Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৩] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৩] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ June 2, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৩] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

ধারাবাহিক অনুবাদ

 

পর্ব ১৩

 

(The Historical Conditions of Accumulation- The Accumulation of Capital)

পুঁজির পুনরুৎপাদন এর সামাজিক বিন্যাস (THE REPRODUCTION OF CAPITAL AND ITS SOCIAL SETTING)

 

এই অসমাধানযোগ্য প্রতিবন্ধকতাগুলোর জন্যই কির্শম্যান এবং রডবার্টাসের মতো অনেকেই পুরোপুরি সঞ্চয় ব্যতীতই চলতে চেয়েছেন, আবার সিসমন্ডি বা তাঁর রুশ ‘জনপ্রিয়তাবাদী’ অনুসারীরা সঞ্চয়ের উপর যতটা সম্ভব কিছু প্রতিবন্ধকতা আরোপের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন।

সঞ্চয়ের সমস্যার মুখ্য দিক এবং এই সমস্যা সমাধানের আগের চেষ্টাগুলোর দুর্বল দিক শুধুমাত্র মার্ক্স-কৃত গভীরতর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেখা গেছে তাঁর (মার্ক্সের) গোটা পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার যথাযথ বৃত্তাকার প্রদর্শনী এবং সরল পুনরুৎপাদনের সমস্যার প্রেরণাদীপ্ত উদ্ভাসে। তবু তিনি গোটা সমস্যার একটি নিষ্পত্তিকৃত সমাধান দিতে পারেন নি, অংশত, তিনি তাঁর লেখাটি শুরু করার পরপর নিজেই নিজের বিশ্লেষণ থেকে বের হয়ে গেছিলেন, এবং অংশত, তিনি এ্যাডাম স্মিথের বিশ্লেষণের নিন্দা করতেই ব্যস্ত ছিলেন আর এভাবেই মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছেন। আসলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা সর্বত্র বিরাজ করে এটা মনে করতে গিয়ে তিনি সমস্যার সমাধানকে আরো জটিল করে তুলেছেন। তথাপি মার্ক্সকৃত সরল পুনরুৎপাদনের পুরো বিশ্লেষণে এবং সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার চারিত্র্য চিত্রণে সঞ্চয়ের সমস্যাটি মার্ক্সের নীতির অন্যান্য অংশের সাথে সাদৃশ্যের নিরিখে এবং পুঁজিবাদের দৈনিক অনুশীলন ও ঐতিহাসিক নানা অভিজ্ঞতার সাথে মিল রেখেই দেখা দেয়। দেখা দেয় তার পরিব্যাপ্ত যাবতীয় বিরোধ এবং তাদের অগ্রগতি সহই (দেখুন ‘পুঁজি,’ তৃতীয় খণ্ড)। এর আলোকেই এই বৃত্তটির যাবতীয় ত্রুটি বা অপূর্ণতা সংশোধন করা যেতে পারে। বৃত্তে বর্ণিত যাবতীয় সম্পর্কই খানিকটা অসম্পূর্ণ। বর্ধিত পুনরুৎপাদনের বৃত্তের নিকটতর পঠন বা অধ্যয়ন এটাই প্রকাশ করবে যে বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী উৎপাদন এবং সঞ্চয় প্রক্রিয়ার চেয়ে কিছুটা উন্নততর সংগঠনকেই এই বৃত্তের কোন না কোন বিন্দুতে নির্দেশ করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত আমরা বর্ধিত পুনরুৎপাদনের শুধুমাত্র একটি দিক বিবেচনা করেছি- উদ্বৃত্তমূল্য আদায়ের সমস্যা, যার এপর্যন্ত যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা সংশয়ীদের সম্পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। উদ্বৃত্তমূল্যের আদায় নিঃসন্দেহেই পুঁজিবাদী সঞ্চয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উদ্বৃত্তমূল্যের আদায় তার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে- সরলতার স্বার্থেই, পুঁজিপতির ভোগের অর্থ পুরোপুরি চায়- চায় যে পুঁজিবাদী সমাজের বাইরেও ক্রেতাসমাজের আরো নানা স্তর থাকুক। সেই সাথে এটাও উল্লিখিত থাকুক যে ভোক্তা নয় বরং ক্রেতাদেরই দরকার হয়ে থাকে যেহেতু উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায়ে তার বস্তুগত আঙ্গিকটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। নিষ্পত্তিমূলক ঘটনা বরং এটাই যে এই উদ্বৃত্তমূল্য শ্রমিক অথবা পুঁজিপতি কারো কাছেই বিক্রির মাধ্যমে আদায় হতে পারে না। তবে, উদ্বৃত্তমূল্য তখনি আদায় হবে যখন এটি এমন সব সামাজিক সংগঠন বা তাদের এমন সব স্তরের কাছে বিক্রি হবে যাদের নিজেদের উৎপাদন পদ্ধতিই পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক নয়। এখানে নিচে আমরা দু’টো পৃথক ঘটনা অনুমান করতে পারি :

১.   পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা তার নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং নিজ প্রয়োজনের ঊর্ধ্বেই, অর্থাৎ শ্রমিক ও পুঁজিপতিদের চাহিদার থেকে বেশিই ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করে থাকে যা অ-পুঁজিপতি নানা স্তর এবং দেশসমূহ দ্বারা ক্রীত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বৃটিশ বস্ত্রশিল্পের কথা বলা যায়। উনিশ শতকের প্রথম দুই-তৃতীয়াংশ সময়ে এবং সত্যি বলতে কি এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে বা পরিসরে আজো এই তুলা শিল্প ইউরোপ মহাদেশের চাষী ও পাতি-বুর্জোয়া নাগরিকদের কাছে ও ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার চাষীদের সুলভে কাপড় সরবরাহ করে থাকে। এভাবেই বৃটিশ তুলা শিল্পের প্রবল সম্প্রসারণ অ-পুঁজিবাদী নানা স্তর ও দেশের ভোগ দ্বারা সম্ভবপর হয়েছে। বৃটেনে বস্ত্রশিল্প একাই শৈল্পিক যন্ত্রপাতির উৎপাদনে বিপুল অগ্রগতি সম্ভব করে (ববিন এবং যন্ত্রচালিত তাঁতের সৃষ্টি)। বস্ত্রশিল্প ছাড়াও কয়লা শিল্প এবং ধাতু শিল্পও বৃটেনে শিল্পায়নের বিপুল অগ্রগতি সম্ভব করেছে। এক্ষেত্রে, বিভাগ-২ অ-পুঁজিবাদী নানা সামাজিক স্তরের কাছে বর্ধিত মাত্রায় তার ভোগ্যপণ্যাদি বিক্রয় করে এবং নিজস্ব সঞ্চয়ের মাধ্যমে বিভাগ-১-এর ঘরোয়া নানা পণ্যের উপর বর্ধিত হারে চাহিদা চাপায় আর এভাবেই বিভাগ-১-কে তার নিজস্ব উদ্বৃত্তমূল্য আদায়ে এবং নিজস্ব সঞ্চয় বাড়াতে সাহায্য করে।

২.   উল্টো দিক থেকে দেখলে, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা উৎপাদনের উপকরণগুলো তার নিজের চাহিদার থেকেও বাড়তি পরিমাণেই সরবরাহ করে এবং অ-পুঁজিবাদী দেশগুলোয় ক্রেতা খুঁজে পায়। উদাহরণস্বরূপ, বৃটিশ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রদেশগুলোয় রেলপথ নির্মাণের জন্য নানা উপকরণ সরবরাহ করেছিল (শুধুমাত্র রেলপথের নির্মাণই অবশ্য একটি দেশে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির আধিপত্য বোঝানোর স্বাক্ষ্য হিসেবে মানা যায় না। বাস্তবে ঘটনা হলো এক্ষেত্রে রেলপথ সেদেশে পুঁজিবাদী উৎপাদনের উন্মেষের শুরুর শর্ত হিসেবে কাজ করেছিল)। এক্ষেত্রে আর একটি উদাহরণ হতে পারে যদি আমরা দেখি যে কিভাবে জার্মান রাসায়নিক কারখনাগুলো এশিয়া, আফ্রিকা এবং সতীর্থ চারিত্র্যের নানা দেশে রং পাঠায় যার উৎপাদন পুঁজিবাদী পদ্ধতির নয়। এখানে বিভাগ-১ পুঁজিবাদী বৃত্তের বাইরে গিয়ে তার পণ্যের পুরো দাম আদায় করে নেয়। ফলাফলস্বরূপ বিভাগ-১-এর প্রগতিশীল সম্প্রসারণ বিভাগ-২-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ সম্প্রসারণের জন্ম দেয়। অর্থাৎ একই ধরণের দেশগুলোয় (পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির দেশগুলোয়) বিভাগ-২-এর সমধর্মী সম্প্রসারণ দেখা দেয় যা বিভাগ-১-এর বর্ধনশীল কর্মীবাহিনীর জন্য অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করে।

এই প্রতিটি ক্ষেত্রই আবার মার্ক্সের বৃত্ত থেকে পৃথক। একটি ক্ষেত্রে, বিভাগ-২-এর উৎপাদিত পণ্য উভয় বিভাগের চাহিদা ছাড়িয়ে যায় যা পরিবর্তনশীল পুঁজি এবং উদ্বৃত্তমূল্যের ভোগকৃত অংশ দ্বারা পরিমাপ হয়ে থাকে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, বিভাগ-১-এর উৎপাদিত পণ্য উভয় বিভাগেই ধ্রুব বা স্থির পুঁজির মোট আয়তনকে ছাড়িয়ে যায়- আয়তনে বর্দ্ধিত হয়ে ওঠে যদিও এটা উৎপাদনের সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই সৃষ্ট। উভয়ক্ষেত্রেই, উদ্বৃত্তমূল্য তার সেই স্বাভাবিক রূপে আসে না যা বিভাগ-১ ও বিভাগ-২, অর্থাৎ দুটো বিভাগেই উদ্বৃত্তমূল্যের মূলধনীকরণকে স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় করে তুলবে। এই দুই নমুনা বাস্তব জীবনে ধারাবাহিকভাবে পরষ্পর জড়িয়ে যায়, একে অপরকে পরিপূরণ করে এবং পরষ্পরের সাথে মিশে যায়।

এই প্রতিযোগিতায় একটি বিন্দু এখনো ঝাপসা মনে হয়। ভোগ্যপণ্যের উদ্বৃত্ত, ধরা যাক সুতি কাপড়, যা কিনা অ-পুঁজিবাদী দেশগুলোয় বিক্রি হয়, একচেটিয়াভাবেই যে উদ্বৃত্তমূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে তেমনটি না-ও হতে পারে। তবে, পুঁজিবাদী পণ্য হিসেবে এটি ধ্রুব বা স্থির পুঁজি এবং পরিবর্তনশীল পুঁজির প্রতিরূপ তুলে ধরে। এমনটা অনুমান করে নেয়া স্বেচ্ছাচারিতা হবে যে সমাজের পুঁজিবাদী স্তরের বাইরে এই সব পণ্যের বিক্রি উদ্বৃত্তমূল্য ব্যতীত অন্য কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না। অন্য দিকে, এক্ষেত্রে বিভাগ-১ শুধুই তার উদ্বৃত্তমূল্য আদায় করা নয় বরঞ্চ সঞ্চয়ও করতে পারে। পুঁজিবাদী উৎপাদনের দুই বিভাগ ব্যতীত উৎপাদিত পণ্যের জন্য অন্য কোন বাজার ছাড়াই এই কাজটি করা সম্ভব (অর্থাৎ উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায় ও সঞ্চয় করা)। তবু এই উভয় আপত্তিই আপাত প্রতিবন্ধকতা মাত্র। যা আমাদের মনে রাখা দরকার তাহলো উৎপাদিত মোট পণ্যের প্রতিটি উপকরণই প্রকৃত মূল্যের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং পুঁজিবাদী উৎপাদনের শর্তাবলীর আওতায় শুধুই থোক পণ্যাদি নয় বরঞ্চ প্রতিটি পণ্যই উদ্বৃত্ত মূল্য ধারণ করে। এই বিবেচনা ব্যক্তি পুঁজিবাদীকে এটা গণনা করা থেকে বিরত রাখে না যে তাঁর উৎপাদিত নির্দিষ্ট পণ্যাদির বিক্রয়কে সর্বপ্রথম তার উৎপাদন খরচ পূরণ করার মত পর্যাপ্ত হতে হবে, ধ্রুব পুঁজির উপর ঝুঁকি নিয়ে করা তার খরচ এবং পরিবর্তনশীল পুঁজিকেও প্রতিস্থাপণ করার মত পর্যাপ্ত হতে হবে। অথবা, আরো ঢিলেঢালাভাবে বললে, বাস্তব অনুশীলনের আওতায়- তার বিক্রয় থেকে অর্জিত অর্থকে প্রথমে তার ধ্রুব পুঁজি ও পরে পরিবর্তনশীল পুঁজি থেকে করা উৎপাদন খরচের পরিপূরক হতে হবে, তারপর আসে মুনাফার কথা। একইভাবে, থোক সামাজিক পণ্যকে, মূল্যের নিরিখে আমরা তিনটি আনুপাতিক অংশে ভাগ করতে পারি যা (১) সমাজে ব্যবহৃত ধ্রুবপুঁজি, (২) পরিবর্তনশীল পুঁজি এবং (৩) নিষ্কাশিত উদ্বৃত্তমূল্যের সদৃশ।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close