Home কবিতা রনক জামান >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতাভাবনা
0

রনক জামান >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতাভাবনা

প্রকাশঃ October 1, 2017

রনক জামান >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতাভাবনা
0
0

রনক জামান >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতাভাবনা

কবিতাগুচ্ছ

বিকেলের বিপরীতে
একটি এরোপ্লেন, খুব রোদ্দুরে—

একফালি মেঘের মতো আমাকে ছায়া দিয়ে যায়।

আর ভাবি আসন্ন বিকেলের হলদেটে

রোদের ভূমিকা।

সে যে কোনো বিকেলবেলা,

নিজেরই ছায়ার সম্মুখে আরো

অসহায় হয়ে পড়ি।

যে ছায়া ক্রমশ দীর্ঘতর হয়

আর আমি অল্প অল্প করে গুটিয়ে যেতে থাকি

আমার ভেতরে। ভাবি সে ছায়া—

অতিকায় হতে হতে মাথা তুলে দাঁড়াবে

একদিন।

আর আমাকে শু’য়ে পড়তে হবে

বরাবর ভূমির সাথে—মেঝের সাথে—
বাবা

মায়ের পেটে থাকতে

আমার খুব বাবাকে দেখতে ইচ্ছে হতো।

বাবার তখন আমাকে দেখতে ইচ্ছে হতো কিনা

বলতে পারি না।

বাবা দেখতে কেমন, কিভাবে হাসেন, কথা বলেন…

একেকবার মনে হতো তিনি ফেরেশতার মতো।

অথচ যতবার মাকে কাঁদতে শুনেছি

বাবাকে জগতের নিষ্ঠুরতম লোক বলে মনে হতো।

ঘৃণা হতো। তার মুখ না দেখার ইচ্ছেরা

চেপে বসত তখন। মা কাঁদতে কাঁদতে নানাবাড়ি

চলে যেত। কিন্তু পৃথিবী ছাড়া

আমার আর কোথাও যাবার ছিল না।

 

সামাজিক জীব

আমরা সবাই সবাইকে চিনি—

প্রতিবেশী, আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু, কত কী।

অচেনা কারো মুখোমুখি পড়ে গেলে

আমরা তাকেও চিনে ফেলি,

একে অন্যের সাথে মৃদু হেসে পরিচিত হই।

সকলেই ভাই-ভাই।

শুধু আলাদা আলাদা নাম, রুচি,

এমনকি খাবারের মেন্যু।

এভাবেই আমরা

সবাই সবাইকে চিনতে চিনতে

চিনতে চিনতে

যার যার খাবারের তালিকা করি :

সকালের নাশতায় কাকে খাওয়া যায়,

অথবা দুপুরবেলা ঠিক খেতে হবে কাকে!

 

পাঠ  ‍‍‍‍‍‍‍‍
যে কোনো কাগজই একেকটি মৃত গাছ।   ‍‍‍‍‍‍‍‍

 

সোফার টেবিলে রাখা আধখোলা ডায়রি তোমার।

সামান্য বাতাসে যার পাতাগুলো—

পাখির ডানার মতো জীবন্ত ঝাপটে ওঠে।  ‍‍‍‍‍‍‍‍

সে ডানায় তোমার দিনলিপি গোটা অক্ষরে।

 

ওপাশেই—বিস্তৃত

দীর্ঘ তুমি—একই ভঙ্গিতে, আধখোলা এবং

জীবন্ত, শরীরে কাগুজে ঘ্রাণ, অক্ষরের পর

অক্ষর, অচেনা ভাষা।

 

পাথর

 

এক টুকরো পাথর—

ভেতরে ঈশ্বরের ভাস্কর্য নিয়ে

পড়ে আছে পথের উপর।

ইনসোমনিয়া ‍‍‍‍‍‍‍‍

 

আমার এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে ঘুমানোর পূর্বে রোজ ভেড়া গণনা করি।

আর প্রতিরাতে একটি ভেড়া শুধু কম পড়ে যায়।

আমি সেই নিখোঁজ ভেড়ার খোঁজে শরীরে সকাল বাঁধিয়ে

রোজ খালি হাতে ঘরে ফিরে আসি।

আয়নার সামনে দাঁড়াই। নিজের বিম্ব দেখে চিনতে কষ্ট হয়

তারও দুই চোখের চারপাশে ডার্ক সার্কেল

আমার দেয়ালের দেয়ালঘড়ির মতো কালোরঙা গোল কিছুটা

যার প্রতিটি সেকেন্ড ধরে প্রতিনিয়তই আমি ভবিষ্যতের দিকে চলি

আর আমার প্রতিবিম্ব তার নিখোঁজ ভেড়ার খোঁজে অতীতের দিকে হাঁটা দেয়।

কেননা আয়নার ওপাশের দেয়ালঘড়িটি

উল্টো ঘোরে
সংসার—একটি বংশগত রোগ
এর চেয়ে মৃত্যু ভালো—অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলতেন বাবা—অর্ধেক কবি, অর্ধেক গৃহস্থ তিনি, পুরোদমে সংসার করেছেন, কবিতা লিখেননি একটিও। বলতেন, মৃত্যু কোনো রোগ নয়, মৃত্যুর পাশাপাশি আরো কিছু করা দরকার, হয় সংসার নয়তো কবিতা। বাবার পোষা এক খরগোশ ছিল, তার ইতিহাস লজ্জাজনক। কচ্ছপের সাথে দৌড়ে হেরে যাবার রেকর্ড আছে। মা খোঁচা মেরে বলত, মানিয়েছে বাবার সাথে। বাবা উদাস ভঙ্গিতে খরগোশের নরম পশমে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলতেন, একবার জেতানো দরকার খরগোশটাকে। মা কিছু বলত না আর। সে ছিল কল্পনাপ্রেমী, নিজের মৃত্যুর দিনকে বিভিন্ন উপায়ে ভেবে কান্না করত। নিজের মৃত্যুতে এভাবে কাউকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখিনি।
কঙ্কালতন্ত্র
চর্ম ও স্নায়ুহীন, মজ্জা ও মগজ ছাড়া এক খুলিসমেত
প্রকৃত অর্থে সুখী

রাখঢাক নেই। হাসি উজ্জ্বল, সবকটা দাঁত বের করে

ভাবছে : আবার যদি আসে নূহের প্লাবন

দুইশ ছয়টি হাড়ে নিশ্চয়ই হয়ে যাবে একটা জাহাজ।

 

মাঝরাতে

দেখবেন—মাঝরাতে মদটাও ফুরিয়ে গেছে আয়ুর মতো

প্রতিবেশী বলতে চারটে দেয়াল, বাইরে অগণন

ভিনগ্রহচারী

এসময় নিজস্ব আয়নাও মিথ্যে বলে, এসময়

শূন্য বোতলটাকে টেলিস্কোপের মতো মনে হতে পারে;

যদি তাতে উকিঁ দিয়ে আকাশে তাকান

আর শতকোটি আলোকবর্ষ দূর হতে যদি চুইয়ে চুইয়ে

নামে শেষফোঁটা মদ…
পানশালার কবিতা‍‍‍‍‍‍‍‍

ধর্মালয় থেকে ফিরে

কে কোথায় গেল,

সে খবর কেউ রাখে না। ‍‍‍‍‍‍‍‍

‍‍‍‍‍‍‍‍ ‍‍‍‍‍‍‍‍

কেবল—প্রিয় বন্ধু প্রেমে ব্যর্থ হলে

তাকে নিয়ে যেতে হয়

শহরের সবচেয়ে দামী কোনো পানশালাতে।

‍‍‍‍‍‍‍‍

ভুলে যেতে হয় চেনামুখ,

ব্যথাবাষ্প।

সমগ্র স্মৃতি—একে একে মুছে যায় ব্যাকস্পেসে।

শুধু মদিরার ঢেউ,

তাতে টলোমলো প্রাণ

কিনারে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া।

‍‍‍‍‍‍‍‍

তখন পৃথিবীজুড়ে—

শুধু সেই ঢেউয়ের উৎসব

…আর কোলাহল;

শোকসন্তপ্ত কোনো মৌনতা নেই।

‍‍‍‍‍‍‍‍

…স্রেফ কোলাহল!

যেন পৃথিবীটা মাছের বাজার।

বন্ধু আমার—বাজারের এককোণে

মৃত কোনো মাছের মতো চোখ মেলে পৃথিবী দেখে।

‍‍‍‍‍‍‍‍

সে পৃথিবী—

নীরব,

উৎসববিহীন।
কবিতা ভাবনা

কবিতা বলতে যা ধারণ করি বা বিশ্বাস করি, সেই অর্থে আমার ধারণা, পৃথিবীর সেরা কবিতাগুলো চিরকাল অলিখিতই থেকে যায়, যাবে। প্রথমত ভাষার নিজের সীমাবদ্ধতা, দ্বিতীয়ত আমার নিজের ভাষা-সীমাবদ্ধতা। ফলে ভাবনা ও অনুভূতি যতদূর গড়াতে পারে, কলম ততদূর যেতে পারে না। আর মাঝখানের যে ব্যবধান, তা এক প্রকার যন্ত্রণা দিতে থাকে সুযোগ পেলেই। ফলে এই ব্যবধান কমানোরই সাধনা চলতে থাকে প্রতিনিয়ত। এই সাধনায় স্বভাবতই উঠে আসে আমার নিজেকে কেন্দ্র করে দেখা পৃথিবীর অভিজ্ঞতা, ভাবনা, বিশ্বাস এবং যে জীবন বেঁচে যাচ্ছি, সেই জীবনের বোধ। নিজের জীবনবোধকে যত্ন করি, আর এর ডালপালায় জন্মায় শিল্পসৃষ্টির মতো একেকটি তীব্র দুঃসাহস।

কবি পরিচয়

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১। মানিকগঞ্জ। পড়াশোনা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা (২০১৬)। অনুবাদ গ্রন্থ : ললিতা । ভ্লাদিমির নবোকভ (২০১৬); ইসমাইল কাদারের কবিতা (২০১৭)।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close