Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অণুগল্প যুদ্ধের শুরু > অণুগল্প >> তমাল রায়

যুদ্ধের শুরু > অণুগল্প >> তমাল রায়

প্রকাশঃ June 24, 2017

যুদ্ধের শুরু > অণুগল্প >> তমাল রায়
0
0

যুদ্ধের শুরু

 প্রিয় আয়ান,

‘আপনার কি হৃদয় বলে কিছু নেই শ্রী স্বঘোষিত ঈশ্বর? যদি থাকে এসে কাটিয়ে যান একটি রাত আমাদের শিফায়। আমাদের এমার্জেন্সি রুমের মেঝে এখন রক্ত-হ্রদ। ভেজা ব্যান্ডেজ, ছিন্ন ভিন্ন চামড়া, আর শরীরের টুকরো টুকরো পরিত্যক্ত অংশ দিয়ে তৈরি পাহাড়। আমি নিশ্চিত আপনি যদি আসতেন, থাকতেন,পাল্টে যেত ইতিহাসের গতিমুখ। ’

মেস গিলবার্ট কে তুমি চেনো? সম্ভবত না। নরওয়েজিয়ান। পেশায় চিকিৎসক। মানবাধিকার কর্মী। গত তিরিশ বছর ধরে প্যালেস্টাইনের বাসিন্দা। আরো কিছু লোক যোগাড় করে নেমে পড়েছিলেন এক অসম যুদ্ধে। আহত, পঙ্গু মানুষগুলোর চিকিৎসাই তার ধ্যান, জ্ঞান।

এ খোলা চিঠি তার লেখা তোমাদের পৃথিবীর স্বঘোষিত ঈশ্বর বারাক ওবামার উদ্দেশ্যে। কাল রাতে তুমি যখন ঘুমিয়ে পড়লে, আমি পড়ছিলাম গিলবার্টের চিঠি আর পড়তে পড়তে কেমন যেন মনে হচ্ছিল এ তো আমাদের ১২০০ স্কোয়ার ফিট ফ্ল্যাটটার কথা বলছেন, যা অজান্তেই কখন এক নরকসম এমার্জেন্সি ওয়ার্ড। গত পরশু ও ছিল ৪০৫। আজ তা ৭০০ অতিক্রম করেছে। মৃতের সংখ্যার কথা বলছি। আর কি ট্রাজেডি জানো, এরা সকলেই মহিলা অথবা নিরীহ সাধারণ মানুষ এবং অবশ্যই শিশু। শিশুরাই সংখ্যাধিক। ঠিক চারমাস আগের ২৩শে মার্চ ও তো ছিল এমনই এক দিন। শহরে বসন্ত যেমন থাকার কথা তেমনই ছিল। কোকিল ডাকছিল কোথাও হয়ত বা। আমি ও তো গুনগুন করে গান গাইতে গাইতেই গেছিলাম সেদিন পাম স্প্রিং নার্সিং হোমে। আজ সকালে যেমন মার হাত ধরে সতেরোটা শিশু গেছিল গাজার কাছে ওই চিলড্রেন পার্কে, লাল, নীল, সবুজ বেলুন কেনার জন্য ঝুলে পড়েছিল মার হাত ধরে। গত চব্বিশ ঘন্টা তো ছিল যুদ্ধ বিরতির আগাম ঘোষণা। তবে আচমকাই শুরু হল ড্রোন আক্রমণ। যেমন আমার ক্ষেত্রেও, কি করে বুঝবোই বা! ঈশ্বর তো সেই কবে থেকেই কালা, বোবা এবং অন্ধ। অবশ্য শয়তানই বা কবে বেশী কথা বলে, তুমি বলতে নাকি। একটা সকাল আর সবকিছু পালটে যাওয়া। ওই শিশুগুলো এখন বেরিয়াল গ্রাউন্ডের পথে, মায়ের কোলে চেপে। আর ইসরায়েল সরকার বলছে তারা জানতো না, যেমন তুমিও কিছু জানতে না অথচ আমার গর্ভস্থ সন্তান এ পৃথিবীর আলো দেখতে পেলো না। না না তোমার দোষ নেই কিছু, যেমন কোনো দোষ নেই শিশুঘাতী সরকারের। ভেবেছিলাম আমিও আনবো ড্রোন আক্রমণ। পারলাম কই? কি করে পারি? অথচ দ্যাখো প্রতিদিন তোমার তৈরি হিটলারীয় চেম্বারে আমিও তো দম বন্ধ করে থেকেছি কতগুলো বছর, দাঁতে দাঁত চেপে। সেই কোন ছোট্টো বেলায় যে রাঙাঠাকুমা শিখিয়েছিল খেলনাবাটি খেলার সময়। সংসারে থাকবি হাঁসের মত ভালটা নিবি। খারাপটা ফেলে দিবি। আমিও তো চেষ্টা কম করলাম না। অথচ আজ দেখ তোমার প্রতি করুণাই জাগছে। কথামৃততে ঠাকুর বলেছিলেন না সেই গল্পটা- আকবর বাদশা প্রার্থনায় বসেছেন। পাশে এক ফকির। তিনি ভিক্ষা নিতে এসেছেন। দেখছেন প্রার্থনা শেষ হলে বাদশা ঈশ্বরকে আরো বেশী ধন, সম্পদের জন্য আর্জি জানাচ্ছেন। ফকির আস্তে আস্তে হেঁটে বেরিয়ে ঘর থেকে যেই না বেরিয়ে যাচ্ছেন বাদশা তাকে জিজ্ঞেস করল- ‘কি হে ভিক্ষা না নিয়েই চলে যাচ্ছো? ফকির হেসে উত্তর দিলো- ভাবলাম ভিখিরীর কাছে আর ভিক্ষে নিয়ে কি করবো! আমারও আজ তোমার সম্মন্ধে শুধু করুণাই জাগে।

আজ অনেকদিন পর ভোর দেখছি আবার। এখনো সকালের গা থেকে কালো অন্ধকারের চাদরটা সম্পুর্ণ সরে যায়নি। কাগজের হকাররা এখনো রাস্তায় বেরোয়নি। গলির মুখের চায়ের দোকানটা এখনো খোলেনি। আমি হাঁটছি একাই। কি ফুরফুরে লাগছে নিজেকে। দূরত্বের মত একা এই আমি না জেনেই মহানিস্ক্রমণে। এ পৃথিবী আগুনে শেষ না বরফে তা না জেনেই এ যাত্রার শুরু। এই দ্যাখো আমি রাস্তায় পড়ে থাকে একটা পড়ে থাকা প্লাস্টিকে লাথি মারতে মারতে এগিয়ে চলেছি। সেই ছোট্টো বেলার মত। বিন্দাস ফুরফুরে আমি কত দিন পর। আজ আর কোনো দ্বিধা নেই একথা বলতে যে কৃষ্ণ আমায় ডেকেছে। ওর সাথে আমার আলাপ ফেসবুকে। ও আমার থেকে ১২ বছরের ছোটো। তাতে কী? ওরা ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহলে বাস করা মানুষদের নিয়ে কাজ করে। কাজ মানে সে অ-নে-ক কাজ। আসলে ওই গরীব-গুর্বো মানুষগুলোকে ওরা আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ভেবে দেখলাম একটাই তো জীবন। অহেতুক নষ্ট তো হল অনেক। আর করে লাভ? আর আমাকেও তো আত্মমর্যাদার অক্ষরেখায় আসতেই হত। জানো এই প্রথমবার তাস আমার হাতের মুঠোয়। আমি আমার মতই তা ফেলবো। সব পুরুষই হয়ত বারাক ওবামা হয়ত এই কৃষ্ণ ও তাই। অন্যকে মেরে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আগ্রহী। তাই কৃষ্ণ নয় এ যাত্রা শুধু আমার জন্য। তুমি ভাল থেকো নিজেকে ঈশ্বর প্রতিষ্ঠার লড়াইতে। আমি বরং মানুষ হবার পথে পা ফেলি…

-তোমার হ্লাদিনী

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close