Home কবিতা যুগলবন্দি কবিতাগুচ্ছ / প্রমিতা ভৌমিক বিজয় আহমেদ
0

যুগলবন্দি কবিতাগুচ্ছ / প্রমিতা ভৌমিক বিজয় আহমেদ

প্রকাশঃ December 30, 2016

যুগলবন্দি কবিতাগুচ্ছ / প্রমিতা ভৌমিক বিজয় আহমেদ
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : যুগলবন্দি সিরিজে আমরা পাশাপাশি দু’জন করে কবির কবিতা প্রকাশ করছি। এই দু’জনের একজন বাংলাদেশের, অন্যজন ভারতের। এই প্রকাশ দু’জনের কবিতার তুলনাত্মক উপস্থাপন নয়। নয়, নারীর লেখা বা পুরুষের লেখা কবিতাকে পাশাপাশি রেখে উভয়ের সংবেদনাকে ছুঁয়ে দেওয়া। নয়, স্থানিক ভিন্নতার ফলে কবিতা কীরকম দাঁড়ায় তার নিরীক্ষণ। তবু এর সবই হয়তো প্রতিফলিত হবে তাদের কবিতায়। আসলে দুই প্রান্তের দুই কবি কীরকম কবিতা লিখছেন, সার্বিকভাবে সেটা বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই এই যুগলবন্দিত্ব; যদিও এই সামান্য কটা কবিতা পড়ে সেটা বোঝা সম্ভব নয়।- সম্পাদকদ্বয়]

 

প্রমিতা ভৌমিক / একগুচ্ছ কবিতা

 

ছায়ার আড়ালে

 

অবাধ্য হিংসা ফেলে রেখে

ধার-বাকি হিসেব কষি না আর,

গোপনে দু-হাত মুঠো করে

জানলায় খুলে রাখি চোরা ইশারা-

চক্রব্যূহে বসে লিখে যাই প্রেম

সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে চেনা রিংটোন

 

অসহায় কাকভোর আলেয়া চিনেছে,

খরস্রোতার পাশে এক ফালি সাঁকো-

জল দিও পোড়া গন্ধে, সন্ধ্যা-শৈশবে

ছায়ার আড়ালে তুমি গান হয়ে বেজো।

14479693_711974888949472_4941898914654394051_n
প্রমিতা ভৌমিক

 

খোলাবাজারের পাশে

 

খোলাবাজারের পাশে

বসে আছে অসম্পূর্ণ ঘর,

তার চারদিকে ফেটে পড়ছে হাসি।

দুলে উঠছে ফিকে যৌনতা

মৃদু অন্ধকারে কাঁপে রাতের লণ্ঠন

 

তাকে সম্মোহনের ছলে

বেঁকে চলে যায় সরল আয়ুরেখা।

অবিরাম ভাসে ষড়রিপু

 

প্রতিটা সম্পর্কের শেষে

লেখা থাকে কিছুটা হাততালি আর খানিকটা বাজারের দর।

 

 

মায়াদ্বীপ

 

তাকে আমি জেনেছি শোণিতের টানে;

দু উরুর ভাঁজে সে অনায়াসে

চোখ খুলে দেখেছিল গচ্ছিত আয়ুরেখা

ঘরে-ঘরে আলো আর অদৃশ্য খেয়া পারাপার

 

সে ছিল আমার সন্তান

কোনও এক আলোকবর্ষ আগে,

ভ্রমণের ছলে আজ জরায়ুর পথে

দেখে নিচ্ছে অনর্গল সংযত ইশারা

 

এই তার মায়াদ্বীপ

এই তার স্নেহ সভ্যতা।

 

নিঝুম সকাল

 

ভোরের শ্মশানে জাগে ঋষভ-গান্ধার,

শীত নামে আঙুলের ভাঁজে,

নিরালা আঁধার রঙ সমে ফেরে

অপলক নদী জল ঠোঁটে লেগে থাকে

 

ধীর লয়ে হাঁটা পথ

শুষে নেয় পাখির পালকে লাগা নিঝুম সকাল

 

খবর রাখি না আমি তার।

 

নতুন শহরে

 

অকারণে হাসছি জেনেও

নিভে যাচ্ছে স্নানঘরের আলো,

নোনা ঘাসে টের পাই মৃত ওড়াউড়ি

 

নতুন শহরে এসে অনায়াসে

ভিড়ে যাচ্ছো ছুরির ফলায়,

মুহূর্তে আমিও দেখছি ত্রস্ত নিশানা-

মলিন জলের পাশে ক্ষীণ পারাপার

 

এরপর ভোর হলে দৈবপাখির ডানায়

চাতুর্য লিখে দেবো খরোষ্ঠী লিপিতে।

 

ঘর

 

পাগল হাসির মতো মাতালেরও সন্তান ছিল,

ছিল সেঁকা মাংস, রুটি,

গোলমরিচের নিজস্ব প্রদেশ –

হয়তো তোমারও ছিল কলাপাতার ভাত

আমি শুধু চিবিয়ে খেয়েছি কবিতা

 

এই জটিল বিস্তার, মনুষ পারাপার,

লোকারন্যে কিছুটা পরকীয়া –

জ্যান্ত খিদের কাছে ডুকরে কাঁদা হলে

কৃষ্ণপক্ষে ঘরে ফিরে আসা

 

ঘর মানে চতুর্ভুজ ভাবতে কষ্ট হয় খুব।

 

পাশাপাশি থাকে

 

এই স্রোতে ঈশ্বর ভাসে –

আমিও পুরনো শহর ফেলে সেই পথে

ভেসে যাচ্ছি নিষ্পলক নদীতে,

 

আর তোমাকে বিছিয়ে নিচ্ছি সমস্ত শরীরে

 

জলের গভীরে যত কান্না ছিল;

আজ সব তুমি মুছে দেবে

তোমার আলতো আঙুলে

 

আরও আরও গভীরে নেমে জেনে যাবে –

তানপুরা আর বেসুরো সুরার গেলাস

কীভাবে একসাথে পাশাপাশি থাকে।

…………….

প্রমিতা ভৌমিক

জন্ম ও বেড়ে-ওঠা কলকাতায়। পাঠভবনে পড়াকালে খুব অল্প বয়সেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। সাহিত্যের টানে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠগ্রহণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই পিএইচডি করেছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : প্রথম স্তবক (২০১৩), অসমাপ্ত মানচিত্র (২০১৪), সান্ধ্য বিষাদের পর (২০১৬)।

 

বিজয় আহমেদ / একগুচ্ছ কবিতা

 

ভূমিকা কবিতা

 

আমার সূর্য় আমার কাঁধ্

নতুন গ্রহ আর তার নীল ট্যাক্সিক্যাব শাপগ্রস্ত;

তুমি মনে রেখো এইসব।

শহরে, এসো উট। আমার তুমুল কোকের ক্যান,

চিপস, ট্রাভেলগ, ইশারা ও প্রণয় মৃদু উত্তেজনায় কাঁপে!

প্রভু তুমি বিখ্যাত বলেই লিখে দিতে পারে

ডালিম কীভাবে ফেটে ফুটে যায়।

…  …  …

উইকএন্ডে বেরিয়ে পড়ো। ভ্রমণে বিশ্লেষণে নেই। সংকেত, রহস্য, নৈর্ব্যক্তিকতা, সানগ্লাস, সফট-ড্রিংকস, চিপস, মেমোরিকার্ড ভর্তি জাপানি গান ও হেডফোন এর প্রাণ! মানে এই ভ্রমণ, উটযাত্রা!

ভাই ষড়যন্ত্র নয়। রক্তেও কিছু কনসার্ট, স্কার্ট-পড়ুয়া বাদামী মেয়ে, লাল রিবন আর জিপগাড়ি থাকে। ট্যাটুর হাসির সমাধান নেই; অতএব ভেবো না এসব।

উঁচু টাওয়ার। তারও উঁচুতে ডিশ অ্যান্টেনা আর প্রবাদবাক্য। এই বাক্য বুকপকেটে রেখে দিও। এই বাক্যে তোমার ধর্ম ও নির্দেশ।

ভ্রমণসঙ্গীদের মৃত্যুর পর, চুইংগাম চিবাতে চিবাতে, পুনরায় ফিরে এসো তুমি, অবিরাম হ্রেষায় জেগে-ওঠা ভোরে।

(এই তোমার ব্লু-প্লানেট। অথবা গ্যারেজ। তুমি ভ্রমণক্লান্ত, ঘুমাও।)

…  …  …

আমার মেয়েবন্ধুর গান নেই। আছে রোবট, অহং প্রেম ও মনস্কাম!

 

তবু উটপাখির মাস্টার – বিখ্যাত হয়ে ওঠো!

…  …  …

রুকস্যাকে প্রেমিকার মৃতদেহ ওঁৎ পেতে থাকে –

নেক্সট ফ্রাইডেতে আমরা কাঁদবো;

শোনো তুমি কিন্তু ডিটেকটিভ নও ভাই।

এমন কি তোমার অবিরাম জার্নি ও হারমোনিয়ামে

ভূতের হাসিই ঘুরে বেড়ায় শুধু। আর

মেয়েরা, ফেইরি-টেইল ও সাহসী পুরুষের অপেক্ষায় থাকে

…  …  …

অর্ধেক খেয়ে-রাখা আপেলের দিকে যেও;

দূরতম নক্ষত্ররাজিকও প্রম বলে ডাকা

যতে পারে!

জেব্রাক্রসিংয়ে ডানা সমর্পণ করি এসো;

এসো, অবসাদ (হীরা, অবিরাম হীরা)

…  …  …

মেয়েরা পনিটেল থেকে পায়রা উড়ায়া দিচ্ছে। উফ আমার কথা শোনো। রেডিওটা বন্ধ করো। আমাকে শোনো। আমার খুব পিপাসা। খুব ওড়ার ইচ্ছা। আমার কথা শোনো। তুলোর বল কুলোর বল খরগোশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে যাচ্ছে। আমিও গতকাল রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরে ম্যাপ দেখে দেখে ফিরে এসেছি। শোনো একটা অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছিল যাচ্ছিল ভ্যা ভ্যা করে চিল্লাতে চিল্লাতে, দেখলাম সেইটাতে কারা যেন গুলি ছুঁড়ছে ঠাস ঠাস ঠাস ঠ্রা ঠ্রা করে। কয়েকটা মোটরবাইককে মনে হলো ভিনদেশী। মন হলো হলিউডি সিনেমার শ্যুটিং। মনে হলো অনেকগুলা শাদা শাদা মেয়ে নেমে আসবে এখন। শোনো তখনো সামার আসে নাই। ফুলগুলা সবেমাত্র ফুটতে শুরু করেছে। শরীরটাও বাড়ছে তখন। সেক্স করত ইচ্ছা করতো। শনিবারে শনিবারে সেক্সের ইচ্ছাটা আরো বাড়ত। শোনো পরে হলো কী এ-বাড়ির কেউ গান শেখে নাই অথচ কীভাবে যে এতগুলা খরগোশ এল কীভাবে যে আমরা কমিকস পড়তে শিখলাম আমরা তা নিতান্তই মুর্খ গমচাষী বোকা

(অংশবিশেষ)

[উৎস : কমিকস, ক্যামেরা, ট্র্যাভেলগ ইত্যাদি]

বিজয় আহমেদ
বিজয় আহমেদ

বোকাদের কবিতা

 

আমার যে বন্ধুরা হাসছে, ঝিরিঝিরি আনন্দ ছড়িয়ে, সে বোকা

সে লিখছে হাসাহাসির গান

 

আর যে বন্ধুটা কাঁদছে, সেও বোকা, তার কথা মানেই

কাতরতার ভাষা পেয়ে উড়ে যাচ্ছে

জোড়া জোড়া শাদা-নীল ফুল

 

তবে শোনো যে কাঁদছে, যে হাসছে, আর যে গাইছে

এরা সবাই তুড়িবাদক, এরা সবাই দুই টাকার নোটে

চিত্রিত হরিণের গায়ে রক্ত দেখে ভয় পায়, আঁতকে ওঠে

আর এরা, এরা সবাই,

বোকা বলেই বোধ হয়, অকারণে ভালোবাসছে খুব, জীবন ও জীবনের শিস?

 

সাহসের কবিতা

 

সাহসের কথা বলতেই, মাঠ থেকে উড়ে এসে

একটা খয়েরি শালিক

ভেংচি কেটে গ্যালো

 

বলি, হেই ব্যাটা সাহস কাকে বলে জানিস?

সাহস হলো মায়া-খনির পাশে, নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে

তোর ঝুঁটিতে, প্রবল মায়ায় এঁকে দেয়া অন্ধ এবং বেপরোয়া চুমু

 

পারলে শেরিফকেও ডাকিস, তাকেও দেখাবো

ধূলি-গ্রন্থেও

এমন সাহসের কথা লেখা ছিলো

 

ম্যাজিক

 

জীবন কি যথার্থ লালে ও নীলে? হঠাৎ শিসে?

এই যে লাজুকলতা, খড়ের স্তূপ, জলপাই বন,

কুহুকুহু ডাক আর গাছ-গাছালির ফাঁক

গলে পড়া সোনারঙ আলোর ইলিক-ঝিলিক,

সবাই তো যাচ্ছে গূঢ়ার্থে,

বলি পাবে ধূলি ও মায়া সেখানেও?

 

ভাবি ধূলিই কি জীবন, নাকি জীবনীকার?

কালো কালো হরফে যে জীবনী লিখে যাচ্ছে

মধুপোকা ও রহস্যের!

 

নাকি জগৎজুড়ে কোনো গূঢ়ার্থ নেই! যা আছে তা

রূপ-অরূপের মায়া! আর যা যথার্থ বলে জানি,

তাই ভুল,

যেমন মধু যেমন হাসি যেমন কাতরতা

 

কবিতা-উন্মাদিনী

 

আমি সেই লাল-উন্মাদিনীকে চিনি না, যে তার

বুকের মাঝখানে ঘুমিয়ে থাকা জরুল দেখিয়ে বলেছিলো,

পূর্বে নয়, পশ্চিমেও নয়

এখানেই থাকে উড়ন্ত কবিতা!

 

সে আরো বলেছিলো, ‘জেনে রেখো

সর্বদা ডানপ্রান্তের ভাষা লাল ও একরোখা

আর বামপ্রান্তের ভাষা, নীলচে-নীল ও বিষণ্ন?’

 

‘আর এ দুই প্রান্তের মাঝখান দিয়ে

বয়ে গেছে যে কূল-কূল ধ্বনিপ্রবাহের নদী

তার নাম একান্ত, তার নাম উড়ু-উড়ু জীবনের হাসি!’

 

[উৎস : মুচকি হাসির কবিতা]

 

ধান

 

ফুল হয় ধুলো,

ধুলো হয় ফুল,

এমনি আনন্দ রে

 

যখন সকালে সূর্য় আমার বন্ধু

এসবই ঘটছে তখন

 

তখন পড়শির মেয়ে স্কুলে যায়

তার চোখে-মুখেই যেন

ধান ফুটে উঠছে

 

আর ওই ধানের ধ্বনিতে

একটা নিমগাছ

মুহূর্তেই প্রেমিক তার!

 

বন্ধু ও গাছ

 

আমরা বন্ধুরা প্রত্যেকে একেকটা

যাদু না জানা রঙধনুগাছ;

 

মুহূর্তেই মেঘ ও বৃষ্টির জন্য লিখে ফেলেছে

হাততালি ওসান। আর সে গানগুলো উড়ে যাচ্ছে,

বালকঘুড়ির মতো শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে,

পাহাড় ও ফরেস্ট বাংলোয়

 

যেখান পর্য়টকের শিস ও জোৎস্নাপাতের ধ্বনি

আলাদা করা যায় না

 

[উৎস : সার্কাস-তাঁবুর গান]

……………

বিজয় আহমেদ

বাংলাদেশের প্রথম দশকের কবি। জন্ম নান্দাইল, ময়মনসিংহে ১৯৮৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পেশায় প্রকৌশলী। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, সার্কাস-তাঁবুর গান (২০০৮), মুচকি হাসির কবিতা (২০১১), কমিকস, ক্যামেরা, ট্র্যাভেলগ ইত্যাদি (২০১৫)। সম্পাদিক গ্রন্থ : ফিল্মমেকারের ভাষা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close