Home ছোটগল্প রাসেল রায়হান / টিপু সুলতানের তলোয়ার [ছোটগল্প]

রাসেল রায়হান / টিপু সুলতানের তলোয়ার [ছোটগল্প]

প্রকাশঃ May 10, 2017

রাসেল রায়হান / টিপু সুলতানের তলোয়ার [ছোটগল্প]
0
1

‘ভাইসকল, এই যে দেখতেছেন, আমার পোলারে আমি দুধসাদা কাপড় দিয়া ঢাইকা দিলাম। বলতে পারেন, কাফনের কাপড়ে মোড়াইলাম। আর কিছুক্ষণ পরেই কবর হইব। এই যে দেখেন, আমার পোলায় এখনো বাঁইচা আছে। আপনেগো চউখের সামনেই তো অরে বাঁধলাম। বান্ধন মনে হইতেছে শক্ত হয় নাই। নড়তেছে।… ঐ, চুপ কর! নড়বি না একদম। খাঁড়া, তোর নড়নচড়ন বন্ধ করতেছি। আর কিছুক্ষণ। এই যে টিপু সুলতানের তলোয়ার। এই তলোয়ার দিয়া আইজ তোরে কতল করব।

‘ভাইসাহেবরা, আর একটু অপেক্ষা করেন। রায় হয়া গেছে, এখন কার্য সম্পাদন হইব। সামান্য কিছুক্ষণ। তার আগে আপনেগোরে নতুন কিছু তথ্য জানাই। এই যে, আমার হাতে লম্বা, পুলসিরাতের মতো ধারালো তলোয়ার দেখতেছেন, এইটা মহামতি টিপু সুলতান ব্যবহার করছেন। টিপু সুলতানরে তো আপনেরা সবাই চেনেন। বিটিভিতে টিপু সুলতানের সিরিয়াল সবাই দেখছেন। মহামতি টিপু সুলতান। একখান কথা, আপনেগো মইধ্যে কেউ কেউ অভিযোগ করতে পারেন, আঙ্গুল তুলতে পারেন যে, টিপু সুলতানের তলোয়ার তো এমন ‘ইসটেট’ আছিল না। ঐটাতো ঈদের চান্দের লাহান ব্যাঁকা আছিল। সম্মানিত ভাইসকল, অরা ভুল দেখাইছে। অরা আমাগো জন্য ভুল ইতিহাস রচনা করছে। অগোর শাস্তি হওন দরকার।

‘আসলে মহাবীর টিপু সুলতান এই তলোয়ারখান দিয়া ইংরাজগো বিরুদ্ধে খাঁড়াইছিলেন। সেই মহান বীরের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইয়া আসেন, আমরা এক মিনিট নীরবতা পালন করি।’

এক মিনিট নীরবতা পালিত হলো। তিনি পুনরায় শুরু করলেন—

‘টিপু সুলতানের এই তলোয়ার আপনেরা দেখতেছেন, এইটা যে আপনাদের কত বড় সৌভাগ্য, সেইটা আপনেগো ধারণায়ও নাই। যাই হউক, আরেকখান প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আমি রাস্তার ফকির। রাস্তায় রাস্তায় জাদু দেখাই। আপনারা দুইটা-চাইরটা পয়সা দেন, তাই দিয়া পেটে দুইটা অন্ন দিতে পারি। আমি টিপু সুলতানের তলোয়ার কই পামু? ভন্ড ভাবতেছেন হয়ত! আমার মতন রাস্তার পিঁপড়া, যারে আমরা আঙ্গুলের একখান টিপে না মাইরা আপনারা বাঁচায়া রাখছেন, সেইটা আমার সাতকপাল। তাহলে এমন মিছা গল্প মারি কোন সাহসে?

‘ভাইসব, আমি মিছা কথা বলি না। আসল কথা হইল, আমরা টিপু সুলতানের বংশধর। মাতুল গোত্রে, মানে টিপু সুলতানের মায়ের দিক দিয়া। আইজ ভাইগ্যের ফেরে আমাগো রাজত্ব নাই। পথে পথে মানুষরে মজা দিয়া, আনন্দ দিয়া, ভেল্কি দেখাইয়া পয়সা উপার্জন করি। কিন্তু ভাই, বিশ্বাস করেন, এই যে আমার হাতের তলোয়ার, রাজরানীর দাঁতের মতন চকচকা তলোয়ার, এইটা দিয়া টিপু সুলতান স্বয়ং যুদ্ধ করছেন। এই বাঁটে শক্ত কইরা হাত রাইখা ইংরাজগো রক্তচক্ষু দেখাইছেন। ইংরাজগো লাল প্যান্ট প্রায় ভেজার জোগাড় হইছিল এই তলোয়ার দেইখা।

‘যাই হউক, দেখেন, এই তলোয়ার এখন সোজা আমার পোলার পেটে ঢুকায়া দিমু। ও অপরাধী। ভয়ংকর অপরাধী। অর শাস্তি প্রাপ্য। এই যে দেখেন, দিলাম ঢুকায়া টিপু সুলতানের তলোয়ার—’

মতিন ঘ্যাঁচ করে সাদা কাপড়ের উপর দিয়ে আন্দাজ করে তলোয়ার চালাল। পরপর দুবার। মুহূর্তেই সাদা চাদর লাল টকটকে হয়ে উঠল। কাপড়ে মোড়ানো বালক ছটফট করতে লাগল কাটা মুরগীর মতো।

তৃতীয়বার তলোয়ার চালানোর পর মতিন জনতার দিকে তাকাল। সবার মুখ ফ্যাকাসে এবং সাদা। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে সবাই। দু-চারজনকে অবশ্য অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক দেখা গেল। মতিন নিশ্চিত যে এরা এই ম্যাজিক আগেও কোথাও না কোথাও দেখেছে। নইলে এত শক্ত কলিজা এই দেশে কারো থাকার কথা না। কিংবা কে জানে, মানুষ ক্রমাগত পিশাচ হয়ে যাচ্ছে কি না। নিজেকেও পিশাচের বাইরে ভাবে না মতিন। নইলে নিজের পুত্রকে নিয়ে কোনো মানুষ এসব বিপজ্জনক খেলা দেখাতে পারে!

মিনিটখানেক পর পুত্রের ছটফটানি কমে এল। চতুর্থ মিনিটের মাথায় নিস্তেজ হয়ে গেল সম্পূর্ণ। এখন একটা দলার মতো পড়ে আছে লাল-সাদা চাদরে মোড়া বালকটি।

একটু সময় নিয়ে মতিন আবার শুরু করল—

‘ভাইসকল, আপনেরা দেখলেন আমি নিজ হাতে আমার পুত্ররে হত্যা করলাম। বড় সাধের পোলা আছিল। কিন্তুক কী করব, আপনেরাই বলেন। পাপ ! ভয়ংকর পাপ করছে। কী পাপ, কেউ জিজ্ঞেস কইরেন না। আমি বাপ হয়া পোলার এই পাপের কথা আপনেগো সামনে উচ্চারণ করতে পারব না।

‘কেউ কেউ অভিযোগ করতে পারেন, পাপ করছে ভাল কথা। রাষ্ট্র শাস্তি দিবে। তুমি শাস্তি দিবার কে? এর যৌক্তিক কোনো উত্তর আমার কাছে নাই। তবে উত্তর একখান আছে।

‘আমার এই পোলা বহু মানতের ফল। মহান আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি কইরা আমার বউ অরে কোলে ধরছে। সেই পোলারে আমি কীভাবে অন্যের হাতে তুইলা দিই মারার জন্য? কইলজা পুড়ে। যা-ই হউক, পাপ করছে, শাস্তি তো পাইবই। এই মৃত্যুই তার শাস্তি। এবার আপনেগো প্রতি কিছু প্রশ্ন আছে আমার তরফ থেইকা। আপনেরা জ্ঞানী-গুনী মানুষ, আপনেরাই পারবেন সঠিক উত্তর দিতে। আমার মতো মূর্খ মানুষের আপনেরাই ভরসা।

‘আছিলাম টিপু সুলতানের বংশধর, এখন কপালদোষে ভেল্কিবাজ। আপনেরাই দেখেন এইটা কোন ভেল্কি কিনা! আপনেগো চোখের সামনে আমার পোলাডারে হত্যা করলাম। তলোয়ার এখনো পেটে ঢুইকা আছে। আপনেরাই দেখতেছেন। এইটা কি ভেল্কি? এইটারে ভেল্কি বলবেন? আপনেরা চাইলে লাশ ছুঁইয়া দেখতে পারেন—’

মতিন পুত্রের নিথর দেহ তুলে নিল দুইহাতে। শরীরের নিচের ঘাসগুলি সামান্য থেঁতলে আছে। রক্তে টইটম্বুর।

কাপড়ে মোড়া লাশের কপাল বরাবর একটি চুমু খেল মতিন। তারপর চক্কর কাটতে লাগল বৃত্তাকার ভঙ্গিতে দাঁড়ানো জনতার সামনে, ধীরে ধীরে। জানতে চাইল কেউ ছুঁয়ে দেখতে আগ্রহী কিনা। কাউকেই আগ্রহী দেখা গেল না। সবাই ভয় পেয়েছে।

সবার সামনে একবার ঘুরিয়ে এনে আবার আগের জায়গায় শুইয়ে দিল মতিন, তার বালকপুত্রকে। নিথর। পুনরায় বলতে আরম্ভ করল—

‘আপনেরা কিন্তু ভুলে গেছেন যে আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাইছিলাম। যা-ই হউক, প্রশ্ন শুরু করি। ধরেন কোনো মানুষের অপরাধের বিচার হইল। শাস্তিও সম্পাদন করা হইল। এখন কি ঐ লোকরে আর অপরাধী বলা যাইব। সে তো শাস্তি পাইছে। আপনেগো বিবেক কী বলে?… চুপ কইরা আছেন কেন? যাইব তারে অপরাধী বলা? বলেন—’

ভিড়ের মধ্যে থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়া গেল, ‘না।’

‘তাইলে আপনেগো বিচারেই আমার পোলার পাপ কাটা গেল। শাস্তি হইছে, আমার পোলা এখন পুরা নিরপরাধ। কী বলেন?’

এবারো সবাই সপক্ষেই রায় দিলো।

‘হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহপাক। এখন যদি কোনোভাবে আমার পোলায় তাঁরই কোন ইশারায় বাঁইচা ওঠে তাইলে আর পুরান পাপের ভার কালা মেঘের লাহান মাথায় নিয়া তারে ঘুরতে হইব না। কী বলেন আপনেরা?’

এবারও সপক্ষে রায়। আস্তে আস্তে জোরালো হচ্ছে আওয়াজ। সবার ভয় কেটে যাচ্ছে। ক্ষত থেকে বের হওয়া রক্তের মতো বেড়ে উঠছে কৌতূহল। এক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে আগের কথার খেই ধরল মতিন—

‘ভাইসব, আমরা গরীব মানুষ। একবেলার খাবার জোটাইতেই কষ্ট হয়। পেটে পাথর বাইন্ধা পইড়া থাকি। পোলারে খাওন দিতে পারি না। এইভাবে বাঁচার চাইতে মইরা যাওয়াই ভাল। তয় আপনেরা যদি দুই-চাইর টাকা দয়া কইরা দেন, আমার পোলার পেটে দুইটা ভাত যাইব। পোলা আমার বাঁইচা থাকার আনন্দ পাইব। এখন সব আপনেগো উপরে। আপনেরা যদি চান যে ও আবার বাঁচব, হাসব, খেলব—যদি চান আবার চঞ্চল হইয়া, ছটফট কইরা আমার পোলাটা ছুটাছুটি করব তাইলে যে যা পারেন কিছু দেন। দুই ট্যাকা, চাইর ট্যাকা, পাঁচ ট্যাকা, দশ ট্যাকা—যে যা পারেন।’

সবাই তাকিয়ে আছে। কেউই খুব আগ্রহ প্রকাশ করছে বলে মনে হচ্ছে না। হঠাৎ একটা পাঁচ টাকার কয়েন কেউ ছুড়ে দিলো ভিড়ের মধ্য থেকে। কয়েনটা মুহূর্তের জন্য ঝিক করে এসে নিথর দেহের পাশেই পড়ল। পরমুহূর্তেই তুমুল আগ্রহে টাকা-পয়সা ছুড়ে মারতে লাগল মানুষ। দেখতে দেখতে পয়সা আর টাকায় ঝলমল করতে লাগল ঘাস। আনন্দিত মুখে সব জড়ো করে একটি পুঁটলিতে বাঁধল মতিন।

‘আপনেগো মুখের দিকে তাকায়া আবার বাঁচাইতে মন চাইতেছে পোলাটারে। কিন্তুক আমি তো বাঁচানোর কেউ না। বাঁচানোর মালিক ওই যে, তিনি। আপনেরা সবাই একমনে দোয়া করতে থাকেন আমার পোলাডার জন্য। দেইখেন, আপনেগো দোয়ার জোরেই সর্বশক্তিমান আল্লাহপাক দয়া করবেন,’—বলতে বলতে হ্যাঁচকা টানে তলোয়ারটি উঠিয়ে আনল মতিন—মাঝখান থেকে ডগা পর্যন্ত টকটকে লাল রক্ত।

সবাই নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত প্রার্থনা করছে। দেড় মিনিটের মাথায় নড়ে উঠল লাল-সাদা কাপড়। টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল তার আট-দশ বছরের পুত্র। সবার সামনেই মতিন শক্তভাবে বেঁধেছিল পুত্রকে। হাত-পায়ের সেই বাঁধন নিজে নিজেই যেন কীভাবে খুলে ফেলেছে পুত্র। জনতার মধ্যে একটা হর্ষধ্বনি বয়ে গেল। সবাই খুব হাততালি দিতে লাগল।

মতিনের মন চলে গেল বাড়িতে। সকালে বের হওয়ার আগে দেখে এসেছে শিরিন কচুশাক তুলে আনছে। চালের জন্য বসে আছে। গেলেই রান্নাবান্না শুরু হবে। অন্যকে কৌশল দেখাতে দেখাতে মতিনই হারিয়ে যাচ্ছিল বারবার। স্বপ্নে স্পষ্ট গরম ভাত।

ভাবছে সাহস করে একটা পাঙাস মাছ কিনে ফেলবে কি না।

গরম গরম ভাত। মাড় ফুটছে। ঢাকনা সরে গেল। গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল সাদা মাড়। পাশেই লাফাচ্ছে জ্যান্ত পাঙাস মাছ। নদীর মাছ।…

বালক তখন টলছে। তার সাদা গেঞ্জি ভিজে আছে রক্তে। রক্ত ঝরছে তীব্র স্রোতের মতো। সবাই খুব উপভোগ করেছে। হাসছে। এটাকে এখন তারা খেলা হিসেবে নিয়েছে। তাদের হাসি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল।

বালক এখনো টলছে। মুহূর্তেই স্বপ্ন উবে গেল মতিনের। সবকিছু ছকমতো হচ্ছে না। কোথাও একটা সুতা কেটে গেছে। কিছু একটা আন্দাজ করল মতিন। আর তখনই ভেল্কিবাজের মুখোশ মুখ থেকে আছড়ে পড়ল তার।

এক লাফে গিয়ে পুত্রকে যে ভঙ্গিতে সে ধরল সেটি কোনো ভেল্কিবাজের ভঙ্গি নয়, স্রেফে এক পিতার ভঙ্গি।

…চারপাশের ভিড় তখনো হাসছে। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতে তখনো ঝিকঝিক করছে বিখ্যাত টিপু সুলতানের তলোয়ার।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. অসাধারণ, অসাধারণ ছোটগল্প! শব্দবুননের অপার মুগ্ধতায় আর শব্দজালে জড়িয়ে থাকা বেদনায় ভাষা হারিয়ে ফেলছি। অসম্ভব ভালোলাগা! এখনও কানে বাজছে–‘ভাইসব, আমরা গরীব মানুষ। একবেলার খাবার জোটাইতেই কষ্ট হয়।….। এইভাবে বাঁচার চাইতে মইরা যাওয়াই ভাল।’
    অফুরন্ত শুভেচ্ছা শ্রদ্ধেয় গল্পকার: ‘রাসেল রায়হান’কে; আর তীরন্দাজের জন্য অশেষ শুভ কামনা!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close