Home অন্যান্য স্মৃতিচারণা মৌলি আজাদ / হুমায়ুন আজাদ আমার বাবা তাঁর শেষ লেখা বা শেষ চিঠি

মৌলি আজাদ / হুমায়ুন আজাদ আমার বাবা তাঁর শেষ লেখা বা শেষ চিঠি

প্রকাশঃ February 26, 2017

মৌলি আজাদ / হুমায়ুন আজাদ আমার বাবা তাঁর শেষ লেখা বা শেষ চিঠি
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি। ২০০৪ সালের এই দিনে বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় আবাসনে ফেরার পথে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক হুমায়ুন আজাদ অজ্ঞাত কিছু হামলাকারীর দ্বারা আক্রান্ত হন। সেই আক্রান্ত হওয়া এবং পরবর্তী ঘটনা নিয়ে এই নিবন্ধটি লিখেছেন তার কন্যা মৌলি আজাদ। সঙ্গে সংযুক্ত করা হল মৌলিকে পোস্টকার্ডে লেখা চিঠির ছবি।]

মৌলি আজাদ / হুমায়ুন আজাদ আমার বাবা তাঁর শেষ লেখা বা শেষ চিঠি

২০১৭ সাল চলছে। ২০০৪ সালের ১২ই আগস্ট বাবাকে হারিয়েছি। মাঝে দ্রতগামী যানের মতন সময় চলে গেছে। যখন একা থাকি, পিছনে ফিরে তাকাই। তাঁর সাথে জড়ানো সময়ের কথা যখন চিন্তা করি অতীত বর্তমান সবকিছু যেন গুলিয়ে ফেলি। মনকে কোনভাবেই বোঝাতে পারিনা যে ‘সে’ আজ অতীত। স্মৃতিমাত্র।

ঘাতকদের হাতে তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণে তাঁর সাথে জীবনের ২৭টি বছর কাটাতে পেরেছি  মাত্র। আমি জানি  পাঠকের তাঁর জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বহুবার তাঁকে নিয়ে লিখেছি। ‘তীরন্দাজের’ অনুরোধে তাঁকে নিয়ে লিখতে আবারো বসলাম।

হুমায়ুন আজাদের শেষ চিঠি > কন্যা মৌলি আজাদকে
হুমায়ুন আজাদের শেষ চিঠি > কন্যা মৌলি আজাদকে

বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন পরিপূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপন করে গেছেন। তাঁর যা ভাল লাগতো তিনি তাই করতেন। পরিপূর্ণভাবে ‘জীবনযাপন’ করা যাকে বলে (বাঙালির জীবনেতো বেশিরভাগ সময়ই চলে যায় অন্যের ইচ্ছে-অনিচ্ছের উপর)। প্রচুর ধূমপান করতেন তিনি। মানা করেছি দু-একবার। শোনেননি। এমনকি থাইল্যান্ডে চিকিৎসা করে দেশে ফিরে আসার পরও তিনি নিয়মিত ধূমপান করতেন। বেশ বাধা দিয়েছিলাম তখন। লাভ হয়নি। তিনি বলতেন, এটা আমার নতুন জীবন। বাধা দিসনা। উপভোগ করে নেই।

তিনি নিজে যেমন নিজের স্বাধীনতা ভোগ করতেন আমাদেরকেও তা দিতেন। বড় হয়ে নয়, ছোটবেলা থেকেই তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলাম সব কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা। মাঝেমাঝে মনে হয় স্বাধীনতার মাঝে বড় হলে জীবনে ঝড়তুফান এলেও ভেঙে না পরে নিজ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার প্রচেষ্টা চালানো যায় বোধহয়।

স্বাধীনতার পাশাপাশি বাবা আমাদের দুইবোনকে সবসময় সাবলম্বী হতে তাগিদ দিতেন। যেখানে অন্য বাবারা মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করেন, সেখানে বাবাকে এ বিষয়ে কখনও চিন্তা করতে দেখিনি। তাঁর কথা ছিল তোমরা আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করো। এতেই মুক্তি পাবে। স্বামী আর বাবার রেখে যাওয়া সম্পদে হয়তো সাময়িক আনন্দ পাওয়া যাবে, কিন্তু নিজের মনোবলটা শক্ত হবেনা। তাই তাঁর কাছে পেতাম নিজের পায়ের মাটি শক্ত করার তাগিদ।

[২]

হুমায়ুন আজাদ প্রসঙ্গ এলেই যে-কথাটি বলা হয় তা হলÑ ‘প্রথাবিরোধী হুমায়ুন আজাদ’। সত্যিকার অর্থেই তিনি কোন একটা বিশ্বাসে আবদ্ধ হতে চাননি। তবে কোন বিষয়ে তিনি যদি দ্বিমত পোষণ করতেন তাহলে সেটা অবশ্যই যুক্তি দিয়ে করতেন। কোন একটা ‘মিথে’ তিনি গ-ীবদ্ধ থাকতে চাননি কখনও। বাবা যদি কোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী না হতেন তবে সেটা ভাঙতে চাইতেন প্রচ-ভাবে। এজন্য আমি বাবার সাথে অনেককে তুমুল তর্ক করতে দেখেছি। আমার মা-বাবার বিয়েটাও হয়েছিল অনেকটা প্রথার বাইরে। টেলিফোনে তাদের বিয়ে হয়েছিল। যেটা সেসময় অতটা প্রচলিত ছিলনা। বাবা লেখার স্বার্থে তার পিতৃপ্রদত্ত নাম হুমায়ুন কবীর বদলে হমায়ুন আজাদ হয়েছিলেন। প্রথাবিরোধী হলেও  তিনি প্রথার মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবন কাটিয়ে গেছেন। অবশ্য এই সমাজে ছকের মধ্যে জীবনযাপন না করে থাকা সম্ভব কি?

হুমায়ুন আজাদ নামটি উচ্চারিত হলেই অনেককে বলতে শুনি ‘হুমায়ুন আজাদ নাস্তিক’। মেয়ে হিসেবে একথা শুনতে আমার বেশ খারাপ লাগে বৈকি। আস্তিক/নাস্তিক হওয়ার বিষয়টা প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত বিষয় বলেই আমি মানি। তিনি নিজে ধর্মকর্ম করতেন না ঠিক, কিন্তু অন্যকে ধর্মকর্ম করতে পারবেন না বলেও হুমকি-ধামকি দিয়েছেন বলে শুনিনি। আমি সবসময় নামাজ পড়ি। এক্ষেত্রে আমি তাঁর সাথে সারাজীবন থেকেও বাধার সম্মুখীন হইনি।

বাবাকে আমার অন্য সবার চেয়ে ব্যতিক্রম লাগত তাঁর সাহসের জন্য। সুবিধাবাদী সমাজে সবাই যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করে অন্যায় দেখেও মুখ খুলবনা বলে পণ করি, সেখানে তাঁর  যেন কাউকে তোয়াক্কা  না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতেই হবে। অনেক সময় তাঁকে বলেছি তুমি এমন কেন? তিনি বলতেন, “তাঁর কারো কাছে কোন কিছু চাওয়ার নেই। তিনি যা করবেন তা নিজেই করবেন।” তাই রাখঢাক করে কোন কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। বাবার চারপাশে সাংবাদিকেরা থাকত সবসময়। শামসুননাহার হলের ছাত্রীদের উপর যে-বছর আক্রমণ হয় ,আক্রমণের পরে বাবার নেতৃত্বে শিক্ষকেরা কারাগারে ফুল  নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ নারীর উপর প্রকাশ্যে হাজারও মানুষের মাঝে আত্রমণ হওয়ার পরও সুশীল সমাজের কয়জনই বা জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি? মনে হয় সাহিত্যের জন্য নয় কেবল, দেশের চরম সংকটের সময় ‘উচিত কথাটি’ বলার জন্য ‘এ মানুষটার’ এসময়ে থাকার দরকার ছিল। মেয়ে হিসেবেও তাঁর ঠোঁটকাটা নানা মন্তব্যের জন্য মাঝেমাঝে অনেকের কাছে অপ্রস্তুত হতাম। কিন্তু তাঁর ঠোঁটকাটা কথা  থামাতে পারিনি।

অনেককেই বলতে শুনেছি, হুমায়ুন আজাদ বির্তকিত কথা বলে নিজেকে ফোকাস করতে চান। বাবা বেঁচে থাকতে আমার নিজেরও তা মনে হত। কিন্তু আজ মনে হয় সত্যি কি তাই? এতটা ঝুঁকি নিয়ে কথা বলতে কি আমরা সবাই পারি? তাঁর বইয়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সত্য তুলে ধরায় তিনি নিজ জীবনটাওতো দিয়ে গেছেন। তাঁর উপর আক্রমণ হবার পর বাংলার মানুষের ক্ষোভে ফেটে পরার কারণ তো একটাই ছিলÑ তাঁর সাহসী উচ্চারণ। সুবিধাবাদী পা-চাটা কারো জন্য কি এই বাংলার মানুষের বুকের মধ্যে এতখানি ভালবাসা থাকত? আহত হওয়ার পরে যে অল্প সময় তিনি বেঁচে ছিলেন তাঁর জন্য উত্তাল বাংলার  কথা আমি তাকে বলেছি। তিনি মুখে কিছু বলেননি। তাঁর আক্রান্ত চোখের এক কোণ দিয়ে জল পরতে দেখেছি কেবল। একজন ঠোঁটকাটা মানুষের শত্রু থাকবে এটাই ভেবে নিয়েছিলেন বোধহয়। কিন্তু মিত্ররা…। সবকিছু যে এখনও নষ্টদের কবলে যায়নি।

বাবা সারাদিন পড়াশোনা করতেন। লিখতেন। অধ্যাপনার বাইরে বইলেখা ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। বাবাকে আমি কখনও কোন কনসালটেন্সি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য উদগ্রীব দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সাথে ক্লাবে বসে আড্ডা দেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করা, এসব ছিল তাঁর রুটিনের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকার সময় দেখতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বিভিন্ন ‘রঙের দলে’ নিজেদের তুলির ছোঁয়া দিতে চাইতেন। কিন্তু তিনি কখনো লাল-নীল রঙে নিজেকে সাজাননি। তারপরও একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য শিক্ষদের অনুরোধে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। বাসায় আমরা সবাই তাঁকে বলতাম তুমি কারো সাথে মিশ না, কারো স্তুতি করো না তোমাকে কে ভোট দিবে? বাবা হাসতেন। এবং যথারীতি বাবা নিবার্চনে হারেন। নির্বাচনে হেরে হাসতে হাসতে বাসায় আসেন…নির্বাচন নিয়ে মজা করেন। আমার উত্তেজিত হওয়া দেখে আরো বেশি করে হাসেন এবং তারপর যথারীতি তাঁর পড়ার রুমে গিয়ে বইয়ে মগ্ন হন।

তিনি সাহিত্যের সব শাখাই বলতে গেলে লিখেছেন। কিন্তু নাটক লেখায় দেখেছি তাঁর অনীহা। আমার আবার নাটক দেখার নেশা। তাঁকে প্রায়ই বলতাম তুমি নাটক লিখো…তোমার লেখা নাটক টিভিতে দেখতে ইচ্ছা হয়। তিনি বললেনম “নাটক আমি লিখবনা। নাটক মানেই মিথ্যা কোন কিছুকে উপস্থাপন করা…তাই নাটক লেখার ইচ্ছা আমার নেই।” বাবার সমসাময়িককালের লেখকদের অনেকেই নাটক লিখে অর্থ ও প্রচারের দিক দিয়ে চারদিকে তুমুল সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে কখনো নাটক লেখার রেসে নাম লেখাতে দেখিনি।

তাঁকে আমি কখনও ‘ইংরেজি বাংলা’ মিলিয়ে  কথা বলতে দেখিনি। ইংরেজি পারতে বলতেন না। আমার সবচেয়ে মজা লাগত বাবা টেলিফোন নাম্বারগুলো পর্যন্ত বাঙলায় লিখতেন ও পড়তেন। এ নিয়ে তাঁর সাথে আমরা হাসতাম। তিনি বাংলার অধ্যাপক হলেও পিএইচডি করেছিলেন কিন্তু ইংরেজিতে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের নাম চমৎকার বাংলায় লেখা। আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে তিনি একটি বই লিখতে চেয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে একটি বই লিখব। সে-সময়ের পত্রিকাগুলো গোছাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “বইয়ের নাম কি দিবে?” তিনি বললেন, “মৃত্যু থেকে এক সেকেন্ড দূরে।” বললাম, সেকেন্ড তো ইংরেজি শব্দ। তিনি বললেন সেকেন্ড শব্দটি না দিলে বইয়ের নামটি আকর্ষণীয় হবেনা। এখানে ইংরেজিই প্রযোজ্য।

তাঁকে কখনো কোনো দল/লেখক সংঘের সাথে থাকতে দেখিনি। অবশ্য একসময় জাতীয় কবিতা পরিষদে ছিলেন। পরে তিনি বেরিয়ে আসেন। বলা যায়, এরপর তিনি বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মতোই ছিলেন। বই লেখাই যেন হয়ে উঠেছিলো তাঁর প্রধান কাজ। ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছিলো ‘নারী’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’, ‘সব কিছু ভেঙে পরে’-সহ  অন্যান্য অসামান্য সব গ্রন্থ। তবে হ্যাঁম লেখার বাইরে আধুনিক চিন্তা-ভাবনা সম্পন্ন তরুণদের সঙ্গ তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন। তাদের সাথে আড্ডা দিতেন শাহবাগে। একদিন দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গাড়ি নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে যাবার জন্য রীতিমতো ব্যস্ত। সেসময় বাবাকে দেখলাম তরুণদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মাঠে আকাশের তারা দেখছেন। মনে মনে হাসলাম।

বিদেশ ভ্রমণটাও আমাদের সবার কাছে খুব উপভোগ্য বিষয়। প্লেনে ওঠা থেকে শুরু করে গন্তব্য পর্যন্ত সকল ঘটনা চারপাশের সবাইকে জানান দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর না তোলা পর্যন্ত আমাদের মনে যেন শান্তি আসে না। কিন্তু বাবাকে দেখেছি অনেকটাই ব্যতিক্রম। তাঁর মুখ থেকে কখনো আমি বিদেশ ভ্রমণের গল্প শুনিনি (যদিও তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন)। তাঁর মুখ দিয়ে বের হতো কেবলি তাঁর নিজ গ্রাম ‘রাড়িখালের কথা’। রাড়িখালকে ভালোবাসতেন গভীরভাবে। রাড়িখাল গ্রামের পুকুর, মেঠো পথ, কড়ি ফুল, কচুরিপানা, শীতের শিশির, গ্রীষ্মের রোদ, বর্ষার প্লাবন, শরৎতের নীলাকাশ, কার্তিকের কুয়াশা, ফাগুনের সবুজ পাতার কথা তাঁর মুখ দিয়ে গলগল করে বের হতো। যে রাড়িখাল ছিলো তাঁর এত আপন, সেখানেই হয়েছে তাঁর শেষশয্যা।

তিনি আহত হওয়ার পর যে কয়টা দিন বেঁচেছিলেন, তখন আমার তাঁকে ভিতরে ভিতরে অস্থির মনে হত। তাঁর যেন মনে হত অনেক লেখা তাঁর বাকি। তিনি অসুস্থতার মধ্যেও লিখতে চাইতেন। কিন্তু পারেননি। আমাদের নিয়েও সেসময় তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখতাম। শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ বির্পযস্ত ছিলেন। বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে তাঁর সারাজীবনের জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টা বোধহয় ভিতরে ভিতরে মেনে নিতে পারেননি। শারীরিকভাবে বির্পযস্ত থাকলেও কিন্তু তাঁর মূল চিন্তার জায়গায় ফাটল ধরেনি। সে জায়গায় আগের মতই অনড় ছিলেন। তিনি আক্রান্ত হওয়ার পর টিভির ফুটেজে দেখেছি তাঁর সারা শরীরে রক্তের বন্যা। পুলিশ তাঁকে হসপিটালে নিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু তিনি পুলিশের গাড়িতে উঠবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। শারীরীক কষ্ট তাঁর মাথা ওলটপালট করে দিতে পারেনি। মনে পরে সিএমএইচ হসপিটালে তাঁর জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কথা ছিলÑ “আমি বইমেলায় যাব।” এতটা শারীরীক যন্ত্রণার মধ্যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মাথায় এ চিন্তা আদৌ আসত কি? আক্রান্ত হবার পর তিনি দুজন পুলিশ পেয়েছিলেন। অন্যরা পুলিশ পেলে হয়ত স্বস্তি পান, বাবাকে দেখিছি উল্টো। তাঁকে দেখে মনে হত পুলিশ প্রহরায় তিনি নিরাপদ বোধ করছেন না। তাঁর মধ্যে সারাক্ষণ চিন্তা ছিল আর  কোনদিন কি তিনি আগের মত মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবেন? তাঁকে আমি বলেছিলাম, “তোমাকে যারা পিছন থেকে আক্রমণ করেছিল তাদের দেখা পেলে কি করবে তুমি?” তিনি আমার প্রশ্নে হেসেছিলেন। কোনরকম প্রতিশোধস্পৃহা দেখিনি তাঁর চোখে।

জানি, জার্মানিতে বাবার হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে তাঁর ভক্ত-পাঠকের মধ্যে  রয়েছে ধোঁয়াশা। তাদের উদ্দেশ্যে বলি আমরাও তাদের মতো এ বিষয়ে অন্ধকারেই আছি। জার্মানি থেকে আমরা তাঁর মৃত্যু সর্ম্পকে যে রিপোর্ট পেয়েছিলাম, তাতে তাঁর হার্টফেইল হয়েছে বলেই উল্লেখ আছে। বেশ কিছু পত্রিকায় সেসময় বের হয়েছিল যে অতিরিক্ত মদ্যপান নাকি তাঁর মৃত্যুর কারণ। পত্রিকার পাতায় যা দেখি অনেকসময় আমরা তাইতো বিশ্বাস করে বসি। যারা এরকম লিখেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই জার্মানি থেকে প্রেরিত রিপোর্টে তাঁর শরীরে অ্যালকোহলের উপস্থিতি নেই বলেই উল্লেখ আছে।

আচমকা একজন সুস্থ মানুষ কিভাবে জার্মানি গিয়ে হার্ট ফেইলের শিকার হলেন তা আমাদেরও বোধগম্য হয়নি। আর তাই জার্মানির পেন সংস্থার কাছে বিষয়টা তদন্তের জন্যও বলেছিলাম। কিন্তু জার্মানি থেকে এর উত্তরে বলা হয়েছে, “পরিবার থেকে জার্মানি উকিল নিয়োগ করে যেন বিষয়টা তদন্ত করা হয়।” এই ছিল সভ্য দেশের উত্তর। আমাদের মতো ক্ষমতা নেই, অর্থ নেই এরকম পরিবারের পক্ষে কী সম্ভব জার্মানিতে  গিয়ে এ বিষয়ে তদন্ত করা? উকিল দিয়ে কেস চালানো!

[৩]

সাতাশ বছরে বাবার সাথে এত স্মৃতি, এত ভাললাগা মন্দলাগা আছে, এরকম একটি নিবন্ধে লিখে তা  শেষ করা যাবেনা হয়তো। ইদানিং বাবার কথা মনে হলেই তাঁর জীবনের শেষের দিনগুলোর কথাই বেশি মনে পড়ে। একদিন বাবা আমাদের সবাইকে ডেকে বললেন, “দেখ, তোমরা তো সব দেখছো, কীরকম হুমকি আসছে এখন আমার উপর। তাই আমি ঠিক করেছি কিছুদিনের জন্য জার্মানিতে যাব।” আমরা বললাম, “তা কি করে হয়। তুমিতো অসুস্থ। কী দরকার জার্মানি যাওয়ার। আর একা ওখানে থাকবেই বা কিভাবে?” তিনি বললেন, “আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। বরং অনন্যকে (আমার ছোট ভাই) নিয়ে চিন্তা কর। ওর তো সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ওতো আমার জন্য পড়াশোনা করতে পারছেনা।” ঠিক হল বাবা ৭ই আগস্ট জার্মানি যাবেন। বাবা যতবার বিদেশ গেছেন ততবারই আমরা সবাই সেজেগুজে তাঁর সাথে হাসিমুখে বিমানবন্দরে যেতাম, কিন্তু কেন যেন সেদিন আর পারলাম না। সবাই কেমন মলিন কাপড় পরে মলিন মুখে  বাবার সাথে বেশ কয়েকটি ছবি তুললাম। জীবনে কখনও বিদেশ যাবার সময় আমরা ফ্যামিলি ফটো তুলিনি। সেবারই প্রথম তুললাম। আর সেই ছবিগুলোই হল বাবার সাথে তোলা আমাদের শেষ ছবি। বিমানবন্দরে যাওয়া পর্যন্ত কেউ কোন কথা বললাম না। যখন প্লেন ছাড়ার সময় হল তখনো কথা বলতে পারলাম না। শুধু সবার চোখ দিয়ে পানি পরতে লাগল। বাবা আমাদের দিকে ভালভাবে তাকাতে পারলেন না। বললেন কেবল, “সাবধানে থাকিস।”

জার্মানি পৌঁছেই বাবা ফোন দিলেন। তাঁর সাথে কথা হল মাত্র দুই দিন। খুব কম কথা হল। তাঁর কথায় বুঝলাম আমাদের জন্য তিনি হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও চিন্তাগ্রস্ত। এরপর আমরা থেকেছি তাঁর টেলিফোন আর ইমেইলের সামনে। কিন্তু না, কত ফোন বাসায় আসল কিন্তু বাবার ফোন আর আসেনি। অনেকে বলেছে, “উনি তো মাত্র জার্মানি গেলেন। তোমরা এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? উনি ওখানে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিক।” কারো কথার উত্তর দেইনি। বাইরের বারান্দায় কাকের তারস্বরে ডাকের সাথে আমাদের মনের অস্থিরতা যেন বাড়তেই লাগল। তিনি যে আমাদের মধ্যে আর নেই এই চরম দুঃসংবাদটি আমরা পেলাম ১৩ই আগস্ট। ৭ থেকে ১৩। মাঝখানে ৫ দিন। যিনি জার্মানিতে নিরাপদে থাকবেন বলেই গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখান থেকেই চিরতরে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।

সেসময় যে কিভাবে আমাদের পারিবারের সবার দিনগুলো গেছে তা আমি লিখে বোঝাতে পারবোনা। তাঁর মৃত্যুটি কি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক তা ভাবব, নাকি বাবা ছাড়া আমাদের অনাগত দিনগুলো কিভাবে কাটবে তাই চিন্তা করব- কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যেন। সেময় মাথা যেন ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। শুধু মাঝেমাঝে বুকের ভেতর দলা পাকানো কান্না বের হয়ে আসত। তিনি তো মরে পড়ে ছিলেন জার্মানির মরচুয়ারিতে। আর আমরা একবার অসহায়ের মত পেন সংস্থার কাছে আরেক বার জার্মান দূতাবাসের কাছে  ছুটেছি। কিন্তু পাইনি কারো সাহায্য। বরং তারা পাঠাল এক বিশাল অংকের ফর্দ, যা হুমায়ুন আজাদের লাশ বাংলাদেশে পাঠাতে হলে তাদের দিতে হবে। একথা জানার পর দেশ-বিদেশ থেকে বাবার ভক্তরা জানাল, তারাই টাকার ব্যবস্থা করে বাবার লাশ দেশে আনবেন। আমাদের মা তখন শক্ত অবস্থান নিলেন। মা বললেন হুমায়ুন আজাদ বিত্তশালী ছিলেন না সত্যি, কিন্তু তাঁর লাশ দেশে আসতে ভিক্ষা করতে হবে এত খারাপ অবস্থায়ও তাঁর ছিলনা। তাঁর টাকাতেই তিনি ফিরবেন। অতঃপর তাঁর মৃতদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা হলো। কিন্তু তখন শুরু হল অন্য ষড়যন্ত্র। কারণ জীবিত হুমায়ুন আজাদের চেয়ে মৃত হুমায়ুন আজাদকে যে সবার আরো বেশি ভয়। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ভেঙে দিয়ে তিনি তাঁর নিজ দেশের মাটিতে ফিরলেন বৃষ্টিভেজা দিন ২৭শে আগস্টে। একশ্রেণীর লোকের হুমকিধামকি উপেক্ষা করে তাঁর জানাজা হল হাজার হাজার মানুষের কাতারে দফায় দফায়। বাবাকে তাঁর শেষ বিছানায় শোয়ানোর সময় চারপাশে হাজার হাজার মানুষের শব্দে, সাংবাদিকদের ক্যামেরার ঝলকানিতে সেসময় আমি যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি ঝরছিলো। মনে হচ্ছিলো আমাদের কান্না যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। মনে পড়ছিল কেবল বাবা বলেছিলেন, “তুই বড়। যখন আমি থাকবনা তখন আমার চোখ (যার এগ্রিমেন্ট ছিল) ও আমার ডেডবডি (যার এগ্রিমেন্ট ছিলনা) যেন  মেডিকেলে দিয়ে দেওয়া হয়।” কিন্তু পারিনি তাঁর কথা রাখতে। নিজেকে ব্যর্থ মেয়ে মনে হল। কারণ ডাক্তারেরা বললেন, এতদিন পর লাশের চোখ আর দেহ মেডিকেলের কোনও কাজে আসবে না। এগুলো মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরেই সংগ্রহ করতে হয়।

এখানেই তো বাবা আমার কাহিনি শেষ হতে পারত। কিন্তু হলো না। তিনি সমাধিস্থ হবার দুই মাস পর আমাদের হাতে এল তাঁর জার্মানিতে বহন করে নেয়া জিনিসপত্র, কিছু রিপোর্ট, আর তাঁর কাপড়ের ভাঁজে থাকা আমার জন্য পাঠানো তাঁর শেষ উপহার। আমার উদ্দেশ্যে লেখা একটি ভিউকার্ড। ভিউকার্ডের পেছনে  বাবা তাঁর সামান্য কয়েকটা দিন থাকা জার্মানির কথা বলছেন এভাবে, “এখানে সব চুপচাপ, লোকজন কম, বিশাল সব দালান, তবে নিউইয়র্কের উল্টো- প্রাচীন দালান।…তোমরা খুব সাবধানে থাকবে।” [ছবি দেখুন]

জীবনে প্রথম এরকম একটি উপহার পেয়ে খুশিতে ফেটে পরতে পারলাম না। কাঠের মত অনুভূতিশূন্য মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম কেবল।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close