Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ রোখসানা চৌধুরী / হেনরি জেমস : ভিড়ের মধ্যে একা

রোখসানা চৌধুরী / হেনরি জেমস : ভিড়ের মধ্যে একা

প্রকাশঃ December 29, 2016

রোখসানা চৌধুরী / হেনরি জেমস : ভিড়ের মধ্যে একা
0
2

হেনরি জেমসের জন্ম (১৮৪৩-১৯১৬) নিউ ইয়র্কের ধনী ও সম্ভ্রান্ত আমেরিকান পরিবারে। খামখেয়ালী বাবার কাছ থেকেই তিনি মূলত প্রতিষ্ঠানবিরোধী আচরণের উৎসাহ পান। ভৌগোলিক বংশীয়সূত্রে প্রথমে প্যারির উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেন। তারপর লন্ডনে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটান এবং সিংহভাগ রচনাও সেখানে সম্পাদিত হয়; যদিও নিয়মিত ইতালিতে যাতায়াত অব্যাহত ছিল শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং খাদ্যের প্রতি ভালোবাসার জন্য। তাঁর শিক্ষা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। পরে ১৮৬২ সালে তিনি আইন পড়ার জন্য যোগ দেন হাভার্ডে। নিউ ইংল্যান্ডের লেখক গোষ্ঠির সদস্য জেমস রাসেল লোয়েল, এল ডাবলিউ, লংফেলো, উইলিয়াম ডিন প্রমুখ ছিলেন তার বন্ধুস্থানীয়। হাওয়েলের আটলান্টিক মান্থলি এবং অন্য কয়েকটি মার্কিন পত্রিকায় লেখালেখি করতে গিয়ে জেমসের সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত হয়। ১৮৬০-এর দশকের শেষদিক থেকে পুরোনো ইউরোপীয় সভ্যতা তাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে শুরু করে। এইসময় ইউরোপে তিনি দীর্ঘদিন কাটান। শেষে ১৮৭৫ সালে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন লন্ডনে। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত জেমস লন্ডনেই ছিলেন। তারপর তিনি চলে যান রাইতে। সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটেনের নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন।
হেনরি জেমস ছিলেন বহুমুখি প্রতিভাধর লেখক। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, সাহিত্য সমালোচনা, আত্মজীবনী- সবকিছুই সারাজীবন ধরে নিয়মিত লিখে গিয়েছেন। তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। রোডেরিক হাডসন (১৮৭৫) থেকে শুরু করে যে চারটি উপন্যাস আমরা পাই সেগুলি তাঁর পরিণত উপন্যাসগুলির তুলনায় অনেক সরল সাদাসিধে পদ্ধতিতে লেখা। এগুলির মধ্যে তিনি ধারণ করেছেন পুরোনো ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও নব্য আমেরিকান সভ্যতার পার্থক্যের দিকটিকে। এই শ্রেণির অপর তিনটি উপন্যাসের নাম দ্য আমেরিকান (১৮৭৬-৭৭), দ্য ইউরোপিয়ানস (১৮৭৮) ও দ্য পোর্টেট অব দ্যা লেডি (১৮৮১)। শেষোক্ত উপন্যাসটিকে তাঁর প্রথম জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা বলা চলে। এই উপন্যাসের সূক্ষ্ম চরিত্র বিশ্লেষণ ও সযত্ন রচনাশৈলী জেমসকে তার সাহিত্যজীবনের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
এরপর যে তিনটি উপন্যাস তিনি লেখেন সেগুলি মূলত তার ইংরেজ চরিত্র অধ্যয়নের ফল। এগুলি হল দ্য ট্রাজিক মিউজ (১৮৯০), দ্য স্পয়েলস অব পয়েন্টন (১৮৯৭) এবং দ্য অকার্ড এজ (১৮৯৯)। এগুলোর মধ্যে দ্য স্পয়েলস অফ পয়েন্টন উপন্যাসটি জেমসের রচনাশৈলীর বিবর্তনের অন্যতম স্বাক্ষী। সাহিত্যজীবনের মধ্যগগনে তিনি রচনা করেন তিনটি উপন্যাস- দ্য উইংস অব দ্য ডাভ (১৯০২), দ্য এ্যাম্বাস্যাডারস (১৯০৩) ও দ্য গোল্ডেন বাওল (১৯০৪)। এই তিন উপন্যাসে তিনি আবার ফিরে আসেন ইউরোপীয় আর আমেরিকান সংস্কৃতির বিরোধের জায়গাটিতে। তবে এখানে চরিত্রচিত্রণে তিনি অনেক সূক্ষ্ম এবং শিল্পসৃজনে এক দক্ষ রূপকার। তাই আধুনিক উপন্যাসের সারিতে এগুলির নাম উঠে আসে সবার আগে।
মার্কিনীদের জীবনধারা অধ্যয়ন করে তিনি দুটি অসামান্য গ্রন্থ লিখেছিলেন- ওয়াশিংটন স্কোয়ার (১৮৮১) ও দ্য বস্টনিয়ানস (১৮৮৬)। আরও দুটি উপন্যাস তিনি অস্পূর্ণ রেখে গিয়েছিলেন যেগুলো দ্য সেন্স অফ দ্য পাস্ট এবং দ্য আইভরি টাওয়ার নামে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।
তিনি প্রায় একশটি ছোটগল্প লিখেছিলেন। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগ্রন্থের নাম দ্য টার্ন অব দ্য স্ক্র (১৮৯৮)। কিন্তু অতিপ্রাকৃতের প্রতি তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি পরিস্ফুট হয় দ্য অল্টার অব দ্য ডেড, দ্য বিস্ট ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য বার্থ প্লেস এ্যান্ড আদার টেলস (১৯০৯) গল্প-সংকলনে। অন্যান্য গল্পগুলো সংকলিত হয়েছে দ্য ম্যাডোনা অব দ্য ফিউচার এ্যান্ড আদার টেলস (১৮৭৯), দ্য অ্যাসপার্ন পেপারস এ্যান্ড আদার স্টোরিজ (১৮৮৮), টারমিনেশনস (১৮৯৫) ও দ্য টু ম্যাজিকস (১৮৯৮) সংকলনগুলিতে।
তাঁর আত্মজৈবনিক রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য আ স্মল বয় অ্যান্ড আদারস (১৯১৩), নোটস অব আ সন অ্যান্ড ব্রাদার (১৯১৪) এবং মরনোত্তর প্রকাশিত খ- রচনা টারমিনেশনস (১৯১৭)। ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় জেমসের পত্র-সংকলন। এছাড়া নোটস অন নভেলিস্টস (১৯১৪) এবং প্রবন্ধ দ্য আর্ট অব ফিকশন (১৮৮৪) তাঁর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত দ্য নোটবুক অব হেনরি জেমস লেখককে জানবার জন্য একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ।
[দুই]
হেনরি জেমসের সম্মানে পোস্টাল সার্ভিস লিটারি আর্ট সিরিজের অংশ হিসেবে ৮৯ সেন্ট মূল্যের যে স্ট্যাম্প বের হয়েছিল পোস্টাল অফিস থেকে, সেখানে জেমস ছিলেন ৩১তম সম্মানিত ব্যক্তি।
এটাকে একধরণের আয়রনি বা শ্লেষও বলা যেতে পারে। কারণ এটা ছিল হেনরি জেমসের মৃত্যুর শতবর্ষপূর্তির বছর, আবার এই বছরেই তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন। এটা অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের অংশগ্রহণের সমর্থনের বিষয়। উল্লেখ্য, আমেরিকা ১৯১৭ সালের এপ্রিলের পূর্বে যুুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তবুও, ইংল্যান্ডের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতাকে মাথায় রেখেও বলা যায়, তাঁর আনুগত্য সম্পূর্ণভাবে তার জন্মভূমির প্রতিই নিবেদিত ছিল। এর প্রমাণ রয়েছে তার সমস্ত রচনায়, যা ছিল মার্কিন চরিত্রচিত্রণে পূর্ণ: গ্রাম্যতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় থাকলেও একইসঙ্গে তা সাহসিকতা ও দৃঢ়তারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। নৈতিকভাবে যারা সর্বদাই ইউরোপীয় ভাবমূর্তির চাইতে শ্রেয়তর রূপে রূপায়িত হতে পেরেছে।
হেনরি জেমসের প্রারম্ভিক রচনাগুলো যদিও অধিক পঠিত এবং প্রভাবসঞ্চারি বলে মনে করা হয়, তবুও শেষের দিকের রচনাগুলো উপন্যাসশিল্পের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। এগুলো শিল্প-প্রকরণের দিক থেকে জটিলতর। প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁর জনৈক বন্ধু এ প্রসঙ্গে চমৎকার একটা মন্তব্য করেছিলেন : ‘যতটা না সাবাড় করেছেন তারচেয়ে বেশি চিবিয়েছেন।’
জেমসের প্রারম্ভিক সরলতর রচনার সাথে শেষের দিককার রচনার জটিল ও গভীরতর শৈলী পরস্পর স্থানান্তরিত হয়েছিল। উপন্যাস শিল্পের কাঠামোগত পূনর্নির্মাণের কারণে, যার অনেকটাই চেতনাস্রোতের উপর ভর করে নির্মিত, তার পাঠকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
হেনরি জেমসের অবদান এই যে, বিংশ শতাব্দিতে পদার্পণের মুহূর্তে তিনি উনিশ শতকীয় স্টাইলকে পরিহার করেছিলেন। তিনি চূড়ান্তভাবে স্বভাবগত সাযুজ্য রক্ষা করছিলেন সমকালীন ইউরোপীয় আধুনিকদের সাথে। এদেও মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন জেমস জয়েস, ডি. এইচ. লরেন্স এবং ভার্জিনিয়া উলফ। শেষজীবনের জেমস ছিলেন অস্পষ্ট, প্রহেলিকাচ্ছন্ন। তার বড় ভাই উইলিয়াম জেমস সাহিত্য রচনায় বাস্তবতাবোধ এবং স্বচ্ছতর রুচি তৈরিতে এবং দর্শন ও মনস্তত্তে¦র জগতকে উন্মোচনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখে গেছেন। তার কথার সূত্র ধরে বলা যায়, জেমসের রচনায় ক্রমশ আধুনিকতার দুর্বোধ্য চিহ্নগুলো উঠে আসছিল আর তিনি প্রত্যাখ্যান করছিলেন বাস্তবতাবোধের সরল স্পষ্ট দিকগুলিকে। অর্থাৎ জেমস ছিলেন মনস্তত্ত্বনির্ভর চেতনাপ্রবাহনির্ভর প্রথম গদ্যশিল্পী।
কেন তুমি তোমার ভাইকে অনুগ্রহ করছনা, বসে যাও এবং লিখতে শুরু করো নতুন কিছু, সেখানে থাকবে না কোন অস্পষ্ট আলো-আঁধারি অথবা প্লটের নির্মাণে কোন সেকেলে বস্তাপচা ভাব। বরং থাকবে প্রবল মানসিক বলিষ্ঠতা, সিদ্ধান্তগ্রহণে দৃঢ় নিশ্চায়ক, সংলাপে থাকবেনা জড়তা, মনস্তাত্ত্বিক বিবরণী এবং আঙ্গিক হবে বিশুদ্ধ, সহজ ও সাবলীল।
জেমস ছিলেন নতুন যুগের চূড়ান্ত আধুনিকতাবাদী, এমনকি যন্ত্রপাতির ব্যবহারেও তিনি এর পরিচয় দিয়েছেন। টাইপরাইটারে ‘ডিকটেশন’ দিয়ে উপন্যাস গল্প লেখাতেন তিনি। টাইপ রাইটারের শব্দে তিনি এতটাই অভ্যস্ত ছিলেন যে হৃদরোগে আক্রান্ত হবার পর মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তিনি এভাবে লেখাতে ভালোবাসতেন এবং সেই শব্দ শুনে তৃপ্তি পেতেন।
টাইপরাইটারের মতো তিনি চলচ্চিত্রের সদ্যজাত বর্ণনামূলক ফর্মের প্রতি মোহমুগ্ধ ছিলেন। এই মুগ্ধতা তাঁর পরবর্তী উপন্যাস রচনার গতিকে স্তব্ধ করে দেয়। ফলে, ১৮৯০ সলে মঞ্চের জন্য নাটক লেখার চেষ্টা করেন। যদিও সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। দর্শক তার এই প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা সহকারে ফিরিয়ে দেয়। এর ব্যাখ্যা হিসেবে অনেকে বলে থাকেন ভিক্টোরিয়ান শিকড়কে ঠেলে সরিয়ে দেবার ফলে এই ব্যর্থতা। কেননা ভিক্টোরিয়ানদের পছন্দ ছিল অলংকার-বাহুল্য ও অসংখ্য চরিত্র-ঘটনার গাদাগাদি সন্নিবেশ। এছাড়া ভিক্টোরিয়ানদের রচনার বৈশিষ্ট্যই ছিল শব্দের জমকালো উপস্থাপন। কেউ হয়তো বলতে পারেন জেমস আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলোকেই প্রাধান্য দিয়ে গেছেন, কিন্তু তার রচনায় সম্পূর্ণভাবে সেগুলোকে সংযুক্ত করতে পারেননি কেন? আসলে তিনি চলচ্চিত্র ও টিভি, অর্থাৎ অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যমে এধরণের কিছু কাজ দেখিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা কোন অর্থেই সফল হয়নি। এছাড়া আরো একটি পথে তার আধুনিকতার অসম্পূর্ণ পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। আর তা হলো, তিনি কখনও সামনে অগ্রসর হওয়া ছাড়া পিছনে তাকিয়ে দেখেননি। তার শেষ দিককার রচনায় ভিক্টোরিয়ান পূর্বসূরীদের শব্দ ও বাক্যের আড়ম্বরপূর্ণতার কোন চিহ্ন দেখা যায়না। এটা ছিল নিবিড় গভীর এবং তুলনামূলকভাবে জটিল, সম্পূর্ণ নতুন ও সম্মুখবর্তী রচনাভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গি। জেমসের পছন্দ ছিল বিরোধাভাস এবং এমন ভাবনা যা এতটাই আধুনিক হবে যে আধুনিক যে-কোনো পাঠককে অভিভূত করে দিতে পারবে।

[তিন]
হেনরি জেমসের সৃষ্টিসম্ভারের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তার শেষের দিককার রচনাসমূহের অনেক কিছুই বর্তমান সময়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক, যেমন- অসম বিবাহের ক্ষেত্রে নারীবাদী দাবীর জটিলতা (দ্য বোস্টোনিয়ানস); বিপ্লবের আদর্শ সন্ত্রাসে রূপান্তরিত হওয়ার নৈতিক জটিলতা (দ্য প্রিন্সেস কাসামাসিমা); সন্তানদের উপর বিবাহ বিচ্ছেদের প্রভাব (হোয়াইট মেইজি নো); পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্কে বিজড়িত হওয়ার বিপদসমূহ (দ্য গোল্ডেন বাওয়েল)।
জেমস আরো আগাম বার্তা দিয়েছেন বিশ্বায়ন সম্পর্কে, যাকে তিনি ‘আর্ন্তজাতিক থিম’ নামে অভিহিত করে উদযাপন করতে চেয়েছেন। কিন্তু জেমসের রচনার বস্তুগত বিষয়ের চাইতে ধারণাগত মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি প্রাধান্য লাভ করেছে যা সবচাইতে আধুনিক বলে উল্লেখ করা যেতে পারে। দৃঢ়তার পরিবর্তে চিরায়ত সত্যের প্রতি এক অনিশ্চিয়তা আমরা লক্ষ্য করি যা পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের রচনাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার রচনার সূত্র ধরেই তারা অর্জন করেছিল বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি।
শব্দ সাধারণভাবে যোগাযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যম, কিন্তু তার অর্থের প্রসারণ ঘটলে সুবিধার চাইতে যোগাযোগের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। জেমসের সংলাপ প্রক্ষেপণের ধরণও ছিল অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত যা চরিত্রের কথোপকথনে অর্থের পূর্ণতা দান করতে অক্ষম। তার রচনাভঙ্গি বর্ণনাত্মক হওয়া সত্ত্বেও পাঠক তার গন্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞই থাকেন, এবং পাঠকভেদে তা ভিন্ন ভিন্ন পাঠ দাবি করে বসে। উদাহরণস্বরূপ ‘উইংস অব দ্য ডাভ’(১৯০২) উপন্যাসের প্রারম্ভিক বাক্যটি দেখা যাক।
‘সে অপেক্ষা করছিল, কেট ক্রো তার বাবার আসার জন্য, কিন্তু সে তাকে অযৌক্তিকভাবে ধরে রেখেছিল, এবং সেখানে কিছু মুহূর্ত সে আয়নার বিচ্ছুরিত আলোর ওপর দিয়ে নিজেকে দেখছিল- একটি মুখ, যা সত্যিকার অর্থেই, অস্বস্তিতে বিবর্ণ যা তাকে প্রবৃত্ত করছিল দ্বিধাহীনভাবে তার কাছে যাবার জন্য।’
বাক্যটি সুদীর্ঘ ও প্রলম্বিত- কিন্তু এটা দক্ষ কুশলতার সঙ্গে নির্মিত। বাক্যটি দ্বিধান্বিতভাবে আমাদের সম্মুখে অগ্রসর হতে দেয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই যেন থাকে না।
১৮৮১ সালে ‘পোট্রেট অব আ লেডি’ উপন্যাসের মাধ্যমে জেমস সাহিত্যবিশ্বে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উন্মোচন ঘটান। উপন্যাসের নায়িকা ইসাবেল আর্চার সম্পর্কে লেখক বলেন, তার ‘ভালোবাসার জ্ঞান শেষ পর্যন্ত অবজ্ঞা করবার উপযুক্ত ক্ষমতার’ সঙ্গে সম্পর্কিত। লেখকও আসলে আমাদের শেষ পর্যন্ত যেন ‘অবজ্ঞা করবার ক্ষমতা’কে মূল্যায়িত করতে শেখান।
যেখানে রোমান্টিক যুগের কবিগণ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে কল্পনার বিস্তারকে মুক্ত উদারভাবে দেখাতে চান, জেমস সেই কল্পনার বিস্তারকে আরো বৃহত্তর মাত্রায় দেখাতে চাইলেন। নিজের মুক্ত উদার ভালোলাগার দৃষ্টিতে পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখেছেন তিনি। এই প্রকাশভঙ্গিটি আধুনিক নৈঃসঙ্গ্য চেতনার ভাসমান, ক্ষণস্থায়ীত্বের অনুভূতিকে উপস্থাপনা করে যা উত্তরাধুনিকতার সাথে সমন্বিতভাবে সম্পর্কিত।
জেমস তার শেষদিককার রচনা দ্য ‘অ্যামবাসেডরে’ তার নিজস্ব রচনাপদ্ধতির উপস্থাপন ঘটিয়েছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে তার নায়ক ল্যাম্বার্ট স্ট্রেদার, নিজেকে লেকে সন্তরণরত অবস্থায় আবিষ্কার করেন যেখানে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে তার অন্য বন্ধুদের দেখা পান। ম্যাডাম দ্য ভায়োনেট এবং শ্যাড নিউসাম যারা অন্য নৌকায় পরস্পরকে প্রেম নিবেদন করছিল, অপ্রত্যাশিতভাবেই এই নির্জন স্থানে দুজনকে দেখা গেল। স্ট্রেদার তাদের উপেক্ষা করে চলে যেতেও পারছিল না আবার বিশ্বাসও করতে পারছিল না, কারণ তারা তো পরস্পর প্রেমিক-প্রেমিকা। খুব দ্রুত দেখা গেল এই দৃশ্যটি সরে গেল এবং প্রকৃতিস্থ হয়ে তাদের সম্পর্কের নড়বড়ে, অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটা দেখানো হলো। লেখকের ইচ্ছাশক্তির কারণে দৃশ্যায়িত মুহূর্তটুকু এভাবেই মুছে যায়।
স্ট্রেদারের চরিত্রটি অসাধারণ সৃষ্টি। পাঠক যে-কোনভাবে তার চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, সেটা অবজ্ঞার দ্বারাই হোক কিংবা মানুষের অভিজ্ঞতা ও যুক্তির সীমাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সুশক্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণ সহকারেই হোক। স্ট্রেদার চরিত্রটির ধারণার সাথে সম্পর্ক রয়েছে বিনির্মাণের জটিল পদ্ধতির। বিশশতকের শেষার্ধে যে দুর্বোধ্য পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

[চার]
অসংখ্য লেখক জেমসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ফিলিপ রথ, টয়বিন, অ্যালান হলিংহার্স্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য লেখক যারা জেমসীয় চরিত্রসমূহ এবং উপন্যাসের অন্যান্য মোটিফকে তাদের রচনায় অনুসরণ করেছেন। এছাড়া আরো অনেকেই ছিলেন যারা পরোক্ষভাবে কিংবা জেমস-প্রভাবিত লেখকদের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। এবং জেনে রাখা ভালো, জেমসীয় সংবেদনশীলতা, শুরু হয়েছিল ল্যাম্বার্ট স্ট্রেদারের জগৎ দর্শনের মাধ্যমে।
জেমস অভ্যস্ত ছিলেন নৈতিক সমাপ্তির প্রকাশে। তার সৃষ্ট চরিত্রেরা প্রায় সবাই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট এবং তাদের কল্পনাশক্তি বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের ভেতরকার ইতিবাচক শক্তিকে তারা প্রত্যক্ষগোচর করতে পারে। নেতিবাচক পরিস্থিতিকে তারা ইতিবাচক ও সৃজনশীল সমাপ্তি পৌঁছে দিতে পারে।
সমস্যা হল, যেভাবেই হোক, এটাই জীবনের সেই প্রকাশভঙ্গি যা উভয়সংকটের সৃষ্টি করে। এটা একদিকে সমবেদনা পূর্ণ কল্পনাকে সৃষ্টি করতে পারে আবার স্বার্থপর বা পরশ্রীকাতরতাকেও প্রশ্রয় দিতে পারে। এর নামই বিনির্মাণবাদী সৃষ্টিশীল এবং ক্ষমতাধর, যদিও এর অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় প্রতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে ইতোমধ্যে সাংঘর্ষিকরূপে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিশ শতকের ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে জোরদার হয়েছিল। ইতিবাচক সমাপ্তির জন্য এটি এমনকিছু গ্রহণ করে, চূড়ান্ত অর্থে যার অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে।
অর্থাৎ জেমসের রচনার যাবতীয় দুর্বোধ্যতা ও প্রহেলিকা সময়োচিত প্রকাশ ছিল না। কাঠামোগত দিক থেকে বিনির্মাণবাদ, ভাবগত দিক থেকে উত্তর-আধুনিকবাদের কাছাকাছি ছিল তাঁর রচনাভঙ্গি ও লেখকসত্তা। শব্দের পরিধি প্রসারণে, ভাষার গভীরতা ও সম্ভাবনা সৃষ্টির অনন্ত সুবিশাল জগতে তিনি পদার্পণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কালের দ্রষ্টা, মার্কিন কথাসাহিত্যের অগ্রদূত। খুব স্বাভাবিকভাবেই চলমান সময়ে তিনি পাঠক-সমালোচকের কাছে সমাদৃত হননি সেরকমভাবে। বিষয়গত, ভাবগত কিংবা আঙ্গিকগত- সকল ক্ষেত্রেই তিনি সময়ের তুলনায় ছিলেন প্রাঅগ্রসর। আর কে না জানেÑ যে ভাঙে, তাকে একা হতে হয়।
মৃত্যুশতবার্ষিকীতে মহান এই কথাসাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

  1. হেনরি জেমস পড়িনি।তীরন্দাজের সৌজন্যে পড়া হবে তাই আগাম সাধুবাদ জানাই।রোকসানা চৌধুরীকে শুভেচ্ছা সাবলীলভাবে জেমসকে উপস্থাপনের জন্য।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close