Home অনুবাদ রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১১] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১১] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত

প্রকাশঃ April 25, 2018

রোজা লুক্সেমবার্গ > নির্বাচিত রচনা সংকলন [পর্ব ১১] >> অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত
0
0

পর্ব ১১

 

সঞ্চয়ের ঐতিহাসিক শর্তাবলী- পুঁজির সঞ্চয় (The Historical Conditions of Accumulation- The Accumulation of Capital)

 

বর্ধিত পুনরুৎপাদনের বৃত্তের মধ্যবর্তী বৈপরীত্য (CONTRADICTIONS WITHIN THE DIAGRAM OF ENLARGED REPRODUCTION)

 

‘বাজারকে তাই অবশ্যই ক্রমাগত প্রসারিত হতে হবে, যাতে করে এর আন্ত:সম্পর্ক এবং বাজারকে নিয়ন্ত্রণকারী শর্তগুলো উৎপাদক-মুক্ত হিসেবে আরো বেশি বেশি করে একটি সাধারণ আইনের চেহারা নেয় এবং আরো অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই বাহ্যিক বৈপরীত্য উৎপাদনের প্রত্যন্ত ক্ষেত্রগুলো পর্যন্ত সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিজের বৈপরীত্যে একটি সমতা আনার চেষ্টা করে। কিন্তু যে স্তর অবধি উৎপাদক ক্ষমতা বিকশিত হয়, নিজেকে সে ভোগের শর্তসমূহের ভিত্তির সাথে অনৈক্যের সঙ্কীর্ণ কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। এই আত্ম-বৈপরীত্যের ভিত্তির উপর এটা তাই কোন বৈপরীত্য নয় যে অতিরিক্ত জনসংখ্যার সাথে যুগপৎভাবেই অতিরিক্ত পুঁজি থাকবে বা দেখা দেবে। যেমন, যখন জনসংখ্যা আর পুঁজি- যখন এ দুইয়ের সংমিশ্রণ প্রকৃতপক্ষে উদ্বৃত্ত-মূল্যের আয়তন বা ভর বাড়াবে, তখন একইসময়ে এটি উদ্বৃত্ত-মূল্য যেসব শর্তের আওতায় উৎপাদিত হয় এবং যেসব শর্তের আওতায় আদায় হয়, সেই দুইয়ের ভেতরের বৈপরীত্যকে প্রকটতর করে।’

আমরা যদি এই বিবরণকে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের বৃত্তের সাথে তুলনা করি, তবে এই দু’টোকে কোনভাবেই সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে হয় না বা হবে না। এই বৃত্ত অনুসারে, উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন এবং এর আদায় করার ভেতর কোন বৈপরীত্য নেই, বরং দু’টোই একইরকম বা অভিন্ন। এখানে শুরু থেকেই উদ্বৃত্ত-মূল্য একটি স্বাভাবিক আঙ্গিকে দেখা দেয় যা সঞ্চয়ের পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে পরিকল্পিত। বস্তুত অতিরিক্ত পুঁজির আঙ্গিকে এটি (উদ্বৃত্তমূল্য) উৎপাদনের জায়গা ছেড়ে দেয়; সোজা কথায় বলতে গেলে সঞ্চয়ের পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় উদ্বৃত্ত মূল্য আদায় করার সক্ষমতা অর্জিত হয়। পুঁজিপতিরা তাই, একটি শ্রেণি হিসেবেই, আগে থেকেই দেখতে বা বুঝতে পারে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য যেটি তারা আদায় করে তার পুরোটাই একটি বস্তÍগত আঙ্গিকে উৎপাদিত হয়, অধিকতর সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে তারা (পুঁজিপতিরা) একে আরো কাজে খাটানোর অনুমতি দেবে, আরো কাজে খাটানো নিশ্চিত করবে। এখানে তাই উদ্বৃত্ত-মূল্যের আদায় এবং সঞ্চয় দু’টোই একই প্রক্রিয়ার এপিঠ ওপিঠ। যৌক্তিকভাবেই তারা এক ও অভিন্ন। সুতরাং বৃত্তে নির্দেশিত পুনরুৎপাদনমূলক প্রক্রিয়ার উপস্থাপনা অনুযায়ী, সমাজের ভোগ করার ক্ষমতা উৎপাদনে কোন বাধা সৃষ্টি করেনা। এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উৎপাদন বছরের পর বছর বেড়ে চেলে, যদিও সমাজের ভোগের ক্ষমতা ইতোমধ্যেই “বিতরণের শত্রুভাবাপন্ন শর্তের” কারণে তার আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। সঞ্চয়ের সম্প্রসারণের এই স্বয়ংক্রিয় ধারাবাহিকতা তাই সত্যিই ‘পুঁজিবাদী উৎপাদনের আইন…ব্যর্থতার শাস্তি।’ তবু রোজা লুক্সেমবার্গ রচনা সমগ্রের ৩য় খণ্ডে প্রদত্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘বাজারকে অবশ্যই ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হতে হবে,’- এখানে বাজার, অতি আবশ্যিকভাবেই, পুঁজিবাদী এবং শ্রমিকদের ভোগকে অতিক্রম করে যায়। এবং যদি তুগান-বারানোভস্কি নিম্নলিখিত স্তবকটি ব্যাখ্যা দেন (“এই চিরায়ত বৈপরীত্য উৎপাদনের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় প্রসারণের মাধ্যমে সামঞ্জস্য তৈরির চেষ্টা করে”) যেন স্বয়ং মার্কস ‘উৎপাদনের প্রত্যন্ত এলাকা’ বলার মাধ্যমে ‘উৎপাদনকে’ বুঝিয়ে থাকেন- তুগান-বারানোভস্কির এই বক্তব্য শুধুই ভাষার আত্মাকেই আঘাত করেনা বরং মার্কসের চিন্তার স্বচ্ছ ধারাকেও আঘাত করে। ‘উৎপাদনের প্রত্যন্ত ক্ষেত্রগুলো’ সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীসভাবেই উৎপাদন নয় বরং ভোগ, যা ‘অবশ্যই ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হতে হবে।’ ‘উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বগুলিতে (থিওরিজ অফ সারপ্লাস ভ্যালু)’ অন্য অনেককিছুর মতো নিচের স্তবকটি, ভালোভাবেই এটা দেখায় যে মার্কসের এটাই মনে ছিল এবং অন্য কিছু ছিল না :  রিকার্ডো তাই  উৎপাদনের সম্প্রসারণ এবং পুঁজির বৃদ্ধির সাথে সঙ্গ দেবার জন্য বাজার বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে চলেন। একটি দেশে বিরাজমান সমগ্র পুঁজি সেই দেশে লাভজনকভাবে ব্যবহার করা যায়। এজন্যই তিনি এডাম স্মিথের বিরুদ্ধে যুক্তি সাজান, যিনি একদিকে রিকার্ডোর মতামত সাজান, অন্যদিকে নিজের ভেতরের ডাক থেকে এর বিপরীত মত ব্যক্ত করেন।

তবু আর একটি স্তবকে মার্কস পরিষ্কারভাবে দেখাচ্ছেন যে তুগান-বারানোভস্কির ‘উৎপাদনের জন্য উৎপাদন’ বিষয়টি তার কাছে পুরোপুরি বিজাতীয় একটি বিষয় :

‘এছাড়াও, আমরা অধ্যায় ৩-এর দ্বিতীয় খণ্ডে দেখেছি যে ধ্রুব-পুঁজি এবং ধ্রুব-পুঁজির ভেতরে একটি ধারাবাহিক আবর্তন চলতে থাকে (কোন বর্ধিত সঞ্চয়কে বিবেচনা না করেই), যা সত্যি বলতে ব্যক্তিগত ভোগের ঊর্ধ্বে যেহেতু ধ্রুব-পুঁজি কখনোই ব্যক্তিগত ভোগ অবধি আসে না, তবু যা এই ব্যক্তিগত ভোগ কর্তৃকই সীমায়িত, আরো যেহেতু ধ্রুব-পুঁজি কখনো তার নিজের জন্য ঘটে না বরং উৎপাদনের যেসব খাত থেকে উৎপাদিত পণ্য ব্যক্তিগত ভোগে কাজে লাগে সেই কাজেই ধ্রুব-পুঁজির দরকার হয়।’

স্বীকৃতভাবেই, দ্বিতীয় খণ্ডের বৃত্তে, তুগান-বারানোভস্কির সম্পূর্ণ সহায়তায়, বাজার এবং উৎপাদন  একত্রিত হয়- তারা একক ও অভিন্ন। এখানে বাজারের সম্প্রসারণ বলতে বোঝায় বর্ধিত উৎপাদন, যেহেতু উৎপাদন নিজেই তার একচেটিয়া বাজার- শ্রমিকদের ভোগ উৎপাদনের একটি উপাদান হিসেবে অর্থাৎ পরিবর্তনশীল পুঁজির পুনরুৎপাদন হিসেবে দেখা দেয়। সুতরাং উৎপাদনের সম্প্রসারণ ও বাজারের প্রসার এক ও অভিন্ন : যে পরিমান সঞ্চয় ইতিমধ্যে হয়েছে অথবা সামাজিক পুঁজির আয়তনের দ্বারা এটি প্রদত্ত হয়ে থাকে। পুঁজির প্রাকৃতিক আঙ্গিকে উদ্বৃত্ত-মূল্যের যতটা আয়তন নিষ্কাশিত হয়ে থাকে, ততটাই পুঁজি সঞ্চয় হয়। আর সঞ্চয়ের আয়তন যত বেশি হবে, তত বেশি উদ্বৃত্ত-মূল্য পুঁজির বস্তুগত আঙ্গিকে আদায় করা হবে। এভাবেই বৃত্তটি তৃতীয় খণ্ডের বিশ্লেষণে বৈপরীত্যের যে রূপরেখা আঁকা হয়েছে, তাকে স্বীকার করেনা। বৃত্তে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় পুঁজিপতি এবং শ্রমিকদের ভোগের বাইরে বাজারের ধারাবাহিক প্রসারণের কোন প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হয়নি, ভোগের জন্য সীমিত সামাজিক সক্ষমতাকে উৎপাদন ও তার বাজার সম্প্রসারণের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার পথে কোন প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও দেখা হয়নি। বৃত্তটি তাই প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের ভেতর সমানুপাতের অভাবের কারণেই সঙ্কটকে অনুমতি দেয়। উৎপাদনের ভেতর সমানুপাতের এই অভাব উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কারণে সৃষ্ট। এটা অবশ্য পুঁজিবাদী সমাজে ভোগ এবং উৎপাদন ক্ষমতার ভেতরকার গভীর ও মৌল বৈপরীত্যকে বাতিল করে দেয়। বাতিল করে সেই সংঘাতকে যা পুঁজির সঞ্চয়-প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভুত এবং যা পর্যায়ক্রমে সংকটে ফেটে পড়ে ও বাজারের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ-কর্মে পুঁজির উদ্দীপনা যোগায়।

[চলবে]

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close