Home কবিতা রিমঝিম আহমেদ / কবিতাগুচ্ছ, কবিতাভাবনা ও সৈয়দ তারিকের পাঠ-প্রতিক্রিয়া
0

রিমঝিম আহমেদ / কবিতাগুচ্ছ, কবিতাভাবনা ও সৈয়দ তারিকের পাঠ-প্রতিক্রিয়া

প্রকাশঃ December 24, 2016

রিমঝিম আহমেদ / কবিতাগুচ্ছ, কবিতাভাবনা ও সৈয়দ তারিকের পাঠ-প্রতিক্রিয়া
0
0

রিমঝিম আহমেদ / কবিতাগুচ্ছ

অর্ধপ্রেমিকের প্রতি

সুন্দরের দিকে মুখ করে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো
বর্শার ফলার মতো চোখ
দূরে বৃষ্টি হচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে ঘর-বাড়ি, কলাপাতা
পাখির পালক….
আত্মার সুগন্ধ নিয়ে
নিজেকে ভাবতে থাকি ফুল; দুপুরের সর্ষে বন
তীব্র মদিরাক্ষী, নদী ও চরের মতো সহোদর
জড়ো করা গান, ভক্তিযোগে বেজে যাচ্ছে দেবব্রত
জানালার এপারেও আমি, ওপারেও আমি
সোমত্ত সুন্দর বেচে দিয়েছি হারাম রাত্তিরে

সুন্দরের দিকে মুখ রেখে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো
মৃতরা আবারো ফিরে আসে গায়েবি আনন্দে
আমার অর্ধ-প্রেমিক, বারান্দায় ঝুলে আছে মাছি পরম্পরা
আর আমার দিকেই এগিয়ে আসছে আত্মহন্তারক নদী।

দৃশ্য অদৃশ্য

সারাপথ, সারাপথ একসাথে হেঁটে আসে শুক্লা দ্বিতীয়ার চাঁদ, ভেজা, ঘন সরের মতন।
লাল মলাটের আমপারা, পৃষ্ঠার ভাঁজে রাখা ময়ূর পালক! ফসকে যাচ্ছে চোখের পাতা
থেকে তুলতুলে শৈশব। মই ভেঙে গেছে, ছুঁই ছুঁই আকাশ উপরে উঠে গেছে বয়সের সাথে।


একদা আত্মহত্যা গাইতে গাইতে সবুজ সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছি। বিস্মরণও একটা সমুদ্র
তুমি ক্রমশ তাতে তলিয়ে যাচ্ছ, আর তলিয়ে যেতে যেতে ভাবছ কার আঙুল এঁকে গেছে বেলেমাটিতে ব্যথার ছুরি, ছুরির পেছনে তার বংশধর খুঁজতে খুঁজতে তুমি নিজেই ছুরি
হয়ে যাচ্ছ; ফালাফালা করে কেটে নিচ্ছ মানুষের তাজা হৃৎপিণ্ড।
ভ্রান্তি

ভাবছি এ অন্ধকার নয়, কুয়াশা
মশারি টানানো ঘরে ইন্দ্রজাল মেলে আছে
স্বপ্ন নয়, মেঘের ভেতর শুয়ে আছি
নীলাভ্র বিছানাময় সাপ খেলা করে
রানী আর রাজা সাপ, তাদের মণিতে
চড়ুই পাখির ছায়া, অদূরে স্বর্গের নদী

কুয়াশার অন্তরালে কেউ একজন
দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার একচোখে আমার পিতার লাশ
অন্য চোখে প্রণয়ের হাতছানি।

দরিয়ানগর

মধ্যরাতে জেগে ওঠে ঘুমন্ত ঠোঁট, বরফ আঙুল। বিছানার ধুলো উড়ে যাচ্ছে, আয়নায় জেগে ওঠে বাদামি চর, সবুজ চাঁদ। ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে যেতে যেতে মিথ্যে হয়ে যায় তাবৎ গান, পাতালের স্বর্গ থেকে সহসা ডুব দিয়ে ওঠে গোলাপি ঘোড়া। তখনও হিমছড়ির ঝর্ণা ঝরছে … পাহাড়ের চূড়ায় জেগে উঠে মায়ামন্দির।


ঘুমন্ত ঠোঁটে পুড়ে যাচ্ছে মিথ্যেবাদী শহর। সারিবেঁধে আসছে যন্ত্রসঙ্গীত হাওয়ায় হাওয়ায়। প্রাচীন খরায় শুকিয়ে যাওয়া আঙুল জলের হাহাকারে ক্রমশ এগুচ্ছে সমুদ্রের দিকে … চোখে বিরানপ্রান্তর অগত্যা লাল হয়ে ঝুলে পড়ে; তখন পিঁপড়েদের রাজ্যজুড়ে মিষ্টান্নভোজ। দুরগ্রাম ফুলে উঠছে বেঢপ নৈঃশব্দ্যে। রাস্তাজুড়ে ধুলোকুয়াশায় অন্ত্যক্ষর খেলছে একদল মাতাল- কামুক চাঁদের নিচে।


পাড়াতো প্রেমিকেরা ঘুমিয়ে পড়েছে
জানালায় ঝুলে আছে হাইওয়ে
রাতের গাড়ি– ঢুলুঢুলু চোখ
কিছুদূর এগোলেই সমুদ্র, ফেনা
বালিতে বাতাসের পদচিহ্ন পড়ে আছে
কয়েকটা নদী এগিয়ে আসছে আমার দিকে
আমি দেখছি, কোন দূর সমুদ্রে জাহাজডুবি হচ্ছে
ছিটকে পড়ছে একেকটা মানুষ পাখির মতো
আর প্রাচীন মাছেরা গিলে খাচ্ছে প্রেমিকের চোখ।
রিমঝিম

তোর জন্য একটা আলাভোলা দিন তুলে রাখি চোখের ভেতর, একটা
লু-হাওয়া বিকেল আর অসংখ্য পয়মন্ত রাত। খাবলে নিয়েছে যেসব
অস্থিমজ্জা আদিমতম ঘুণ নখের শানে সব কাটা পড়ছে নিরলস শ্রমের
ফসল। মন্দিরা বেজে চলে, শাঁখের শব্দে আত্মা কেঁপে ওঠে। যবনিকা
টেনে নেবে অমীমাংসিত শঙ্কা, না লেখা দিনলিপির পাশে যে নাম রয়ে
যায় অপ্রকাশ্য, তার জন্য একটি শোকের আশুরা নামবে পৃথিবীতে।
শোক প্রস্তাব শেষে খিলখিল হাসি সব ছুঁয়ে দেবে অন্ধ আঙুল আমার
পরিত্যক্ত হাতের….

তোর খিদের পাড়ে ঝুড়িভর্তি মেঘ, বুক জুড়ে সুড়সুড় করে নেমে যাচ্ছে
ভাটি! আত্মরতি শিখে গেলে সঙ্গমও বর্ণহীন; রাতগুলো জমা পড়ে বাহুতলে।
নদী
তারে কাটা, ধারে কাটা সব কাটাদের ঋণ
নির্জনে কোন সাপুড়িয়া বাজায় বিষের বীণ
অন্ধজনের চোখে না হয় সূর্যাস্ত নেই
গলছে বরফ, অচল স্রোতে কে হারালো খেই?

প্লাবন নাচে শিকলবাহা ঘোলা নদীর জলে
নিষ্ফলা ওই মাঠের বুকে রোদ্র শস্য ফলে
ভাঙন নাচুক, কাঁপন লাগুক ঘুম জড়ানো বুকে
পালাবদল না হয় হ’লো অসুখে-বিসুখে

ল্যান্টানাফুল তারার মতো রাত জাগে না ভালো
গণ্ডি কেটে রক্তবুকে জ্বালায় মোমের আলো
শহরবন্দি শহরবন্দি বিষ নামানো সাপ
তোমার জন্য রইল জমা সতীর অভিশাপ

কোন পালঙ্কে দিবানিদ্রা কোন ঘাটেরই জল
আদিমতম নদী আমার চক্ষু ছলাৎছল।
মায়েদের গল্প
মায়ের জন্য একরত্তি জায়গা ছিল বাবার,
বাকিটা জুড়ে ছিল তাসঘর, সাহেব-বিবি-গোলাম
পান মশলার ঘ্রাণে বন্ধুপত্নির গোপন হাসি….

চুলের খোঁপায় মা বেঁধে রেখেছিল নাইয়রের গল্প
ভেজা শাড়িময় তীব্র অভিমান; রাতজাগা অসুখ-বিসুখ

বাবার অসংখ্য গল্পের ভিড়ে মা একটি শব্দ হয়ে শুয়ে থাকে….
বেনামি চিঠি
আমারই চোখ; যার মর্মমূলে করোনি নিক্ষেপ
তোমার আদুল দৃষ্টি। দৃশ্যত আগুন নেই
অন্তর্মুখী যে দহনে জ্বলে খাক। তাকাতেই যদি
এই পোড়া চোখে,  শান্ত জলের কেমন তিরতিরে
সমুদ্র দেখতে পেতে তুমি ! জলের তলায়
লুকোনো অমূল্য মণি…

দৃশ্যত পড়ে থাকে খোলা শনিবারের বেনামি চিঠি।
ঘণ্টাধ্বনি
অন্ধ সে সন্ধ্যায় ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছি দূরে ও অদূরে
নিজের টুকরোগুলো পুনরায় রাত-ভোর কুড়িয়ে নিয়েছি
নিজেকে দিয়েছি জোড়া, জোড়া দিতে দিতে আঙুল ক্রমশ ক্ষয়ে
গেছে। খয়েরি তিলের ভাঁজ খুলে কেউ যেন মায়া রেখে যায়!
ঘণ্টা পরানো কুকুরী, কার চোখে রেখে আসে হারানো সভ্যতা
অর্বাচীন ঠাটবাঁট, সলিলময় দুপুর; আলুনি সালুন
টিভি খুলে বসি রোজ ;ঋতুপর্ণ ঘোষ, জ্যাকসনের গিটার
ফ্রেমে ও প্রচ্ছদে রাখি মকবুল ফিদা, দালি, লিওনার্দো ভিঞ্চি

কোন তাড়া নেই আর, সব পথ ডুবে গেছে অতল আঁধারে
শুধুই শ্রবণগত ভাঙা ইশকুল, নুরালী’র ঘণ্টাধ্বনি
গন্তব্য
প্রতিটি ঘুমের পরে
নিরবচ্ছিন্ন প্রত্যুষ
সুতো টেনে রেখে যায়
দ্বেষ, জরা ও কুসম
প্রতিটি স্বপ্নের পর
বুকে নদী নদী টান
স্রোতোবহা একা ডিঙি

তোমার দিকেই যাচ্ছি
আয়ুরেখা বেয়ে বেয়ে
যাচ্ছি স্বর্গ ও নরকে
ভুলচুক অহর্নিশ
মুছে দিতে দিতে সব
নিজেকেও মুছে ফেলি
বন্ধ জানালার কাচে
স্পর্শ
সদর দরজা পেরিয়ে গিয়েছে হাওয়া
ঘাসের ডগায় তারই মখমল দিন
একটা দিনের বিগত সুভাস মেখে
আনাচেকানাচে জমিয়ে রেখেছি ঋণ

জল টুপটুপ ভাদ্র-দুপুর কাচ
অঞ্জলি এঁকে শুয়েছে বুকের পাড়ায়
গালিচা ছড়ানো মাটি ঝুরঝুর সুখ
রক্ত গলিতে গোপনে এসে কে দাঁড়ায়?

চেনাজানা হোক দখিন বাহুতে ফুল
ঘাড়েগর্দানে সেলুন সেলুন ছোঁয়া
সোনালু ফুলের কেশরে লুকানো মায়া
চোখেমুখে জল, মনেমনে জাগে ধোঁয়া

জানালা খুলেছে, পালক ঝেড়েছে পাখি
এখানে-ওখানে দহনের ঘনঘটা
সুধাময়ী আজ যাবে না জবার বনে
মননে লেগেছে বজ্র আলোকচ্ছটা।
বিস্মৃতি
তোমার দিকে যে যাবো সেই পথ ভুলে গেছি আজ
তোমার দিনের পাশে আমারই রাত জমে থাকে
সাক্ষী থাক না ঘুমানো স্রোতহীন ইছামতী জল
তোমার জানালা পাশে কে বা আজ মায়া এঁকে রাখে!

সে কথা ভাবিনি বলে শূন্য হাতে হয় ঘর ফেরা
সন্ধ্যাদীপ জ্বেলে দিয়ে পুষে রাখি মাটির অসুখ
প্রত্যেক মুহূর্ত যেন অবরুদ্ধ সময়ের টোপ
আলাভোলা শরীরের এ কেমন ছিন্নায়িত বুক!

একদিন আমরাও রিকশার হুট ফেলে দিয়ে
জামালখান অথবা লাভলেন ছেড়ে আরও দূরে
যেতে চাই পথভুলে উদাসীন পারিপাট্য ভুলে
তবুও থামে না নদী দূরবেধী প্রাচীনতা ঘুরে

স্তোক দিয়ে ঢেকে রাখি মৌন এক কলঙ্কের জের
আসবে আমার কাছে তুমিও যে ভুলে গেছো ঢের
সুবেহ তারা
কাছে-দূরে কেউ নেই, বিড়ালের লোমের মতোই লেগে রয়েছে খণ্ডকালীন পাথরস্মৃতি…. যেন বা মূর্দা পড়ে আছে হিমঘরে- বিগত ছায়াকে জড়িয়ে ; অতৃপ্ত হাতের তালুময় জ্বর। ঘরের জানালায় নিমফুল, কার গুনছে প্রহর মশগুল! জলতেষ্টা পায়। কোন কোন বিকেলের আগে তুমি মিছে হয়ে যাও; বেরিয়ে আসে ড্রাকুলার ছায়ামগ্ন দাঁত! আঙুলের আঁচড়ে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি, ঝরে যাওয়া চোখের পাতায় উত্তর পাঠিয়ো। আর জেনো- সুবেহ তারা, প্রতিটি গতকাল আমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনন্ত বিচ্ছেদের দিকে।
তপ্তশ্বাস
আমার নিশ্বাসে তুমি উড়ে যাচ্ছ, গাংচিল
আগামি বসন্তে এসো, রক্ত ও পায়েসে অন্নপ্রাশন হবেই

মিঠে-পানি নদী ছেড়ে
বরফগলা সমুদ্র ছেড়ে
পাথরের পাহাড়ের দিকে…

যেখানে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন মানুষ
খুলি ও হাড়ের বন, আঙুল খুইয়ে  আসা প্রেমিকের হাত
যার স্পর্শ থেকে বেড়ে ওঠে রক্তজবা ভ্রূণ

আমার নিশ্বাসে তুমি পুড়ে যাচ্ছ….
আত্মপ্রবঞ্চনা
হরফ ভাঙার পর চিঠিটা অচেনা হয়ে যায়
থাকে শুধু হাহাকার, মূক ও বধির শব্দমালা
অনিচ্ছেয় কি ইচ্ছেয় যে কথা বোঝোনি কোনদিন
পাখিদের ঘাড়ে চেপে উড়ে গেছে দূরে তার দায়

ছায়ার সংসার পেতে  আকাশ অঘোর ঘুমিয়েছে
এইবেলা পাল তোল, ইছামতী-তোমার নৌকোয়
ল্যান্টানা ফুলেরগুচ্ছ অযতনে ফুটেছে বৃথা-ই
আমার শরীরে বসে কে যেন ঘাপটি মেরে আছে !

আত্মার চেয়েও কেউ অধিক পূজিত হতে নেই
অনিবার্য বৃষ্টি ভারে নিজেকে পতিত হতে হয়
মানুষের মুখগুলি পাথরের মূর্তি মেনে নিয়ে
চোখ টেনে নিয়ে যায় কুহকের দিকে নিমিষেই

নিজেকে লুকিয়ে রাখে বহুদিন নিজেরই মুঠি
মাটির পুতুল সেজে সোনার সিন্ধুকে বেড়ে উঠি
তৃষ্ণা
প্রতিদিন ঘুমের পাশে মা এঁকে শুয়ে পড়ি। চুলের ঘ্রাণে ডুবে যেতে যেতে ছেড়ে
যাচ্ছে আন্তঃনগর ট্রেন। দেখি, রাত শেষে হিরণ্ময় ভোরগুলো কারা যেন কুড়িয়ে
নিয়ে চলে গেছে অচিন্তপুরে। আমি আজো একত্রিশ বসন্তের শিশু। মাঝরাতে
কেঁদে উঠি মাতৃদুগ্ধের তৃষ্ণায়।
অভিমান
হায় অভিমান!  কেন তুমি জানালায় এসে
দাঁড়িয়ে রয়েছো?
এই ভিজে সন্ধ্যা, নিভে যাওয়া ধুপবাতি
ঘ্রাণের কুণ্ডলী রেখে মিলিয়েছে অন্ধকারে

কার অভিমুখে হাঁটো? তার চোখেই টারটারাস
অন্ধতা সরিয়ে সে যে তুলসীতলায় আসবে না আর
দাঁড়াবে না প্রদীপের নিচে…
ভাঙা আলো ঝুলে আছে পাঁজরের আলনায়

পায়ে পায়ে লেগে আছে শ্যাওলার রঙ
জাগতিক পিচ্ছিলতা
দরজাকবাট ভুলে হাওয়া ফিরে যায় অরণ্যের পথে

অভিমান!
আমার আঙুল ধরো ; চুলে বিলি কেটে কেটে
সিঁথি টেনে নাও কোন আনন্দমঠের দিকে….
রিমঝিম আহমেদ / কবিতা ভাবনা

ভাবনা কোথা হতে আসে ! ভাবনারও নিশ্চয় প্্েরক্ষাপট আছে , আর সে প্্েরক্ষাপট ভিন্ন কবি কি লিখতে পারে ? কবির অন্তর্গত ক্ষরণ, বেদনা, হাহাকার, সুখানুভূতি ব্যতিত ভাবনার ঊদয় হয় কি! সেসব অনুভূতিসমূহের আন্দোলন ছাড়া তো ভাবনা আসে না।

বলছি অনেক কিছু কিন্তু বলছি না কিছুই । এক অনির্বাচনীয় সুখের আলোড়ন থেকে কবিতার জন্ম। সুখ তো সুন্দরই হয় । ব্যথা, দহণ, ক্ষরণ, আনন্দ সবই মূলত সুন্দর, শুধূ সুন্দর দর্শনের দৃষ্টিটাকে উন্মুক্ত রাখতে হয়। আর সে তো শুধু কবির পক্ষেই সম্ভব। সুন্দরের নান্দনিক প্্রকাশই আমার কাছে কবিতা।

কবিতা আমার কাছে নৈঃশব্দ্য ধ্যানের নাম। সমস্ত যাপন থেকে ইচ্ছে পালানোর নাম।  মেঘের ওড়া, বৃষ্টির ঝরে পড়া, পাতার মর্মর শব্দ ঘাসের ডগায় ফড়িঙের বসার ভঙিমা এসব চিরাচরিতের মাঝে নতুর রঙ এনে দেয়া এক হকিয়ার। কবিতা আমার একচিলতে উঠোন যেখানে ইচ্ছেমত পাতা ফেলি, নিকোই, ঝাটপাট দিই, রোদ পোহাই, জোছনা মেখে শুয়ে থাকি । আমি, আমার ভাবনা, অভিজ্ঞতা, মানবিক সম্পর্ক, জীবন জটিলতা ব্যতিত আমার কবিতার শরীর বিকলাঙ্গ। সুতরাং আমি যা, আমার বাহির ও ভেতরগত সামগ্্িরক প্্রকাশই আমার কবিতা।

ছুঁতো খুঁজে বন্ধ অর্গলটা খুলে দিই, কপাট খোলা পেয়ে ঢুকে পড়ে হাওয়া, হাওয়ার সাথে অজস্্র ঘ্্রাণ– এভাবে খুচরো অনুভব জড়ো হয়ে জেগে ওঠে কবিতারা। কবিতার কোন সংজ্ঞাই তাই নৈর্ব্যক্তিক নয়, ফিক্সড নয় । আমার কাছে কবিতা অনেকরকম। আমি নিজেও স্পষ্ট নই কবিতার ব্যাপারে। অনেকটা দৃশ্যে-অদৃশ্যে দোদুল্যমান।

কবিতার ভূবনে ব্যক্তিগতের কোন স্থান নেই । কবিতা আড়াল দাবী করে । আমার আড়ালতত্ত্ব রপ্ত করা হয়ে উঠেনি। সে বেদনা নিয়ত পোড়ায়। আবার এই দহন থেকে পালাতে গিয়ে পুন পুন আশ্্রয় খুঁজি কবিতার কাছে।

কবিকে নিশ্চিতভাবে ঢুকতে হয় শব্দের গহীনে। ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের বহুরৈখিক স্বাদের কাছে পৌঁছতে পারা কবির দক্ষতা বলেই বিবেচিত। কবিও কি বহুরৈখিক নয় ? ক্ষরণে এক, সুখ-বিহ্বলতায় আরেক! নানা মেজাজে কবি স্বতন্ত্্র । ব্যক্তিসত্তা থেকে মানুষ পালাতে পারে না, কবি তো মানুষই। তাই তো নিজের চরি্েত্রর কাছে ধরা পড়ে আত্মসমর্পণ করতে হয় করতেই হয়। কবিতা চিরকালের সত্যভাষণ। যাপনের মধ্য দিয়ে জাতিসত্তার বিকাশ। নানা স্তর অতিক্রম করে ’বর্তমানে’ উপনিত হতে হয়্ । ত্রিশের কবিরা যে ভাষায় কবিতা লিখতেন দ্বিতীয় দশকে এসে নিশ্চয় একরূপভাবে কবিতা লেখা হয় না ! নানা উত্তরণের মধ্য দিয়ে কবিতাও নানাভাবে  বিবর্তিত হয়েছে ভাষা, আঙ্গিক এবং চিন্তাগত দিক দিয়ে। কবি সময়কে জয় করেছে সকল সময়, সকল অবস্থায় । শিল্প ও জীবনের দণ্ডে কবি কেবল শিল্পের পক্ষেই আঙুল তুলেন। নানাবিধ শৃঙ্খল ভেঙে কবি গড়ে তোলেন এক বিচিত্র পৃথিবী । আর সে পৃথিবীতে কবি একা, কবিতা নৈর্ব্যেক্তিক।

সৈয়দ তারিক / পাঠ-প্রতিক্রিয়া

তীরন্দাজকে ধন্যবাদ জানাই। কার, যদিও রিমঝিম আহমেদ-এর সাথে ফেসবুকে আমি সংযুক্ত আর সেই সূত্রে তার কোনো-কোনো কবিতা পড়েওছি, কিন্তু ঠিক সেইভাবে পড়া হয়ে ওঠে নি আগে। তার কবিতা সম্পর্কে তাই তেমন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু এই কবিতাগুচ্ছ পড়ে নিজেকে বকুনি দিই যে আরেকটু খেয়াল করে ও খুঁজে তার কবিতা পড়াই উচিত ছিল। কারণ, সমকালীন কেউ যদি পাঠযোগ্য ভালো কবিতা লেখে তবে কবিতার পাঠক হিশেবে তা উপভোগ করা এবং সম্ভব হলে সেই কথাটা অন্যদের জানিয়ে দেওয়া দরকার।

রিমঝিম আহমেদ-এর কবিতায় শব্দের ব্যবহার মাকে চমৎকৃত করেছে। কবির নামের সাথে তার কবিতার চমৎকার মিল পাওয়া যায়। কবিতার শব্দগুলো যেন নুড়িপাথরের মতো করতলে তুলে ওজন বুঝে নিয়ে নিপুণহাতে ছড়িয়ে দেওয়া। তার কবিতার ভাষা আলুলায়িত নয়, স্মার্ট ও সঙ্গীতময় – আছে নির্মেদ আবেগ। আছে তার ছন্দসচেতনতাও।

তার দেখবার, অনুভব করবার ও প্রকাশের ধারাটি বড় চিত্তহারী : চিত্রল ও ইন্দ্রিয়ঘন। কয়েকটি উদাহরণ বিবেচনা করা যাক :

১. সুন্দরের দিকে মুখ রেখে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ।

২. সারাপথ একসাথে হেঁটে আসে শুক্লা দ্বিতীয়ার চাঁদ ভেজা ঘন সরের মতন।

৩. একদা আত্মহত্যা গাইতে গাইতে সবুজ সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছি।

৪. কুয়াশার অন্তরালে কেউ একজন / দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার একচোখে আমার পিতার লাশ / অন্য চোখে প্রণয়ের হাতছানি।

৫. খয়েরি তিলের ভাঁজ খুলে কেউ যেন মায়া রেখে যায়।

সম্প্রতি ফেসবুকে একটা স্টেটাস দিয়েছেন রিমঝিম, হয়তো মজা করবার জন্যই : ‘আচ্ছা, আমি কি কবি? কবি হলে কাদের কাছে কবি?’

হ্যাঁ, রিমঝিম আহমেদ নিশ্চয়ই কবি, একজন ইতোমধ্যেই দক্ষ-হয়ে-ওঠা ও বিকাশমান কবি। যারা নানা রকম কবিতার স্বাদ নিয়ে আনন্দ পান, তাদের কাছে তার কবিতা সমাদৃত হবে বলে আমার মনে হয়েছে।

২০.১২.১৬

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close