Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৪] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৪] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ August 30, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৪] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

ধারাবাহিক অনুবাদ

 

 

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

সম্পাদনা : পিটার হুদিস এবং কেভিন বি. অ্যান্ডারসন

 

 

পর্ব ১৪

সরল পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে এই অনুপাতগুলো থোক পণ্যের বস্তুগত আকৃতিতেও প্রতিফলিত হয় : ধ্রুব পুঁজি উৎপাদনের উপায় হিসেবে বাস্তবে পরিণত হয়, পরিবর্তনশীল পুঁজি শ্রমিকদের বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে এবং উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতিদের জন্য টিকে থাকার উপায় হিসেবে দেখা দেয়। তবু যেমন আমরা জানি, পুঁজিপতিদের দ্বারা গোটা উদ্বৃত্ত মূল্যের খেয়ে ফেলার সাথে সরল পুনরুৎপাদনের তত্ত্ব নিছকই যেন গল্প। বর্থিত পুনরুৎপাদন অথবা সঞ্চয়ের জন্য, মার্ক্সের বৃত্তে সামাজিক পণ্যের গঠন দামের হিসেবে তার বস্তুগত আঙ্গিকের সাথে একদম সমানুপাতিক: উদ্বৃত্ত মূল্য অথবা উদ্বৃত্ত মূল্যের যে অংশটুকু মূলধনীকৃত করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়, সেটা শুরু থেকেই উৎপাদনের বস্তুগত উপায় এবং শ্রমিকদের টিকে থাকার উপায় হিসেবে একটি প্রদত্ত প্রযুক্তিগত ভিত্তির উপর উৎপাদনের প্রসারণের সাথে সমানুপাতিক হারে রয়েছে। যেমনটা আমরা দেখেছি, এই পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিচ্ছিন্নতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার উপর গড়ে ওঠা এই তত্ত্বের পতন ঘটে যখনি কিনা উদ্বৃত্ত মূল্যের বাস্তবায়নকে আমরা বিবেচনা করি। তবে, যা-হোক আমরা যদি ধরে নিই যে উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিবাদী উৎপাদনের বাইরে প্রতীত হয়ে থাকে, তবে এর বস্তুগত আঙ্গিক পুঁজিবাদী উৎপাদনের শর্তাবলী থেকে মুক্ত। এর বস্তুগত আঙ্গিক অপুঁজিবাদী সেইসব বৃত্তের চাহিদার কাছে মাথা নোয়ায় যা ভোক্তা পণ্যের আকৃতি ধারণ করে, যেমন, সুতার কাপড় অথবা উৎপাদনের উপায়, যেমন, রেলপথ নির্মাণের উপাদান সমূহ- যেমন যেমন হয়ে থাকে আর কি। যদি একটি বিভাগ এর পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে তার উদ্বৃত্ত মূল্য আদায় করে থাকে এবং উৎপাদনের আসন প্রসারণের সাথে সাথে অন্য বিভাগকে দেশীয় বাজারে তার উদ্বৃত্ত মূল্য আদায় করতে সাহায্য করে, তবে এ বাস্তবতা রয়েই যায় যে উপরোল্লিখিত দুই বিভাগের বাইরে সামাজিক উদ্বৃত্ত মূল্য দ্রুত বা ধীর গতিতে আদায় হয়ে থাবে। একই ধরণের বিবেচনা ব্যক্তি পুঁজিবাদীকে তার উদ্বৃত্ত মূল্য আদায়ে সক্ষম করে, যদি এমনকি তার সব পণ্য অন্য কোন পুঁজিবাদীর পরিবর্তনশীল অথবা ধ্রুব পুঁজিকেই শুধু প্রতিস্থাপন করতে পারে।
উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায়ই পুনরুৎপাদনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ দিক নয়। এটা যদি আমরা ধরেও নিই যে বিভাগ ১ তার উদ্বৃত্ত মূল্য বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছে আর এভাবে যদি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া শুরুও হয়, তারপরও অপুঁজিবাদী বৃত্তগুলোয় চাহিদার এক নতুন বৃদ্ধি কিন্তু বিভাগ-১ আশা করে। এই দুই শর্ত সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যা কিছু তার মাত্র অর্ধেক যোগ করতে পারে। প্রবাদে যেমন আছে : ‘চায়ের কাপ এবং ঠোঁটে পাক খাও।’ সঞ্চয়ের দ্বিতীয় শর্ত হলো সম্প্রসারণশীল পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত উপাদানসমূহের অধিগম্যতা। বিভাগ-১-এর আওতায় অপুঁজিবাদী বৃত্তগুলোয় আমরা সব উদ্বৃত্ত পণ্যকে মাত্রই টাকায় পরিণত করেছি আর এটা করেছি উৎপাদনের উদ্বৃত্ত উপায় থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যমে, তবে উৎপাদনের বস্তুগত উপাদানগুলো কোথা থেকে আসে? যে লেনদেন কিনা উদ্বৃত্ত মূল্য আদায়ের দুয়ার হিসেবে স্বীকৃত, যেমন অতীতেও ছিল, মূলত সেই পশ্চাৎদ্বার, যে-দ্বার থেকে এই আদায়কৃত উদ্বৃত্ত মূল্যকে উৎপাদনশীল পুঁজিতে রূপান্তরিত করার সব সম্ভাবনা বের হয়ে যায়- একটি অপরটিকে নিম্নস্থ এলাকায় নিয়ে যায়, ঠেলে নিয়ে যায় গভীর সাগরে। আমাদের আর একটু ঘনিষ্ঠতর ভাবে দেখতে দিন।
এখানে আমরা ধ্রুব পুঁজিকে বিভাগ ১ ও বিভাগ ২- উভয় বিভাগেই এমনভাবে ব্যবহার করছি যেন উৎপাদনের গোটা ধ্রুব পুঁজিকেই উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও বিষয়টি কত বড় ভুল তা’ আমরা জানি। শুধুমাত্র বৃত্তটিকে সরল করার জন্যই কি আমরা এই বিষয়টি উপেক্ষা করেছি যে বৃত্তের অন্তর্গত বিভাগ ১ ও বিভাগ ২-এ ধ্রুব পুঁজির যে অংশটুকু দেখা যায় তা’ মূলত সমাজের মোট ধ্রুব পুঁজির শুধুমাত্র সেই অংশ যা বছরে একবার আবর্তিত হয়ে গোটা ধ্রুব পুঁজিকে ব্যবহার করবে এবং উৎপাদনের একটি সময়পর্বে উৎপাদিত সব পণ্যে মূর্ত রূপে দেখা দেবে। তবু গোটা বিষয়টিই নিদারুণভাবে অবাস্তব মনে হবে যদি পুঁজিবাদী উৎপাদন- অথবা অন্য কোন কিছু- তার সমস্ত ধ্রুব পুঁজিকে ব্যবহার করে এবং উৎপাদনের প্রতিটি পর্বে তাকে নতুন ভাবে সৃষ্টি করে। বিপরীত ভাবে, আমরা এটুকু অনুমান করে নিতেই পারি যে উৎপাদনের উপকরণের গোটা ভর উৎপাদনের পশ্চাতেই নিহিত থাকে; বিশেষত, বৃত্তে যেভাবে উপস্থাপিত (অবশ্য এই সূত্রটি শুধুমাত্র পণ্যের পরাবৃত্ত পর্যাাবৃত্ত সামগ্রিক নবায়ণের জন্য প্রযোজ্য যেটা কিনা বার্ষিক কিস্তি অনুসারে মার্ক্সের বৃত্তে প্রদত্ত হয়ে থাকে)। প্রগতিশীল শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং উৎপাদনের ক্রমপ্রসারমান আয়তনের সাথে সাথে এই ভর শুধু নিরঙ্কুশভাবেই বাড়ে না বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদনের যতটুকু অংশ ভোগ করা হয়ে থাকে সেই অংশের সাথে সম্পর্কিত হয়েও বাড়ে। বাড়ে ধ্রুব পুঁজির দক্ষতার ক্ষেত্রে অনুরূপ বৃদ্ধির সাথে সাথেও। ধ্রুব পুঁজির এই অংশের তীব্রতর শোষণের কারণেই, যতই দাম বাড়ুক, উৎপাদনের সম্প্রসারণ সম্ভব হয়ে থাকে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘খনি শিল্পগুলোয়, কাঁচামাল অগ্রসর পুঁজির কোনো অংশ গঠন করে না। এক্ষেত্রে শ্রমের বিষয় অতীত শ্রমের কোনো উৎপাদন নয়, বরং প্রকৃতি প্রদত্ত বিনামূল্যে লব্ধ সম্পদ। যেমনটা দেখা যায় যে কোনো ধাতু, খনিজ, কয়লা, পাথর প্রভৃতি সম্পদের ক্ষেত্রে। এমন সব ক্ষেত্রে ধ্রুব পুঁজি শ্রমের প্রায় সব যন্ত্রই নিরঙ্কুশভাবে ধারণ করে থাকে যা কিনা শ্রমের এক বর্ধিত পরিমাণকে দারুণভাবেই শোষণ করে নিতে সক্ষম (যেমন, শ্রমিকদের দিবা ও নৈশকালীন ওভারটাইম ইত্যাদি)। অন্য সব বিষয় একই থাকলে, উৎপাদিত পণ্যের ভর ও মূল্য শ্রমের সম্প্রসারিত বাজারের সাথে প্রত্যক্ষ অনুপাতে বাড়বে। উৎপাদনের প্রথম দিনে, আদি উৎপাদকেরা, এখন পুঁজির বস্তÍগত উপাদানের প্রচেষ্টায় পরিণত- মানুষ এবং প্রকৃতি- আজো একইসাথে কাজ করে। শ্রমশক্তির স্থিতিস্থাপকতাকে ধন্যবাদ যে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রটি প্রসারিত হয়েছে; প্রসারিত হয়েছে ধ্রুব পুঁজির পূর্ববর্তী কোনো প্রসারণ ছাড়াই- কৃষিতে বীজ এবং সারের অগ্রগতি ব্যতীত কর্ষিত বা আবাদযোগ্য জমি তার ফলন বাড়াতে পারেনা। তবে একবার যদি বীজ এবং সারের অগ্রগতি সম্ভবপর হয়, তবে মৃত্তিকার বিশুদ্ধ যান্ত্রিক কাজের ধরণ উৎপাদিত পণ্যের উপর নিজেই চমৎকার প্রভাব ফ্যালে। পূর্বের মতোই একই সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে, অধিকতর শ্রমের কাজ সাধিত হলে, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এতে করে শ্রমের হাতিয়ারে কোন নতুন অগ্রগতি সাধন দরকার পড়ে না। এভাবেই প্রকৃতির উপর মানুষের প্রত্যক্ষ ক্রিয়ার ফল বৃহত্তর সঞ্চয়ের আশু উৎস হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে কোনো নতুন পুঁজির হস্তক্ষেপ ছাড়াই। সর্বোপরি, উৎপাদন কারখানা বলতে যা বোঝায়, সেখানে শ্রমের প্রতিটি বাড়তি বা অতিরিক্ত ব্যয়ই কাঁচামালের কোনো সমধর্মী, বাড়তি খরচকে আগে থেকেই হিসাবে নিয়ে নেয়। তবে সেই হিসাব সবসময়ই যে শ্রমের হাতিয়ার বিষয়ক তা নয়। এবং যেহেতু খনিশিল্প ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও প্রস্তুতকারী শিল্প তার কাঁচামাল ও শ্রমের উপকরণসহই পুঁজির অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়তি উৎপাদনে সক্ষম হয়- সার্বিক ফলাফল মোটামুটি এমনটা দাঁড়ায় : সম্পদের দুই প্রাথমিক প্রচেষ্টার (শ্রম-শক্তি ও জমি)-কে একত্রিত করার মাধ্যমে, পুঁজি অর্জন করে সম্প্রসারণের এক বিপুল শক্তি যা তার সঞ্চয়ের যাবতীয় উপাদানের বৃদ্ধিকে অনুমতি দেয়। অনুমতি দেয় তার যাবতীয় সীমারেখা অতিক্রম করার- যে সীমারেখা কিনা তার নিজ ব্যাসার্ধ কিম্বা তার মূল্য এবং উৎপাদনের উপকরণের ভর দ্বারা গতি-নির্দিষ্ট।
এছাড়াও কেন যে উৎপাদনের উপকরণাদি এবং ভোগ্যপণ্য শুধুমাত্র পুঁজিবাদী পদ্ধতিতেই উৎপাদিত হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট কারণ নেই। এই অনুমান, যা কিনা মার্ক্স তাঁর থিসিসের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, বস্তুত পুঁজির প্রতিদিনের ইতিহাস, পুঁজি এবং উৎপাদনের বিশেষ চারিত্র্যের সাথে খাপ খায় না। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডে সুতির কাপড় থেকে উদ্বৃত্ত মূল্যের একটি বড় অংশ আসতো। তবু এই উদ্বৃত্ত-মূল্যের মূলধনীকরণের বস্তুগত উপকরণগুলো উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করলেও গোটা উদ্বৃত্ত-মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করতো না। যেমন, উদাহরণ হিসেবে আরো বলা যেতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীতদাস শ্রমে পুষ্ট তুলা ক্ষেত বা জারের ভূমিদাস-নির্ভর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির রাশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয়নি এমন উৎপাদনের উপকরণের উপরও পুঁজিবাদী সঞ্চয় কতটা নির্ভরশীল, সেটা মার্কিনী গৃহযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে তুলার সঙ্কট থেকে বোঝা যায়- বিশেষত যখন মার্কিনী গৃহযুদ্ধের কারণে সেদেশে তুলা চাষ প্রায় অচলাবস্থায় পৌঁছায়। অথবা, প্রাচ্যে যুদ্ধের সময় যখন ভূমিদাস অর্থনীতির রাশিয়া থেকে যথেষ্ট পরিমাণে শন পশ্চিম ইউরোপে পৌঁছতে পারেনি, তখন সেখানে লিনেন কাপড় বয়নশিল্পে সঙ্কট দেখা দিল। আমরা শুধু এটুকুই স্মরণ করতে পারি যে কৃষকদের ফলানো ভুট্টা- সোজা কথায় বললে, ভুট্টা বা ভুট্টার মতো যেসব কৃষিপণ্য পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয়নি- সেসব কৃষিপণ্যই শিল্পশ্রমিকদের খাওয়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। খাইয়েছে পরিবর্তনশীল পুঁজির একটি উপকরণ হিসেবে যা পুঁজির সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যত বস্তুগত উপকরণ এবং অপুঁজিবাদী স্তরের ভেতরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
এছাড়াও, পুঁজিবাদী উৎপাদন, তার নিজস্ব স্বভাব বা চারিত্র্যের কারণেই, উৎপাদনের এমন কোনো পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না যেমনটা পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়া সম্ভব। ধ্রুব পুঁজির সস্তা উপকরণগুলো ব্যক্তি পুঁজিপতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে তার মুনাফার হার বাড়াতে সচেষ্ট হয়। উপরন্তু, উদ্বৃত্ত মূল্যের হার বাড়াতে শ্রম উৎপাদনশীলতায় ধারাবাহিক বিকাশ বা উত্তরণের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে শর্তটি রয়েছে, সেই শর্তটি প্রকৃতি এবং মৃত্তিকার সব আশীর্বাদ ও উপাদানকে অমিত ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনিঃশেষ সুবিধা ভোগ করে। এক্ষেত্রে কোন নিয়ন্ত্রণ সহ্য করাটা পুঁজির মূল সারাংশেরই বিরোধী, তার অস্তিত্বের গোটা প্রক্রিয়ার প্রতিকূলে তার অবস্থান। অনেক অনেক শতাব্দীর উন্নয়নের পর, উৎপাদনের পুঁজিবাদী পদ্ধতি আজো গোটা বিশ্ব উৎপাদনের মাত্র অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ গঠন করে। এমনকি পুঁজিবাদের মূল বাসস্থল তথা ইউরোপের এই ক্ষুদ্রায়তন মহাদেশেও উৎপাদনের সব শাখাকে নিয়ন্ত্রত করার মতো সফল পুঁজিবাদ এখনো হয়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ কৃষি ও স্বাধীন কুটিরশিল্পের কথা বলা যায়; একইকথা উত্তর আমেরিকার বিস্তৃত অংশগুলো এবং অন্যান্য মহাদেশগুলোরও নানা অঞ্চল সম্পর্কে সত্য। এখনো অব্দি নাতিশীতোষ্ণ এলাকাগুলোতেই পুঁজিবাদী উৎপাদন মূলত সীমাবদ্ধ থেকেছে। পাশাপাশি প্রাচ্য বা দক্ষিণে পুঁজিবাদ খুব সামান্যই প্রাগ্রসর হতে পেরেছে। এভাবে, এসব সঙ্কীর্ণ পরিসরের ভেতরেই প্রাপ্তিযোগ্য উৎপাদনের উপকরণসমূহের উপর পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি যদি নিরঙ্কুশভাবে নির্ভরশীল হয়, তবে তার বর্তমান উচ্চতা এবং এর সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব হবে না। এভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদনের আঙ্গিক ও নিয়মাবলী তার সূচনালগ্ন থেকেই গোটা বিশ্বের যাবতীয় উৎপাদিকা শক্তির একটি আড়ত গঠনের প্রয়াস চালায়। পুঁজি, শ্রমশোষণের লক্ষ্যে যথাযোগ্য উৎপাদিকা শক্তিগুলোর শোষণে যে তাড়িত, তন্ন তন্ন করে গোটা পৃথিবী, দুনিয়ার সব প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করে এর উৎপাদনের যত উপকরণ, প্রয়োজনে বলপূর্বক দখল করে সব- সভ্যতার সব স্তর ও সর্বপ্রকারের সমাজ থেকে। পুঁজিবাদী সঞ্চয়ের বস্তুগত উপকরণের সমস্যা হলো যে উদ্বৃত্ত মূল্যের বস্তুগত আঙ্গিক দ্বারা মীমাংসিত হবার বদলে, এই বস্তুগত উপকরণ বরং একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করে। পুঁজির জন্য পূর্ণতরভাবে ও প্রগতিশীলভাবে গোটা পৃথিবীর মীমাংসা করাটাই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রয়োজন হয় উৎপাদনের উপকরণের অমিত এক পছন্দ বাছাই করে নেয়া। যেটুকু উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজি আদায় করেছে তার গুণগত ও পরিমাণগত উভয় সাপেক্ষেই এই বাছাই এভাবেই আদায়কৃত উদ্বৃত্ত মূল্যের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান খুঁজে নেয়।
সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া, ঠিক যতটা প্রাণবন্ত ও আকস্মিক হয়ে থাকে, ততটাই তার দরকার হয়ে পড়ে কাঁচামালের বাজারে অপ্রতিরোধ্য মুক্ত অভিগম্যতার। বিশেষত সত্যিই যেখানে কাঁচামালের প্রয়োজনটা খুবই বেশি। আরো যখন পুরানো উৎসগুলো থেকে আমদানি ব্যর্থ হয় অথবা সামাজিক চাহিদা যখন হঠাৎ বেড়ে যায়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কারণে মার্কিনী তুলা রপ্তানি যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ল্যাঙ্কাশায়ার জেলায় কুখ্যাত ‘তুলা দূর্ভিক্ষ’ শুরু হয়। তখন যেন-বা যাদুবল বা ইন্দ্রজালের সাহায্যে রাতারাতি মিশরে নতুন এবং বিপুল পরিমাণে তুলা চাষ শুরু হলো। মিশরের এই সাফল্য সম্ভব হয়েছিল বোধ করি সেখানকার শাসক শ্রেণির স্বৈরতান্ত্রিক বজ্রশাসন ও কৃষকদের ভেতর স্নেহ-মমতার খুবই প্রাচীন বন্ধনরীতির কারণে। মিশরের এই বিশেষ সামাজিক রীতি-নীতিকে উপলক্ষ্ করেই ইউরোপের রাজধানী শহরগুলোয় এক নতুন কর্মজগতের সৃষ্টি করলো। কারণ যতই তুলা ফলুক মিশরের মাটিতে, চাষের নতুন যন্ত্রপাতি সব তো গেছে ইউরোপ থেকেই। আসলে মিশরে যে অল্প সময়ে যত বিপুল তুলার ফলন হয়েছিল, তা এক রূপকথাতুল্য ঘটনা। পুঁজি তার যন্ত্রপাতির সাহায্যে এমন এক রূপকথা তখনি ঘটাতে পারে যখন অধিকতর পশ্চাৎপদ সমাজের প্রাক-পুঁজিবাদী মাটিতেই এমন আশ্চর্য ফলন সম্ভব করার মতো কর্তৃত্ব তৈরি করা যায়। একই ধরণের একটি উদাহরণ হলো গোটা বিশ্বে রাবারের চাহিদা এত বিপুল পরিমাণে বেড়েছে যে প্রতি বছর ৫০,০০০,০০০ পাউন্ডের সমতুল্য রাবার গাছের কষের সরবরাহও প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁচামালের উৎপাদনের অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত বঞ্চণার একটি আদি ব্যবস্থা যা ইউরোপের রাজধানীগুলো অহরহই আফ্রিকীয় ও আমেরিকান উপনিবেশগুলোয় করে এসেছে। যে উপনিবেশগুলোয় দাসত্ব আর বন্ধনের প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে যুক্ত থাকে।
উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন এবং এর পরবর্তী সঞ্চয়ের পর্বে, দু’টো ভিন্ন লেনদেনের ঘটনা ঘটে থাকে। আর সেটা হলো উদ্বৃত্ত মূল্য আদায়ের ঘটনা অর্থাৎ উদ্বৃত্ত মূল্যকে বিশুদ্ধ মূল্যে পরিণত করা এবং বিশুদ্ধ মূল্যকে উৎপাদনশীল পুঁজিতে পরিবর্তিত করা। উদ্বৃত্ত মূল্য আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধ্রুব পুঁজির বস্তুগত উপকরণগুলো সংগ্রহ করা বা কেনার স্তর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো পুঁজির ঐতিহাসিক অস্তিত্বের জন্য এক প্রধান প্রয়োজন- প্রকৃত শর্তাদির অধীনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আসলে উৎপাদনের পুঁজিবাদী ও অপুঁজিবাদী পদ্ধতিগুলোর ভেতরে এক আবশ্যিক বিনিময়।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ১৩

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৩] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close