Home আত্মজীবনী রিজিয়া রহমান > জোনাকি-জীবন >> আত্মজীবনী

রিজিয়া রহমান > জোনাকি-জীবন >> আত্মজীবনী

প্রকাশঃ December 28, 2017

রিজিয়া রহমান > জোনাকি-জীবন >> আত্মজীবনী
0
0

রিজিয়া রহমান > জোনাকি-জীবন >> আত্মজীবনী

 

আজ রিজিয়া রহমানের জন্মদিন। রিজিয়া রহমান আমাদের একজন প্রধান কথাসাহিত্যিক। নিভৃতচারী এই লেখকের জন্মদিনে তীরন্দাজ তাঁর লেখা আত্মজীবনী ‘নদী নিরবধি’র প্রথম অধ্যায়টি প্রকাশ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

 

অভিবাসী আমি

 

‘মানুষ তো চিরকাল পৃথিবীর প্রান্ত থেকে প্রান্তে অভিবাসন তৈরি করে চলেছে, মানুষ আসলে অনন্তকালের অভিযাত্রী।’ কথাটা বলল অপু। ওর হাতে ধরা চায়ের পেয়ালায় ধোঁয়ার আঁকাবাঁকা রেখা হালকা হয়ে এসেছে। সামনে বসা বারবারার নীল চোখে মনোযোগী ছাত্রীর একাগ্ৰতা। কঠিন বাংলা সংলাপ ও বুঝে ওঠে না। তবু চেষ্টার বিরাম নেই বারবারার। অবশ্য ওর ধারণা বাংলা বেশ কঠিন ভাষা।

আমার বড়ো ভাইয়ের ছেলে অপু আর ওর বউ বারবারা, এক মাসের ছুটি কাটাতে আমেরিকা থেকে এসেছে। ঢাকায়। কথা হচ্ছিল আমার আমেরিকায় ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে। ইমিগ্রেশন ভিসার ইন্টারভিউর জন্য আমাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে অনেক আগেই। ভিসা নিতে আমি যাইনি। অপুর মতে ‘কাজটা ঠিক হয়নি, গ্রিন কার্ডটা নিয়ে রাখলে তো ক্ষতি নেই, বরং লাভই।’ পূর্ণিমা— আমার ডাক্তার বোনটি ছিল পুরোদস্তুর আমেরিকার নাগরিক। বসবাস করছিল সেখানে প্ৰায় পাঁচিশ বছরের ওপরে; আমাদের সবাইকে আমেরিকার ইমিগ্র্যান্ট করে নেয়ার ইচ্ছেতে অভিভাবকত্বটি নিয়ে বসেছিল। অন্য ভাইবোন অনেকেই গ্রিন কার্ডধারী হয়ে গেছে, পিছিয়ে গেছি আমি। দেশান্তরী হতে প্ৰচণ্ড অনীহা আমার। অপুকে বললাম, নিজের দেশ ছেড়ে কোথায় যাব বল! কথাটা তখনই বলল অপু। বলল, সারাটা পৃথিবীই তো মানুষের দেশ। মনে কর তো বড়ো ফুফু, আমাদের পূর্বপুরুষ, কোথায় সেই মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান থেকে এসেছিল দিল্লিতে। তারপর পশ্চিমবঙ্গে। তোমার বাবা অর্থাৎ আমার দাদা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে এলেন এই বাংলাদেশে, আর তার নাতি আমি, এখন আমেরিকায় ঘর বাধছি। মানুষ তো এমনি চিরকাল দেশান্তরী।

কথাগুলো অপু এবার বলল, ইংরেজিতে। বারবারার ঠোঁটে ফিরে এসেছে সহজ হাসি। হাসতে হাসতে বলল— আমার পূর্বপুরুষ তো এসেছিল ইংল্যান্ড কিংবা আয়ারল্যান্ড অথবা ফ্রান্স থেকে। আমেরিকানদের জীবনে এখনো রয়েছে অভিবাসনের সেই অস্থিরতা— ‘মুভ, মুভ অ্যান্ড মুভ অন।’

বারবারার কথার ভঙ্গিতে হাসলাম আমরা। বারবারার কথা ধরেই অপু বলল, আমাকে দেখো, ‘মুভ অন’-এর ওপরেই ঘুরছি, ছ’বছর বয়স থেকে শুরু করেছি। তিন-চার মহাদেশ পেরিয়ে গেলাম এ বয়সেই। কথাটা সত্যি| জন্ম ওর বাংলাদেশে। শৈশব কাটিয়েছে ওর বাবার কর্মস্থল আফ্রিকায়। আর ইয়োরোপ, আমেরিকায় কেটেছে কৈশোর যৌবনের শিক্ষা-জীবন| কিন্তু তাতে কী! মানুষের ‘রুট’ বা শিকড়ই তো তার আসল ঠিকানা। বিতর্কটা চলল বেশ কিছুক্ষণ। যাবার সময় অপু বলে গেল, আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট হওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করবে কি না ভেবে দেখা আরেকবার|

ভাবতে শুরু করলাম। এই ভাবনাই আমাকে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাবার অবকাশ এনে দিল| আশ্চর্যভাবেই উপলব্ধি করতে হল জীবনের দীর্ঘ যাত্ৰাপথটিতে মানুষ এক অভিযাত্রী ছাড়া আর কিছুই বোধহয় নয়, জীবন হচ্ছে আসলে বার বার অভিবাসন গড়ে তোলা।

স্মৃতির পরতগুলোতেই লেখা থাকে সেই অভিবাসনের কাহিনী। যে কাহিনী কেবলই স্মৃতিকথা, আর কিছু নয় অথবা সে যেন শুধু ভো-কাট্টা ঘুড়ির মতো হারিয়ে যাওয়া কিছু।

এ পৃথিবীতে স্মৃতির অভাব মানুষের জীবনে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। মানুষ মাত্রই যেন একেকটি স্মৃতির জাহাজ। ধাবমান সময় অবধারিত নিয়মে মানুষের জীবনকে পরিণতির দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়।

শৈশব, কৈশোর থেকে যৌবন, তারপর মধ্য বয়স, বার্ধক্য অতিক্রম করে ক্রমেই শেষ পরিণতির দিকে যাত্রা। এই ছুটিয়ে নেয়ার বড়ো অবদান হচ্ছে প্রতিদিন গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি তৈরি করে যাওয়া। আজ যা বর্তমানের ঘটনা, কালই তা পড়ে থাকছে বিগতের ঘরে। এক সময় সেসব হয়ে উঠছে স্মৃতি, জীবনের স্মৃতি। দুঃখের কিংবা সুখের, মূল্যবান অথবা মূল্যহীন। জীবন বোধহয় একটা স্মৃতির গ্রন্থ। আমার নিজের জীবনের স্মৃতি-গ্রন্থটি কিন্তু কখনোই খুব একটা মূল্যবান মনে হয়নি। অবশ্য অনেকে আমাকে আত্মজীবনী লেখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিখ্যাত লোকরা অথবা অবিখ্যাত অনেকেই আত্মজীবনী লিখে পৃথিবীখ্যাত হয়েছেন, জানি। আমি এই দুই দলের কোনোটিতেই নেই। কারণ জীবনটা আমার একেবারেই অখ্যাত। বিখ্যাত হওয়ার মতো চমকদার কোনো ঘটনা সেখানে নেই বললেই চলে। আর আত্মজীবনী লিখে বিখ্যাত হওয়ার বাসনাও পোষণ করিনি। তাছাড়া নিজের কথা অন্যকে জানানোর সংকোচ তো আমার আজীবনের।

পৃথিবীর অগণিত মানুষের মতো আমারও রয়েছে যথা নিয়মে শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও মধ্য বয়স অতিক্রান্ত অপরাহ্নে পৌঁছে যাওয়া সময়গুলোর স্মৃতি। সেসব বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন বয়স ও অবস্থায় নতুন নতুন আবাসন তৈরির স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিক দিয়ে দেখলে বলতে হয়, আমার জীবনটা নিজের মাঝেই বার বার স্থানান্তরিত হওয়া এক অভিযাত্রীর জীবন। যেন দেশ থেকে দেশান্তরে অবিরাম ছুটে চলার কাহিনী। সব মানুষের মতো আমিও ধরে নিয়েছিলাম আমার জীবনটাই আমার রাজত্ব, আর আমি তার একচ্ছত্র অধিপতি। জীবনের স্মৃতিতে তাই ক্ৰমাগত উঠে আসে সেই একই শব্দের ধ্বনি, ‘আমি, আমি আমি।’ জীবনের বিভিন্ন স্তরের এই ‘আমি’গুলোকে নিয়েই বিবর্তিত আমার জীবন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকাদের মতো আমিও কখনো কখনো ভেবেছি, আমার জীবনটা রয়েছে আমারই হাতের মুঠোয়। কী নির্বোধ আমি! বুঝিনি, জীবন তো লখিন্দর বেহুলার বাসরঘরে অনুপ্রবেশকারী সেই সাপের মতোই অদৃশ্য গতি, ধূর্ত কৌশলে পিছলে বেরিয়ে যায় আঙুলের ফাঁক গলিয়ে। জাদুর তাক লাগিয়ে হয়ে যায় এক রহস্যময়ী নারী, কৌতুকী প্রশ্ন করে, বল তো, আমি কে? বল তো আমি কার? হাত বাড়ালেই সে সরে যায় দূরে, অদৃশ্য হয়ে। কানামাছি হয়ে অন্ধের মতো কেবলই খুঁজে বেড়াই তাকে। এই সে ছিল, এই নেই। কোথায় আমার সেই জীবন! সারা পৃথিবীর প্রান্তে প্রত্যন্তে কোথায় আছি আমি? সৃষ্টিজগতের রহস্যের মাঝে নিত্য অভিবাসী আমি কেমন করে খুঁজে পাব হারিয়ে যাওয়া আমার সেই ক্ষুদ্ৰ তুচ্ছ জীবনকে? বিলুপ্ত হওয়া আমাকে? বিলীন হওয়া সময়কে? হারিয়ে ফেলা জীবনের জন্য নিঃশব্দ আর্তি বুকের মাঝে কাঁদে— জীবন, আমার জীবন| ফিরে এসো আমার হাতের মুঠোয়। জীবন আমার হাতের আজলা থেকে এক রাশ জোনাকির মতো উড়ে যায় দূরে। হারিয়ে যায় নক্ষত্রের জগতে। ফিরে সে আসে না, আসবেও না কোনোদিন আর। অন্ধকার গুহায় হোমসেপিয়ানের হাতের ছাপটির মতো শুধু স্মৃতির ছাপটি ফেলে রেখে চলে যায় অভিবাসনান্তরে। তবুও কখনো কখনো মূর্ত হয় স্মৃতি আর বিস্মৃতির, দৃশ্য আর অদৃশ্যের, আলো আর আঁধারের লুকোচুরি খেলা।

 

এক

 

অন্ধকারের পরত খুলে যে ছবিটি প্রথম জোনাকির আলো হয়ে জ্বলে সেটি একটি নগরীর ছবি। কলকাতা মহানগরী। স্মৃতির সেই শহরটি আজো আলোআঁধারি লুকোচুরি খেলে আমার মনের গভীরে। সেই শহরেই আমার জন্ম। ভবানীপুরের সেই হাসপাতাল, সেই বেণীমাধব স্ট্রিট, হরিশ মুখার্জি রোড, জগুবাবুর বাজার, দ্বারিক ঘোষের মিষ্টির দোকান… আর কী?

কেন,  আলিপুর চিড়িয়াখানা, ঘোড়দৌড়ের মাঠ, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, আউট্রাম ঘাটে গঙ্গার বুকে থেমে থাকা জাহাজের ঝলমলে আলোর সারি, কালিঘাটের ব্রিজ, গড়ের মাঠ।

স্মৃতির দৃশ্যগুলো বড়ো বেশি ভিড় জমায়। সারি ভেঙে এলোমেলো এসে যায় আগেরটাকে সরিয়ে পরেরটা।

ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাব্ধি, যেন ছেড়ে যাওয়া রেলগাড়ির যাত্রীদের হৈহট্টগোল। এ বড়ো বিশৃঙ্খল ব্যাপার। থাক এসব, বরং নিজের কিছু কথা বলি আগে| কী কারণে জানি না, অবোধ বয়স থেকে ছিলাম খুব দুর্বল আর রোগা। শরীরটা ছিল যেন ছোটোখাটো একটা তালপাতার সেপাই। সরু ঘাড়-গলা, বেঢপ বড়ো মাথা আর কাঠি-কাঠি হাত-পা, একেবারে রীতিমতো এক ‘আগলি ডাকলিঙ’। কথা বলতাম খুবই কম, সেকথা এতই আস্তে আর এমন মিহি চিকন সুরে, সহজে তা কারো বোধগম্য হত না। এর কারণে বকাঝকা কম জোটেনি কপালে। শুটকি মাছের সঙ্গে আমার সাদৃশ্যটা কে যে আবিষ্কার করেছিল জানি না। তবে আমাকে সম্বোধনে ‘শুটকি’ নামকরণটি নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করার অধিকার ছিল প্রায় সবারই। যদিও আমার একটি ডাকনাম এবং হয়তো জমকালো একটি ভালো নামও ততদিনে রাখা হয়ে গেছে। ডাকনামটি আমার বেশ কাব্যিক। সারাক্ষণ রোগী আর হাসপাতাল নিয়ে ব্যস্ত আমার ডাক্তার বাবা আমার নামকরণে তার প্রকৃতিপ্রেমিক সৌন্দর্যপ্রিয় মনটির ছাপ রাখতে ভুলে যাননি।

সন্ধ্যারাতে বাড়ির সামনের মাঠটিতে জ্বলা-নেভার ম্যাজিক দেখাত অজস্র জোনাকি পোকার ঝাঁক, আমরা ক’ভাইবোন আর পাশের বাড়ির খেলার সাথিরা ছুটে বেড়াতাম জোনাকি ধরার জন্য। মুঠোভরা জোনাকি পোকা হাতর আজলায় আর ফ্রকের কোঁচড়ে ভরে নিয়ে একেকজন হয়ে উঠতাম জ্যোতির্ময় শিশু যেন। দলের সবাই মাঝে মাঝে আমাকে তাড়া করত— ধর ধর, ওই জোনাকিটাকেও ধর। বলত, ‘ও জোনাকি, তোর পাখা কই? তুই উডিস না কেন? উড়ে যাস না কেন জোনাকিদের সাথে?’

একদিন সবার তাড়ায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম মাঠে, তখনই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। জোনাকি পোকায় ভরা ফ্রকের কোঁচড়ের প্রান্ত ফসকে গেল হাতের মুঠো থেকে। বেরিয়ে পড়ল কোঁচড়-বন্দি জোনাকিরা, উড়তে শুরু করল। আমার চারপাশে। আমার জামায়, চুলে কপালে ঝিকমিকিয়ে জ্বলছে নীল আলোর ফুলকি। হতভম্ব আমি, আমাকে নিয়ে কি উড়ে যাচ্ছে জোনাকিরা? আমি কি সত্যি আলোর জোনাকি? সাঁজ আঁধারে আমাকে ঘিরে জোনাকিদের সেই নীল আলোর জ্বলা-নেভা অনেক দিন পর্য়ন্ত আমার শিশু মনকে আলোড়িত করেছিল। যেন জোনাকি হয়ে উড়ে বেড়িয়েছি… রাতে ঘুম নামা কল্পনায়।

একবার রাতের ফ্লাইটে লন্ডনে যাওয়ার সময়, প্লেনের যাত্রীরা প্রায় সবাই যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন, ফিরে এসেছিল আমার শিশু বয়সের সেই সন্ধ্যারাতটি। হাজার হাজার ফিট ওপর দিয়ে উড়ে চলা বোয়িং জেট প্লেনটি বুঝি ঢুকে পড়েছিল কোটি কোটি জোনাকির রাজ্যে। চারপাশে এমন উজ্জ্বল তারার মেলা, এমন অত্যাশ্চর্য ঝলমলে আলোর জগৎ এত কাছে থেকে দেখিনি আর কখনো। সারা রাত জেগে প্লেনের ছোট্ট জানালায় দৃষ্টি পেতে দেখছিলাম জ্যোতির্ময়ী রাতের আকাশ। তখন আশ্চর্যভাবেই জেগে উঠল শিশু বয়সের নীলাভ আলোর স্মৃতি। মনে হল আমার ফ্রকের কোঁচড় থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া সেই জোনাকিরাই ছড়িয়ে গেছে আকাশজুড়ে। মনের মাঝে যেন কথা বলে উঠেছিল শৈশব- ‘তুমিও তো জোনাকি। এই আলোর ভুবন তোমারই।’

আমি জোনাকি। বাবা আমাকে এ নামেই ডাকতেন। আমাকে ডাকবার জন্য এই নামটাই রেখেছিলেন তিনি। মা যখন-তখন ডাকতেন, জোনাকি, ও জোনাকি, কোথায় গেলি তুই? হাসপাতাল থেকে ফিরে বাবা বলতেন— জোনাকি কই? তাকে তো দেখছি না! মা বলতেন, কোথায় আর! হয়তো ঘরের কোনো কোনায় বসে একা একা কথা বলছে|

বাবার পছন্দের নামের আমি, ছোট্ট জোনাকি ছিলাম এই রকমই, অন্য রকম এক শিশু। বারো মাস অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, দুর্বল শরীর, খেলাধুলা ছুটাছুটি করবার সামর্থ্য নেই। গলার শব্দ কমজোর— চেঁচামেচি, হৈ-হুল্লোড় করার শক্তিও কম। অবয়ব আর কণ্ঠস্বরের শক্তিহীনতায় প্রায় নিঃশব্দ, অস্পষ্ট আমি সবার মাঝে থেকেও যেন নেই। ভাইবোন, সমবয়সী সাথিদের নাগাল পেতাম না। নিঃসঙ্গ এক শিশুর মতো ঘরে বারান্দায় একা আপন মনের খেলা খেলতাম। কথা বলতাম। কাক আর চড়ুইদের সঙ্গে। এই আপন মনের খেলাই হয়তো আমাকে ভাবুক আর কল্পনাপ্রিয় করে তুলেছিল। অনায়াসে তৈরি করে দিতাম কাক, চড়ুইয়ের বাক-ক্ষমতা, বাড়ির সামনের রাস্তাটির শেষপ্রান্তে ঝাপড়ানো বিশাল বট গাছটিকে ভেবে বসতাম দৈত্য, দেয়ালের ওপরে লাফিয়ে ওঠা সাদা বেড়ালটিকে ভেবে নিতাম পঙ্খিরাজ ঘোড়া। এমন আরো কত কী!

ছিলাম দারুণ অমিশুক স্বভাবের। কেউ ডাকলে কাছে যেতাম না, কথা বলতাম না। হতে পারে, শারীরিক অপূর্ণতাই ছিল এর কারণ। আমাকে নিয়ে সবাই হাসে, ‘শুটকি মাছ’ বলে ক্ষ্যাপায়। ধরে নিয়েছিলাম অন্য সবার থেকে আমি পিছিয়ে পড়া কেউ, সবার সঙ্গে একসারিতে দাঁড়ানোর যোগ্যতা আমার নেই। হয়ে উঠেছিলাম অতিমাত্রায় লাজুক আর মুখচোরা। কারো সামনে গিয়ে দাঁড়াতে বা কথা বলতে সংকোচ বোধ করতাম। মায়ের কাছেও সহজে ঘেষে দাঁড়াতে পারতাম না। অদৃশ্য একটা দূরত্ব অনুভব করতাম। কারণ হয়তো ছিল। আমার পরের ভাইটির জন্ম হয়েছিল আমার জন্মের এক বছর চার মাস পরই। শুনেছি, তখন নাকি সবে হেঁটে বেড়াতে শিখেছি। শুনেছি, এত কাছাকাছি বয়সের দুটি শিশুকে সামলানো মায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই চালান হয়ে যেতে হল, অন্য ঘরে, অন্য বিছানায়, আমার বিধবা বড়োফুফুর কাছে। বড়োফুফু নিঃসন্তান। তাকেই মা বলে ডাকতাম। থাকতেন তিনি আমাদের সঙ্গে।

আমাদের বাড়িতে রোজ দুধ দিতে আসত এক হিন্দুস্থানি বুড়ো গোয়ালা। সে এলেই আমরা ভাইবোনরা ছুটে যেতাম, ঘিরে দাঁড়াতাম তাকে। যেন ছোট্ট টিনের মাগে দুধ মেপে তোলাটা উপভোগ্য এক দৃশ্য। দুধ মেপে দিতে দিতে দুধয়ালা রোজই আমাকে— ‘ডাগডর বাবু কা নকরানি’ বলে ঠাট্টা করত। বলত, এ খোখি! তুমি তো ডাগডর বাবু কা লেড়কি নেহি হো, ডাগডর বাবু কা নকরানি।’ হাসতে হাসতে বলত, তু খানা নেহি খাতি? লাকড়ি কি তরা এত্তা দুবলি কাহে কো?

খুব রেগে যেতাম, একদিন আচমকা কেন্দেকেটে অনৰ্থ বাধালাম। নালিশ দিলাম বাবার কাছে, আব্বা! দুধয়ালা, রোজ আমাকে নকরানি নকরানি বলে। লাকড়ি বলে। দুধয়ালাকে ধমকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাবা বললেন, ‘ঠিক মতো খাও না, মোটাসোটা হও না, তাই তো লোকে এসব কথা বলে! এখন থেকে বেশি বেশি করে খাবে।’ এরপরও খাওয়ার রুচি আমার বাড়েনি। আর দুধয়ালা আখ্যায়িত ‘লাকড়ি কি তরা দুবলি’ অবয়বটিরও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ‘শুটকি মাছ’ নামটি বহাল তো ছিলই, সে সঙ্গে ‘নকরানি’ আর ‘লাকড়ি’ নাম দুটির প্রচলন আমার অবস্থান ও আকার নির্দেশে নতুন মাত্রা যোগ করল। আর সেই সময়ই আমি বিদ্রোহী হলাম। সরু গলায় যথাসাধ্য শক্তিতে চিৎকার করে সবাইকে একদিন জানিয়ে দিলাম— আমি শুটকি মাছ নই। আমি নাকরানি না, লাকড়িও না, আমি জোনাকি| সেই প্রথম আমার মাঝে ঘটল আত্মবিস্ফোরণ। উন্মেষ ঘটল প্রতিবাদী চেতনার, অক্ষমতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রয়াসের| আত্মপক্ষের সমর্থনে সেই আমার প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা|

উৎস : নদী নিরবধি, রিজিয়া রহমান, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close