Home কবিতা যুগলবন্দি >> তন্ময় মণ্ডল ও সৈকত ঘোষের কবিতাগুচ্ছ

যুগলবন্দি >> তন্ময় মণ্ডল ও সৈকত ঘোষের কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ July 29, 2018

যুগলবন্দি >> তন্ময় মণ্ডল ও সৈকত ঘোষের কবিতাগুচ্ছ
0
0

যুগলবন্দি >> তন্ময় মণ্ডল ও সৈকত ঘোষের কবিতাগুচ্ছ

 

[সম্পাদকীয় নোট : এখানে সীমান্তের ওপারের দুই তরুণ বাঙালি কবির কবিতা প্রকাশিত হলো। কবিতাগুলি বিষয়আশয়ের দিক থেকে ভিন্ন মেজাজের আর ভাষাশৈলীও অনেকটা আলাদা। বাংলাদেশের পাঠকদের কবিতাগুলি ভালো লাগবে আশা করি।]  

 

যুগলবন্দি >> তন্ময় মণ্ডল ও সৈকত ঘোষের কবিতাগুচ্ছ

 

 

[সম্পাদকীয় নোট : এখানে সীমান্তের ওপারের দুই তরুণ বাঙালি কবির কবিতা প্রকাশিত হলো। কবিতাগুলি বিষয়আশয়ের দিক থেকে ভিন্ন মেজাজের আর ভাষাশৈলীও অনেকটা আলাদা। বাংলাদেশের পাঠকদের কবিতাগুলি ভালো লাগবে আশা করি।]

 

 

তন্ময় মণ্ডল >> কবিতাগুচ্ছ

 

 

ছায়া

নদীর জলে ভেসে থাকে যে ছায়া,
আমি তাকে সমর্পিত আত্মা বলি।

কত জল
বয়ে যায়…
পাড় ভাঙে
বাঁধ ভাঙে…

বেঁচে থাকে থাকার চেষ্টা করে
কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ছায়া

কত জল শুষে নেয় কালের প্রলেপ।
রঙ লাগে, ফিকে হয়
নিয়তিই শেষ কথা বলে

সময় সবটা জানে। ভেসে থাকা ডুবে থাকা সবই

আগুনের গান আসে, ছায়া পোড়ে
পুড়ে যায় নদীটির দুপাশের তীর
তবুও ক্ষণিক সুখে
নদীকে জীবন ভেবে
আগলে রাখে
কিছু ছায়ার শরীর…

 
অপেক্ষা

কিছু শব্দের বুকে জেহাদী ক্ষতচিহ্ন আঁকা থাকে
আর থাকে আগ্নেয় অপেক্ষার শীতলপাটি।

যেখানেই যাই পিছু ছাড়ে না
থোকা থোকা ধারালো অপেক্ষারা…

থেমে থাকা সময় জানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটা কতটা জরুরি

গুরুত্ব
যেমন জলের কাছে স্রোতের
দিনের কাছে আলোর…

অপেক্ষার পাদদেশ সমুদ্রতল পেরিয়ে যায়
সেখানেও শুধু অপেক্ষাই রাখা থাকে।

 

 

বন্ধ্যাত্ব

কল্পনায় জাল বুনতে বুনতে ক্লান্ত কবি
পারিপার্শ্বিক সামলায়…

কবি লিখতে বসলো জীবনের আখ্যান…
কলমের খোঁচায় বেরিয়ে আসছে
এক একটা নিহত শব্দের লাশ।

সন্তানের কবরে মাটি দেবার মতো
একটা নিস্তব্ধতা চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে কলমের শরীর থেকে,
ভিজে যাচ্ছে কবির মন থেকে মননের
এবড়ো খেবড়ো চিত্রকল্পের রাস্তা।

প্রসব বেদনায় নীল হয়ে আসছে হাত
কলমের চোখ ক্রমশ বুজে আসছে…
নিশ্চুপ জেহাদে চুরমার
প্রতিটি রক্ত কণিকায় দেয়াল।

আর, কবির স্থির দৃষ্টিতে সাদা কাগজ হয়ে উঠছে
বেহিসেবি সময়ের দর্পণ।

 
আয়না

আঙুল পোড়ে, হৃদয় পোড়ে দূরে
দৃষ্টি তবু কাচের মত কঠিন
রঙের কাছে বিকিয়ে যাওয়া কবির
শ্বাস উড়ে যায় অবিশ্বাসের সুরে।

রাতের কানায় লোভের রঙিন আলো
স্রোতের মুখে আটকে আছে কলম
চোখের ভেতর পাঁজর ভাঙা মেঘে
হঠাৎ কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো।

বিবেক ডাকে আয়না মিথ্যে বলে
পোষ মানে না বিক্রি হওয়া কলম
জুতোর তলায় স্বত্বা পোতা কবির
হৃদয় ভাসে আগুন নদীর জলে।

 
বিষাদ

বিষাদ তো এক বৃষ্টিদিনে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি
বিষাদ তো এক শরৎ সকাল ঘাসের ওপর তিক্ত শিশির,
মিছিল জুড়ে উপচে পড়া অনর্থ ভিড়
কিংবা কোনো কোনো মদের বোতল …
নতুন কোনো মদ্যপায়ী
খুলছে ছিপি…

বিষাদ তো এক অনন্ত দিন
রাত্রি ঘেরা বিরাট চাদর
বিষাদ তো এক ক্ষুধার্ত ঘুম। ভাতের ওপর
শাক মেশানো হাতের আদর।

চোখের জলেও গন্ধ থাকে
বুকই শুধু সে গন্ধ পায়।
বুকের ভেতর শুষ্ক পাহাড়
ধুকছে যখন
ধুকছে যখন
জলের আশায়…
কিংবা কোনো ব্যর্থ প্রেমিক
নয়তো কোনো সব পাওয়া এক
ক্লান্ত পথিক
সব হারিয়ে
নির্জনতা আগলে রাখে

তাকেই যদি বিষাদ বলি
বিষাদ তবে মুক্তো-ঝিনুক-তিস্তা নদী
সমুদ্রে রোজ হারিয়ে যাওয়া মুখ চেনা ঢেউ
লোকাল ট্রেনের ব্যস্ত হকার। কর্পোরেটের প্রথম সারি।

বিষাদ তবে আগলে রাখা চোখের পলক।
খুব চেনা কেউ।

 
বস্তু ও বাস্তব
চোখ বন্ধ করেও অনেক কিছু দেখা যায়।

ক্লান্ত শহরের শরীর থেকে
দু-চার ফোঁটা অন্ধকার তুলে নাও।
একটা টেস্টটিউবে রাখো।
এরপর বেখেয়ালে মিশিয়ে দাও স্মৃতির বুদবুদ

হলফ করে বলতে পারি
প্রিয়জন বলে যে অনাকাঙ্খিত গণ্ডিকে চিনেছো এতকাল
দেখবে তার বেশিরভাগই ধূসর চরিত্র পোড়া ছাই।

তবু, মানুষকে যদি বস্তু ভাবো
তবে জীবন এক কাকতলীয় নীরবতা।

 
অপ্রাপ্তি

কোলাপসেবল গেটের মতো আমার দ্বিখণ্ডিত মনকে
দু’দিক থেকে টানছে এক অদৃশ্য শক্তি

কষ্ট কীভাবে দুঃখ হয়ে ওঠে তা আমার জানা নেই…
তবে যখন মডার্ন বাসস্টপে কোনো ওড়না পরা যুবতীর মুখের আদল
বড্ড চেনা লাগে,
কেন যেন মনে হয়,
হেরে যাওয়া আর হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে যেমন বিস্তর ফারাক,
ঠিক তেমনি ছোঁয়া আর ছুঁয়ে থাকার মধ্যেও।

বছর দিয়ে আমি কখনও স্মৃতির বয়স মাপিনি অবন্তিকা,
যতবার স্মৃতিরা পলি হয়ে মিশে যেতে চায়
চোখের অতল গহ্বরে- মহানন্দায়;
ততবার আমি
ছোঁয়াকে ছুঁয়ে থাকা ভাবি
আর আমার নির্বাসিত দৃষ্টি এক অমোঘ প্রাপ্তি নিয়ে চেয়ে থাকে
অপ্রাপ্তির দিকে…

 

 

দৃশ্যপট

একটা বিরাট স্থাপত্যের ভগ্নস্তূপে আমার বাস,
যেখানে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে আমার অতীত।
প্রশ্বাস আর নিঃশ্বাসের ব্যাবধানে
যেখানে পরাগরেনুর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে
অগনিত দৃশ্যপট…

আমি সেই বিরাট স্থাপত্যের বাসিন্দা
যার আকাশ-বাতাস
এমনকি চোখ ছুঁয়ে যাওয়া বৃষ্টিফোঁটাও
অবন্তিকাকে চেনে।

ঝরে ঝরে পড়া অতীত ক্রমশ স্তূপের আকার নিচ্ছে।
আর তার এককোণে শরীরহীন অবন্তিকার অবয়ব
আড়চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে।

 

 

তন্ময় মণ্ডল >>

 
পদার্থবিদ্যার ছাত্র হলেও, সাহিত্যের প্রতি নাড়ির টান। জীবনে একাধিকবার পেশা বদলেছেন। বর্তমানে সাংবাদিকতা করেন। লেখালিখির শুরু ছোটবেলা থেকেই। ২০১৩ সাল থেকে ‘নবাঙ্কুর’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। সম্পাদিত গ্রন্থ : এপার বাংলা ওপার বাংলা (দুই বাংলার গল্প নিয়ে গল্প সংকলন, ২০১৩), অ আ ক খ ভাষার কবিতা সংকলন (মাতৃভাষা বিষয়ক কবিতা সংকলন, ২০১৫)। প্রকাশিত গ্রন্থ : মৃত্যুকে খোলা চিঠি (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৬)।

 
সৈকত ঘোষ >> দীর্ঘকবিতা

 

 

জঙ্গল ও অমৃতের উপপাদ্য


প্রত্যেকটা দরজা কিছু না কিছু সংকেত
বহন করে

মুগ্ধতার কোনো ভূমিকা হয় না,
হয় না উপসংহার

আবিষ্কারের পূর্ব-মুহূর্তে জীবনের সমস্ত
পরিভাষা বদলে গেল

আমরা,
এক আলোকবর্ষ থেকে অন্য আলোকবর্ষে
এক মুগ্ধতা থেকে অন্য মুগ্ধতায়
প্রবেশ করলাম

গাঢ় অন্ধকারের মধ্য দিয়ে
সূক্ষ্ম রেখার মতো আলো
ফাটিয়ে দিল নির্জনতার স্ক্রিনসেভার

শরীরের বিজ্ঞাপনে বারবার পেণ্ডুলাম দোলায়
বিস্তীর্ণ জলের পিঠে জঙ্গলের স্তন…

আমার দৃষ্টি কেঁপে ওঠে উজানে
কতটা নিবিড় হলে চুমুতে লেগে থাকে রং

এ আমার প্রত্যক্ষ
আমার ঈশ্বর
এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই

সমঝোতার অঙ্কে নদী জানে
নক্ষত্রের যৌনতা…

নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণায়
মাছরাঙার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই
সে তো শূন্য থেকে তুলে নেয়
প্রাণ

পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময়চিহ্নের পাশে লেখা
মাছেদের শীৎকার

অরণ্যের গভীরতায় নদীও নিবিড় হয়
মুঠো ভরে ওঠে
রাতভোর অভিমানে…

সেই বৃদ্ধ ঘোড়া একাই এগিয়ে যায়
কুমিরের চোখে শান্ত বিষাদ

এতটা উচ্চতা কেবল বিটোভেন স্পর্শ করেছিল
হওয়ার বুকে শব্দের সিম্ফোনি

সবকিছুর অনুবাদ হয় না
যেমন হয় না স্বপ্নের
আমার হৃদপিণ্ড ধরে রেখেছিল কিছুটা
নিরুদ্দেশ প্রাপ্তির মতো
মাটিতে যুবতী ছাপ

আমি জানি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তোমাকে
আমি দেখেছি তোমার চোখে জলের আবডাল

জল ও জঙ্গলের উপপাদ্যে
কখন যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলি

শহরের সমস্ত বেড়া ডিঙিয়ে
আমাকে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছে আলো

আলোর বিকল্প যেমন একমাত্র আলো
শূন্যের বিকল্পে শূন্যের কথামালা

আমাদের যৌনতার প্রতীক হতে পারে নৌকা

এতখানি সময় একসঙ্গে কাটানোর পর
ড্রয়িংরুমে অক্ষরের জন্ম হলে,
সেখানেও জঙ্গলের গন্ধ থাকে

জলের কোনও পূরাণ নেই, গীতা নেই
জল – আদিম স্বপ্ন
জল – জলের মতো সত্য

অন্ধকারের খেলায় জোনাকিরা খুঁজে পেয়েছে পেখম

জীবনের টাইটেল ট্রাকে সমস্ত বিজ্ঞাপন
পরিবেশবিদ্যার উপকরণ হয়ে যাচ্ছে

আক্ষরিক অর্থে ঘটনাটা এরকমও হতে পারে
অন্ধকারের যোনিমুখে কলিংবেল বাজায় হনুমানচল্লিশা

সামাজিক অনুশাসন থেকে বেরিয়ে ইভ ও আদম
খেলছে জলমৈথুন

আমাদের পাঠক্রমগুলো বিস্ময়সূচক দূরত্বে বসে থাকে
সেলুলয়েডের খেলায় জীবিত জন্মান্তরবাদ

ঘুমের মধ্যে রাত হেঁটে চলে
বিষণ্ণরেখার ওপাড়ে রূপকথার গল্প

যত সময় এগোয় তত গাঢ় হয়
জঙ্গলের শরীরে ভালোবাসা-চিহ্ন …

ছায়ায় মিশে আছে ক্রিয়াপদ- ঈশ্বরের রঙিন চাকা

মেটেরিয়াল সুখ স্পর্শ করতে পারে না এসব
যে ঠোঁট চুমু খেতে জানে
সে ঠোঁটে বসন্ত স্বাভাবিক

গ্রহণের সূত্রে কোথাও চোখের বালির উল্লেখ নেই
স্বপ্নে যে আলো ফিরে আসে
পবিত্র সে প্রতিফলন

একমাত্র পূর্ণিমা জানে আলোকিত দূরবীন
১০
জঙ্গলের শরীরে লেখা থাকে সহস্র পদাবলি

অপার বিস্ময় টেনে নিয়ে যায়
গভীরে, আরও গভীরে

জলের চোখে অনন্ত আবেদন

এখান থেকে পরাবাস্তবের জন্ম হতে পারে
নদীর শরীরে সহস্র এক নদী
১১
অন্ধকারের বুকে যতি দিতেই
শুনেছি নৈঃশব্দ্যের গান
গাছেরাও নাকি কথা বলে

সূর্য ডোবার আগেই
ক্যানভাসে এক ঝাঁক বক উড়ে এল

বাকি রাত শুধুই নির্জনতায়

পূর্বজন্মের উদহারণ টেনে আমরা ঘুমাতে যাই
জোয়ার আসে লেখার মাঝখানে

পৃথিবীর সমস্ত সিগন্যাল যখন ওয়াচ টাওয়ারের পরিভাষা

 
সৈকত ঘোষ >>

জন্ম ১৭ই জানুয়ারি ১৯৯০, নৈহাটিতে। পড়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং। বিচিত্র কর্মজীবনে কখনো আই টি কোম্পানিতে চাকরি কখনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা, এমনকি দৈনিক কাজজে ফ্রীল্যান্সও করেন। বর্তমানে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। সৈকতের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “রং বেরঙের অবাস্তব-বাস্তব” প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ভালোবাসেন জীবনকে নানা আঙ্গিকে খুঁজে বেড়াতে। তার কথায় কবিতা কখনো অঙ্ক কখনো ডার্ক ফ্যান্টাসি। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতার বই : ‘@প্রেম’, ‘ঘুমন্ত পৃথিবীর রেপ্লিকা’, ‘জরাসন্ধের বিছানা’, ‘ওভারডোজ’, ‘love ক্যাপুচিনো’ (যৌথ), ‘টরিসেলির শূন্যস্থান’, ‘কলকাতার সেলফি।’

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close