Home কবিতা রাজীব দত্ত > স্বনির্বাচিত সাতটি কুমির ও বিশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া : মাসুদুজ্জামান
0

রাজীব দত্ত > স্বনির্বাচিত সাতটি কুমির ও বিশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া : মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ November 6, 2017

রাজীব দত্ত > স্বনির্বাচিত সাতটি কুমির ও বিশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া : মাসুদুজ্জামান
0
0

রাজীব দত্ত > স্বনির্বাচিত সাতটি কুমির ও বিশটি কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া : মাসুদুজ্জামান 

সাতটি কুমির ও বিশটি কবিতা 

১.
ঝুলে আছে ফুল তোলা জামা। আমরা তার নীচে দাঁড়িয়ে যে দীর্ঘ বন এবং বনের মৌমাছির ঘ্রান পাই, তা এখানকার নয়। আরো কিছুটা জলের। আরো কিছুটা ভূমির। আমরা জামার খুলে যাওয়া সুতো বুনে দিতে দিতে জল আর ভূমিলগ্ন যে শূন্যতা, তার নিবিড় মোহের ভেতর ঢুকে যাই। মোহের নিজস্ব যেসব রন্ধ্র, তার অতীতে দাঁড়িয়ে খুঁটে খাই মৌমাছির মধু। মধু মৌমাছির জ্ঞান। জ্ঞানের ভেতর কিছুটা রক্ত। আমরা রক্তকে জ্ঞান বিচ্ছিন্ন করতে করতে পৃথিবীর বাইরে পা টেনে দিই এবং বুঝি, এইখানে এই জ্ঞান, রন্ধ্র অথবা রক্ত যাই বলিনা কেন সবই মূলত ফুল তোলা জামার ছায়ার পরিসর। রোদ উঠলেই ভেঙে যাবে। একটু পরে
২.
কখনো কখনো আমিও মাছের চোখের দিকে অপলক তাকিয়েছি। ভুলে গেছি প্রিয় নাম, কবরের মাপ এবং অংশত সুঘ্রাণ। ফলে একলা একলা বাড়ি ফিরেছি। সফেদা বাগানের ওপাশে যেখানে রাত, তাতে ঢুকতে গিয়ে দরজা বন্ধ দেখে পোষা শামুকের নখ কেটে দিয়েছি। নখ কেটেছি নিজের হাত ও পায়ের। খুলে রেখেছি বিষণ্ন শিঙ। তখন সবাই-ই ভুল করেছে আমি বাসায় ভেবে, আমিও হ্যাঙারে কাপড় ঝুলাই দেখে নিমের আগাতে দাঁতন সেরেছে। মুখ তিতা হলে পরে পুবদিকে তাকিয়ে খালি করে নিয়েছে পূর্বাপর। তারপর হেসেছে চিড়িয়াখানায় গিয়ে। বলেছে, যে কোনো ওভারব্রিজই শূন্য ওড়ে আর পাখিরা দাঁড়িয়ে থাকে বলাকা চত্বরে
৩.
একটা ফরসা ফল গড়িয়ে যাচ্ছে

আরো নীচে মাটি
সম্ভবত তার দিকেই
গড়িয়ে যাচ্ছে একটা ফল, ফরসা বলে
অন্য যেকোন ছবির দিকে
যেভাবে তাকাই, অইভাবে তাকিয়ে আছি
আর দেখতেছি, আরো আরো

ফরসা, একটা ফল গড়িয়ে যাচ্ছে

৪.
নদীরা সঙ্গমে মেতেছে। গায়ক দেখছে। নতুন জাগা লোমের উপর হাত বুলোতে বুলোতে আমারও ধুলোর দিন মনে পড়ে; হ্যাঁ, সেইসব ধুলো, সেই সব দিন, যখন আলো পুড়ে গেছে ভোরে আর আমাদের পরিত্যক্ত চামড়ারা একটু একটু করে ধুলো সেজে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র হবে বলে। ধ্রুবতর নক্ষত্র। যারা আগেও জ্বলেছে, এখনো জ্বলছে; গোপনে নক্ষত্রের বেশে। ভালোই লাগে। অন্তত নিজের চামড়াজাত ভেবে অলীকসব নক্ষত্রের ভেতরে ভেতরে
৫.
কার স্মৃতির ভেতর এতো একলা একটা বাঘ, তুমি কি জানো? শুনেছো কোথায় খুব গাঢ় কুন্দফুলের ঘ্রান? ঘ্রানের গুহা? যেখানে সন্ধ্যার সকল ফিরতি মানুষ দেয়াল নিয়ে ঢুকে পড়ে। জেগে ওঠে। আবার ভেঙে যায়। গড়িয়ে যায় সুযার্স্তের সাথে সাথে ওপাশের পাড়ায়, হাওয়ার তালে তালে। কে যায়? কে যায় অইভাবে ভিড়ে, এতো একলা, বাঘের জামা গায়ে? তাকে দেখেছো আগে? চিনো?

তবে কীভাবে যাবো নীচে, অলক্ষ্য ঘাতকের কাছে?

৬.
হে দামেস্কের ধুলা, ঘরে ঢুকো। দেখো জমজ একজোড়া পাথর কিভাবে ওড়ে, কিভাবে ঘুমায়, আবার জড়ো হয়। তাকেই সাক্ষী মানো, তুলে আনো এজিদের খুন। রোদের মধ্যে ঈশ্বরকে ভুলে আছে, ভুলে আছে ক্ষত, ঘা, অথচ রেকাব ভরতি নুন।তবুও হারপুন; গেঁথে আছে লোমহীন বুকে, অসুখে বিসুখে যেখানে ঘুমাতো আঁধার, মাবিয়ার; দূরে চিরে যাচ্ছে রূকবালা রাগ আর অবোধ আফলাতুন

৭.
তোমার গোসলখানার ভিতর একটা কুমির
তোমার শোবার ঘরে দুইটা কুমির
তোমার রান্নাঘরে তিনটা কুমির
তোমার ব্যালকনিতে পাঁচটা কুমির
তোমার নামার সিঁড়িতে…

এইভাবে আমি আমার সাত নাম্বার কবিতাটা শেষ করলাম, কুমিরকে খাবার দিতে দিতে

৮.
আরো কিছু বরফ বাড়ুক। আরো কিছু সশব্দ জল। এরপর সেলাইকলের মোহের ভেতর ঢুকে যাওয়া যা কিছু দৃশ্য, মসলিনের জানু ঘিরে ঘুমিয়ে যাক। আঁধারও এইখানে থাক। সাথে সাথে ঘোর। এই ঘোর আর আঁধারের মাঝখানে যে সুতোর মেঘ, দলা খুলে ছড়িয়ে যাক দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত। আমি বরঞ্চ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো। ভেদরেখার প্রত্যেকটি চুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাখিয়ে দেবো নিদ্রাকুসুম ভোর। বলবো- তোমরাও হারিয়ে যাও। নিয়ে যাও এই সৌরভ। নিয়ে যাও এই গহন ঘ্রাণ। আমি এইভাবেই দেখবো। এইভাবেই আঁকবো- তোমাদেরও একশো একটা পা। অথচ হাত নেই কোনো
৯.
একটা কলাবতীফুল, যেটার রঙ মূলত হলুদ; কেমন করে ছিঁড়ে হাতে রাখতে হয়; তা দেখাতে দেখাতে সেই আমাকে প্রথম বলেছিল: থাইগ্লাস এবং মানুষের আত্মজীবনী কখনোই এক নয়। এবং এইসব সন্ধ্যা, যাদের ভিতর দিয়ে দোতলা বাস অনবরত রাস্তা পার হয় ও দূরে গিয়ে থামে; তারাও পরস্পর দেখতে এক নয়। হ্যাঁ, হতে পারে তারা সকলেই নূরজাহান রোডই যাবে অথবা মৌচাক, এমন কি সামনের যে যাত্রীটা স্নেকস খেলছে একা একা, পরের বাসেও এরকম আরো একজন থাকতে পারে, যারা ভালোবেসে নিকটতমাকে লালগোলাপই দেবে, ঘনিষ্ট দাঁড়িয়ে: কিন্তু তারা যখন আত্মহত্যার চিন্তায় একমত হবে, তখন ভিন্নভাবেই ভাববে। তারা ভিন্ন সময়েই ছাদে গিয়ে দাঁড়াবে, এবং নিজ নিজ অর্জন থেকেই বেছে নিবে নিজস্ব পদ্ধতি, খুন হওয়ার। আর এটাতো জানা’ই, অইসময়ে টিভি বিজ্ঞাপনে শুধু প্যানথারের ছবিই রিলে হবে, একটু একটু গ্যাপ দিয়ে
১০.
ফলে যা যা হয়: আমরা একই আকাশের শুয়ে পড়ি, পা টানি এবং গান গাই; এমন মানবজমিন। এটুকুতে এসে আমরা পৃথিবীর আরো কার্নিশে এসে পড়ি এবং স্ব স্ব খেলনা হরিণ অভ্যস্ত অন্ধকারের চোখে ছুঁড়ে মারি। অন্ধকার দৃষ্টি পায়। অন্ধকার গতি পায়। অন্ধকার ছুটে যায় নৈঋতে মেঘ রেখে এবং আকাশ হেলে পড়ে। যেহেতু আকাশ; হুলুস্থুল কাণ্ড বাধে। আমাদের দায়িত্ব পড়ে আকাশ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার। তাই দাঁড়িয়েই থাকি আর কাচের মাছির চোখের ভেতর সুর্যাস্ত গুনি; সূর্যাস্তের দিকে পা টেনে দিয়ে
১১.
যেভাবে লিখতেছি তোমাকে, যে ভাষায়; তার জন্য তুমি একটা গাজর বাগান রেখো। সাথে দুয়েকটা ছদ্মবেশী খরগোশ; যারা আমারই প্রেরিত ভাষা ভিন ভাষায় রিফ্লেক্ট করবে আমার বসার ঘরের আয়নায়; যেটার দুরু দুরু ফ্রেম, যেটার বিম্বরা শতছিন্ন; অথচ গেঁথে গেঁথে রাখা দূরে গেলেও যাতে দূরে না যায়, যেন মনে মনে পড়ে, এমত নতুন হরবোলার নগরে, তুমি ও তোমাদের অদৃশ্য ভাসা, ভাষার কবরে
১২.
ফুটো করে দিয়েছি মনোহর বেলুন
এতে বেলুন ও বেলুনের সমস্ত চিহ্ন একটু একটু করে দূরে ছিটকে পড়ার কথা। অথচ তারা ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে, নিবিড় হয়ে উঠছে এবং এবং একট একটু করে মিথ্যা করে তুলছে সীমাবদ্ধতার সকল সূত্র
এইভাবে ক্ষিপ্র সুঁই হাতেই প্রায়ই আমি পৃথিবী পার হই
১৩.
কে কাঁদে অমন খুন খুন করে? কাটা, অর্ধেক মেঘের কিনারে? নাগরায় কুমুদিনী ফুল; কিছুটা ফুটে আছে। বাকিটা উবে যাবে হাওয়ায়, দক্ষিণে? কে থাকে অইদিকে? হরিণ, চিত্রল? গা যার ফোঁটা ফোঁটা? অধরা আলোর বিলাপে। আমি তো ছুঁইনি, একটুও না। তবে কেন অমন ভেঙে গেছে? ছড়িয়ে পড়েছে সীতার গা, মাটির; এইখানে অইখানে? কেউ আছো, কুড়িয়ে আনবে?
১৪.
পৃথিবীর পিঠের দিকে, যেখানে সবচে চওড়া, ঘাম বেশি; ওইখানে নুন মেখে দিয়ে, অন্যদিকে পা রেখে, একলাফে পার হয়ে যাই দীর্ঘ দীঘি। নিচে মাছ ও মাছিপাড়া, সাবান ও সাবানের বুদবুদ; উবে যাবে বলে আরো ঘন হয়ে আসে এবং সত্যি সত্যি উবে যায়। এইসব দূর থেকে দেখি, আরো দেখি ।এবং দেখা দেখা খেলা খেলে জামার পকেটে হাত পুরে পৃথিবীর দিকে দেখি। জানি আয়ুরা এইরকমই, ঘোর বিকেলে চোখ খুলে রাখে , একা একা হাসে
১৫.
সত্যগাছের নিচে বিষ পিপঁড়ার বাসা। তারা একা একা থাকে। ভীষণ দুর্দিন অাসে যখন, গাছ ঘিরে, তারা গাছের নিচে বসে সত্য ফলের সুনাম করে। সত্যফলে রঙ আসে। ফলের মতোই পাকে। দিন শেষে ঝরে পড়ে। ঝরা সত্য, যেটা ফল, ঘিরে ঘিরে মাতম উঠে। অাহা, সেদিন আসবে কবে, সত্যরা পাকবে না, গাছেই রয়ে যাবে, চিরায়ত হয়ে। নিচে পিপঁড়ার সারি, একা একা, নিজেরাই সম্মিলিত হবে, বাসনার গোপন অতলে, ফুলে ফলে
১৬.
দই খেতে গিয়ে গরুকে ভাবিনি আগেও, এখনও, ঢকঢক গিলে গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু, দেখেছিও বাইরে,দূরে একপাল গরু চরিতেছে আর দুয়েকটা ফিঙে উড়ে বসে শুধু গরুদের পিঠে, গরুদের পিঠেই, আর গরুরা ভালো,তারা ওভাবেই হাঁটে, হেঁটে হেঁটে আমাকেই হয়তো দেখে আর পাখিদের বলে, এরা অমনই, দুধই খায় শুধু, সারাদিন, প্রথমে নিজের খেয়ে হাঁটাচলা শেখে, পরে আমাদের, তারপরে এভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, দেখে মনে পরে, মনে পড়ে বলে ঘরে ঢুকে বসে থাকি, খাতায় গরু গরু আঁকি, পরে আরো মনে পড়ে পাখিতো দিইনি, শুনে গরুরা হাসে, কানে কানে বলে পাখিতো নেই, উড়ে গেছে কবে

১৭.
কে কাঁদে অমন খুন খুন করে?কাটা, অর্ধেক মেঘের কিনারে? নাগরায় কুমুদুনি ফুল; কিছুটা ফুটে আছে। বাকিটা উবে যাবে হাওয়ায়, দক্ষিণে? কে থাকে অইদিকে? হরিণ, চিত্রল? গা যার ফোঁটা ফোঁটা? অধরা আলোর বিলাপে। আমি তো ছুঁইনি, একটুও না। তবে কেন অমন ভেঙে গেছে? ছড়িয়ে পড়েছে সীতার গা, মাটির; এইখানে অইখানে? কেউ আছো, কুড়িয়ে আনবে?
১৮.
একটা আধখোলা চাকু কার কল্পনায় এতো নগ্ন হয়ে থাকে? কার ঘুমের দৃশ্য রিলে হয় শহরের মহাসড়কে? ফুরিয়ে গেছে কি পাখিদের অযথা শীৎকার? নাকি যমদূত? কলিংবেলের পাশে যে গোপন গুহাচিত্র, ঘামে রঙ গুলিয়ে গুলিয়ে আঁকো, প্রাচীন হাড়ে, তা কি লিফট না পেরিয়ে দেখা যাবে? কিভাবে পার হবে এসকল সাপের ছবি? ডোরাকাটা ঘ্রাণ, ভাঁজ করা মৌতাত; তুমি যে সাঁতার হারিয়ে ফেলেছো গেল শীতে? পাড় পার হবে কখন? সময় তো এখনো অসুখ, হার্টবিটের পাশে জড়োসড়ো শুয়ে থাকে, খুব খুব ভোরে? কেঁপে কেঁপে?
১৯.
মা বলেন, তুমি নিশ্চয় ঝাড়বাতি ভালোবাসো এবং শ্যাডো ল্যাম্প। আমি হ্যাঁ বললাম এবং সেই রাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের ভেতর আবিষ্কার করলাম: আমি একটা পর্বত চূড়ায় বসে আসি। বরফের। তাই শাদা। সেই শাদা পর্বতের চূড়ার উপর থেকে লাল বল গড়িয়ে দিচ্ছি নীচের দিকে। নীচে আমার মা।

২০.

ঝাড়বাতির নীচে এবং শ্যাডোল্যম্পের অপজিটে। ফলে তার চোখ দেখা যাচ্ছে না। তিনি তার সেই দেখা না যাওয়া চোখে আমার পরপর গড়িয়ে দেয়া লাল বল গুণছেন। একটা একটা করে

 

 

রাজীব দত্ত > কবিতাভাবনা

 

সেই এক লোকের গল্প শুনেছিলাম, অজ্ঞাত কারণবশতঃ এক অন্ধকার ঘরের ভেতর আটকে পড়েছিলেন। কিছুই দেখতে পেতেন না। তাই নিজে নিজেই কথা বলতেন। নিজের গায়ে নিজেই হাত বুলোতেন। কখনো কখনো দেয়াল। যেন অন্য কোন মানুষ। অনেকদিন পর কাছে পেয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন। এইভাবে অনেক অনেকদিন। একসময় কয়লা জাতীয় কিছু একটা কুড়িয়ে পান অন্ধকারে। আর দেয়ালে লিখতে থাকতেন কী সব। নিজেও জানতেন না। একটু একটু করে। যদি পুরিয়ে যায় অই কয়লা। একদিন দরজা খুলে গেল যখন, আর লোকটি সম্পূর্ণ উন্মাদ; বিস্মিত হলেন বাইরের আলোকিত লোকজন। পুরো দেয়ালজুড়ে অদ্ভূত আঁকিবুঁকি। মুছে চুনকাম করে ফেললেন সব। আবার সব সাদা। অন্য কোনো উন্মাদের জন্য। বোধকরি, কবিও তা। অদ্ভূত অন্ধকারে আটকে পড়ে লিখে যাচ্ছেন হাবিজাবি। দেয়াল জুড়ে। জানেন, মুছে যাবে সব। তারপরও। বেঁচে থাকতে হবে তো !
পৃথিবীর বদ লোকেরা এই বাঁচার পদ্ধতির (অথবা আত্মমৈথুন) নাম দিলেন শিল্প। কবিতা তার একটা। স্বমেহন বৈ অন্য কিছু না।
কিন্তু তাই বলে কবি বিশেষ কেউ নন। আর সব লোকের মতোই। যে লোকটা ইদুঁর মারার ওষুধ বেচে অথবা মসজিদের মুয়াজ্জিন, তার সাথে আদতে কবির কোন পার্থক্য নাই আমার কাছে। একটা মানুষের ভেতর তো অনেকগুলা মানুষ থাকে। কবিসত্তা তার একটা। যে লোকটা কসাই, মাংশ বেচতেছে, সেও ফুলগাছ লাগায়। কোকিলের ডাক শুনে তারও ছুরি স্লো হয়।
এইভাবেই, এত কিছুর পরও একজন মুচি, নাপিত, মুদির দোকানদার, বেশ্যা বা কোন একজন কবি বেঁচে থাকে।
কবিতা বেঁচে থাকার হাজার হাজার টুলসের একটা। আর কিছু না।

আসুন বেঁচে থাকি।

 

মাসুদুজ্জামান > পাঠপ্রতিক্রিয়া
কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় রাজীবের কবিতাকে? ভালো কবিতাপাঠের অভিজ্ঞতা ও বোধ যাদের আছে তারা নিঃসন্দেহে চিনতে পারবেন রাজীবের কবিতাকে। আমার কাছে অসাধারণ লাগে তাঁর কবিতা। পরাবাস্তবতা, অ্যাবসার্ডিটি, স্বপ্ন-কল্পনা, স্ট্রিম অব কনশাসনেস- ইত্যাদি প্রায় অবচেতনভাবে কবিতায় মিশিয়ে ‘অন্য’ এক অনুভবের জগতে নিয়ে যান রাজীব। পরিমিতিবোধ সাংকেতিক ইঙ্গিতধর্মী তাঁর সবগুলি কবিতা। আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, তাঁর কবিতায় একটা মেসেজ থাকে, শুধু অর্থহীন করে তোলেন না কবিতাকে।
তাঁর কবিতার শুরুটা দারুণ, সহজ একটা গল্পবলার ভঙ্গিতে শুরু হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে গল্পটাকে ঘনীভূত করে আমাদের অনুভূতিকে উস্কে দেন। যে অনুভূতির সঙ্গে পাঠকের পরিচয় নেই বললেই চলে। অর্থাৎ নতুন একধরনের অনুভব, যা পাঠককে ভাবিত করে, প্রগাঢ় চৈতন্যের কাছে নিয়ে যায়। এই কবিতাগুচ্ছের প্রথম কবিতাই দেখুন, শুরুটা কেমন এবং ধীরে ধীরে কোথায় পাঠককে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি :

ঝুলে আছে ফুল তোলা জামা। আমরা তার নীচে দাঁড়িয়ে যে দীর্ঘ বন এবং বনের মৌমাছির ঘ্রান পাই, তা এখানকার নয়। আরো কিছুটা জলের। আরো কিছুটা ভূমির। আমরা জামার খুলে যাওয়া সুতো বুনে দিতে দিতে জল আর ভূমিলগ্ন যে শূন্যতা, তার নিবিড় মোহের ভেতর ঢুকে যাই। মোহের নিজস্ব যেসব রন্ধ্র, তার অতীতে দাঁড়িয়ে খুঁটে খাই মৌমাছির মধু। মধু মৌমাছির জ্ঞান। জ্ঞানের ভেতর কিছুটা রক্ত।

লক্ষ্য করুন, কোথায় ফুল তোলা জামা আর কোথায় জ্ঞানের ভিতর রক্ত! তারপরে কবিতাটা শেষ করলেন কীভাবে? দেখুন এই শেষ সম্পূর্ণ দুটি বাক্য আর অসম্পূর্ণ শেষ বাক্যটি :

আমরা রক্তকে জ্ঞান বিচ্ছিন্ন করতে করতে পৃথিবীর বাইরে পা টেনে দিই এবং বুঝি, এইখানে এই জ্ঞান, রন্ধ্র অথবা রক্ত যাই বলিনা কেন সবই মূলত ফুল তোলা জামার ছায়ার পরিসর। রোদ উঠলেই ভেঙে যাবে। একটু পরে

রাজীব কিন্তু শেষ করলেন না কবিতাটা শেষ বাক্যটি অসম্পূর্ণ রেখে। অর্থাৎ তাঁর বলবার কথা শেষ হয়েও শেষ হয় না…পাঠকের মনে অনেক ভাবনার অনুরণন ছড়িয়ে দেন।
পরের কবিতাটা পড়ুন, শুরু হচ্ছে একটা পরাবাস্তবধর্মী পরিবেশে :

কখনো কখনো আমিও মাছের চোখের দিকে অপলক তাকিয়েছি। ভুলে গেছি প্রিয় নাম, কবরের মাপ এবং অংশত সুঘ্রাণ। ফলে একলা একলা বাড়ি ফিরেছি। সফেদা বাগানের ওপাশে যেখানে রাত, তাতে ঢুকতে গিয়ে দরজা বন্ধ দেখে পোষা শামুকের নখ কেটে দিয়েছি।

এই যে ছবি, এই যে মাছের চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখতে দেখতে পোষা শামুকের নখ কাটার ভেতর দিয়ে একধরনের পরাজগতে পাঠককে নিয়ে যাওয়া, এই সময়ের খুব কম কবির মধ্যেই কল্পনার এতটা ঐশ্বর্য় আর ভাবতন্ময়তা খুঁজে পাওয়া যাবে।
রাজীবের কবিতার যে দিকটি আমার ভালো লাগে, এবং বৈশিষ্ট্যও বটে, খুব মৃদু স্বরে কথা বলেন, কিন্তু ভাবনার গভীরতা অতলস্পর্শী। খুব জাঁক করে বক্তব্য প্রকাশ করেন না, বক্তব্য হয়তো তেমন তীব্র নয়, কিন্তু সূক্ষ্ণ, গভীর। এই কবিতাটার পঙক্তিগুলি পড়ুন :

নতুন জাগা লোমের উপর হাত বুলোতে বুলোতে আমারও ধুলোর দিন মনে পড়ে; হ্যাঁ, সেইসব ধুলো, সেই সব দিন, যখন আলো পুড়ে গেছে ভোরে আর আমাদের পরিত্যক্ত চামড়ারা একটু একটু করে ধুলো সেজে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র হবে বলে।

এই হলো রাজীবের কবিতা। মানবিক যাপনের চমৎকার আলেখ্য। বলার ভঙ্গিটা সহজ কিন্তু পাঠাককে পরাবাস্তব স্বপ্নলোকে নিয়ে গিয়ে জীবন ও যাপনের অংশ করে তোলেন। রাজীব, তাই এই সময়ের একজন শক্তিশালী কবি। সমকালীন কবিতায় আত্মস্বাক্ষর মুদ্রিত করে দিয়েছেন ইতিমধ্যে।
রাজীবের জন্য শুভকামনা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close