Home প্রতিক্রিয়া রাজিয়া সুলতানা >> মাহি : সৃষ্টির গহন কুয়াশায় নিঃশেষিত জীবন

রাজিয়া সুলতানা >> মাহি : সৃষ্টির গহন কুয়াশায় নিঃশেষিত জীবন

প্রকাশঃ January 26, 2018

রাজিয়া সুলতানা >> মাহি : সৃষ্টির গহন কুয়াশায় নিঃশেষিত জীবন
0
0

রাজিয়া সুলতানা >> মাহি : সৃষ্টির গহন কুয়াশায় নিঃশেষিত জীবন

 

আফ্রিদা তানজিম মাহি। আমার মেয়ের বয়সী মেয়েটা। ফাঁস নেবার আগের রাতে যে মায়ের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেছে মায়ের বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে।
এতো কথা এতো হাসি – একবারও বলেনি কী ঘটাতে যাচ্ছে সে পরদিন! নাকি সে নিজেও জানতো না কী ঘটতে যাচ্ছে? অথবা জানাতে চায়ও নি? আত্মহত্যা করলে নাকি এমনই আচ্ছন্ন থাকে কেউ। মনোবিজ্ঞানীরা তো সেরকমই বলেন। ওহ! সিলভিয়াও কি এরকম ভেবে রেখেছিলো কিছু? সিলভিয়া প্লাথ – মার্কিন কবি, যার দুটো শিশু সন্তান ছিলো পাশের ঘরেই। যাদের ক্ষিদের কথা চিন্তা করে নিজের হাতে খাবার রেখে এসেছিলেন তাদের জন্য। কোন জটিল মনস্তাত্ত্বিক কোষের অন্ধকারে শেষে নিজেকেই টেনে নিয়ে গেলেন নিচতলার কিচেনে জীবনের শেষদিনটির জন্য!
মাহিরই-বা কি ঘটেছিল? কেন, ওই যে জীবনানন্দ যেমন বলেছিলেন, “কাল রাতে- ফাগুনের রাতের আঁধারে / যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ / মরিবার হল তার সাধ।” কেন হলো এই সাধ মাহির?
বয়স মাত্র কুড়ি। আরও কম বয়স থেকেই বিশ্বমানের ছবি আঁকতো মাহি। তার ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধন হলো। মেয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়োলো। মাকে গর্বিত করে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্ট পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্কলারশিপ পেলো। পরের মাসেই তার অস্ট্রেলিয়া যাবার কথা। সবকিছু ঠিকঠাক। প্রদর্শনী চলছে। এরই মধ্যে পৃথিবী থেকে তার স্বেচ্ছা প্রস্থান। স্বেচ্ছা প্রয়াণ। উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এরকম একজন তরুণ চিত্রশিল্পীর আত্মহত্যায় আমি ভীষণ মর্মাহত। উত্তর খুঁজে চলেছি – কেন সে এইপথ বেছে নিলো? জীবন কী দুঃসহ ব্যথায় অসহ্য হয়ে উঠেছিলো তার কাছে? কেন সে সাহায্য চাইলো না? কেন সে কাউকে কিছুই জানতে দিলো না?
নিজের প্রদর্শনীর জন্য মাহি যা লিখে গেছে তাতে ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তোবা মিলবে না – ওর বিয়োগে আমাদের পাঁজরে ব্যথার যে মর্মর, তাও সারানো যাবে না। কিন্তু কিছু একটা তো প্রয়োজন আমাদের! মাহি মেয়েটা আমাদের জন্য কিছু সান্ত্বনা কি রেখে গেলো? নাকি বিষাদ?
মাহি লিখেছিল, “আমার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে আমার চিত্রকর্ম। ওগুলোই আমার প্রতিকৃতি। আমার যতো বলা, না বলা কথা। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় এরকম একটা সময়ে কেন আমি একক প্রদর্শনী করার সিদ্ধান্ত নিলাম – তাহলে আমি বলবো অতীতের সঙ্গে মিলবার, শান্তি স্থাপন করার জন্য এ আমার একমাত্র পথ। আমি আমার নিজের থেকে, পৃথিবীর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম দেখার এবং দেখানোর এবং অবশেষে মুক্তি পাবার। আমার চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কখনও স্বস্তি পাই নে। যেসব ঘটনা আমি ভুলে থাকতে চাই, ছবিগুলো সেসব ঘটনা আমাকে মনে করিয়ে দেয় অথচ আমিই সেগুলোর অমরত্ব দান করে চলেছি। সেইসব কথা ভুলে থাকতে পারতাম হয়তোবা কিন্তু ছবিগুলো, ইমেজগুলো তো আর মুছে ফেলা যায় না।… যখন আমি মরিয়া হয়ে উঠি নিজেকে প্রকাশ করার জন্য, পৃথিবীর সঙ্গে কমিউনিকেট করার জন্য – তারই এক আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফসল হচ্ছে আমার সেলফ পোর্ট্রেট। কখনও আমি নিরাপরাধ মানুষের সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করি, হিস্টিরিয়া-গ্রস্ত লোকের মতো আচরণ করি, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই ছবি আঁকি। যখন কিছু বলতে চাই কিন্তু বলার মতো মানুষ খুঁজে পাই নে, তখন আমি ছবি আঁকি। আর যদি সেরকম কাউকে পাইও, নিজেকে প্রকাশের জন্য শব্দ বা কথা খুঁজে পাই নে।”
মাহি আরও বলেছে – হতাশা ওকে গ্রাস করলে নিজেকে প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে সে ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করতো। এইকাজে নিজেকে ওর জোর করতে হতো না।

মাহির আত্মপ্রতিকৃতি
মাহির আত্মপ্রতিকৃতি

মাহির বাবা সাইয়েদ হোসেন বলেছেন, “একজন আর্টিস্ট আমাদের মতো চিন্তা করেন না। একই বিষয় আমরা যেভাবে দেখি, একজন আর্টিস্ট সেভাবে দেখেন না। মাহির আঁকা ছবিতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
মাহির মা কবি রহিমা আফরোজ মুন্নী লিখেছেন, “কজ আর এফেক্ট-এর এই সূত্রের সত্যতা প্রমাণ করতেই চলে গেল আমার বাচ্চাটা।” কি সেই কজ বা কারণ?  এফেক্টটা তো জানিই আমরা- মাহির আত্মহত্যা। যে কারণই থাকুক, কেউ যেন এভাবে মৃত্যুর পথ বেছে না নেয়, আমাদের মনে হয় সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। মাহির পরিণতি কেউ চাই না।

আসলে জীবন জটিল রহস্যে ঘেরা। শিল্পবোধের সঙ্গে বাস্তবজীবনের সম্পর্ক স্থাপন  জটিল মনস্তাত্বিক বিষয়। শিল্পীসত্ত্বা কীভাবে সেই সম্পর্ক বা সংযোগ স্থাপন করে বা করতে সক্ষম হয়, সেই চিন্তাও শিল্পীর নিজস্ব বিশ্বাস ও ধ্যানপ্রসূত। মাহি ওর প্রদর্শনীর নাম দিয়েছিলো “লস্ট ইন ট্রানজিশন।” সে তার অকাল-প্রস্থানের মধ্য দিয়েই যেন তা প্রমাণ করে গেলো। অতীত আর বর্তমানের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধটা অনেক চেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত আর করে উঠতে পারেনি মেয়েটা। ওর জটিল শিল্পীসত্ত্বাই হয়তো ওকে এব্যাপারে সফল হতে দেয়নি।
জীবনের ধর্মই হচ্ছে সমস্ত প্রতিকূলতাকে উজিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে যাপনের আরেক নাম জীবন। কিন্তু যাপন কেন, কীভাবে একজন শিল্পীর জীবন ও ভাবনা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে – মস্তিষ্কের সেই জটিল গ্রন্থিটা খোলার চাবি কি আমাদের হাতে আদৌ আছে? অথবা আদৌ কি কোনোদিন এসে পৌঁছুবে? এর উত্তর জানা নেই। জানা নেই কারণ এটা একটা জটিল প্রশ্ন। জীবনকে কে কীভাবে দেখবে বলা সত্যি দুরূহ। তবে জীবনবিমুখতাই যে আত্মহননে মানুষকে প্রলুব্ধ করে বা তাড়িত, যে কোনো আত্মহত্যাই তার প্রমাণ। “বধূ শুয়ে ছিল পাশে- শিশুটিও ছিল; / প্রেম ছিল, আশা ছিল- জ্যোৎস্নায়- তবু সে দেখিল / কোন ভূত? মাহিও কিসের তাড়নায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল? কী করে আর কেনই-বা “জীবনের স্বাদ- সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের-” তার অসহ্য হলো; আর মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো/ মর্গে- গুমোটে / থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্ত-মাখা ঠোঁটে! আমরা জানি না, সত্যি জানি না।
সাধারণ মানুষের তুলনায় শিল্পীসত্তার অধিকারী মানুষেরা অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়। নিশ্চয়ই জীবনের এমন কিছু তাকে আহত করেছিল যে আত্মহননের মধ্য দিয়ে সে তা থেকে মুক্তি খুঁজে নিল। কিন্তু আমাদের দাঁড় করিয়ে দিল অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি। কুড়ি বছরের একটা কচি মেয়ে সত্যি আমাদের অপরাধী করে গেল। কুড়িতেই যে তুড়ি মেরে জীবনকে বিদায় জানাতে পারে, তাকে যে বিষাদ, দুঃখ-কাতরতা কতটা ঘিরে ধরেছিল সেটা বোঝাই যায়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো একজন শিল্পীর, সম্ভাবনাময় শিল্পীর মৃত্যু। বিশ্ব-ইতিহাসে এরকম আত্মহননের ঘটনা আরও আছে, কিন্তু এত অল্প বয়সে কোনো শিল্পী আত্মহত্যা করেছেন, সেই দৃষ্টান্ত বিরল বলেই মনে হয়। নিজের মৃত্যুর কারণ মাহি হয়তো নিজেই বলতে পারতো, আয়নায় আমরা আমাদের বিচূর্ণ চেহারাটা তাহলে দেখতে পারতাম, বুঝতে পারতাম। কিন্তু হায়, মৃতেরা তো নৈঃশব্দ্য ভালোবাসেন, তারা মুক-বধির; কোনো প্রশ্নের উত্তরই আমাদের কখনও জানা হবে না। তবু-

এই সব শীতের রাতে মৃত্যু আসে।
হে বিপাশা-মদির নাগপাশ, তুমি
পাশ ফিরে শোও,
কোনও দিন কিছু খুঁজে পাবে না আর।

শিশিরের সুর নক্ষত্রকে লঘু জোনাকির মতো খসিয়ে আনবে না আর কেউ। আনবে না মাহি। সৃষ্টিকে গহন কুয়াশায় ঢেকে দিয়ে সে চলে গেল প্রশ্নহীন জীবনের অন্য প্রান্তে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close