Home কবিতা রবিশঙ্কর মৈত্রী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

রবিশঙ্কর মৈত্রী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ February 23, 2017

রবিশঙ্কর মৈত্রী / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ
0
1

রক্তপিঞ্জিরার গান

 

বাঁহাতের কনিষ্ঠ রক্তাক্ত হলে

ক্ষিপ্র ডান হাত তুলে নেয় অর্ঘ্য দূর্বাদল।

যতো রক্তপাতই হোক, ভয় নেই মা

রক্তভেজা মাটি এখন সবুজ বারো মাস।

 

রক্তই এখন সকাল সন্ধ্যার আকাশ-

প্রিয় পতাকার ইতিহাস।

রক্তই এখন শেকড়ের প্রেরণা

রক্তই এখন প্রিয় আগুন ফাগুন

রক্তই এখন বর্ণমালা, কৃষ্ণচূড়া

আবীররঙে শাশ্বত ভালোবাসা।

 

শামুকের কঙ্কালে বারবার পা কেটে যায়

বর্ষার ঘোলা জলে রক্ত ভাসাই

খালপাড় বারবার নিকটবর্তী হয়

নতুন চর ও চরাচরে গর্জে ওঠে কবিতা।

 

মাটিতে জন্ম আমার, এ মাটির রক্ত আমার

অন্তহীন প্রাণে মিশে আছে।

আঁতুড়রক্তমাখা একটাই পরিধান বস্ত্র আমার

এক বস্ত্রেই স্নান আহার বিহার, সিথান শয্যা সবই-

আমার এই মাটির দেহে শহিদের অস্থিমজ্জা, মানচিত্র

আমার এই রক্তপিঞ্জরে সার্বভৌম আত্মার বিনিদ্র আশ্রম।

 

পাহারাদার

 

জন্মেই দেখি মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে

যেখানেই যাই, মৃত্যু আমার আগে সেখানে।

 

এখন আমিও মৃত্যুকে পাহারা দিই,

চোখে চোখে দেখে রাখি তাকে।

জানি, গোপনে সে হাত বাড়ালে

বিদায়বিহীন চলে যাব চির আড়ালে।

 

 

যুদ্ধ

 

জন্মেই আমি নেমে গেছি

যুদ্ধের ময়দানে

মৃত্যুঞ্জয়ী না হয়ে আমার আর

ঘরে ফেরা নেই।

 

কখনো অজ্ঞাতবাসে,

কখনো শত্রুর সাথে

কখনো-বা ছদ্মবেশীর পাশে

সতত পাহারাদারের মতো

তরবারি হাতে ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকা

আমি আর পারি না, মা।

 

আমার তো রাজ্যপাট নেই

সিংহাসন-বাসনা নেই;

কার জন্যে এই সশস্ত্র জীবন আমার?

রোদ্দুরে ঘেমে বৃষ্টিতে ভিজে

পাঁজরভাঙা শীতে মাংসপিণ্ড হয়ে

কার আজ্ঞাবহ জীবন নিয়ে

কুরুক্ষেত্রের মাঠে মাঠে

তূণে বান বয়ে বেড়াব, মা?

 

 

অনির্বাণ

 

তর্জনী মরে গেছে গতকাল,

আজ সকালে কনিষ্ঠ।

ডান চোখ লাফাচ্ছে খুব

মা যেন কী বলেছিল

মনে পড়ছে না ঠিক-

হয়তো বড়ো কোনো বিপদের আশঙ্কা

ঝুলে আছে কড়িকাঠে।

 

আমাকে মৃতের বিছানায়

শুইয়ে দিয়েছি গত বছরের আগে।

মরা আঙুল মৃত চোখ

বিদীর্ণ বক্ষ নিয়ে বসে আছি

বোধিবৃক্ষের নিচে।

 

আমার দিবা রাত্রি হচ্ছে

আহ্নিক-নিয়মে;

নির্বাণব্যর্থ অনির্বাণ আমি

তোমাদের প্রাণাধিক প্রিয় হব বলে-

আমি অপার হয়ে বেঁচে আছি।

 

 

যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়

 

হে আথেন্সের অধিবাসীবৃন্দ-

আমি আজও বলি

আমার কোনো জ্ঞান নেই

কিছুই জানি না আমি- এইমাত্র জানি।

তোমরা যে কিছুই জানো না,

তোমরা তাও জানো না।

আমার জানা ছিল না

তোমরাও ভাবতে পারোনি

আবার একদিন আমার জন্য বসবে

বিচারসভা।

 

শুনতে পাচ্ছ হে পরম বাদী অ্যানিটাস-

দুই হাজার চারশো পনের বছর পর

তোমাদের অভিযোগ আজ মিথ্যা প্রমাণিত হল;

মিলেটাস, লাইকন, তোমরা ক্রোধ কোরো না,

হেরে গেলেও ক্রুদ্ধ হতে নেই।

যদি আত্মাকে শুদ্ধ করতে চাও,

দৃঢ়কণ্ঠে বলো-

আমি অক্রোধী আমি অমানী

আমি নিরলস কাম-লোভজিৎ-বশী

আমি ইষ্টপ্রাণ সেবাপটু।’

সকল প্রাণীর ইষ্টই আমার আমার ধর্ম।

 

হে আথেন্সবাসীবৃন্দ-

ডেলফি থেকে আমার বন্ধু চেরোফেন

দেবতার যে দৈববাণী নিয়ে এসেছিল

আমি তা আজও বিশ্বাস করি না,

আমার অধিক জ্ঞানী ব্যক্তি নিশ্চয়ই

এই পৃথিবীতে বর্তমান;

কিন্তু আমি তাঁকে চিনি না এবং

তোমরাও তাঁকে দেখোনি, আজও।

মাননীয় বিচারকগণ, আপনাদেরকে ধন্যবাদ

আজ আবার প্রমাণিত হল

আমি কারো অনিষ্ট করিনি-

আমি প্রচলিত দেতাদের উপেক্ষা করিনি

আমি নতুন নতুন দেবতার প্রবর্তন করিনি

যুবকদের আত্মাকে আমি কলুষিত করিনি।

আমি কেবল প্রকাশ্য পথসাক্ষাতে

বাজারে ও মহাজনের টেবিলে

আথেনীয়গণকে যুক্তি দিয়ে সৎ ও

সত্যের পক্ষে খুব সাধারণ কথা বলেছি।

 

শুনতে পাচ্ছ অ্যারিস্টোফিনিস-

নাঃ, আমি বাতাসের উপর দিয়ে হাঁটিনি কখনো

নাঃ, আমি মেঘ ও পবন দেবতার পূজারী নই

নাঃ, আমি ভাবনার দোকানদারি করিনি

নাঃ, আমি সুবক্তা ছিলাম না কখনো।

মিথ্যা আবেগভরা মনভোলানো কথা আর

জ্ঞানীর ভান ছাড়া সুবক্তা হওয়া যায়?

আমাকে নিয়ে তুমি ভয়ানক মিথ্যা নাটক

বানিয়েছিলে অ্যারিস্টোফিনিস;

সত্যরে লও সহজে বন্ধু

মিথ্যাকে করো ঘৃণা।

 

হে আমার শিষ্যবৃন্দ-

আমার মৃত্যু তোমাদেরকে ব্যথিত করেছিল

আমার মৃত্যু তোমাদেরকে মুষড়ে দিয়েছিল

জল্লাদের বিষপাত্র তোমাদেরকে আতঙ্কিত করেছিল।

 

ক্রিটো, মনে আছে তোমার

কারাগার ভেঙে আমাকে নিয়ে তোমরা

পালাতে চেয়েছিলে; আমি রাজি হইনি।

আমি জানতাম পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই

যে দেশে মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়।

 

ক্রিটো, শেষ মুহূর্তটি মনে পড়ছে আজ-

রক্তমুখ সূর্য বিদায় নেবার সময়

সেদিন আমার মৃত্যুক্ষণ ক্রমে ক্রমে নিকটে আসছিল;

আমার শিশুপুত্রকে বিদায় দিয়ে

আমি তোমাদের দিকে হাসিমুখে ছেয়েছিলাম-

তোমরা সকলে উচ্চস্বরে সেদিন কাঁদছিলে,

কান্না তোমাদের মানায় না বন্ধুগণ,

পরের দুর্দশা দেখে ভেঙে পড়া এলিয়ে পড়া

কারো মৃত্যু দেখে লুটিয়ে পড়ে কান্না করা

– ওসব দুর্বলতা।

 

মনে পড়ে, সেদিন নির্মম স্বাস্থ্যবান জল্লাদ

পূর্ণপাত্র বিষ এনে বলেছিল-

একফোঁটা হেমলকও যেন নষ্ট না হয়।

নাঃ, আমি সম্পূর্ণ বিষ পান করেছি,

একটুও নষ্ট করিনি।

ক্রিটো, তুমি তো জানো

সেদিনের সেই বিচার সভার

শত শত মুখভরা বিষের চেয়ে

জল্লাদের হেমলক ছিল অমৃতসমান।

 

বিষপান করে জল্লাদের নিষ্ঠুর অনুরোধে

আমি তোমাদের সামনে পায়চারী করছিলাম

আর আমার সারা দেহে বিষ ছড়িয়ে পড়ছিল;

আমি অসাড় হতে হতে বুঝতে পারছিলাম

আমার দেহে তখনো বেদনার অনুভূতি আছে

যতোক্ষণ বেদনা আছে, ততোক্ষণ সৃষ্টির আনন্দ বর্তমান

-আনন্দই মৃত্যুহীন আত্মার প্রাণ।

হে আথেনীয়গণ-

আত্মার মৃত্যু নেই,

সত্য ও সূর্য অস্তহীন, চিরন্তন;

আজ আমি আমার আত্মার পক্ষ থেকে

তোমাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

 

প্লেটো, জেনোফেন-

বিশ্বসভার সুবিচারে আমি আজ আনন্দিত,

আমি আজ পাহাড়বিদীর্ণ ঝর্নার গান;

ওই দেখো, গ্যালিলিওর পরম সূর্যালোকে

জ্বলজ্বল করছে তোমাদের অনুলিখন;

বিচারসভার জবানবন্দি আজ আবার

উচ্চারিত হচ্ছে পথে পথে, সমস্বরে।

 

হে বিশ্বনাগরিকবৃন্দ-

আমি আজও বলি

আমার কোনো জ্ঞান নেই

কিছুই জানি না আমি- এইমাত্র জানি।

তোমরা যে কিছুই জানো না

তোমরা তাও জানো না।

আমি জানি-

সক্রেটিস হলেই বিষপান করতে হয়

যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়।

 

আজও একই মাটিতে বিষ ও অমিয় ফুল ফোটে,

অগণিত সক্রেটিস বিষপানের জন্য প্রস্তুত হয় এখনও।

আজও অগণিত যিশু ক্রুশবিদ্ধ হবার জন্য

সারিবদ্ধ দাঁড়ায় অকুতোভয়;

মানুষ কাঁটার মুকুট পরে

কেঁদে কেঁদে শুদ্ধ সুন্দর হতে চায়।

 

জিব্রাইলের ডানা

 

একবার পাখির দিকে,

আরবার নিজের দিকে তাকাও-

কী দেখছ অমন করে?

তুমি একবারই উড়বে একা,

হয়তো বা ডানা হবার আগেই।

 

 

তুমি

 

মাটির প্রতিমার সঙ্গে পদ্মার জলে ভেসে যায়

একশো আটটা নীলপদ্ম সকল।

একবার ভেসে গেলে

পূজার ফুল ঘাস

সকলই পচনশীল।

সাঁতারের শক্তি হারালে

খাল বিল নদী সমুদ্রের জল

অভিন্ন সমান।

 

খাঁচা ভেঙে অভিমান সরে গেলেই

সকলই পরিত্যক্ত

মরা ডাল লতা পাতা,

জংধরা লাঙলের ফলা।

 

খিলখোলা দরজা জানলায়

অর্থহীন বাতাসের

দোল খেলে যাওয়া-

এই তো জীবন

এই তো মাধুকরীহীন

তোমাকে পাওয়া।

 

বাড়িফেরার গল্প

 

শরীরেও থাকে, মনেও থাকে

কিছু ছেঁড়াফাটা জোড়ামারা দুঃখকষ্ট থাকেই।

রুগ্ন অসাড় হাতটুকু ঢাকা থাকে লম্বা হাতার নিচে।

দুপায়ে কতো ক্ষত কুৎসিত দাগ আর

বিবর্ণ মরামরা রোম থাকে- জিন্সের নিচে-

ওসব বাড়ির লোকের কাছে

চোখসওয়া নিত্য জীবন।

বাইরে কেবল বদগন্ধঢাকা প্যারিসের সুগন্ধি

বানানো গল্প ছড়ায়।

 

পোশাকআশাক ভুল গল্পে কতো কিছু বকে যায়

আমরা পানাহার শেষে

পরস্পরের মদিরতায়

চাঁদ তারা এবং সুসজ্জিত অন্ধকারে নিবিড় হয়ে

বাড়িফেরার সময় হারাই।

 

ঈশ্বর ও শয়তান

 

ঈশ্বরকে ডাকলাম, একটি কুকুর সাড়া দিল। কুকুরটিকে আমি ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলাম। সে ঘেউ ঘেউ করে চোখের আড়ালে চলে গেল।

 

আবারও আমি ঈশ্বরকে ডাকলাম, এবার একটি বিড়াল এসে আমার গা ঘঁষতে লাগল। আমি বিরক্ত হয়ে লাথি মেরে তাকে সরিয়ে দিলাম।

 

এবার আমি শয়তানকে ডাকলাম। না, কেউ এল না। কিছুক্ষণ পর আবারও ডাকলাম- এবারও কেউ এল না- না কুকুর, না বিড়াল।

 

শয়তানকে ডাকতে ডাকতে আমি রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে কুকুরটা দৌড়ে পালাল। আরো একটু হেঁটে গিয়ে দেখি সেই বিড়াল, সে আমাকে দেখেই একলাফে গাছে উঠে গেল।

 

প্রেম যমুনায় ময়লা জলের গান

 

বৃষ্টি আসে মুষলধারে রিকশাঘরে

দুজন মিলে একলা হয়ে যাই।

 

বাতাস হানায় মেঘগুলো সব ছন্নছাড়া

তুমিও তখন আয়ান ঘরে যাও।

 

যেদিকে চাই, শুধুই মানুষ, যেদিকে যাই

চেনা চোখের ইতরকাতর কাম।

 

কোথাও কাদা কদম ছায়া যায় না পাওয়া

কোথাও গোঠের রাখাল বালক নাই।

 

গাঙ যমুনায় সাঁতার খেলায় মন ডোবে না

শুনছ তুমি ময়লা জলের গান।

 

প্রাসঙ্গিক তথ্য

যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়

প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭

প্রকাশক : পাললিক সৌরভ

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close