Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অণুগল্প ময়ূরপঙ্খী > অণুগল্প >> অলোকপর্ণা

ময়ূরপঙ্খী > অণুগল্প >> অলোকপর্ণা

প্রকাশঃ June 24, 2017

ময়ূরপঙ্খী > অণুগল্প >> অলোকপর্ণা
0
0

ময়ূরপঙ্খী

“ময়ূরপঙ্খী শুনেছিস?” রুক্মিণী আমায় জিজ্ঞেস করে। অনেক ঝড়ঝাপ্টা পার করে আমি আর মনে করতে পারিনা। “আরে ওই যে বাচ্চা অ্যাডাপশান আর স্ট্রীট চাইল্ডদের নিয়ে লেখা কবিতাটা, ব্রততীর ক্যাসেটে বাজতো।” ছোটবেলার মায়া লাগা রোদের ঘর থেকে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠ ভেসে আসে, আমার মনে পড়ে না। “নিজেকে ওরকম লাগছে জানিস তো ক’দিন ধরে।” হবে হয়তো। রুকি নিজেকে অনেক কিছু ভাবতে ভালোবাসে। আমি ভাবনা চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি। “কি রে, বল কিছু!” “ভালো তো!” “ভালো মানে! আমাদের ওরম একটা হবে!” আবার মাথাটা দুলে ওঠে। স্পার্ম ট্রান্সপ্লান্টের পর ড. সেনগুপ্তা আমার ঘরে এলেন, কনগ্রাচ্যুলেট করে বললেন, “সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী নভেম্বরে আপনারা সন্তানের মা হতে চলেছেন।” সারা ঘর দুলে উঠেছিল, ঘুরতে থাকা ফ্যানটা দোলনা খাটের উপর থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আমার, রুক্মিণী অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল ডক্টরকে, এ দেশে আমাদের জন্য কজনই বা এতো ঝক্কি নেয়! রুক্মিণী বলে চলে, “ওকে শহরের সেরা বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াবো, শুরু থেকেই গান, নাচ, আঁকায় ভর্তি করে দেব, যেটা ওর ইচ্ছে সেটা ও বেছে নেবে।” যদি ও প্রশ্ন করে? আমাদের প্রশ্ন করে? “এতো ভাবিস না তুই, এসময় টেনশান নেওয়া উচিৎ না। কি প্রশ্ন করবে? যে আমরা কি? আমরা কেন? তাই তো? ওকে বোঝাবো! ওকে দেখাবো কিভাবে আমরা এতো কিছুর পরেও ওর কথা ভেবেছি, ওকে এনেছি সাহস করে, ও বুঝবে না! বুঝবেনা ও?” ও বুঝবে। ও বুঝবে কেন আমাদের অতীত নেই, কেন আমরা ‘আলাদা’, কেন রাস্তায়, স্কুলে, কলেজে, সারাজীবন ওকে হেনস্থা হতে হবে, ও বুঝবে সমকাম কত বড় অসুখ, কত ছোঁয়াচে, যার ছোঁয়াচ থেকে বাঁচতে তোকে, আমাকে কোয়ারেন্টাইন করলো আমাদেরই বাবা, মা আর অন্যান্য শুভাকাঙ্খীরা। এর পরেও তোর ময়ূরপঙ্খী মনে পড়বে রুকি? “তোর হরমোনাল চেঞ্জ দেখা যাচ্ছে, বুঝলি! কালই আমি ফেরার পথে ড. সেনগুপ্তার সাথে দেখা করবো।” ওকে কোথায় আনছি রুকি আমরা! শূন্য থেকে আরেক শূন্যে এসে পড়ছে ও, যদি এই শূন্যটাই একদিন ও লাথি মেরে আমাদের দিকে পাস করে দেয়, তখন কি বলবো আমরা ওকে? তুই আমি নিজেরা একটা সময় রোজ ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রশ্ন করিনি? কেন আমি? কেন আমিই? বল! এর পর তোর ময়ূরপঙ্খী যদি ঘৃণার নৌকায় এক টাওয়েল মুড়ে আসে, এক ছেলেবেলা জুড়ে, এক পার্কের একা স্লিপে, এক ক্লাসের একা লাস্ট বেঞ্চ ভরা ঘৃণা আনে যদি, ও-ও যদি আমাদের ছোঁয়াচ থেকে বাঁচতে একা-একা আরও একা হয়ে যেতে শুরু করে? তখন পারবি তুই তোর ময়ূরপঙ্খীকে কম্পাসের ঠিক কাঁটাটা চিনিয়ে দিতে। টালমাটাল অবস্থাতেও রুকির গলা শুনতে পেলাম,- “পারবো।”

অন্ধকারের মধ্যে আমার মাথাটা সময়ের চেয়েও দ্রুতবেগে ঘুরে চলেছে, তুই শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরলি আমায়। কানের কাছে মুখ এনে বললি, “আমরা পারবো। দেখিস, ঠিক পারবো। পারতে তো হবেই, ও আমাদের ময়ূরপঙ্খী না? ওর জন্যই আমাদের পারতে হবে।” তোর গরম হাতটা আমার পরিণত ঝিনুক পেটটার ওপর রাখলি তুই, চোখ বুজলাম আমি। একটা ছোট্ট লাথি। ওই দেখ রুকি, তোর ময়ূরপঙ্খী এর মধ্যেই আমাদের দিকে শূন্যটা ঠেলে দিতে শুরু করেছে, আমি তোর দিকে তাকাই, অন্ধকারেও টের পাই তুই ভীষণ শক্ত হয়ে গিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে আমায় জড়িয়ে ধরলি, আমার পেটে হাত রেখে ময়ূরপঙ্খীর এগিয়ে দেওয়া শূন্যটা প্রাণপনে ঠেকিয়ে রাখলি। আমিও শূন্যটাকে আমাদের শূন্যতা দিয়ে গুণ করে যেতে থাকলাম।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close