Home অনুবাদ রাশিদা আল-শার্নি > পথের বাড়ি পথের বিস্ময় >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : নাহিদা নাহিদ

রাশিদা আল-শার্নি > পথের বাড়ি পথের বিস্ময় >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : নাহিদা নাহিদ

প্রকাশঃ August 16, 2017

রাশিদা আল-শার্নি > পথের বাড়ি পথের বিস্ময় >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : নাহিদা নাহিদ
0
0

রাশিদা আল-শার্নি > পথের বাড়ি পথের বিস্ময়

[সম্পাদকীয় নোট : রাশিদা আল-শার্নির জন্ম তিউনিসে ১৯৬৭ সালে। ১৯৮১ সালে আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর শুরু হয় তাঁর সাহিত্যচর্চা। আরবি ভাষাভাষি বিখ্যাত পত্র-পত্রিকা আর সংবাদপত্রে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম গল্পসংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। প্রকাশের পরই আল-শার্নি তিউনিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর দ্বিতীয় ছোটগল্পের বইটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এটিও একটি পুরস্কার লাভ করে, কিন্তু ধর্মান্ধদের সেন্সরের খড়্গ নেমে এলে তিনি এই বইয়ের নামগল্পটির নাম বদলে দিতে বাধ্য হন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নারীর জন্য শোকাশ্রু’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। স্কুল ইন্সপেক্টর আল-শার্নি এখন তিউনিসে বসবাস করছেন।

আল-শার্লির এই ছোটগল্পটির, পাঠক লক্ষ করবেন, কাহিনি ভীষণ গতিশীল। পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণে আর জনমনস্তত্ত্ব উন্মোচনে কতটা পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। এসব ছাড়িয়ে গল্পটির কেন্দ্রে আছে যে নারী, কীভাবে পুরুষের অপৌরেষয় কাপুরুষত্ব আর পুরুষতন্ত্রকে (পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি) চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। মনে হবে, এ শুধু আরব দেশের কোনো গল্প নয়, বাংলাদেশেরই গল্প।

প্রিয় পাঠক, পাণ্ডুলিপি থেকে গল্পটি নেওয়া হয়েছে বলে সম্পূর্ণ গল্পটি প্রকাশ না করে সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো। তবে এজন্যে গল্পটির রসাস্বাদনে পাঠকদের অসুবিধা হবে না।]

মেয়েটি লোকটাকে গুনগুন করে শিস দিতে দিতে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো, লোকটা তার সামনে এমনভাবে থামলো যেন খুব বিনয়ের সাথে পোপি স্ট্রিটের রাস্তাটা কোন দিকে জানতে চাইছে। মেয়েটি একমুহূর্তের জন্যও ভাবেনি লোকটি এসেছে তার সোনার নেকলেস ছিনিয়ে নিতে। মেয়েটি রাস্তার যে-পাশ ধরে হাঁটছিলো লোকটাও আনমনে সে পাশ ধরেই হেঁটে আসতে থাকে। লোকটার আচরণ দেখে মেয়েটার একবারও মনে হয়নি ওই ছিনতাইকারীর ব্যাপারে তার সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে। বরং লোকটার কমনীয় উচ্ছল চেহারা দেখে তার প্রতি একধরনের শ্রদ্ধাই জেগেছে। মনে হয়েছে লোকটা স্বচ্ছল সৎ মানুষ।

কিন্তু লোকটা যখন তার হাতের আঘাতে মেয়েটার বুকের খাঁচাটা খুলে নিয়ে যাচ্ছিল, মানে নেকলেসটা ছিনিয়ে গেল, তখন কিছুক্ষণের জন্য সে বিমূঢ় হয়ে পড়ে; খুব দ্রুতই আবার ধাতস্থ হয়ে ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার দেয়। চেঁচিয়ে বলে –
চোর! চোর! এই থামো…।
আমার নেকলেস, হ্যাঁ, আমার নেকলেস…!
মেয়েটা ক্ষোভে ক্রোধে আক্রশে ফেটে পড়ে। কাঁদতে শুরু করে। রাস্তার পাশের বাসাবাড়ি, দোকান বা কর্মশালা থেকে লোকজন ছুটে আসে, তারা আতঙ্কিত চোখে দৃশ্যটি  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, নড়ে না কেউ। লোকটার পিছু ধাওয়া করে না কেউ। কিন্তু মেয়েটি তো দমবার পাত্রী নয়।

লোকটি কিন্তু কল্পনাও করতে পারেনি, একটা মেয়ে এত অল্প সময়ে, এত দৃঢ়তার সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে এবং তাকে ধরে ফেলতে পারে।

লোকটা ছুটছে। সর্পিল আঁকাবাকা পথে সে দৌড়ুতে থাকে। উদিত সূর্য তখন পথচারিদের মাথার উপরে জ্বলজ্বল করছে। সূর্যের সেই আলো তরঙ্গের মতো মেয়েটার ঘর্মাক্ত মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলোয় লোকটার কুটিল আঙুলে গোল করে ঘুরপাক খাওয়া নেকলেসটিও চকচক করছে। মনে হতে পারে, নেকলেসটি বুঝি ঝুলন্ত একটা স্বর্ণফলক, যার একপাশে সুদৃশ্য একটা চূড়া, আরেক পাশে পাথরের গম্বুজ। মেয়েটি এর আগে কতবার গহনা হারিয়েছে কিন্তু কখনো এ জন্য তার দুঃখবোধ জাগেনি। এমনকি গহনার দাম সমন্ধেও তার সচেতনতা জাগেনি। কিন্তু জীবনে এই প্রথম তার মনে হলো কেউ বুঝি তার আত্মাটা ছিঁড়ে নিয়ে পালাচ্ছে।

মেয়েটি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে, হাত বাড়িয়ে টেনে-হিঁচড়ে লোকটাকে ধরতে চেষ্টা করে। তার আঙুলগুলো লোকটাকে প্রায় ধরে ফেলে আর কি। কিন্তু লোকটা ঘুরে মেয়েটার শরীরে পেঁচিয়ে যায়। তার ডান পা পেছনের দিকে বেঁকে গেলে সে ভারসাম্য হারায়। এই সুযোগে মেয়েটি লোকটার শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে। লোকটাও প্রাণপণ হাচাড়ি-পাছাড়ি করে যেন কুস্তি লড়ে যায়। কিছুতেই মেয়েটার সাথে পেরে ওঠে না।

ইতিমধ্যে মৌমাছির মতো চারপাশে লোকজনের ভিড় জমে ওঠে। কিন্তু কেউ-ই মেয়েটার সাহায্যে এগিয়ে আসে না। বিষয়টা এমন যে তারা ভুলো মন নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, ইতস্তত ভ্রমণ করছে। মেয়েটি মিনতির সুরে কান্নায় ভেঙে পড়ে-

ও চোর, তুমি আমার নেকলেসটা দিয়ে দাও!

কিন্তু কে শোনে কার কথা! হঠাৎ লোকটা তার প্যান্টের গোপন পকেট থেকে একটা ছুড়ি বের করে মেয়েটার মুখের দিকে তাক করে ধরে। এই দৃশ্য দেখে লোকজন আরও ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। মেয়েটি ধ্বস্তাধ্বস্তি কমিয়ে এবার একটু সচেতন হয়। চারপাশ থেকে জড়ো হওয়া জনতা হল্লা করে তাকে সতর্ক করে দেয়।

‘এই মেয়ে, চলে আসো। ওর হাতে দেখছো না একটা ছুরি- অস্ত্র! বোকা মেয়ে কোথাকার! এ তোমার মুখ খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে দেবে। তোমার শক্তি কম, তবুও লড়তে যাও কেন?  এত সাহস কেন তোমার? একগুঁয়ে মেয়ে কোথাকার!’

লোকজনের এসব কথা কানে আসতেই মেয়েটার মুখ আরো কঠোর হয়ে ওঠে,  যেন শুধু ওই লোকটাই নয়, কতগুলো ভয়ঙ্কর শক্তিশালী দৈত্য তার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে। কিন্তু তার সাহস আরও বেড়ে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে একবারও মনে হয় না যে সত্যিকারের ভয় বলতে এখানে কিছু আছে বা এবার সে পিছু হটে যাবে।

পাশের মোটর ওয়ার্কশপ থেকে মেয়েটিকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল এক যুবক। কিন্তু জড়ো হওয়া মানুষগুলো তাকে বাধা দিয়ে অবিবেচকের মতো রূঢ়স্বরে বলে উঠল, ‘এই ছেলে, তুমি কী অন্যের জন্য তোমার জীবন বিসর্জন দেবে নাকি? চোরটাকে নিজের মতো যেতে দাও। এই যে এখন যা ঘটছে তার জন্য এই একরোখা জেদি মেয়েটি দায়ী!’

লোকজনের এরকম ভীত, তিক্ত, ব্যঙ্গ করে কথা বলার স্বর মেয়েটাকে প্রচণ্ড আহত করে। সে এবার তার চার পাশে পতঙ্গের মতো ঘুরতে থাকে মানুষগুলো সম্পর্কে সতর্ক হয়ে ওঠে। লক্ষ করে, এই লোকগুলোর প্রতিবাদ প্রতিরোধ করবার কোন ইচ্ছে নেই। তাদের পরাজিত দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েটার কাছে মারাত্মক কোনো মারণাস্ত্র বলে মনে হয়।
তাদের হাল ছেড়ে দেয়া মনোভাবটাই মেয়েটার ক্ষোভটাকে আরো উস্কে দেয়। এক অন্ধ আক্রোশে সে ফেটে পড়ে। নাই-বা থাকুক ছুরি, তার ধারালো নখতো আছে। আক্রমণকারী লোকটাকে ঘায়েল করতে এখন সে তা-ই ব্যবহার করবে। বুক ভরে দীর্ঘ দম নিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে লোকটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে –

‘পৃথিবীর সব অস্ত্র নিয়ে এলেও আমি আমার নেকলেস নিয়ে যেতে দেবো না; না, কিছুতেই না।’
মেয়েটির এই ফুঁসে-ওঠা প্রতিক্রিয়া দেখে লোকটার মুখভঙ্গি বদলে যায়। ক্রোধে সে তার ঠোঁট চেপে ধরে। আর মেয়েটা হলুদ চোখের সেই লোকটির চোখের তারায় নিজের উত্তেজিত মুখের প্রতিফলন দেখতে পায়। লোকটা দাঁত-মুখ খিচেয়ে খেকিয়ে উঠে বলে- ‘অসভ্য  গোঁয়ার মেয়ে কোথাকার!’

মেয়েটিকে বিস্মিত করে দিয়ে লোকটা তার কপাল ও মুখ বরাবর পর পর কয়েকটি হিংস্র ঘুসি মারে। মেয়েটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তার শরীর পিছলে গড়িয়ে পড়ে। উপর্যুপরি ঘুষি চলতেই থাকে। অনেক্ষণ ধরে লোকটার কলার আঁকড়ে থাকা মেয়েটার হাতের মুঠি এবার শিথির হয়ে আসে। লোকটা মুঠিটা ছাড়িয়ে নেয়। সবার চোখের সামনে শুয়োরের বাচ্চাটা মেয়েটাকে লাথি মারে। ভয়ে সকলের গা শিউরে ওঠে। নিজেদের কাপুরুষতায় নিজেরাই স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর লোকটা মেয়েটাকে আরো একটা পৈশাচিক লাথি দেয় এবং দৌড়ে পালায়।

তাৎক্ষণিকভাবে মেয়েটা নিজেকে সামলে নিয়ে আবার লোকটার পিছু নেয়। তার চুল আলুথালু, পোশাকে ধুলো আর নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত! তবুও মেয়েটি তার সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়ে গিয়ে লোকটার পিছু নিতে নিতে চিৎকার করে বলতে থাকে-‘আমার নেকলেস! আমার নেকলেস.,.!’

মেয়েটির চারপাশে লোকজনের ভিড় আরও বাড়তে থাকে! তারা তার চোখের দিকে না তাকিয়ে সান্ত্বনা দেয়-

‘যা ঘটেছে তার জন্য আমরা দুঃখিত।’

‘তুমি আর নিজেকে বিপদে জড়িও না।’

‘তুমি কেন এরকম জেদ আর সংকল্প নিয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনলে?’

‘তুমি এই বিপদের কথা ভুলে যাও, বাঁচো, আর নিজের জন্য ভালো কিছু করো।’

লোকগুলো তার শরীরের দিকে বললো,

‘তুমি তোমার সম্পত্তি লুকিয়েই রেখো।  এটা প্রদর্শনের জন্য নয়।’

আহত দর্পে ক্ষোভে মেয়েটা এবার চারদিকের মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকায়। মেয়েটার মনে হয় একটা দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর তার আর এই লোকগুলোর মাঝে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি নিজে নিজেই উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। এখনো তার চেহারায় যুদ্ধের সেই ধূলি-ধূসরিত চিহ্ন স্পষ্ট। সে শুনতে পায় কেউ একজন তাকে একরাশ ঘৃণা নিয়ে বলছে- ‘ছিঃ, কী লজ্জা! নিজেকে তুমি একটা হাস্যকর ভাঁড় বানিয়ে ফেললে? কত নগণ্য তুচ্ছ তুমি!’

চারদিকে তাকিয়ে মেয়েটি লোকটিকে দেখতে চায়, অনুসরণ করতে চায় ওই ঘৃণামিশ্রিতি কণ্ঠস্বরটি কার! জড়ো হওয়া সবার মুখের দিকে পলকহীনভাবে সে কিছুক্ষণ তাকায়, তারপর চিৎকার শুরু করে বলে, মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষের দল। আর কতকাল এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসি-তামাশা দেখবে?

বেদনায় তার কন্ঠ ভেঙে পড়ে। কর্কশ হয়ে ওঠে সুর। সবার তখন মনে হয়, মেয়েটা বুঝি তাদের সবাইকে ছিঁড়েখুড়ে নগ্ন করে ফেলবে, এতটাই হিংস্র মনে হয় মেয়েটাকে।

চারিদিকের আবিল অস্থিরতা আর বিভ্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মেয়েটা এখন একা-একা বাবা মায়ের কাছে ফিরছে। রাস্তার শেষপ্রান্তে তাদের ঘর। সে চেষ্টা করছে সূর্যের নিচে অবিচলভাবে হেঁটে যেতে। সূর্যটাও যেন মেঘের পর্দা সরিয়ে চাপা আক্রোশে চকচকে ধারালো আলোর নিঃশ্বাস ফেলছে, ফেলেই যাচ্ছে।

[পাণ্ডুলিপি থেকে গল্পটি নেওয়া হয়েছে বলে সম্পূর্ণ গল্পটি প্রকাশ না করে সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close