Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১২] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১২] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ May 15, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১২] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

ধারাবাহিক অনুবাদ

পর্ব ১২

(The Historical Conditions of Accumulation- The Accumulation of Capital)

পুঁজির পুনরুৎপাদন ও এর সামাজিক বিন্যাস (THE REPRODUCTION OF CAPITAL AND ITS SOCIAL SETTING)

মার্ক্সের বর্দ্ধিত পুনরুৎপাদনের বৃত্ত সঞ্চয়ের প্রকৃত ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে ব্যখ্যা করতে পারে না। এবং কেন পারেনা? সত্যি বলতে বৃত্তের ভিত্তির কারণেই পারেনা। পুঁজিপতি এবং শ্রমিকরাই শুধুমাত্র পুঁজিবাদী ভোগের একমাত্র প্রতিনিধি এমন ভাবনা থেকেই মার্ক্সের এই বৃত্তটি সঞ্চয় প্রক্রিয়াকে ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেছে। আমরা দেখেছি যে মার্ক্স ধারাবাহিকভাবে এবং ভেবে-চিন্তে উৎপাদনের পুঁজিবাদী পদ্ধতির শাশ্বত এবং চূড়ান্ত আধিপত্যকে তাঁর ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডেই তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এমতো শর্তাদির আওতায়, সমাজে স্বীকৃতভাবে শুধুমাত্র পুঁজিপতি ও মেহনতি শ্রমিক শ্রেণি ব্যতীত আর কোন শ্রেণি থাকতে পারেনা। যেমনটি এই বৃত্তে দেখানো হয়েছে- ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ মাত্রেই- অর্থাৎ কিনা সরকারি কর্মচারি, উদারনৈতিক পেশাজীবী, পুরোহিত শ্রেণি ইত্যাদি ইত্যাদি- এরা প্রত্যেকেই, ভোক্তা হিসেবে, উপরোক্ত দুই শ্রেণি অর্থাৎ পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির ভেতর পুঁজিপতি শ্রেণির আওতায়ই গণ্য বা অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই স্বতঃসিদ্ধ সত্য অবশ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত- পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণাধীনে বাস্তব জীবন কখনোই একটি স্বনির্ভর পুঁজিবাদী সমাজকে দেখেনি বা জানেনি। দেখতে বা জানতে পারেনি। এই তত্ত্বীয় কৌশল ততক্ষণ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌশল সমস্যাকে তার অখণ্ডতায় প্রদর্শন করতে সাহায্য করে এবং এর শর্তাদিতে হস্তক্ষেপ করেনা। এ বিষয়ে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো থোক সামাজিক পুঁজির সরল পুনরুৎপাদন এবং সেই পুনরুৎপাদনের বিশ্লেষণ। যেখানে কিনা সমস্যাটি নিজেই এক কল্পকথার উপর নির্ভরশীল : যে সমাজে উৎপাদন কিনা পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিতে হয়ে থাকে, সেই সমাজ উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করে। এবং পরে এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতি শ্রেণিই কড়ায়-গণ্ডায় আদায় ও ভোগ করে থাকে। মার্ক্সের বৃত্তের মূল উদ্দেশ্য তাই প্রদত্ত শর্তাবলীর আওতায় সামাজিক উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের আঙ্গিকগুলো উপস্থাপন করা। এখানে সমস্যার নির্দিষ্ট গঠন এটাই বোঝায় যে পুঁজিপতি এবং শ্রমিক শ্রেণি ব্যতীত উৎপাদন নিজেই অন্য কোন ভোক্তা শ্রেণিকে চেনে না এবং এভাবেই মার্ক্সের তত্ত্ব আরো দৃঢ় ভাবে অনুসৃত হয় : উৎপাদনের পুঁজিবাদী পদ্ধতির শাশ্বত এবং চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। এই দুই কল্পকথারই প্রভাব একইরকম। একইভাবে পুঁজির প্রথম খণ্ডে বর্ণিত ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের বিশ্লেষণে পুঁজির চূড়ান্ত আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া খুবই বৈধ। সমগ্র সামাজিক পুনরুৎপাদনে ব্যক্তিগত পুঁজির পুনরুৎপাদন একটি উপাদান তবে ব্যক্তিগত পুঁজির এই পুনরুৎপাদন একটি স্বাধীন গতিপথ অনুসরণ করে, যা অন্য উপকরণগুলোর আন্দোলনের বিপরীত। ফলাফলস্বরূপ নিজ নিজ পুঁজির ব্যক্তিগত আন্দোলনকে কোনভাবে একত্রিত করাটাই সামাজিক পুঁজির পূর্ণ আন্দোলনে উপস্থিত থাকার জন্য যথেষ্ট হবে না, যেহেতু দ্বিতীয় বিষয়টি মূলত আলাদা। ব্যক্তিগত পুঁজি পুনরুৎপাদনের স্বাভাবিক শর্তগুলো তাই না একে অপরের মত হয়, না তারা সমগ্র পুঁজির সম্পর্কের সাথে মানিয়ে নেয়। অর্থের সঞ্চালন বা আবর্ত্তনের স্বাভাবিক শর্তাদির আওতায়, প্রতিটি ব্যক্তিগত পুঁজি এই আবর্ত্তন বা সঞ্চালন এবং সঞ্চয়ের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে যায়। জড়িয়ে যায় সম্পূর্ণত নিজের ভাল-মন্দের হিসাব থেকেই আর অন্যদের প্রতি ঠিক ততটুকুই নির্ভরতা থেকে যতটুকু নির্ভরতায় এটি বাধ্য হয় তার উৎপাদনের জন্য একটি বাজার এবং বিশেষ নানা কর্মকান্ডের জন্য উৎপাদনের উপকরণগুলোর যতটুকু প্রাপ্তিযোগ্যতা প্রয়োজন ততটুকু খুঁজে নিতে। সেটা সমাজের যে স্তরই হোক বা যে কিম্বা যারাই এই বাজারকে ধারণ করা বা উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো যোগানোর মত সামর্থ্যবান হোক, সে বা তারা নিজেরাই পুঁজিবাদী উৎপাদক কি নয় সেটা ব্যক্তিগত পুঁজির জন্য একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়। যদিও তত্ত্বে অবশ্য ব্যক্তিগত পুঁজি সঞ্চয়ের বিশ্লেষণের জন্য সবচেয়ে অনুকূল প্রতিজ্ঞা হলো এই অনুমান যে পুঁজিবাদী উৎপাদন একটি শাশ্বত ও নিরঙ্কুশ আধিপত্যের মাত্রা ছুঁয়েছে এবং এটাই এই প্রক্রিয়ার একমাত্র বিন্যাস।
এখন স্বভাবত: এই প্রশ্ন জাগে যে এই অনুমানগুলো যা ব্যক্তিগত পুঁজির ক্ষেত্রে নিষ্পত্তিমূলক ছিল- তারা কি একইভাবে সমগ্র পুঁজির বিবেচনার ক্ষেত্রেও বৈধ বিবেচিত হবে?
‘আমরা এখন অবশ্যই সমস্যাটি নিম্নোক্ত আঙ্গিকে রাখব : শাশ্বত সঞ্চয়ের প্রেক্ষিতে, সঠিক ভাবে বলতে গেলে যে উৎপাদনের সব শাখাতেই পুঁজির কম বা বেশি সঞ্চয় আছে- যা সত্যি কথা বলতে পুঁজিবাদী উৎপাদনের একটি শর্ত এবং যা পুঁজিপতি থেকে পুঁজিপতি ভেদে একইরকম স্বাভাবিক একটি বিষয় যেমন কৃপণের জন্য টাকা জমানোটাই স্বাভাবিক (যা কিনা একইসাথে পুঁজিবাদী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয়ও বটে)- শাশ্বত সঞ্চয়ের শর্তাবলী কি, কোন্ কোন্ উপাদানে এই শর্তাবলী হ্রাস করা যায়?’
এবং উত্তর : ‘পুঁজির সঞ্চয়ের শর্তাবলী অবিকল সেগুলোই যারা বৃহত্তর ভাবে মূল উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে : এই শর্তাবলী অর্থের সেই অংশটুকু হয়ে শ্রম এবং অন্যান্য পণ্যাদি ক্রয় করে (যেমন, কাঁচা মাল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি)…সুতরাং একই রকম শর্তাবলীর আওতায় নতুন পুঁজির সঞ্চয় অগ্রসর হতে পারে যা ইতোমধ্যেই বিরাজমান পুঁজির আওতায় পুনরুৎপাদিত।’
বাস্তব জীবনে থোক পুঁজির সঞ্চয়ের বাস্তব শর্তগুলো ব্যষ্টি পুঁজি এবং সহজ পুনরুৎপাদনের জন্য বিরাজিত শর্তাদির থেকে একেবারেই আলাদা। সমস্যাটি মোটামুটি এমন দাঁড়ায় : উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি ক্রমবর্দ্ধমান অংশ যদি পুঁজিপতিদের দ্বারা ভোগ করা না হয়ে থাকে বরং উৎপাদন সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে সামাজিক পুনরুৎপাদনের আঙ্গিকগুলো কি? অনুমান নির্ভর ভাবে ধরে নিয়েই- ধ্রুব পুঁজির প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অঙ্কাদি বিয়োগের পর একটি সামাজিক পণ্যের অবশিষ্ট আর কি থাকে, যা শ্রমিক এবং পুঁজিপতিরা ভোগ করে নি:শেষ করতে পারে? এটাই এই সমস্যার মূল দিক- শ্রমিক ও পুঁজিপতিরা থোক পণ্য নিজেরাই ভোগ করতে পারেনা। তারা সর্বদাই পরিবর্তনশীল পুঁজি আদায় করতে পারে, আদায় করতে পারে ধ্রুব পুঁজিরও সেই অংশটুকু যা ব্যবহৃত হবে, এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের সেই অংশ যা ভোগ করা হবে, কিন্তু এভাবেই তারা এটুকুই কেবল নিশ্চিত করতে পারে যে উৎপাদন তার পূর্ববর্তী মাপনীর ভিত্তিতে নবায়িত হতে পারে। শ্রমিক এবং পুঁজিপতিরা সম্ভবত: উদ্বৃত্ত মূল্যের যে অংশটুকু পুঁজি বা মূলধনে খাটাতে হয় সেটুকু নিজেরা নিজেরা আদায় করতে পারেনা। সুতরাং, শুধুই শ্রমিক ও পুঁজিপতি নির্ভর একটি সমাজে সঞ্চয়ের জন্য উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায় করাটা একটি অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়ায়। যথেষ্ট পরিমাণ আশ্চর্যজনক ভাবেই, সকল তাত্ত্বিক যারাই রিকার্ডো থেকে সিসমন্ডি হয়ে মার্ক্স অবধি সঞ্চয়ের সমস্যাটি বিশ্লেষণ করেছে, তারা প্রত্যেকেই এই অনুমান দিয়ে শুরু করেছেন যে অনুমানের জন্য তাদের সমস্যাটি অসমাধানযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি নিশ্চিত প্রেরণা যে উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায় করতে হলে ‘তৃতীয় ব্যক্তিদের’ দরকার হয়, কিম্বা সঠিকভাবে বলতে হলে ভোক্তা ব্যতীত পুঁজিবাদী উৎপাদনের আশু এজেন্টগণ (অর্থাৎ শ্রমিক ও পুঁজিপতি) ‘অনুৎপাদনশীল ভোগ’ এড়ানোর জন্য সব ধরনের কৌশল বা উপায় অবলম্বন করেছেন যা সামন্ত ভূস্বামী হিসেবে ম্যালথাস উপস্থাপন করেছেন, ভরন্তোসভ করেছেন সামরিক অবস্থায়, স্ট্রুভ করেছেন ‘উদারনৈতিক পেশা’য় থেকে এবং পুঁজিপতি-শ্রেণির অন্যান্য নানা সুবিধাভোগী দলের সাথে থেকে; অথবা সঞ্চয়কে যারা সংশয়ের সাথে দেখেছেন তাদের জন্য নিরাপত্তা ভালভ হিসেবে বিদেশী বাণিজ্যকে রঙ্গমঞ্চে নিয়ে আসা হয়েছে। একথা সিসমন্ডি থেকে নিকোলিয়ন- সবার ক্ষেত্রেই সমান সত্য। এই অসমাধানযোগ্য বাধাগুলোর কারণেই মূলত কির্কম্যান এবং রডবার্টাসের মত অর্থনীতিবিদরা পুরোপুরি সঞ্চয় নিয়েই শুধু কাজ করেছেন, অথবা সিসমন্ডি এবং তার রুশ ‘জনপ্রিয়’ অনুসারীদের মত অনেকেই যতটা সম্ভব সঞ্চয়ের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলেছেন। সঞ্চয়ের সমস্যার মূল দিক এবং অতীতে এই সমস্যা সমাধানের ব্যর্থ প্রচেষ্টাগুলোর অসহায়তার দিক শুধুমাত্র মার্ক্সের অধিকতর গভীর বিশ্লেষণেই দেখানো হয়েছে। গোটা পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে তিনি ব্যখ্যা করেছেন তাঁর যথার্থ বৃত্তাকার নক্সার প্রদর্শনীর মাধ্যমে এবং আরো বিশেষত তাঁর সরল পুনরুৎপাদনের সমস্যার অনুপ্রাণিত উদ্ভাসের মাধ্যমে। তবু সাথে সাথেই তিনি একটি নিখুঁত সমাধান দিতে পারেননি। পারেননি কিছুটা একারণে যে তিনি তাঁর বিশ্লেষণ শুরু করার প্রায় সাথে সাথেই বলতে গেলে এটির ছেদ ঘটিয়েছেন। এবং খানিকটা তিনি তখন উন্মনাও ছিলেন বৈকি যেমনটা আমরা দেখিয়েছি। অ্যাডাম স্মিথের বিশ্লেষণ পরিত্যাগের মাধ্যমে মার্ক্স মূল সমস্যার গভীরে তাকানোর দৃষ্টিশক্তি কার্যত: হারান। বস্তুত পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিকেই চিরায়ত ধরে নিয়ে তিনি সমাধানকে আরো জটিল করে তোলেন।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close