Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১০] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১০] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ April 14, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১০] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

 

[পর্ব ১০]

যাহোক, আমরা সম্পদ সঞ্চয়ের এই পথে উৎপাদন পন্থার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় আনতে পারি। এই পরিবর্তন সমূহ মার্কসের বৃত্তের মৌল সম্পর্ক বিপর্যস্ত না করে করা সম্ভব নয়।

এবং মার্কসের বৃত্ত অনুসারেই আরো বলা যায় যে মূলধনীকৃত উদ্বৃত্তমূল্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট একটি সময়পর্বের উৎপাদনমুখী প্রক্রিয়ার দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে এবং সম্পূর্ণত শোষিত হয়ে থাকে। ভোগের জন্য উৎপাদনের নির্দিষ্টকৃত অংশটুকু ব্যতীত এই মূলধনীকৃত উদ্বৃত্তমূল্যের একটি প্রাকৃতিক আঙ্গিক রয়েছে যা শুধু একধরণের কর্মসংস্থানের অনুমতি দেয়। এই বৃত্তটি আর্থিক আঙ্গিকে উদ্বৃত্ত মূল্যের নগদ টাকায় ভাঙানোকে নিবৃত্ত করে, যেহেতু পুঁজি বা মূলধন বিনিয়োগ হবার অপেক্ষায় থাকে। ব্যক্তিগত পুঁজির মুক্ত আর্থিক আঙ্গিকসমূহ, মার্কসের মতে, স্থির পুঁজির ব্যবহার এবং ক্ষয়ের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে জমানো পুঁজির অর্থ, এর পরিণামস্বরূপ নবীকরণ, এবং দ্বিতীয়ত, অর্থের সেই পরিমাণ যা বুঝে নেয়া উদ্বৃত্ত মূল্যের প্রতিনিধি তবে আজো বিনিয়োগ হিসেবে যৎসামান্য। থোক পুঁজির দৃষ্টিকোণ থেকে, মুক্ত অর্থ পুঁজির এই উভয় উৎসই বিবেচনায় নেবার মতো কিছু নয়। যেহেতু আমরা ধরে নিই যে সামাজিক উদ্বৃত্ত মূল্যের কোনো অংশ যদি অর্থ বা নগদ টাকার আঙ্গিকেও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য বুঝে নেয়া হয়, তখন সাথে সাথেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় : এই উদ্বৃত্ত মূল্যের বস্তুগত উপকরণগুলো কে কিনেছে এবং কেনার অর্থটা কে যোগান দিয়েছে? উত্তর যদি হয় : নিশ্চিতভাবেই, অন্য পুঁজিপতিরা,- সেক্ষেত্রে, বৃত্তে দুই বিভাগের অবস্থান থেকে পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়, একইসাথে উদ্বৃত্ত মূল্যের এই অংশটুকু ডি ফ্যাক্টো (বাস্তববাদী) বিনিয়োগকৃত হিসেবে ধরে নিতে হবে, উৎপাদনী প্রক্রিয়ায় যেমনটা নিযুক্ত হয়ে থাকে। এবং তাই আমরা উদ্বৃত্ত মূল্যের তাৎক্ষণিক এবং পূর্ণ বিনিয়োগে ফিরে আসি।

অথবা কিছু পুঁজিপতির হাতে আর্থিক আঙ্গিকে বা নগদ টাকায় উদ্বৃত্ত মূল্যের একাংশের জমা থাকা কী এটাই বোঝায় যে অন্য পুঁজিপতিরা বস্তুগত আঙ্গিকে উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুরূপ অংশটি পায়? কারো দ্বারা আদায়কৃত উদ্বৃত্ত মূল্যের মজুদ কি পরোক্ষভাবে এটাই প্রকাশ করে যে অন্যরা এখনো তাদের উদ্বৃত্তমূল্য আর বুঝে নিতে পারছে না, আরো যেহেতু কিনা পুঁজিপতিরাই উদ্বৃত্ত মূল্যের একমাত্র ক্রেতা? এর অর্থ হবে, যাই হোক না কেন, বৃত্তে বর্ণিত পুনরুৎপাদনের মসৃণ পথের সৃষ্টি হওয়া এবং একইভাবে সঞ্চয় প্রতিবন্ধকতা প্রাপ্ত হবে। এর ফল হবে একটি সঙ্কট; অতিরিক্ত উৎপাদনের দরুণ এই সঙ্কটের সৃষ্টি হবে না বরং সঞ্চয়ের নিছক অভিপ্রায় থেকে এই সঙ্কটের সৃষ্টি হবে, সিসমন্ডি যেমন সঙ্কট প্রত্যক্ষ করেছেন।

মার্কস তাঁর ‘থিওরিজ’-এর একটি স্তবকে অনেক অনেক শব্দ ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করেছেন যে তিনি “মোটেই পুঁজির একটি দিক সঞ্চয় নিয়ে উদ্বিগ্ন নন যা উৎপাদনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে এবং ব্যাংকে নগদ অর্থ হিসেবে অলস শুয়ে থাকতে পারে, যা-কিনা ভবিষ্যতে বিদেশে ধার হিসেবে পাঠানো হতে পারে।” মার্কস এই প্রপঞ্চগুলো তাঁর প্রতিযোগিতা বিষয়ক অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। তবু এটা প্রতিষ্ঠিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর (মার্কসের) বৃত্ত যথার্থভাবেই এই ধরনের উদ্বৃত্ত পুঁজির সঞ্চয়কে বাতিল করে দেয়। প্রতিযোগিতা- এই ধারণাকে আমরা যত প্রসারিত ভাবেই গ্রহণ করি না কেন, নিশ্চিতভাবেই অর্থ সৃষ্টি করতে পারে না, পারে না পুঁজি সৃষ্টি করতে, যা নিজেই কিনা পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলাফল নয়।

এই বৃত্তটি তাই উৎপাদনের অভুতপূর্ব প্রসারণের সম্ভাবনা বাতিল করে দেয়। এটা শুধুমাত্র একটি ধারাবাহিক প্রসারণকে অনুমতি দেয় যা উদ্বৃত্তমূল্য গঠনের সাথে শক্তভাবে তাল মেলায় এবং যা উদ্বৃত্ত মূল্যের আদায় এবং মূলধনীকরণের মধ্যবর্তী পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

একই কারণে এই বৃত্ত একটি সঞ্চয়ের কথা অনুমান করে নেয় যা উভয় বিভাগকেই সমানভাবে প্রভাবিত করে এবং এভাবেই প্রভাবিত করে পুঁজিবাদী উৎপাদনের সকল শাখাকে। এটা চাহিদার বিপুল প্রসারণকে প্রতিহত করে ঠিক সেই পরিমাণে, যে-পরিমাণে এটি পুঁজিবাদী উৎপাদনের ব্যক্তিগত শাখাগুলোর অকালপক্ক বা একমুখো উন্নয়নকে ব্যহত করে।

এভাবেই বৃত্তটি থোক পুঁজির একটি আন্দোলনকে অনুমান করে নেয় যা পুঁজিবাদী উন্নয়নের প্রকৃত স্রোতের মুখে উড়ে যায়। প্রথম দর্শনে, এই দু’টো অভিমুখই উৎপাদনের পুঁজিবাদী পন্থার ইতিহাসের জন্য একদমই গতানুগতিক : একদিকে উৎপাদনের গোটা খাতের পরা‌বৃত্ত প্রসারণের অভাবনীয় গতি, এবং অন্যদিকে উৎপাদনের বিভিন্ন শাখার চূড়ান্ত অসম উন্নয়ন। আঠারো শতকের প্রথম পঁচিশ বছর থেকে উনিশ শতকের সত্তরের দশক অবধি বৃটিশ কার্পাস-শিল্পের ইতিহাস তাই হয়ে দাঁড়ায় পুঁজিবাদী উৎপাদনের ইতিহাসের সবচেয়ে চরিত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সমন্বিত অধ্যায়, যা মার্কসের বৃত্তে সবচেয়ে অব্যাখ্যেয় হিসেবে দেখা দেয়।

সর্বোপরি, এই বৃত্তটি মার্কসের ‘পুঁজি’-র তৃতীয় খণ্ডে বর্ণিত পুঁজিপতির ধারণার পুরো প্রক্রিয়া এবং এর নির্দিষ্ট গতিপথ আঁকা হয়েছে। পুঁজিবাদী বিতরণের শর্তের আওতায় সামাজিক ভোগের সীমিত, সম্প্রসারণশীল ক্ষমতা ও উৎপাদক শক্তিগুলোর অন্তর্নিহিত লাগামছাড়া সম্প্রসারণমুখী শক্তির উপর এই তত্ত্বটি নির্ভরশীল। এবার আমাদের দেখতে দিন যে কিভাবে মার্কস এই বৈপরীত্যের দিকটি তাঁর ‘আইনের অন্তর্গত বিরোধ’ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন (অবনমনমুখী মুনাফার হার) :

“উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোর সৃজনকে অনুমান করে নিয়েই উদ্বৃত্ত-মূল্যের সৃষ্টি, অথবা পুঁজির পর্যাপ্ত সঞ্চয় যা বিদ্যমান থাকবে, তার যেন সত্যিই মেহনতি জনগণ ছাড়া কোনো সীমানা নেই, যখন কিনা উদ্বৃত্ত-মূল্যের হার, অর্থাৎ বঞ্চণার তীব্রতা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে; এবং শ্রমিক জনগণের পরিপ্রেক্ষিতে এই বঞ্চণার তীব্রতার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। উৎপাদনের পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া মূলত ধারণ করে উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন যা উদ্বৃত্ত-দ্রব্যে রূপায়িত হয়ে থাকে, এবং যা কিনা উৎপাদিত পণ্যের ভাগশেষ না রেখে সমাংশে ভাগ করতে সক্ষম এমন অংশবিশেষ যেখানে পারিশ্রমিক অপরিশোধিত শ্রমে রূপায়িত হয়েছে। এটা কখনোই ভোলা উচিত নয় যে উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই উৎপাদন এবং এর একটি অংশের পুঁজি অথবা সঞ্চয়ে পুনর্রূপান্তর, উদ্বৃত্ত-মূল্যের একটি অচ্ছেদ্য অংশ গড়ে তোলে- এবং এই গড়ে তোলাটাই হলো পুঁজিবাদী উৎপাদনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য এবং বাধ্যকারী উদ্দেশ্য। পুঁজিবাদী উৎপাদন যা নয় তাকে তেমনভাবে উপস্থাপন করার কাজ এটা করবে না, অর্থাৎ সঠিকভাবে বললে, উৎপাদন হিসেবে পণ্যের ভোগই এর তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হয়ে থাকে অথবা আরো সঠিক ভাবে বললে পুঁজিপতিদের জন্য আনন্দোপকরণের উৎপাদন (এবং অবশ্যই, শ্রমিকদের জন্য আরো কম- রোজা ল্যুক্সেমবার্গ)। এটা হবে পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিশেষ চারিত্র্য লক্ষ্য না করা, যা-কিনা নিজেকে তার নিভৃততম সারাৎসারে প্রকাশিত করে। এই উদ্বৃত্ত-মূল্যের সৃষ্টিই হলো উৎপাদনের প্রত্যক্ষ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য, এবং এই প্রক্রিয়ার উপরোক্ত সীমানাগুলো ব্যতীত অন্য কোনো সীমারেখা নেই। উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই প্রাপ্তব্য পরিমাণ যখনি পণ্যদ্রব্যে রূপায়িত হয়, তখনি উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই উৎপাদন উৎপাদনের পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার প্রথম কাজ, এটা প্রত্যক্ষ উৎপাদনকে বন্ধ করে দেয় মাত্র। পুঁজি যে কত মূল্য শোধ না করা শ্রম শুষে নেয়! প্রক্রিয়ার এই উন্নয়নের সাথে সাথে (যা কিনা মুনাফার হারের পতনশীল প্রবণতার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে), উদ্বৃত্ত-মূল্যের ভর বিপুল নানা মাত্রার অভিমুখে স্ফীত হয়। এরপর আসে প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় কাজ। পণ্যের পুরো ভর বা আয়তন, সমগ্র উৎপাদন যা কিনা এমন একটি অংশ ধারণ করে, যে অংশটি ধ্রুব ও পরিবর্তনশীল পুঁজি তৈরি করে এবং যা উদ্বৃত্ত-মূল্যের প্রতিনিধিত্বকারী একটি অংশও বটে, অবশ্যই বিক্রি হতে হবে। এটা যদি না করা হয়ে থাকে, অথবা আংশিকভাবে যদি কাজটি করা হয়ে থাকে, অথবা এমন দামে যদি বিক্রি করা হয় যা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম, অথচ শ্রম-শোষণ ঠিকই হয়েছে, তবে শ্রমিকের সেই শ্রম-শোষণ পুঁজিপতির জন্য যথেষ্ট হয় না। প্রত্যক্ষ বঞ্চণার শর্ত এবং উদ্বৃত্ত-মূল্যের আদায় হওয়াটা এক কথা নয়। যৌক্তিকভাবেই তারা পৃথক এবং সময় ও পরিসর দ্বারা ভিন্ন। প্রথমটি সমাজের উৎপাদক শক্তির দ্বারা সীমায়িত এবং শেষেরটি উৎপাদনের বিভিন্ন দিকরেখা এবং সমাজের ভোগের ক্ষমতার দ্বারা সীমায়িত। এই দুই ক্ষমতার শেষোক্তটি চূড়ান্ত উৎপাদনশীল ক্ষমতা অথবা চূড়ান্ত ভোগবাদী ক্ষমতার দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরঞ্চ বিতরণের বৈরীভাবাপন্ন শর্থগুলোর ভোগকারী শক্তির দ্বারাই নির্ধারিত যা বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোগকে কম-বেশি একটি সীমারেখার পরিবর্তনশীল ন্যূনতম সংখ্যার ভেতর আনতে পারে বা আনতে সক্ষম। ভোগের ক্ষমতা সঞ্চয় প্রবণতা কর্তৃক আরো বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়, দেখা দেয় পুঁজির প্রসারণের লোভ এবং আরো বর্ধিত মাত্রায় উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন। পুঁজিবাদী উৎপাদনের এই এক আইন যা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিরতিহীন নানা বিপ্লবের দ্বারা চাপানো, প্রচলিত পুঁজির ফলাফলস্বরূপ অবচয়ন, সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রাম এবং পণ্যের মান উন্নততর করার প্রয়োজন ও উৎপাদনের প্রসারমান মাত্রা যা আত্ম-সংরক্ষণ এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে থেকে যায়।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close