Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন : পর্ব ১৫ >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন : পর্ব ১৫ >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ September 17, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন : পর্ব ১৫ >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

 

ধারাবাহিক অনুবাদ

 
রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
সম্পাদনা : পিটার হুদিস এবং কেভিন বি. অ্যান্ডারসন

 

পর্ব ১৫

 

এখন পর্যন্ত সঞ্চয়কে আমরা শুধুই উদ্বৃত্তমূল্য এবং ধ্রুব পুঁজির নিরিখে বিচার করেছি। সঞ্চয়ের তৃতীয় উপাদান হলো পরিবর্তনশীল পুঁজি যা প্রগতিশীল বা বর্ধনশীল সঞ্চয়ের সাথে বৃদ্ধি পায়। মার্ক্সের বৃত্তে সামাজিক উৎপাদন শ্রমিকদের জন্য বেঁচে থাকার আরো বেশি উপকরণ বা উপায় ধারণ করে। ধারণ করে পরিবর্তনশীল পুঁজির যথার্থ বস্তুগত আঙ্গিক হিসেবে। পরিবর্তনশীল পুঁজি অবশ্য শ্রমিকদের বেঁচে থাকার সত্যিকারের উপায় নয়। পরিবর্তনশীল পুঁজি আসলে জ্যান্ত শ্রম, যার পুনরুৎপাদনের জন্য বেঁচে থাকার এই উপকরণগুলো জরুরি। সঞ্চয়ের অন্যতম মৌলিক শর্ত তাই জীবন্ত শ্রমের এক সরবরাহ সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পুঁজি দ্বারা সংহত হয়ে থাকে। এই যোগান বা সরবরাহ বিশেষভাবে অনুকূল নানা শর্তের আওতায় বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সেই বৃদ্ধি হবে শুধুই একটি নির্দিষ্ট বিন্দু পর্যন্ত। দীর্ঘ দীর্ঘতর শ্রমঘণ্টা এবং অধিকতর খাটুনির মাধ্যমে। সরবরাহ বা যোগান বৃদ্ধির এই দুই প্রক্রিয়াই অবশ্য পরিবর্তনশীল পুঁজিকে সম্প্রসারিত করেনা; অথবা করলেও একটি ক্ষুদ্র পরিসর পর্যন্ত মাত্র করে থাকে (যেমন, অতিরিক্ত সময় কাজ বা ওভারটাইমের জন্য বাড়তি মজুরি প্রদান)। উপরন্তু যোগান বা সরবরাহ বাড়ানোর এই পন্থা নির্দিষ্ট বা বলতে গেলে সঙ্কীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ, যা তারা প্রাকৃতিক ও সামাজিক উভয় কারণেই অতিক্রম করতে পারেনা। পরিবর্তনশীল পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধি সঞ্চয়ের সঙ্গী; আর তাই অবশ্যই পরিবর্তনশীল পুঁজির এই বৃদ্ধিকে নিযুক্ত শ্রমে আরো বেশি সংখ্যায় বা হারে প্রকাশিত হতে হবে। তো কোথায় এই বাড়তি শ্রমকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে?

ব্যক্তিগত পুঁজির সঞ্চয়ের বিশ্লেষণে মার্ক্স নিন্মোক্ত উত্তর দেন :

এখন এই সমস্ত দাবিদাওয়াকে পুঁজি হিসেবে বাস্তবিক কার্যকর দেখতে চাইলে, পুঁজিপতিশ্রেণির দরকার বাড়তি শ্রম। যদি ইতোমধ্যে শ্রমে নিযুক্ত শ্রমিকের শ্রমশোষণ ব্যাপকভাবে বা নিবিড়ভাবে আর না বাড়ে, তবে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি অবশ্যই খুঁজে পেতে হবে। অতীতে এর জন্য পুঁজিবাদী উৎপাদন কৌশল সহায়তা যুগিয়েছে, যেমন মেহনতি শ্রেণিকে মজুরি বা বেতনের উপর নির্ভরশীল শ্রেণিতে বদরে ফেলেছে। মেহনতি শ্রেণিকে এমন একটি গড় বেতনের উপর নির্ভরশীল শ্রেণিতে বদলে ফেলেছে যার বা যাদের বেতন শুধু মোটামুটি চলার মতো নয়, বরং বৃদ্ধিও পায়। পুঁজির জন্য দরকার হলো শুধু এই বাড়তি শ্রমশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা, যা প্রতিবছর শ্রমিকশ্রেণির সব বয়সী সদস্যদের শ্রমের আকারে সরবরাহ হয়ে থাকে। আর এই শ্রমের সাথে বাড়তি যুক্ত থাকে উৎপাদনের উদ্বৃত্ত উপায় বা উপকরণগুলো। এই বাড়তি উপায় বা উপকরণগুলো বার্ষিক উৎপাদনে অন্তর্ভুক্ত থাকে- এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের পুঁজিতে রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়।’

এভাবেই পরিবর্তনশীল পুঁজির বৃদ্ধি পুঁজির দ্বারা ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রিত একটি শ্রমিক শ্রেণির স্বাভাবিক, আয়তনিক বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও নিরঙ্কুশভাবে ভূমিকা রাখে। এই ভূমিকা রাখার কাজটি বর্ধিত পুনরুৎপাদনের বৃত্তের সাথে যথাযথ সাযুজ্য রেখেই সম্পন্ন করা হয় যা কিনা পুঁজিপতি এবং শ্রমিকদের শুধু সামাজিক শ্রেণিগুলোকে স্বীকার করে এবং উৎপাদনের পুঁজিবাদী পন্থাকে চূড়ান্ত ও নিরঙ্কুশ বলে মনে করে। এসব অনুমানের উপর ভিত্তি করে শ্রমিক শ্রেণির স্বাভাবিক বৃদ্ধিই হয়ে ওঠে পুঁজিবাদের দ্বারা নির্দেশিত শ্রম যোগান-বৃদ্ধির একমাত্র শর্ত। তবে, এই শর্ত সঞ্চয় প্রক্রিয়ার পরিচালনাকারী নিয়মাবলীর সম্পূর্ণ বিপরীত। সময় বা পরিমাণের নিরিখে শ্রমিক শ্রেণির প্রসারণ বা সঞ্চয়কারী পুঁজির শর্তাবলী আপেক্ষিক নয়। মার্ক্স নিজেই অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত কায়দায় বুঝিয়েছেন যে শ্রমিক শ্রেণির সংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি পুঁজির সহসা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পুঁজির চাহিদার সাথে পালিত হতে পারে। যদি পুঁজির বিকাশের জন্য প্রাকৃতিক প্রসারণই একমাত্র ভিত্তি হতো, তবে সঞ্চয় তার অতিরিক্ত কাজে লাগা থেকে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া অবধি বিভিন্ন পর্যায়ে টানা-পোড়েন আর চলতে পারত না, কিম্বা উৎপাদনশীল স্তর হু হু করে বাড়ত না। সঞ্চয় হয়ে উঠতো অসম্ভব একটা ব্যাপার। পরের বিষয়টি (দ্রুতগতি সঞ্চয়) পরিবর্তনশীল পুঁজির নিরিখে চলাচলের এক অমিত স্বাধীনতা জরুরি মনে করে, যা কিনা ধ্রুব পুঁজির উপাদানসমূহের নিরিখে উপভোগকৃত স্বাধীনতারই সমান- সোজা কথায় বললে কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত শ্রমশক্তির সরবরাহের মীমাংসা অবশ্যই করতে হবে। মার্ক্স মনে করেন সেটা শুধুমাত্র ‘শিল্পশ্রমিকদের একটা বাহিনী মজুদ’ থাকলেই সম্ভব হতে পারে। তাঁর সরল পুনরুৎপাদনের বৃত্ত অবশ্য এমন শিল্পশ্রমিক বাহিনীর উপস্থিতি স্বীকার করে না, এমন ভাবনার কোনা স্থানই তাঁর কাছে নেই যেহেতু পুঁজিবাদী বেতনভিত্তিক প্রলেতারিয়েতের স্বাভাবিক প্রসারণ শিল্পশ্রমিক বাহিনী প্রদান করতে পারে না (বেতনভিত্তিক শ্রমিক শিল্পশ্রমিক বাহিনী হতে পারেনা)। এই বাহিনীর জন্য শ্রমশক্তি নিযুক্ত করা হয় পুঁজির প্রভুত্বের বাইরে সামাজিক নানা আধার থেকে – শুধুমাত্র প্রয়োজন দেখা দিলেই মজুরির উপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকে এমন শ্রমিক বাহিনীর কাছে যাওয়া হয়। শুধুমাত্র অপুঁজিবাদী গোষ্ঠী এবং দেশগুলোর অস্তিত্ব পুঁজিবাদী উৎপাদনের জন্য বাড়তি শ্রমশক্তির যোগান নিশ্চিত করতে পারে। তবু, শিল্পশ্রমিকের মজুদ বাহিনী বিষয়ক তাঁর বিশ্লেষণে মার্ক্স অনুমতি দিচ্ছেন শুধুমাত্র ক) যন্ত্রপাতির কারণে ছাঁটাই হয়ে যাওয়া বয়স্ক শ্রমিকদের, খ) কৃষিতে পুঁজিবাদী উৎপাদনের আধিপত্য সৃষ্টি হওয়ায় শহরে গ্রামীণ শ্রমিকদের আসার ঢল, গ) অনিয়মিত শ্রম যা শিল্পকারখানা থেকে বাদ পড়েছে এবং ঘ) সবশেষে থাকছে তুলনামূলক বাড়তি জনসংখ্যার নিন্মতম অবশিষ্ট, সোজাকথায় ভবঘুরে ভিক্ষুক শ্রেণি। এই বিভাগগুলোই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা কোনো না কোনো আকারে নিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে; এই বিভাগগুলো মিলেই এক মজুরিভিত্তিক প্রলেতারিয়েত শ্রেণি গড়ে তোলে যা একান্তই অবসন্ন এবং একে অপরের ক্ষেত্রে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডে বিদ্যমান যে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ পুঁজিবাদের উচ্চ স্তরের বিকাশ সম্ভবপর করেছে, সেই বিকাশ দেখে মার্ক্স গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সেই উদ্বুদ্ধ হওয়া থেকেই তিনি এই মতবাদে আসেন যে গ্রামীণ মজুররা- যারা ধারাবাহিকভাবে শহরগুলোয় অভিবাসন করে- তারা মূলত মজুরিভিত্তিক প্রলেতারিয়েত শ্রেণির আওতায় পড়ে। তিনি অবশ্য এই সমস্যাকে তত গুরুত্ব দেন না যা ইউরোপ মহাদেশে খুবই গুরুত্ববাহী। মূলত কৃষি-অর্থনীতি এবং কুটিরশিল্পের ক্ষয়ের যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় গ্রামীণ ও নাগরিক মধ্যস্তর প্রলেতারিয়েত হয়ে থাকে, সেসব স্তর থেকেই নাগরিক ও গ্রামীণ প্রলেতারিয়েত শ্রেণি নিযুক্ত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি হলো শ্রমশক্তির অপুঁজিবাদী থেকে পুঁজিবাদী শর্তে নিরন্তর রূপান্তরের প্রক্রিয়া যা প্রাক-পুঁজিবাদী বা অপুঁজিবাদী শক্তির দ্বারা তাদের প্রগতিমুখী ভেঙে পড়া বা বিভাজনের সময় নিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। ইউরোপীয় কৃষক ও কারিগর শ্রেণির ভেঙে পড়ার পাশাপাশি অইউরোপীয় দেশগুলোয় উৎপাদন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর নানা আদি রূপ বিভাজনের ঘটনাও এসময় ঘটেছে।

যেহেতু শুধুমাত্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ও জলবায়ুর প্রতি পুরোপুরি অভিগম্যতাই পুঁজিবাদী উৎপাদনের পুরোপুরি বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে, সেহেতু পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি নিজেকে শুধুই নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শ্বেতকায় শ্রমশক্তিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনা। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদকে নিয়ন্ত্রণে রাখার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বিশ্বশ্রমশক্তিকে ব্যবহার করার জন্য এই উৎপাদন ব্যবস্থাকে যথেষ্ট সক্ষম হতে হবে- সক্ষম হতে হবে উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদনশীল ব্যবস্থার দ্বারা চাপিয়ে দেয়া সীমারেখা অবধি। পুঁজির সক্রিয় সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হবার জন্য এই উৎপাদনব্যবস্থাকে মুক্ত করে দিতে হবে। আদিম নানা সামাজিক শর্ত থেকে শ্রমশক্তির মুক্তিলাভ এবং পুঁজিবাদী মজুরি ব্যবস্থায় তার শোষণ পুঁজিবাদের অবিচ্ছেদ্য, ঐতিহাসিক ভিত্তিসমূহের একটি।

[চলবে]

 

পর্ব ১৪-এর লিংক :

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১৪] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close