Home অনুবাদ রোলাঁ বার্থ > কাফকার উত্তর >> প্রবন্ধ >>> ফরাসি থেকে ভাষান্তর : পার্থ গুহবক্স

রোলাঁ বার্থ > কাফকার উত্তর >> প্রবন্ধ >>> ফরাসি থেকে ভাষান্তর : পার্থ গুহবক্স

প্রকাশঃ July 4, 2018

রোলাঁ বার্থ > কাফকার উত্তর >> প্রবন্ধ >>> ফরাসি থেকে ভাষান্তর : পার্থ গুহবক্স
0
0

রোলাঁ বার্থ > কাফকার উত্তর >> প্রবন্ধ >>> ফরাসি থেকে ভাষান্তর : পার্থ গুহবক্স

 

“তােমার এবং পৃথিবীর মধ্যে দ্বন্দ্ব পৃথিবী দ্বিতীয়”

 

আমরা অঙ্গীকৃত (committed) সাহিত্যের সময় থেকে বেরিয়ে আসছি। সার্ত্রীয় উপন্যাসের সমাপ্তি, সামাজিক উপন্যাসের নিস্তেজ দারিদ্র্য, রাজনৈতিক নাটকের দোষত্রুটি সব মিলে ঢেউয়ের মতো সরে গিয়ে একটিমাত্র বিষয়কে তুলে ধরছে, সর্বপ্রতিরােধকারী এই বিষয় : সাহিত্য। ইতিমধ্যে তার ওপর আবার উল্টো আরেকটি ঢেউ ফিরে আসছে, নিশ্চিত বাধাহীন সেই ঢেউ। প্রেমের কাহিনিতে প্রত্যাবর্তন, ধ্যানধারণার বিরুদ্ধাচরণ, সৎ লেখার (bien ecrire) আচার পদ্ধতি, জগতের তাৎপর্য খুঁজবার অস্বীকৃতি- সব মিলে শিল্পের এক নতুন নীতি উপস্থাপিত হচ্ছে যা রােমান্টিসিজম ও চপলতার মধ্যে, কবিতার (সামান্যতম) ঝুঁকি ও বিচারবুদ্ধির (ফলপ্রদ) আশ্রয়ের মধ্যে এক সুবিধাজনক ঘূর্ণিবাজি তৈরি করে। তাহলে কি আমাদের সাহিত্য সবসময়েই রাজনৈতিক বাস্তববাদ এবং শিল্পের জন্য শিল্প অঙ্গীকারের নীতি এবং নন্দনতত্ত্বের বিশুদ্ধতা, আপসে রফা এবং অজীর্ণতার ক্লান্তিকর যাতায়াতের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকবে? সে কি সবসময়েই রিক্ত (যদি সে নিজেই হয়ে ওঠে) বা বিহ্বল (যদি নিজের চাইতেও অন্যরকম) থাকবে? তাহলে কি কখনো এই পৃথিবীতে তার কোনাে জায়গা হবে না?

আজ এই প্রশ্নের একটি যথার্থ উত্তর : মাৰ্থ রােবেরের কাফকা (Martha Robert: Kafka)। কাফকা কি আমাদের কোনো উত্তর দেয়? নিশ্চয়ই দেয় (কেননা মাৰ্থ রােবেরের চেয়ে আর বেশি যত্নবান কোনাে আলােচনার কথা ভাবা যায় না। কিন্তু তাকে বােঝা দরকার। কাফকা মানে কাফকাইজম নয়। কুড়ি বছর ধরে কাফকাইজম সবচেয়ে বিপরীতধর্মী সাহিত্যগুলিকে, কামু থেকে আয়োনেস্কো পর্য়ন্ত, পুষ্টি জুগিয়ে এসেছে। আধুনিক যুগের আমলাতান্ত্রিক আতঙ্কের বর্ণনা সম্বন্ধে কি আর প্রশ্ন তুলতে হবে? দ্য ট্রায়াল, দ্য কাসেল, দ্য পেনাল কলোনি সাধ্যাতীত শ্রমের আদর্শ তৈরি করেছে। বস্তুকে আক্রমণ করার মুখে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দাবিপ্রকাশ কি সংশ্লিষ্ট? দ্য মেটামরফোসিস একটি উপকারী চমক। কাফকার রচনা (oeuvre) বাস্তববাদী ও মন্ময়ধর্মী (subjective), তা সমস্ত জগতের প্রতি সমর্পিত হলেও কাউকে কোনো উত্তর দেয় না। একথা সত্যি, আমরা তাকে বেশি প্রশ্ন করি না, কেননা তার বিষয়ের ছায়ার ওপর লিখবার জন্য কাফকাকে প্রশ্ন করা যায় না। মার্থ রােবের যা নিয়ে সুন্দর বলেছেন, নিঃসঙ্গ জীবন, বিপথগমন, অনুসন্ধান, বিমূর্ততার পরিচয়, সংক্ষেপে সেইসব ধ্রুবক (constant), যাদের আমরা কাফকার জগৎ বলে থাকি, তারা কি আমাদের সব লেখকের মধ্যে বিরাজ করে না, যখন তারা কর্তৃত্বপূর্ণ জগতের সেবার জন্য লিখতে অস্বীকার করেন? প্রকৃতপক্ষে কাফকার উত্তর তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যারা তাকে সবচেয়ে কম প্রশ্ন করেছেন- যাঁরা শিল্পী। মার্থ রােবের আমাদের বলেন : কাফকার অর্থ তার রীতির (technique) মধ্যেই আছে। আলােচনাটি একটি নতুন দৃষ্টিকোণ নিয়ে কেবল কাফকার নয়, আমাদের সমস্ত সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত। মাৰ্থ রােবেরের মন্তব্য আপাতদৃষ্টিতে পরিমিত (কাফকার উপরে রচিত অশ্লীল জনপ্রিয় সংকলনগুলির মধ্যে এই বইটি কি সবার থেকে আলাদা নয়?) হলেও এটি সম্পূর্ণভাবে মৌলিক প্রবন্ধ যা মেধা এবং জিজ্ঞাসা অনুযায়ী সৃষ্ট হয়ে চেতনাকে উপযােগী ও অমূল্য পুষ্টি জোগায়।

কেননা যতই আপাতবিরােধী সত্য হােক না কেন, সাহিত্য রীতিপদ্ধতির ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই। যখন কোনো লেখক তার শিল্প নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন (বিরল এবং বেশিরভাগই বিরাগজনিত), আমরা বড়জোর বলতে পারি তিনি কিভাবে জগৎ নিয়ে কল্পনা করছেন, তার সঙ্গে কোন সম্পর্ক তিনি স্থাপন করছেন, অর্থাৎ তার চোখে মানুষ কিরকম; এককথায় প্রত্যেকেই বলবে তিনি বাস্তববাদী কিন্তু কিরকম; সাহিত্য কারণ এবং সমাপ্তিবিহীন কেবলমাত্র একটি পদ্ধতি, এখন এইভাবে নিঃসন্দেহে সংজ্ঞা দেওয়া যায়। তুমি সাহিত্যবিধির কোনো সমাজবিজ্ঞানের দিকে আকৃষ্ট হতে পার কিন্তু লেখার কাজকে কোনো ‘কেন’ বা ‘কোনদিকে’ জিজ্ঞাসা করে কখনো সীমাবদ্ধ করতে পার না। লেখক একজন কারিগরের মতোই কোনরকম আদর্শ বা এর ব্যবহার সম্বন্ধে অজ্ঞ থেকে অ্যাশবির মত অনুযায়ী আন্তরিকভাবে একটি জটিল বস্তুর বুনন তৈরি করেন। কেন লেখা হয়, এই জিজ্ঞাসা অন্তত প্রেরণার প্রসন্ন অজ্ঞানতার থেকে আরাে উন্নতির লক্ষণ, কিন্তু এই উন্নতিও একরােখা, এর কোনো উত্তর নেই। চাহিদা এবং সাফল্য হচ্ছে অভিজ্ঞতালব্ধ অন্যত্র সরে থাকবার ওজর (Alibis), যা পরিবর্তনশীল সত্যের থেকে অনেক বেশি জোরদার; এইসব বাদ দিলে সাহিত্যক্রিয়া কারণ ও সমাপ্তিবিহীন, কেননা তা যথার্থভাবে কোনরকম অনুমােদনের অপেক্ষা রাখে না; জগতের কাছে সে নিজেকে তুলে ধরে, সেজন্য কোন স্বীকৃত প্রথাকে (praxis) প্রতিষ্ঠিত বা যাচাই করতে হয় না, এই ক্রিয়া একেবারেই অকর্মক (intransitive), সে কোন কিছুকেই বদলায় না, কোনকিছুই তাকে নতুন করে আশ্বস্ত করে না।

তাহলে? তাহলে এই হচ্ছে তার আপাতবিরােধী মত, এই ক্রিয়া নিজেকে নিঃশেষ করে তার রীতির মধ্যে, শুধুমাত্র কোনো বিশিষ্ট পদ্ধতিতে তার অবস্থান। আবার সেই পুরনাে (বাঁজা) প্রশ্ন : ‘কেন লেখালেখি’-র পরিবর্তে মার্থ রোবেরের কাফকা এক নতুন প্রশ্নকে তুলে আনে : ‘কিভাবে লেখালেথি’ তার। এই ‘কিভাবে’ প্রশ্নটি ‘কেন’কে ক্ষইয়ে দেয়; হঠাৎ করেই কানাগলি খুলে যায়, এক সত্য আবির্ভুত হয়। এই সত্য, এই উত্তর কাফকার (যারা লিখতে চায়, তাদের জন্য) : ‘সাহিত্যের অস্তিত্ব তার নিজস্ব রীতি ছাড়া অন্য কোথাও নেই।’

মোটের ওপর এই সত্যকে যদি আমরা বাগর্থতত্ত্বের (semantic) ভাষায় প্রকাশ করি, তাহলে বলা যায় কোনো রচনার বিশেষত্ব তার অন্তর্নিহিত সংকেতিত (signified) অর্থের মধ্যে থাকে না (হে ‘উৎস’ এবং ধ্যানধারণামূলক সমালােচনা, বিদায়), থাকে তার তাৎপর্যের (signification) ছাঁচের মধ্যে। কাফকার সত্য কাফকার জগতে নয় (বিদায় ‘কাফকাইজম’), জগতের সংকেতের (sign) মধ্যে রয়ে গেছে। কাজেই এই রচনা কখনাে জগতের রহস্যের উত্তর দিতে পারে না। সাহিত্য কখনােই মতবাদমূলক নয়। জগৎ এবং তার মৌলিক উপাখ্যানের (legend) অনুকরণে (রােবের যথার্থভাবেই তার প্রবন্ধের একটি অধ্যায়কে মহৎ সাহিত্যের এক চূড়ান্ত ধর্ম ‘অনুকরণে’র ওপর উৎসর্গ করেছেন) লেখক সংকেতিত ব্যতিরেকে কেবলমাত্র সংকেতকেই প্রকাশ করতে পারেন। জগৎ সবসময় ‘তাৎপর্যে’র প্রতি উন্মুক্ত হলেও ‘তাৎপর্য’ই তাকে অনন্তকাল ধরে অতৃপ্ত করে রাখে। লেখকের কাছে সাহিত্য হচ্ছে সেই বাচন যা আমৃত্যু ঘােষণা করে : বেঁচে থাকার অর্থ না জানা পর্যন্ত আমার জীবন শুরু হবে না।’

কিন্তু সাহিত্য যে জগৎকে নিয়ে জিজ্ঞাসা ছাড়া আর কিছু নয়, এই ব্যাপারটি তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যদি আমরা জিজ্ঞাসার প্রকৃত রীতি সম্বন্ধে পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে পারি, কারণ জিজ্ঞাসাকে অবিরামভাবে কোনো আপাত অস্তিবাচক কাহিনির মধ্যে বর্তমান থাকতে হয়। মার্থ রােবের খুব ভাল করেই দেখিয়ে দিয়েছেন যে আমরা যেরকমভাবে প্রায়ই বলে থাকি, কাফকার কাহিনি সেই ধরনের প্রতীক দিয়ে বােনা হয় না, এ কিন্তু সম্পূর্ণ পৃথক এক রীতির ফসল, আর তা হলো পরােক্ষ উল্লেখের (allusion) রীতি। পৃথকত্বের মধ্যেই কাফকার সমস্তটুকু আবদ্ধ হয়ে আছে। কোনো প্রতীক (যেমন ক্রিশ্চিয়ানিটির ক্রশ) একটি ‘নিশ্চিত’ সংকেত, তা আঙ্গিক ও ভাবনার মধ্যে (আংশিক) সাদৃশ্যকে সমর্থন করে, নিশ্চয়তাকে সে প্রকাশ করে। কাফকার চরিত্র এবং ঘটনাগুলি যদি প্রতীকী হতো, তবে তারা সার্বজনীন মানুষের কাছে (এমনকি নিরাশ হলেও) কোনো প্রত্যক্ষ দর্শনের (positive philosophy) উল্লেখ করতো। কোনো প্রতীকের অর্থ নিয়ে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য ঘটতে পারে না যে অর্থের অনুপস্থিতিতে প্রতীক ব্যর্থ হয়ে যায়। কাফকার কাহিনি এই ধরনের একইরকম হাজারাে আপাতযুক্তিসংগত চাবির দায়িত্ব দিয়ে দিলেও এখন বলা যায়, তার কোনো বৈধতা নেই।

আবার পরােক্ষ উল্লেখ সম্পূর্ণ অন্য একটি ব্যাপার। নিজেকে বাদ দিয়ে কল্পিত ঘটনাকে সে অন্যদিকে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু কোথায়? পরােক্ষ উল্লেখ হলো একটি ত্রুটিপূর্ণ শক্তি, যখনই তার সামনে সাদৃশ্যসূচক কিছু রাখা হয়, সে তাকে বাতিল করে। বিচারালয়ের আদেশে K-কে গ্রেপ্তার করা হলো; এটি ন্যায়পরায়ণতার পরিচিত ছবি। কিন্তু আমরা শিখলাম যে ঐ বিচারালয় আমাদের ন্যায়পরায়ণতার চোখে অপরাধকে বিচার করে না। মুছে না ফেললেও এই সাদৃশ্য বিভ্রান্তিজনক। মার্থ রােবের সংক্ষেপে এইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সবকিছুই একধরনের বাগর্থতাত্বিক সংকোচন থেকে এগিয়ে যায় : K-র মনে হয় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আর সবকিছু এমনভাবে ঘটে ‘যেন সত্যি সত্যি’ K-কে প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (দ্য ট্রায়াল), কাফকাকে তার বাবা পরগাছার মতো দেখতেন আর সবকিছু এমনভাবে ঘটে ‘যেন সত্যি সত্যি’ কাফকাকে পরগাছায় বদলে যেতে হলো (দ্য মেটামরফসিস)। কাফকা সুশৃঙ্খল প্রণালীতে ‘যেন সত্যি সত্যি’গুলিকে লুকিয়ে রেখে সাহিত্যসৃষ্টি করেছেন কিন্তু এই হচ্ছে ভেতরের অন্তর্নিহিত ঘটনা যা কিনা পরােক্ষ উল্লেখের অস্পষ্ট অর্থ হয়ে ওঠে।

তাহলে দেখতে পাচ্ছি তাৎপর্যের একটি নিছক রীতি- পরােক্ষ উল্লেথ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সমস্ত জগতের প্রতি কোনো অঙ্গীকার, যেহেতু সে একজন একক মানুষ এবং একটি সাধারণ ভাষার মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশ করে : একটি ‘পদ্ধতি’ (সমস্ত অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজমের ঘৃণ্য অপচ্ছায়া) আমাদের পরিচিত সাহিত্যের মধ্যে সবথেকে জ্বলন্ত এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ হিসাবে (মার্থ রোবের মনে করিয়ে দেন) চট করে বলা যায় একটা কুকুরের মতো, একটা কুকুরের জীবন, একটা ইহুদি কুকুর, মন্ময়তাকে পরােক্ষ উল্লেখের রাজ্যে বদলে দিয়ে রূপকাত্মক অর্থকে খুব ভালভাবেই সমগ্র কাহিনি বর্ণনার মূল বিষয় করে তােলা যায়, যাতে একজন অপমানিত মানুষ হুবহু একটি কুকুর হয়ে ওঠে, কুকুরের মতো ব্যবহারপ্রাপ্ত একজন মানুষ ‘হচ্ছে’ একটি কুকুর। এইভাবে কাফকার রীতি প্রথমে জগতের সঙ্গে একটা সমঝােতার ফল হিসাবে প্রকাশ পায়, যা চলতি ভাষার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে, কিন্তু ঠিক তারপরেই জগতের দ্বারা উপস্থাপিত সংকেতগুলির আক্ষরিক অর্থের সামনে আসে মনােভাব গােপন, সন্দেহ, আতঙ্ককে প্রকাশ করে। মার্থ রােবের একে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে : কাফকা এবং জগতের মধ্যে সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে এক চিরস্থায়ী ‘হ্যা, কিন্তু… মারফৎ, যার সাফল্যের ফলে এটিকে পরিষ্কারভাবে আমাদের সর্বাধুনিক সাহিত্য বলা যায় (এবং প্রকৃতপক্ষে কাফকাই একে সৃষ্টি করেছেন) যেহেতু তা অননুকরণীয়ভাবে বাস্তববাদী পরিকল্পনা (জগৎকে ‘হ্যাঁ’ বলা) এবং নীতিবাদী পরিকল্পনার (কিন্তু…) মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। যে দূরত্ব ‘কিন্তু’র থেকে ‘হ্যাঁ’-কে আলাদা করে রাখে তা হলো সংকেতগুলির সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা, তার কারণ সেখানে কোনো সাহিত্য আছে কিনা সে ব্যাপারে সংকেতগুলি অনিশ্চিত। কাফকার রীতি বলে, জগতের অর্থ উচ্চারণেরও অযােগ্য; শিল্পীর একমাত্র কর্তব্য সম্ভাব্য তাৎপর্যগুলির অনুসন্ধান চালানাে যাদের প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে দেখলে কেবল (প্রয়ােজনীয়) অসত্য ধরা পড়বে, কিন্তু যাদের বিবিধত্ব লেখকের মতো সত্য। এই হলো কাফকার আপাতবিরােধী মত : শিল্প নির্ভর করে সত্যের ওপর, কিন্তু সত্য অবিভাজ্য হওয়ার ফলে নিজেকে জানতে পারে না, সত্য ‘বলা’ মানে মিথ্যা কথা। তাহলে লেখক হচ্ছেন সত্য, তবু যখন তিনি বলেন, তিনি মিথ্যে বলেন : কোনো সাহিত্যধর্মের কর্তৃত্ব তার নান্দনিকতার মাত্রায় কখনো অবস্থান করে না, করে তার নৈতিক অভিজ্ঞতার মান অনুযায়ী যা সেটিকে অনুমিত মিথ্যায় পর্যবসিত করে, কিংবা কাফকা যেমন কিয়ের্কেগার্দকে সংশােধন করে বলেন : “গর্বহীনভাবে শুধুমাত্র নৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা অস্তিত্বের নান্দনিক উপভােগ্যতায় পৌছাই।”

কাফকার পরােক্ষ উল্লেখের পদ্ধতি অন্যান্য সংকেতগুলিকে জিজ্ঞাসা করবার জন্য এক বিশাল সংকেত হিসেবে কাজ করেছে। এখন তাৎপর্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুশীলনের (উদাহরণ হিসাবে অংক যেমন সাহিত্য থেকে অনেক দূরে) কেবল একটি মাত্র প্রয়োজনীয়তা আছে যা কিনা নিজে নিজেই নান্দনিক প্রয়োজন হয়ে উঠবে : সেটা হলো উগ্রতা। যে কোনো ত্রুটি এবং দ্বিধা, পরোক্ষ উল্লেখরীতির নির্মাণে অতিবিরোধী মতানুসারে নানা প্রতীকের সৃষ্টি করতো, তার সাহিত্যের প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাত্মক কাজের জন্য একটি নিশ্চয়াত্মক ভাষাকে প্রতিকল্প হিসাবে স্থান করেন। উপন্যাসের প্রকৃত অনুসন্ধানকারীদের প্রতি আবার কাফকার উত্তর : অবশেষে এই হচ্ছে লেখার যথার্থতা (অবশ্যই সংগঠনরীতির বা sratural যথার্থতা, অলংকশাস্ত্রের বা rhetorical নয় : এখানে ‘সৎ লেখা’র কোন ব্যাপার নেই) যা জগতের কাছে লেখককে অঙ্গীকার করায় : কোনরকম স্বেচ্ছানির্বাচনে নয়, তার নিজের সেই স্বপক্ষত্যাগে : যার কারণ জগৎ ‘শেষ’ হয়নি, যার কারণ সাহিত্য এখনো সম্ভবপর।

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close