Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ ম্যাক্সিম গোর্কি > বই >> ভূমিকা ও ভাষান্তর : মুনতাসীর

ম্যাক্সিম গোর্কি > বই >> ভূমিকা ও ভাষান্তর : মুনতাসীর

প্রকাশঃ April 23, 2018

ম্যাক্সিম গোর্কি > বই >> ভূমিকা ও ভাষান্তর : মুনতাসীর
0
0

ম্যাক্সিম গোর্কি > বই >> ভূমিকা ও ভাষান্তর : মুনতাসীর

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বইদিবস। এই দিনটিতে মানবজীবনে বইয়ের প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত হলো অনূদিত এই ছোট্ট লেখাটি। লিখেছেন প্রখ্যাত রুশ কথাসাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি।]

 

ভূমিকা

 

এক তরুণ ভবঘুরে যুবক, একদিন এক রাতে এক নদীর ধারে নিজের বুকে রিভলভার চালালো। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো সেই যুবককে। আর তার পকেট হাতড়ে পাওয়া গেল একটুকরো কাগজ, যাতে তার নাম লেখা ছিল- আলেক্সেই পেশকভ। নিচে লেখা “I lay The blame of my death on the German poet HEINE, who invented a toothache of the heart.”

আহত লোকটি কিন্তু মরলেন না। সুস্থ হয়েই গল্প লিখলেন। গল্পের নাম দিলেন ‘মাকারচুদ্রা’। আর গল্পের তলায় নিজের নাম লিখলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, যার অর্থ ‘চরম তিক্ত’। তারপর থেকে অনবরত লিখে চললেন গোর্কি।

গোর্কি সাধারণত গল্প লিখেছেন সাধারণ মানুষদের নিয়ে; আর পৃথিবীতে তার ভক্তের সংখ্যাও অগণিত। এখানে ‘বই’ শীর্ষক যে লেখাটি প্রকাশিত হলো সেটি তিনি লিখেছিলেন ১৯২৫ সালে পিয়েরে মর্টিয়ার রচিত `Hitorie Generale der Litteratures etr Angere’ গ্রন্থের ভূমিকা হিসেবে।

 

 

বই >> ম্যাক্সি গোর্কি

 

তুমি আমাকে এই বইয়ের ভূমিকা লিখে দিতে বলেছো। আমি ভূমিকা লিখিয়ে নই, কিন্তু তাই বলে এমন একটা সুযোগ ছেড়ে দিতেও আমি অনিচ্ছুক। তাই এই সুযোগে ‘বই’ সম্পর্কে আমার সাধারণ ধারণা কী, তাই বলবো।

আমার ভিতর যা কিছু ভালো, সে-সব বইয়ের দান। সেজন্য বইয়ের কাছে আমি ঋণী। আমার যৌবনে আমি অনুভব করেছি, আর্ট মানুষের থেকেও মহৎ। বই আমি ভালোবাসি। প্রত্যেকটি বই আমার কাছে এক আশ্চর্য জিনিস। আর তার লেখকরা আমার কাছে জাদুকর।

যখন ছাপাখানা থেকে কোনো লেখকের সদ্য ছাপা বই আমার হাতে আসে (লেখক যেন কোন বীর; আর এই বীরের জয়যাত্রায় সাহায্য করছে আরেক বীর- মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে), তখন আমার মনে হয় কোন কিছু জীবন্ত যা কথা বলতে পারে, আমার ভিতরে প্রবেশ করছে। এ যেন এক নতুন টেস্টামেন্ট, যা একজন লোক লিখেছে, এমন একজন সম্পর্কে, যে নাকি রহস্যময় আর ভালোবাসার যোগ্য। তাঁর (লেখকের) শ্রম আর কল্পনা সৃষ্টি করেছে এই পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, যা কিছু মহৎ।

বই সারাজীবন আমায় পথ দেখিয়েছে। তারা সব সময় এমন এক নতুন কিছু সম্পর্কে আমায় বলেছে, যা আমি আগে অন্য কোন মানুষের মধ্যে দেখিনি। পুরো বইটাতে একটা-না-একটা বাক্য খুঁজে পাওয়া যাবেই যা তোমাকে মানুষের অতি কাছে নিয়ে আসবে।

নাক্ষত্রিক জগতের সৌন্দর্য, পৃথিবীর যান্ত্রিকতা- এসবের কথা যতই বাগ্মিতার সাথে বলা হোক না কেন, তা আমার মনকে নাড়া দেবে না, বা আমার মনে কোন উৎসাহ জাগাবে না, কিন্তু অসাধারণ কল্পনাশক্তির অধিকারী ক্যামিল ফ্লামারিয়নের মৃত্যুতে আমি গভীর দুঃখ পেয়েছি।

পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর তার বর্ণনা দিয়েছে মানুষ। কিন্তু একথাও ঠিক যে সে তার লেখায় মাঝে মাঝে বেদনার সৃষ্টি করেছে এবং এ বেদনা উজ্জ্বলভাবে বর্ণিত হয়েছে বোদলেয়ার বা দস্তয়ভস্কির লেখায়। কিন্তু এখানেও আমি দেখি, জীবনের যা কিছু ঘৃণিত আর বৈচিত্রহীন তা উপশম আর সুশোভিত করার এক সুন্দর প্রচেষ্টা হলো সেই জিনিস যা মানুষ নিজের হৃদয়ের গভীর থেকে সৃষ্টি করে।

আমাদের উপস্থিতি সব সময় সবখানে বেদনাদায়ক, আর এই বেদনাকে লেখক রূপান্তরিত করেছেন ট্রাজেডিতে। এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। তাই পুশকিনের কবিতার বইয়ে আর ফ্লবেয়ারের উপন্যাসে আমি খুঁজে পাই সৌন্দর্য আর সত্য, যা পাইনা তারাদের ঝিকিমিকি, সাগরের শব্দ আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতায়।

অতি তুচ্ছ এক মানুষকে নিয়ে কবি-লেখকরা সৃষ্টি করেন এক অপূর্ব চরিত্র, যা অমর।

আমি যে পৃথিবীতে বাস করি, তা হ্যামলেট, ওথেলো আর রোমিওর পৃথিবী। ডেভিড কপারফিল্ড, মিস্টার ডোম্বে, ব্রাদার কারামাজোভ, মাদাম বোভারি, ম্যানন ল্যাসকাউট আর আনা কারেনিনার পৃথিবী। এই পৃথিবী ডোন কিহোটো আর জুয়ানের।

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেই পৃথিবীতে মানুষকে চিনতে হলে বই পড়তে হবে। ফ্লবেয়ারের ‘উন কোয়ের সিম্পলে’ আমার কাছে গসপেলের মতো পবিত্র। ‘ওডেসি’ আমাকে যেমন মুগ্ধ করে, নুট হামসুনের ‘গ্রোথ অব সয়েল’ও আমাকে তেমনি মুগ্ধ করে।

আমি নিশ্চিত যে আমার পৌত্ররা নিশ্চয়ই রোঁমা রোলার জাঁ ক্রিস্তভ পড়বে এবং বুঝবে লেখক হৃদয়ের মহত্ত্ব, মানবজাতির প্রতি অপরিসীম দরদ।

মানুষ ছাড়া আর কোনো কিছু সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার নেই, আর এ সম্পর্কে জানতে হলে দরকার বইয়ের মতো পথপ্রদর্শক। আমার মনে সেসব বিনীত বীরদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে যারা এই পৃথিবী সমস্ত কিছু- যা সুন্দর আর মহৎ- সৃষ্টি করে গেছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close