Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ রেহেনা গাজী > কবি আলাওলের দেশের উত্তরসূরি রোহিঙ্গারা আজ শরণার্থী >> মানবাধিকার

রেহেনা গাজী > কবি আলাওলের দেশের উত্তরসূরি রোহিঙ্গারা আজ শরণার্থী >> মানবাধিকার

প্রকাশঃ September 16, 2017

রেহেনা গাজী > কবি আলাওলের দেশের উত্তরসূরি রোহিঙ্গারা আজ শরণার্থী >> মানবাধিকার
0
0

রেহেনা গাজী > কবি আলাওলের দেশের উত্তরসূরি রোহিঙ্গারা আজ শরণার্থী 

 “…নাসাকার রাত সাড়ে নয়টা থেকে বারটা পর্যন্ত গুলি চালাইসিল। একশ রাউন্ড পর্যন্ত গুলি চালাইসিল ত—। অটোমেটিক হাতে নিয়া গুলি চালাইসিল। অটোমেটিক হাতে নিয়া গুলি চালাইসিল আর লাশগুলা পইরা গ্যাছে মনে করেন কিসু রাস্তায় কিসু মসজিদের আসেপাশে এই দানের খেতে—।”

“শুক্রবার দিন নমাওয়াজে (এরপর কিছু শব্দ উচ্চারণের জন্য বোঝা যায় না) হাতঅ ধইরা আমাকো একগা লাথি মাইরঅছে। আঁয়ি উঁশ…” (এরপর বাকি শব্দগুলি আর বোঝা যায় না কিন্তু আড়াল থেকে কেউ ইংরেজিতে বলে যেতে থাকেন কিছু যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, পরে মেডিকেল রিপোর্ট জানায় এই মহিলাকে অচেতন অবস্থায় অন্তত কুড়িবার ধর্ষণ করা হয়েছে।)

প্রথম কথাগুলি বলছেন জহির আলম নামে বছর পঁয়তাল্লিশের এক পুরুষ আর পরের কথাগুলি বলছেন বছর তিরিশের এক মহিলা, নাম জাহানারা। দুজনের মধ্যে জাহির আলমের কথা শুনে পরিস্কার বোঝাই যাচ্ছে লোকটি বাঙলাভাষী, আর জাহানারার কথা বুঝতে অসুবিধা থাকলেও ইনিও যে বাঙলাভাষী তা অবশ্যই আন্দাজ করা যায়। কিন্তু দুজনের কথাতেই যে ভয়াবহতার ইঙ্গিত মিলছে তাতে অন্তত আমাদের অভিজ্ঞতা বা জানার মধ্যে ’৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার বিবরণ ছাড়া অন্য কিছু বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু না, এই দুই বক্তার সব কথাই ২০১১ সালের মে মাসে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে। হ্যাঁ, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনারের রিপোর্ট অনুসারে এরাই হল এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অবাঞ্ছিত ও সবচেয়ে অত্যাচারিত শরণার্থী। এরা রোহিঙ্গা।

 

রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়

 কোন দেশের মানুষ এই রোহিঙ্গারা? উত্তরটা সহজ মনে হলেও সহজ নেই আর। আগেকার বার্মা বা এখনকার মায়ানমারের পশ্চিম সীমান্তের রাখাইন প্রদেশের। অধিবাসী যখন তখন তো মায়ানমারেরই। কিন্তু না। মায়ানমার সরকার সেই ১৯৬২ সাল থেকেই চোখ উলটে দিয়েছে। বার্মার তখনকার নে উইন সরকারের মতে এরা সব তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আসা বাংলাদেশী বা তারও আগে অবিভক্ত ভারতের পূর্ব বাংলা থেকে বিভিন্ন কাজে আসা বাঙালি। সরকারের কথায় ১৮২৬ সালের ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধের পর যারা এদেশে এসেছে তাদের নাগরিকতা গ্রাহ্য হবে না। অথচ এই অবাঞ্ছিত রোহিঙ্গাদের পূর্ব পুরুষরাই যে আলোকিত করে থাকতেন আরাকান (বর্তমানে রাখাইন প্রদেশ) রাজের রাজসভায় তার প্রমাণ আছে। এই রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন পঞ্চদশ শতকের বাঙালি কবি শা মুহম্মদ সগির (কাব্য ইউসুফ জুলেখা), মহম্মদ কবীর  (কাব্য মধুমালতী),মুল্লা দাউদ (চন্দ্রায়ণ কাব্য) আর ষোড়শ শতকে পেয়েছি বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত

উল্লেখযোগ্য কবি দৌলত কাজী (কাব্য লোর চন্দ্রানী বা সতী ময়না) ও সৈয়দ আলাওলকে (কাব্য পদ্মাবতী, সয়ফলমুলক বদিউজ্জামাল, সিকান্দারনামা)। বাংলা সাহিত্যের যে কোনো ইতিহাস বইয়েই রোহিঙ্গা পূর্বপুরুষদের সাহিত্যকৃতির পরিচয় দেওয়ার জন্য আলাদা বিভাগ থাকে। রোহিঙ্গা সাহিত্য না হয়ে তা অবশ্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য পর্বের আরাকান সাহিত্য হিসেবেই পরিচিত। আর এই আরাকান সাহিত্য ইতিহাসের মনযোগী পাঠেই রোহিঙ্গা শব্দটা না পেলেও এই শব্দের আদি রূপটাকে সহজেই পাওয়া যায়। হ্যাঁ রোহাঙ্গ বা রোসাঙ্গ। এই রোহাঙ্গ বা রোসাঙ্গ-ই ছিল তখন আরাকানের রাজধানী। অন্তত মধ্যযুগের মহাকবি আলাওলের সময় তো বটেই। অর্থাৎ ১৬৫১ থেকে ১৬৭৩ সালের অন্তর্বর্তীকালে। কেননা এটাই হল সৈয়দ আলাওলের কাব্য রচনার সময়। পদ্মাবতী কাব্যে তিনি লিখেছেন, “বহু মুসলমান সব রোসাঙ্গে বৈসেন্ত/সদাচারী কুলীন পণ্ডিত গুণবন্ত।” আরাকানের রাজা তখন থাদো মিংদার। এখানে পদ্মাবতী কাব্যে ‘রোসাঙ্গ’ শব্দটির উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘রোসাঙ্গ’ শব্দের স্থানীয় উচ্চারণে ‘রোহাঙ্গ’ (স>হি) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষক ড. আহমেদ শরীফও তেমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া আরাকানের রাজা থিরি থু ধম্মা বা সিকান্দার শাহের রাজত্বকাল ১৬২২ থেকে ১৬৩৮-এর মধ্যে কবি মরদন লিখেছেন ‘ভুবনে বিখ্যাত আছে রোসাঙ্গ নগরী/ রাবণের যেহেন কনক লঙ্কাপুরী।” অর্থাৎ মধ্যযুগের আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গ নগরীর বাসিন্দারা তখন থেকে রোসিঙ্গা বা স্থানীয় উচ্চারণে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ ষোড়শ শতক বা তার আগে থেকেই বাংলাভাষী মুসলিম এই জনগোষ্ঠী তখনকার আরাকান বা এখনকার রাখাইনের বাসিন্দা। আর এই জনগোষ্ঠী কিন্তু শুধুই বাংলাভাষী নন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন তাঁরা। এখন মায়ানমার সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে তাঁরা নাকি আরাকানের অধিবাসীই ছিলেন না কোনো দিন। শুধু সরকার নয়, তখনকার বাৰ্মা বা এখনকার মায়ানমারের বুদ্ধিজীবীরা বলছেন ১৯৫০ সালের আগে এই শব্দটা নাকি কেউ শোনেই নি। এমনকি এদের প্রায় সবাই নাকি ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর বা ১৯৪৭-৪৮ সময়কাল থেকে এবং প্রধানত ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়কার বাংলাদেশ থেকে বাৰ্মা বা মায়ানমারে ঢুকে পড়া অনুপ্রবেশকারী।

দেশহীন মানুষ

লেখার শুরুতেই আমরা পুরুষ ও নারীর মুখে ২০১২ সালের মে মাসের যে ভয়ঙ্কর ঘটনার আভাস পেয়েছি, তার মূলে আছে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মায়ানমারের বৃহত্তর বর্মন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের সম্পর্ক। যার সূত্রপাত ঘটেছিল একদিকে জাপান ও অন্যদিকে ব্রিটিশদের মাধ্যমে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জাপানিদের বাৰ্মা দখলের সময়। জাপানিরা দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হাতে অস্ত্র দেয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আবার ব্রিটিশরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের হাতে অস্ত্র দেয় জাপানি সমর্থক বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের ওপর নজর রাখার জন্য। আর এ থেকেই দেশে বৌদ্ধ-মুসলিম লাগাতার সংঘর্ষের সূত্রপাত। আর ১৯৪৮ সালে বাৰ্মার স্বাধীনতা প্ৰাপ্তির মধ্য দিয়েও এই সম্পর্কের কোনও পরিবর্তন হয়নি। এরপর ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জেনারেল নে উইনের ক্ষমতা লাভ আর রোহিঙ্গাদের চিরস্থায়ী ভাগ্য বিপর্যয়ের শুরু। আগেকার (১৯৪৮-১৯৫৮, ১৯৬০-১৯৬২) উ নু সরকার রোহিঙ্গাদের বার্মার ১৩৫টি জনগোষ্ঠীর একটি হিসেবে যে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৬২ সালে নে উইন সরকার সে স্বীকৃতি কেড়ে নেয়। রোহিঙ্গারা সেই থেকে মায়ানমারে বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই সরকারি পরিচিতি লাভ করে। অর্থাৎ এর পর থেকে ১৫ বছর বয়স হলেই বাৰ্মার বা মায়ানমারের অধিবাসীরা যে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট পাওয়ার অধিকারী হতো, রোহিঙ্গারা আর তা পায়নি। তাদের ওই সময় থেকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বাস করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। অনুমতি ছাড়া সেই নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে তারা যেতে পারবে না। আর এই অনুমতি পেতে গেলে অন্তত বার্মিজ মুদ্রার এক লাখ কিয়াত (৭৩ মার্কিন ডলার) খরচ করতে হবে। দুটোর বেশি সন্তান নিতে পারবে না, আর প্রতি সন্তানের জন্মের আগে তা সরকারকে জানাতে হবে। সরকারি চাকরির অধিকার থাকলো না, উচ্চশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারি হলো, পুরোপুরি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা বুথিডং ও মংডৌ টাউনশিপ অঞ্চলের বাসিন্দারা এই অঞ্চল ছেড়ে প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারবে না। আর ১৯৭৮ সালে জনগণনা পুলিশ ও সেনাবাহিনির ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে থাকা বাধ্যতামূলক করে দিয়ে তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হলো। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমিতে বাইরে থেকে এনে বৌদ্ধ রাখাইনদের বসানো হলো। রোহিঙ্গাদের জন্য সপ্তাহে একটা দিন সেনাবাহিনির অধীনে বিনা মজুরিতে শ্রম দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলো। আর যে কোনো স্থানে যে কোনো অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রশাসন দেখতে চাইলে এই সার্টিফিকেট দেখাতে রোহিঙ্গারা বাধ্য থাকবে।

মায়ানমারে িএই রোহিঙ্গা ছাড়াও সেখানে আরও একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীর নাম ‘কামন’। বার্মার মোট ১৩৫টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৃহত্তম গোষ্ঠী ‘বর্মন’। এরা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬৯ ভাগ। এই সংখ্যাগুরু বর্মনরা ছাড়া মায়ানমারে আছে আরও সাতটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা হলো শান, কারেন, আরাকানি (রাখাইনের বৌদ্ধ উপজাতি), কাচিন, চীন, কায়া ও মন।  এছাড়াও আছে আরও কিছু ছোট জনগোষ্ঠী। এই যেমন আরাকানেই আছে কামন, কামি, ডেইনেট, মায়াজি, মায়ো বা থেটেরা। চীনের হান জনগোষ্ঠী যেমন চীনকে শাসন করে, তেমনি বর্মনরা মায়ানমারকে শাসন করে। তারাই শাসকশ্রেণি। উ নু, নে উইন বা বর্তমানের অং সান সুকি এই বর্মন জনগোষ্ঠীরই মানুষ আর বৌদ্ধ। এই বর্মনদের কথাই সরকারের কথা এবং শেষকথা। এদের চোখে একটু আগে উল্লেখ করা প্রতিটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এমনকি আরেক মুসলিম জনগোষ্ঠী কামনরা মায়ানমারের নাগরিকত্ব পেলেও বাদ গোল রোহিঙ্গারা। এই কামন জনগোষ্ঠীর মুসলমানেরা সরকারি মতে ১৮২৬ সালের সেই ব্রিটিশ-বাৰ্মা যুদ্ধের আগে থেকেই এদেশে আছে, আর রোহিঙ্গারা এসেছে নাকি অনেক পরে। অথচ রোহিঙ্গাদের ইতিহাস যেখানে সেই পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতক থেকে, কামনদের ইতিহাসের শুরু সেখানে সপ্তদশ শতকের মোগল রাজপুত্র শা সুজার সময় থেকে। মোগল সিংহাসন লাভের লড়াইয়ে হেরে গিয়ে তিনি তখন দিল্লি থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আরাকানের রোহাঙে। আর আরাকানের রাজার কাছে তিনি মক্কায় তীর্থ করার জন্য জাহাজ চাইলেন একটি, বললেন থাকবেন না এখানে। শা সুজার সঙ্গে তখন আরাকানে এসেছে তাঁর হারেম, তাঁর দেহরক্ষীরা, অর্থাৎ প্রায় ২০০ আফগান যোদ্ধাও। এই যোদ্ধাদের নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই শা সুজা আরাকানের সিংহাসন লাভের জন্য পরিকল্পনা করছেন খবর পেয়েই আরাকান রাজা সান্দা সুধম্মা শা সুজার শিবির আক্রমন করে নির্বিচার হত্যা ও লুণ্ঠন করেন। শা সুজার পত্নী ও কন্যাদের জায়গা হয় আরাকানরাজের হারেমে। আর কিছু আফগান সৈন্য শেষ পর্যন্ত পালায় ও প্ৰাণে বাঁচে। এরা একসময় রাজার সেনাদলেই স্থান পায় আর এদের উত্তরপুরুষেরাই আজকের কামনা গোষ্ঠীর মানুষ। এদেরকে অবশ্য সেই আরাকান রাজা সান্দা সুধম্মার আমল থেকেই আরাকানের মধ্য-পশ্চিমের রামরি দ্বীপের আকিয়াব গ্রামে থাকতে বাধ্য করা হয়, আর সেই থেকে এই কামন জনগোষ্ঠীকে এই রামরিতেই পাওয়া যায়। এই কামনরা হয়ত আরাকানরাজের রাজকীয় যোদ্ধাদের উত্তরসূরি হওয়ার জন্যই বা পরবতীকালে বৰ্মন রাজাদের সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকার জন্যই বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর (যারা অবশ্যই বৰ্মন জাতিগোষ্ঠীর) সুনজর লাভ করে এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সাটিফিকেট পাওয়ার অধিকারী হয়। এবার মায়ানমারের মুসলমানদের মধ্যে কে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা নাগরিকত্বের কাগজ পাবে আর কে ফরেন রেজিস্ট্রেশন সাটিফিকেট বা বিদেশি অনুপ্ৰবেশকারী হিসাবে গণ্য হবে, তা নির্ভর করবে জনগণনা পুলিশের ওপর। হ্যাঁ, জনগণনা পুলিশ। আর নাগরিকত্বের ভিত্তি ধরা হল ব্রিটিশ-বাৰ্মা যুদ্ধের সেই ১৮২৬ সাল। মায়ানমার সেনাবাহিনী বা ‘তাতমাদৌ’কে সঙ্গে নিয়ে জনগণনা পুলিশের একেবারে এলাকা ধরে ধরে ঘরে ঢোকা শুরু হল ১৯৭৮ সালে। আর রোহিঙ্গাদের বড় সংখ্যায় দেশছাড়ার হিড়িকের সেই শুরু। পাকাপাকিভাবে বিদেশি ছাপ পাওয়ার ভয়ে আর সেনাবাহিনী বা ‘তাতমাদৌ’-এর অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ১৯৭৮ সালে প্রায় ২০০,০০০ থেকে ২৫০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী আরাকান বা এখনকার রাখাইন প্রদেশের পশ্চিম সীমার নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করে। আর ১৯৯১ সালের মধ্যে নাফ নদী পার হয় আরও ২৫০,০০০ রোহিঙ্গা। এই অবস্থায় বাংলাদেশের আবেদনে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করে এবং বাংলাদেশ, মায়ানমার, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে ইচ্ছে না থাকলেও মায়ানমার শরণার্থীদের নিজের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। ফিরিয়ে নেয় বিদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ইহুদিরা যেভাবে নাৎসিদের ক্যাম্পে পাঠিয়েছিল, সেইরকম ক্যাম্পে ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আর মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মংডু ও বাংলাদেশের টেকনাফ প্রদেশের অন্তর্বতী নাফ নদীর সীমানায় মায়ানমার থেকে পরবর্তী কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা রোধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আর ওই সময় থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের সেনাবাহিনী অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয়। তারা শ্রেফ অনুপ্রবেশকারী। তাদের স্বাধীন জীবন-জীবিকার বা নিজের মতো করে বেঁচে থাকবার কোনো অধিকার নেই। ক্যাম্পে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের তখন থেকে বেঁচে থাকতে হয়েছে জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশনের দেওয়া খাদ্য-বস্ত্রের ওপর নির্ভর করে। মায়ানমারের সেনাবাহিনির মর্জিমাফিক যে কোনো কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। আর তাদের ছেড়ে আসা ঘরবাড়ি রাখাইন প্রদেশের বৌদ্ধ নাগরিকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সব শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসেনি, শতকরা ৬৫ ভাগ শরণার্থী কিছুতেই ফিরতে চায়নি। কিন্তু ২০০১ সালের মধ্যে অন্তত আড়াই লাখ শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়েছিল।

গণহত্যার শিকার

কিন্তু কী ঘটেছিল ২০১২ সালের মে মাসে? অর্থাৎ এক নারী ও এক পুরুষের বর্ণনায় যে দিনগুলি নরক হয়ে এসেছিল রোহিঙ্গাদের জীবনে? ২৮ মে মা থিডা ট্রে নামে রাখাইন জনজাতির এক মহিলা রামবারি অঞ্চলের কায়ুক নি ম গ্রামে নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে একদল লোক তাঁর সবকিছু লুঠ করে প্রথমে ধর্ষণ করে, পরে তাঁকে খুন করে। ঘটনাচক্রে যাদের হাতে সেই রাখাইন মহিলা ধর্ষিত ও খুন হন তারা ছিল রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের। আর এতেই আগুন জ্বলে ওঠে। দক্ষিণের রাখাইন অধুষিত টংগপ অঞ্চল তাদের এলাকায় বাইরে থেকে কোনো রোহিঙ্গা ঢোকায় নিযেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এরপর জেনেবুঝে বা না জেনে একটি বাসে করে দশজন রোহিঙ্গা কোনো কাজে ওই শহরে ঢুকেছে খবর পেয়ে টংগীপের জনা পঞ্চাশ মানুষের জনতা বাসটিকে থামায় ও ওই দশজন রোহিঙ্গাকে বাস থেকে নামিয়ে হত্যা করে। এই খবর ইন্টারনেটের মাধ্যমে উত্তরের রোহিঙ্গা অধূষিত মংডু শহরে পৌঁছালে উত্তেজনা তৈরি হয়। রোহিঙ্গারা সরকারের কাছে প্রতিকার চায়। মায়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গনে কামনরা রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। সরকার নিশ্চুপ থাকলে মংডু শহরের রোহিঙ্গারা সেখানকার কিছু রাখাইন জনজাতির ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিলে সরকারের টনক নড়ে। সেনাবাহিনী নামে। রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভের ওপর নির্বিচার গুলি চলে। আল জাজিরার একটি তথ্যচিত্রে জাহির আলম নামে বছর পয়তাল্লিশ বছর বয়সের এক পুরুষ আর বছর তিরিশের জাহানারা নামের মহিলার মুখে সেই নরকসদৃশ দিনগুলির বিবরণ পাই।

রোহিঙ্গারা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গণহত্যার শিকার হয় ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে আর তারই জের ধরে এখন চলছে গণহত্যা ও গণবিতাড়ন। জায়গাটিকে শূন্য করে ফেলার প্রক্রিয়া। ২০১৬ সালে বলা হয়েছিল রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা নাকি মংডু অঞ্চলের এক পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে ৮ পুলিশ কর্মীকে খুন করে। কী হল এর পরে? এরপর মায়ানমারের সেনাবাহিনী ‘তাতমাদৌ’ চরম ব্যবস্থা গ্রহণে ঝাঁপিয়ে পড়ে মংডু অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের ওপর। প্রথমে শুরু হল গ্রেফতার এবং সেনাবাহিনীর খুশিমতো গ্রেফতার। এরপর শুরু হল লুটপাট, ঘরবাড়িতে আগুন ধরানো। ক্রমান্বয়ে এল গণধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই নিহত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেল। দেশের কোনও খবরের কাগজে এই হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ পর্যন্ত দেখা গেল না। স্বদেশি বা বিদেশি কোনও সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মী বা কমিটিকে মংডু অঞ্চল কেন, ঘটনাস্থল থেকে অনেক আগেই সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীদের আটকে দেওয়া হল। রোহিঙ্গা অধূষিত মংডু অঞ্চল গোটা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হল। পালানোর সময় পুরুষদের হত্যা করা হচ্ছে, মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে, আর শিশুদের জ্বলন্ত ঘরবাড়ির আগুনে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর যারা রাখাইন প্রদেশ ও বাংলাদেশের সীমান্তবতী নাফ নদী ধরে পালাবে বলে নৌকায় উঠেছিল তাদের নৌকা গুলি করে মানুষশুদ্ধ ডুবিয়ে দেওয়া হল। ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই গণহত্যার ওপর তাদের তদন্ত রিপোর্টে মায়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা উপরের সবকটি অভিযোগ সত্য বলে জানায়। শুধুমাত্র এই ঘটনার ফলে একমাসের মধ্যে নতুন করে ৯২,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এখন সেই সংখ্যা চার লাখ ছুঁই ছুঁই করছে।

প্রতিরোধ আন্দোলনে

আগেকার বাৰ্মা বা এখনকার মায়ানমারে কি রোহিঙ্গাদের অধিকারের প্রতি সহানুভূতিশীল নেই কেউ? ছিল না? ছিল। জাতীয়তাবাদী আরকানিরা। এরা রাখাইন প্রদেশের অধিবাসী যারা আরাকানের ওপর বর্মনদের আধিপত্য মেনে নিতে পারে নি। ১৭৮৪ সালের বর্মনদের আক্রমণে আরাকানের পতনের কথা তারা ভুলতে পারে নি। বৰ্মনদের শাসন না মেনে তারা ব্রিটিশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আবার জাতীয়তাবাদী এই আরাকানিরাই কিন্তু ১৮২৬ সালের পরে গোটা বাৰ্মাই ব্রিটিশদেৱ হাতে চলে যাওয়ায় বৰ্মনদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা-যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয়তাবাদীরা বুঝতে পারে বার্মিজ বর্মন জনজাতির নেতৃত্বে থাকা বার্মিজ নেতৃত্ব কখনই তাদের সমানাধিকার দিতে আগ্রহী নয়, আর তাই ১৯৪০ সাল থেকেই এই আরাকানি জাতীয়তাবাদীরা আরাকানকে একাধারে ইংরেজ ও অন্যদিকে বার্মিজ প্রভাবমুক্তির আন্দালন শুরু করে। তারা ইংরেজদের কাছে পৃথক আরাকান রাষ্ট্রের দাবি জানাতে থাকে। সেই জাতীয়তাবাদী আরাকানিরা কিন্তু কিছুটা হলেও সহানুভূতিশীল ছিল রোহিঙ্গাদের প্রতি। পরবর্তীকালে মতাদর্শগতভাবে দুই ভাগ হয়ে গিয়েও একমাত্র এই জাতীয়তাবাদী আরাকানিরাই রোহিঙ্গাদের আলাদা জনগোষ্ঠী হিসেবে না স্বীকার করেও রোহিঙ্গারা যেন আরাকানের আর পাঁচজন সাধারণ নাগরিকের মতো সব অধিকার ভোগ করতে পারে সে ব্যাপারে কথা দিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই জাতীয়তাবাদীদের সম্বন্ধে মোহভঙ্গ হল রোহিঙ্গাদের। ইতিমধ্যে বৃটিশ-ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে রোহিঙ্গারা মায়ু উপত্যকা অঞ্চলকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে যোগাযোগ করলেন পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেতা মোহম্মদ আলী জিন্নার সঙ্গে। আবেদন ছিল আরাকানকে যেন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসাবে নেওয়া হয়। কিন্তু মোহম্মদ আলী জিন্না পাকিস্তানের প্রধান হয়ে অন্য রাষ্ট্র বার্মার ব্যাপারে নাক গলাতে চান নি। অর্থাৎ জিন্না রোহিঙ্গাদের আবেদনে কর্ণপাত করেন নি। রোহিঙ্গাদের জীবনে তাই শুধুই হতাশা আর আশাভঙ্গের বেদনা। আর এই হতাশা থেকেই তারা বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্ৰ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সশস্ত্ৰ মুজাহিদ বাহিনি তৈরি করেন। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত এই মুজাহিদরা নিজেদের প্রধান বাসস্থান অঞ্চল মায়ু উপত্যকাকে বাৰ্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন করে যান। পরের দিকে বিশেষ করে সত্তরের দশকে ইসলামি আন্দোলনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মুজাহিদ আন্দোলন তাদের ভিত্তি হারাতে থাকে। এরপর ১৯৭৪ সালের পর বার্মায় জনগণনার ছলে ডাইনি খোঁজার মতো বিদেশি খোঁজা শুরু হলে রোহিঙ্গারা এর প্রবল আতঙ্কিত বোধ করে। ১৯৭৮ সালে বার্মিজ সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে জনগণনা পুলিশ মায়ু উপত্যকায় প্রবেশ করলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালানোর হিড়িক পড়ে যায়। জেনারেল নে উইন কুড়ি বছর ধরে এই রোহিঙ্গাদের দমন করার নামে নানা পরিকল্পনা করেন, রোহিঙ্গাদের দমন করার নামে তার সামগ্রিক পরিকল্পনা অপারেশন ব্লু ড্রাগন নামে কুখ্যাত। এই অপারেশন ব্লু ড্রাগনের বিরুদ্ধে বিশেষ করে ১৯৭৮ সালে বিদেশি ছাপ দিয়ে রোহিঙ্গাদের হাতে ফরেন রেজিস্ট্রেশন সাটিফিকেট ধরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ থেকে রোহিঙ্গাদের তরফ থেকে যে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়, তা বিদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের সক্রিয় করে আর এই বিদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বে তৈরি হয় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন। স্বদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র আন্দোলনে রোহিঙ্গা ন্যাশনাল আর্মিকে সাহায্য করার জন্য এরা অস্ত্ৰ সংগ্রহ শুরু করে। বলা হয় এদের হাতে কিছু এ কে ৪৭ রাইফেল, কিছু আর পি জি-২ রকেট লাঞ্চারও আছে। এদের সশস্ত্র প্রতিরোধ সামলাতে ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনী ‘তাতমাদৌ’ অভিযান শুরু করে। অভিযান করতে গিয়ে ‘তাঁতমাদৌ’ অবৈধভাবে বাংলাদেশেও প্রবেশ করে। এই অভিযানের সময় ১৯৯২ সালের মধ্যে বার্মিজ সেনাবাহিনী তাতামাদৌ অন্তত ২৫০,০০০ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বের করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ-বাৰ্মার সীমান্ত নদী নাফ অতিক্রম করে বাইরের দেশের রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন’-এর ১২০ জন সদস্য অস্ত্রসহ আরাকান বা রোহিঙ্গা অধূষিত বর্তমান বার্মার পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন প্রদেশের মায়ু উপত্যকায় প্রবেশ করে। এরা ২৮ এপ্রিল মংডু অঞ্চলে কিছু বিস্ফোরণ ঘটায় আর এসব বিস্ফোরণে কিছু সরকারি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে বার্মিজ সেনাবাহিনীর অত্যাচারের মাত্রাও বাড়তে থাকে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন খুব একটা হিংসাত্মক ছিল বলে কখনই বলা যাবে না, অন্তত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হতে থাকা প্রতিরোধ আন্দোলনগুলির সঙ্গে তুলনা করলেও। কিন্তু ২০১২ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনীর আক্রমণের পর তৈরি হল রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধ আন্দোলন, যাকে বলা হচ্ছে সশস্ত্ৰ মুখ হারাকো আল ইয়াকিন বা বিশ্বাসীদের আন্দোলন। আর এই হারাকো উল ইয়াকিনের মংডুর এক সীমান্ত পুলিশ ফাঁড়ির ওপর হিংসাত্মক আক্রমণের অজুহাত তুলেই মায়ানমারের সেনারা ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মায়ানমারের ইতিহাসে ভয়ঙ্করতম আক্রমণ করে বসল। ২০১৬-র ৯ অক্টোবর রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা অধূষিত মংডু অঞ্চলে নাকি বিদ্রোহীদের হাতে আক্রান্ত হয় মায়ানমার বর্ডার পুলিশ পোস্ট, আর এতে নাকি ৮ জন বর্ডার পুলিশ নিহত হয়। হারাকো উল ইয়াকিন এই আক্রমণের দায় স্বীকার করে। এরপর এখন, গত কয়েক মাস ধরে গণহত্যা আর গণধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়ে তাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করছে। চলছে জাতিগত বিতাড়ন ও নিধন।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ

সেই ১৯৭৪ সালের উনু-র সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের সবরকম নাগরিক অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে এদের একেবারে রাষ্ট্রহীন করার মধ্যে দিয়ে যে নিপীড়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তা এখনও শুধু চালু নয়, বরং তার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করা হচ্ছে। একসময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে গোটা পৃথিবীর আশা ছিল শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া মায়ানমার সরকারের কার্যকর প্রধান অং সান সুকির ওপর। কিন্তু তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া ২০১৬ সালের বর্বরতার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে যাচ্ছেন আর ‘পৃথিবীর সব দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে’ বলে গণহত্যার ঘটনাকে হালকা করার চেষ্টা করায় গোটা পৃথিবীই হতাশ আর ক্ষুব্ধ।  আজ থেকে পাঁচ-ছশ বছর আগে বা তার আগে থেকেই স্বাধীন আরাকানে মুসলিম-বৌদ্ধ শান্তিপ্রিয় সহাবস্থানের বা বন্ধুত্বের যে ঐতিহ্য চালু হয়েছিল, তা হঠাৎ করে এতটা বিপর্যস্ত হল কেন? শুধু কি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইংরেজ বা জাপানের জন্য? এই দুই দেশ রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে এদের একজনকে আর একজনের বিরুদ্ধে লড়িয়ে নিজেদের স্বাৰ্থসিদ্ধির যে চেষ্টা করেছিল তাই কি এদের পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা বা শক্ৰতার একমাত্র কারণ?

কিন্তু রোহিঙ্গারা কেন দেশছাড়া হবে? তারা যাবে কোথায়? নিরুপায় হয় তারা বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে। এরপর? মায়ানমার সরকার ওদের হাতে কেন রেজিস্ট্রেশন সাটিফিকেট ধরিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল যে ওরা বহিরাগত? ওদের প্রতি কি মায়ানমার সরকারের কোনও দায়ীত্ব নেই? বাংলাদেশ আগে বিরোধিতা করলেও এখন রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণ আশ্রয় দিচ্ছে। জাতিসংঘও সীমিত আকারে এগিয়ে এসেছে। অন্যদিকে থাইল্যাণ্ড, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি মায়ানমার সরকারের আচরণের তুমুল বিরুদ্ধতা করেও জানিয়ে দিয়েছে ওরা রোহিঙ্গাদের কোন ভাবেই আশ্রয় দিতে পারবে না। মায়ানমার সরকারকেই ওদেরকে নিজের দেশের নাগরিকের মৰ্যাদা দান করতে হবে। এই দেশগুলি বাইরে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের বা কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে।

অন্যদিকে বৌদ্ধ ধর্মগুরু, দলাই লামা মায়ানমারের বৌদ্ধদের কাছে এক বার্তা পাঠিয়েছেন। এই বার্তায় তিনি বলেছেন, “কিছু বৌদ্ধ সন্যাসী মুসলিম ভাইদের উপর নেতিবাচক আচরণ করছেন, তাদের উচিত বুদ্ধদেবের মুখ স্মরণ করা।” তিনি আরও বলেছেন, “বুদ্ধদেব জীবিত থাকলে তিনি নিশ্চয়ই মুসলিম ভাই-বোনদের রক্ষা করতেন।” বৌদ্ধ ধর্মগুরু দলাই লামা মায়ানমারের কার্যত প্রধান অং সান সুকির কাছে আবেদন করেছেন, “আপনাকে এই বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে চলতে থাকা অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার বাতাবরণের অবসান ঘটাবার দায়িত্ব নিতে হবে।” তার কথায়, “আপনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া নেত্রী, আর তাই গোটা পৃথিবী মনে করে মুসলিম ও বৌদ্ধ ভাইবোনদের মধ্যে চলমান দীর্ঘকালের এই উত্তেজনা প্রশমন করা আপনার নৈতিক দায়িত্ব।” এই দলাই লামা ও অং সান সুকি- এই দুজনের দিকেই এখন রোহিঙ্গারা তাকিয়ে। এই দুজনের প্রচেষ্টায় একমাত্র রোহিঙ্গাদের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

আর একজনের কথা এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি উদারভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে চলেছেন, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু যে সংখ্যায় (মাত্র গত কয়েক সপ্তাহে এই সংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে) বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে, বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশের জন্য তা একটা বিরাট বোঝা। তবু বাংলাদেশের সরকারের প্রশংসা করতেই হয়। মানুষ যে মানুষের জন্য, তারা তার প্রমাণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশের মানুষও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে অং সান সুকিকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে অনাগত দিনগুলিতে তিনি আর মায়ানমার জাতিগত নিধনের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বে ধিকৃত হবে। আমরা আশা করবো, যে জাহানারার কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, অচিরেই সেই অত্যাচার বন্ধ হবে। এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যে উদ্যোগটি হবে মানবিক। শরণার্থী নয়, রোহিঙ্গারা ফিরে পারে দেশ-রাষ্ট-ভূমি।

তথ্যসূত্র

১) দ্য রোহিঙ্গা ইসু : এ থিওরি অবস্টাকল বিটুইন মায়ানমার (বাৰ্মা) অ্যান্ড বাংলাদেশ, কেই নেমেতো।

২) দ্য রোহিঙ্গাজ, আজিম ইব্রাহিম।

৩) রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন এম হাবিবউল্লাহ।

৪) দ্য হিডেন ডকুমেন্ট- আল জাজিরা (ফিচার্ড ডকুমেন্টারি)।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close