Home চিত্রকলা রাজিয়া সুলতানা / ডেরেক ওয়ালকটের কবিতার শব্দচ্ছবি চিত্রশিল্পে

রাজিয়া সুলতানা / ডেরেক ওয়ালকটের কবিতার শব্দচ্ছবি চিত্রশিল্পে

প্রকাশঃ March 25, 2017

রাজিয়া সুলতানা / ডেরেক ওয়ালকটের কবিতার শব্দচ্ছবি চিত্রশিল্পে
0
1

যেভাবে শুরু হয় ছবি আঁকা

সেন্ট লুসিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি দ্বীপ। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সদ্য প্রয়াত নোবেলবিজয়ী খ্যাতিমান কবি ডেরেক ওয়ালকট। কবিতা রচনা ছাড়াও নাট্যকার, নাট্য-পরিচালক এবং সাহিত্য সমালোচক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছবিও আঁকতেন। চিত্রশিল্পী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিশ্বের বেশকিছু চিত্রশালায় তাঁর ছবি সংরক্ষিত আছে। তাঁর ছবি আঁকার শুরু সেই ছেলেবেলা থেকে। কবিতা লেখার শুরুও তখনই।

IMG_51802_1

লক্ষ করলে দেখা যাবে, কবিতা লেখার পাশাপাশি সারাজীবন তিনি ছবি এঁকেছেন। তাঁর বেশকিছু চিত্রকর্ম রয়েছে যেগুলো তাঁর কবিতারই সমান্তরাল ভাবনা থেকে আঁকা। কবিতায় তিনি যেমন ক্যারিবিয়ার সমুদ্র, জনমানুষ আর প্রকৃতির বহুবর্ণিল ছবি এঁকেছেন, তেমনি তাঁর ছবিগুলিও সেইসব ভূদৃশ্য আর সমুদ্রেরই ছবি। সেই উজ্জ্বল সূর্যকরোজ্জ্বল পরিবেশ। সেই উজ্জ্বল বর্ণবিভা। ওয়ালকটই বলেছেন, কবি হবার ইচ্ছে যেমন তাঁর ছিল তেমনি চিত্রশিল্পীও হতে চেয়েছিলেন। বাস্তবে হয়েছেনও তাই। নিজের ছবি আঁকার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, তাঁর বাবাও ছবি আঁকতেন, কবিতা লিখতেন। যদিও তাঁর জন্মের কিছুদিন পরেই বাবার মৃত্যু হয়।

20100124-painting-by-walcott

তুলি হাতে ক্লান্তিহীন

ওয়ালকটের যদিও ইচ্ছা ছিল কবিতা লেখার পাশাপাশি চিত্রশিল্পী হবার, কিন্তু কবিতা ও নাটকের প্রতি ঝোঁক বেশি থাকায় ছবি আঁকার সময় পেতেন না। ফলে, ক্রমেই ছবি আঁকার অভ্যেসটা ক্ষীণ হয়ে যেতে থাকে। একসময় চিত্রাঙ্কন হয়ে দাঁড়ায় তাঁর অবসর বিনোদনের একটা খেলার মতো। লেখালেখিতে গভীর মনোনিবেশের জন্য ১৯৫০ সালে তিনি যখন বাড়ি ছেড়ে ত্রিনিদাদে চলে যান তখন তাঁর জলরঙে আঁকা ছবিগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বরং সেগুলোকে অ্যামেচার কোনো শিল্পীর কাজ বলে গণ্য করা হতো। এইসময়ে লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফাঁকে ফাঁকে শুধু  আনন্দ খুঁজতেই ছবি আঁকতেন তিনি। পরে একসময় আবার ছবি আঁকায় মনোযোগ দেন। আঁকতে থাকেন নতুন নতুন ছবি। গত দু-তিন দশকে সেই ছবিগুলোকে তিনি আবার উন্নত করার করেছিলেন, রঙে-রেখায়। ছবির পেছনে তিনি তখন অনেক সময় দিতেন। পরে এই ছবিগুলো নিয়ে প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছেন ওয়ালকট।

derek-walcott-painting

কবিতার কথা ছবিতে

ক্যানভাসে তৈলচিত্রের কাজ করলেও তাঁর বেশিরভাগ ছবিই জলরঙে আঁকা। এক্ষেত্রে তিনি  দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বড় বড় ক্যানভাসে গ্রামের বর্ণিল দৃশ্য, নাচের দৃশ্য দেখে মনে হয় রঙের চেয়ে নিখুঁত বস্তু-ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে অধিক আগ্রহী ছিলেন। নিপুণ হাতে এঁকেছেনও চমৎকার সব ছবি। তৈলচিত্র ও জলরঙ- উভয় মাধমে তিনি বিমূর্ত ছবি আঁকার পরিবর্তে বাস্তবানুগ ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। এসব ছবির মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও সমুদ্রের দৃশ্য। কিছুকিছু ছবি রয়েছে স্থানিক, ধৃতিময় আবেগের। স্মৃতি থেকে সেসব ছবি আঁকা। আট দ্য গেইট, পেটিট ভ্যালি (১৯৮০), পেটিট ভ্যালি (২০০০)- এই ছবি দুটো ত্রিনিদাদের স্মৃতি ধারণ করে আছে। প্রথম ছবিটা জলরঙে আঁকা। বড় বড় পাতা আর ডিটেইলসে বেশ সাবধানে, যত্ন করে এঁকেছেন। সান্তাক্রুজ ল্যান্ডস্কেপ (২০০১), সান্তাক্রুজ ল্যান্ডস্কেপ (১৯৯৯) এবং লা পাস্তারায় দেখা যাবে ত্রিনিদাদের জনপদকে। স্মৃতিময় অতীত উঠে এসেছে তাঁর এসব ছবিতে। তবে ছবিগুলোর শিল্পরীতি পূর্বাপর একইরকম থাকেনি, স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে এক-একটি চিত্রকর্ম। সূক্ষ্ণ তুলির আঁচড়ে তিনি প্রকৃতি ও জীবনকে অনুপুঙ্খভাবে তুলে এনেছেন এসব চিত্রে। চিত্রকর্মগুলি হয়ে উঠেছে বাস্তব জীবন ও প্রকৃতির ছবি। কিছু কিছু ছবি গাছ-গাছালির মনোরম উপস্থাপনার কারণে বেশ চিত্তাকর্ষক। রঙের সুনিপুণ ব্যবহার ঘটেছে সেগুলোতে। স্পেনে ওয়ালকটের জলরঙ ছবির প্রদর্শনী হয়। প্রদর্শিত ছবিগুলির উৎস ছিল তাঁর রচিত নাটকগুলি। নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যকে তিনি ছবির দৃশ্যে রূপ দিয়েছেন আর নাটকের চরিত্রগুলো ফিগার হয়ে তাঁর ছবিতে ফুটে উঠেছে। বলা বাহুল্য, ডেরেক ওয়ালকট তাঁর কাব্যসৃষ্টির মতো চিত্রাঙ্কনেও বিরল মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কবিতার শব্দ বা ভাবচ্ছবি হয়ে উঠেছে তাঁর চিত্রশিল্পের বিষয়। ওয়ালকটের ছবিকে তাই বলা যায় তাঁর সার্বিক নান্দনিক বোধেরই সম্প্রসারণ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close