রের মূল ভাষার একটা দিক উন্মোচিত হয়েছে। এই উপন্যাস থেকে আমরা পুলিশ প্রসঙ্গ নিয়েছি তাতেও হাস্যরসের উপাদান কম নয়। হিমুর উদ্ভটত্ব একসময় পুলিশ র্যা বে গিয়ে শেষ হয়। আর তাতে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে উঠে আসে ভিন্ন এক বাস্তবতা। সে জন্যেই আনিসুজ্জামান বলেন, হুমায়ূনের পক্ষেই এমন সম্ভব। হুমায়ূন আহমেদ প্রত্যক্ষ বাস্তবতা উপস্থাপন করতে গিয়ে অতিকথনের আশ্রয় নেন অনেক সময়। এটা তার উপন্যাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর মধ্য দিয়ে আমরা সামাজিক বাস্তবতার অন্যরূপটাও খুঁজে পেতে পারি। দলছুট বা খাপছাড়া যে চরিত্রগুলো প্রায় উপন্যাসে একটি বা দুটি দেখা যায় এগুলোর পরিকল্পনায় এ বৈশিষ্ট্যটি বেশি ফুটে ওঠে। বাখতিনের ব্যাখ্যায় পাগলামীকে হাসির মাধ্যমে একটি দার্শনিক তাৎপর্যে নেওয়া সম্ভব। তাই বলা যায়, হুমায়ূন আহমদের উপন্যাস সমাজ বাস্তবতারই একটা রূপ।
‘রজনী’ (১৯৮৯) উপন্যাসটা শুরু হয়েছে বীরু নামের নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের এক ছেলের জবানিতে :

বাবা ‘খক’ ‘খক’ করছেন।
এই ‘খক’ ‘খক’ অন্য দিনের মত নয়। আজকেরটা ভয়াবহ! যেন তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন ফুসফুসের খানিকটা অংশ কাশির সঙ্গে বের করে ফেলতে — পারছেন না। আমি মনে মনে বললাম, ‘আরে যন্ত্রণা’! বলেই খানিকটা অনুশোচনা হল। যাকে বলে জন্মদাতা পিতা। বেচারা কাশতে কাশতে ফুসফুস বের করে ফেলছেন। এই সময় সহানুভূতিতে পুত্রের আর্দ্র হওয়া উচিত। হাওয়া-টাওয়া করা উচিত কিংবা ছুটে যাওয়া উচিত একজন ডাক্তারের কাছে। তা করতে পারছি না কারণ এখন বাজছে ছটা তিরিশ। আমি ঘুমুতে গেছি রাত তিনটায়। আমার পক্ষে মমতা দেখানো সম্ভব না।

এই যে বীরু সে একইসঙ্গে মাকে নিয়েও একই সাথে মজা করছে এভাবে :

ত্রিশ চল্লিশ বছর ধরে মা চা বানচ্ছেন। এখনো তিনি জিনিসটা শিখতে পারলেন না। শুধু চা কেন — এই জীবনে তিনি কিছুই শিখতে পারেন নি। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন সূচিকর্মে তাঁর প্রবল উৎসাহ দেখা গেল। অনেক রাত্রী জাগরণের পর কি একটা জিনিস যেন তৈরি হল। সেইটি গোপনে বাঁধিয়ে বসার ঘরে ঝুলানো হলো। উদ্দেশ্য বাবাকে অবাক করে দেয়া। বাবা সেই শিল্পকর্ম দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, এটা কি? মা ক্ষীণ গলায় বললেন, — তাজমহল। বাবা আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, — আমার বাড়িতে তাজমহল কেন? আমি কি শাহজাহান? এক্ষুনী নামাও।

তাজমহল অবশ্য নামানো হল না। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই দুই কবির মাঝখানে তাজমহল হাইফেনের মত বসে রইলো। এখনো আছে তবে রবীন্দ্রনাথের ছবিটা নেই। একাত্তুরের সময় বাবা রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন দেন। নজরুলের ছবিটা এখনো আছে। ছবিটার দিকে তাকালে মনে হয় কবি নজরুল মুগ্ধ চোখে মার তৈরি তাজমহল দেখছেন। মার শিল্পকর্ম একজন বড় কবিকে মুগ্ধ করেছে এটাই বা কম কি?
ফান (fun) বা মজার করার জন্যে ব্যক্তি নিজেই সাবজেক্ট হয়ে উঠলে এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু এখানে ছা-পোষা পরিবারের নিজেদের উন্মাচনের গল্পটা হঠাৎ হাসির জোয়ারে ভেসে যায় না। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের এক গভীর সত্যের মুখোমুখি করে দেয় এ হাস্যরস। তার অধিষ্ঠান আমাদের অস্তিত্বের অতলে। এখানে এসে হাস্যরস বুদ্ধিদীপ্ত বাগবৈদগ্ধ্যে রূপ নেয়। এখানেই হুমায়ূন আহমেদের সার্থকতা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close