Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ লর্ড হেইলশাম > কবি রবীন্দ্রনাথ >> জন্মশতবার্ষিকীর ভাষণ

লর্ড হেইলশাম > কবি রবীন্দ্রনাথ >> জন্মশতবার্ষিকীর ভাষণ

প্রকাশঃ May 7, 2018

লর্ড হেইলশাম > কবি রবীন্দ্রনাথ >> জন্মশতবার্ষিকীর ভাষণ
0
0

লর্ড হেইলশাম > কবি রবীন্দ্রনাথ >> জন্মশতবার্ষিকীর ভাষণ

 

[সম্পাদকীয় নোট : ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হয় লন্ডনে। উদ্যোক্তা ছিলেন ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য লর্ড হেইলশাম (১৯০৭-২০০১)। শতবার্ষিকীর ওই অনুষ্ঠানে তিনি যে বক্তৃতা করেছিলেন এখানে সেই বক্তৃতার বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করা হলো। লক্ষণীয়, এই ভাষণে সংক্ষেপে লর্ড  হেইলশাম ব্যক্তি ও সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের যে সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরেছেন, তা একজন বিদেশির চোখে হলেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে একসময়ে ভারতবর্ষ যে ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে ছিল, সেই উপনিবেশবাদী দেশের একজন রাজনীতিবিদ রবীন্দ্রনাথের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, সেটা বোঝা যায়।]

“…আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ অদ্বিতীয়। তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তবু সারাজীবন তিনি মুখ্যত কবিই ছিলেন। আমার বিশ্বাস তাঁর সবচেয়ে বড়াে সাহিত্যকীর্তি তাঁর কবিতা এবং নাটক, বিশেষত তাদের মধ্য দিয়ে বাংলার জীবন এবং গ্রাম বাংলার উদ্বোধন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে যখন নােবেল পুরস্কার দিয়ে পাশ্চাত্য জগত তাঁর প্রতিভার সমাদর করল, সারা এশিয়ায় তিনিই প্রথম এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।”

আজ আমরা যে মহামানবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি তিনি নিঃসন্দেহে মহৎ কবি। কিন্তু কেবল কবি বললে তাঁর পরিপূর্ণ পরিচয় হয় না, সব কবিই মানুষ হিসেবে মহৎ নয়। কিন্তু মহৎ মানুষ মাত্রই কবি। কারণ বস্তুজগতে, শব্দসম্ভারে বা মানবসম্পর্কে যেখানেই নতুন সৃষ্টির আবির্ভাব, কবির কাব্য রচনার সঙ্গে তা সমধর্মী। বস্তুত, রচনা বা সৃষ্টির এই ক্ষমতাই প্রতিভার প্রকৃত এবং অভ্রান্ত লক্ষণ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রতিভাধর মহা-মানব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত অর্থেও তিনি কবি, শব্দ ব্যবহার করে তিনি কবিতা লিখেছেন, গান বেঁধেছেন এবং শিক্ষিত ও অশিক্ষিত তাঁর স্বদেশবাসী সকলেরই কণ্ঠে সে কবিতা ও গান ধ্বনিত। মাতৃভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি এবং যুগের আত্মাকে সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছিল।

এ কথা অবশ্য সত্য যে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের জন্যেই রবীন্দ্রনাথ নােবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু, আমার মনে হয় না যে কেবলমাত্র তাঁর কাব্যপ্রতিভার ভিত্তিতেই লন্ডনে তাঁর শতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের আয়ােজন হয়েছে। কবিতার যথার্থ অনুবাদ সম্ভব নয় এবং আমার বিশ্বাস যে সকলেই স্বীকার করেন যে অনুবাদে তাঁর কাব্যরসের বিপুল হানি হয়েছে। অথচ তাঁর মাতৃভাষা বাঙলা। যে ভাষায় তিনি কাব্যরচনা করেছিলেন, এদেশে বিশেষ কেউ জানে না। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন চিন্তানায়ক। যে ভাষায় চিন্তাকে তিনি রূপদান করেছেন তার সৌন্দর্যের চেয়ে চিন্তার উৎকর্ষের জন্যই তিনি ব্রিটেনে বেশি সমাদৃত হবেন।

ব্যাপক এবং বিশিষ্ট দুই অর্থেই রবীন্দ্রনাথ একান্তভাবে ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন। প্রেম, প্রকৃতি, দেশজদৃশ্য নিয়ে কবিতা তিনি প্রচুর লিখেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতার মূল সুর ধর্মাত্মক, এমন কি মিসটিকও। গীতাঞ্জলি প্রধানত হয়তাে সম্পূর্ণভাবেই ভক্ত এবং ভগবানের প্রেমলীলার কাব্য। রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠকালে তাঁর ধর্মবােধের কথা মনে রাখতেই হবে, তার প্রকৃতি নির্ণয়ও একান্ত প্রয়ােজনীয়। যে ধর্মপ্রাণতা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাকে উদ্দীপ্ত করত ভারতবর্ষ এবং য়ুরােপে যে পরিমাণে তার দৈন্য দেখা দিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বােধ হয় সেই পরিমাণেই তাঁর খ্যাতির লাঘব হয়েছে।

ধর্মনিষ্ঠ হয়েও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবতাবাদী—সাধারণ ধার্মিক ব্যক্তিদের সঙ্গে এইখানেই তাঁর তফাৎ। মানবতাবাদে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁদের মধ্যে অনেকেই জাতীয়তাবাদে বিরাগী। কিন্তু মানবতাবাদে বিশ্বাসী হয়েও তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী। তাঁর কাছে স্বদেশপ্রীতি এবং মানবতাবাদ পরস্পর বিরােধিতা তাে নয়ই, বরং একই দর্শনের, একই ধ্যানের অঙ্গীভূত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সভ্য মানবসমাজের সংস্কৃতি এবং দর্শন এক। এবং সত্যিকারের জাতীয় সংস্কৃতি বলে যদি কিছু থাকে তবে বিশ্বসংস্কৃতিরই অঙ্গ এবং প্রকাশ হিসাবেই তার সার্থকতা। বর্তমান যুগে এই বিশ্বাসের প্রয়ােজন যত বেশি, আমাদের দুর্ভাগ্যবশত আজ সে বিশ্বাস তত বেশি দুর্বল।

রবীন্দ্রসাহিত্যের নিগূঢ় অন্তর্লোকে রয়েছে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাতের চেতনা। তাঁর যুগে এ সংঘাত সব চেয়ে বেশি তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছিল। তিনি ব্রিটেনকে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতীক বলে ধরে নিয়েছিলেন, এবং প্রধানত সংস্কৃত সাহিত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বাঙলা সংস্কৃতির মধ্যে তিনি প্রাচ্য-সভ্যতার প্রকাশ দেখেছিলেন। এই দুই সভ্যতার সম্পর্কের চেতনা তাঁর সাহিত্যকে আজকের দিনেও আমাদের পক্ষে সমকালীন করে রেখেছে। এই দুই জগতেই তাঁর বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ। একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে তিনি প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য দুই সভ্যতাকেই ভালোবাসতেন, কিন্তু এককভাবে কোনটাতেই তাঁর মন ভরে নি। সেই অতৃপ্তির ফলেই তাঁর বিশাল সাহিত্য রচনা, নাটক, উপন্যাস, কবিতা, গল্প, বক্তৃতা, গানের মধ্যে আত্মপ্রকাশ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, এবং দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণে তাঁর প্রতিভার অমিত উৎসার। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতীয় বিদ্রোহের চার বছর পরে, তাঁর মৃত্যু হয়েছে ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার ছ-বছর পূর্বে। সুতরাং ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ শাসনের যে মেয়াদ, তার প্রায় সবটা জুড়েই তাঁর জীবৎকাল। মহাত্মা গান্ধী ছাড়া তিনিই প্রথমে বাংলা এবং পরে সর্বভারতের জাতীয় চেতনাকে প্রকাশ করেছেন, জাতির ভবিষ্যতকে নির্দিষ্ট করেছেন। ব্রিটেন এবং ভারতবর্ষের মধ্যে আজ যে মৈত্রীর বন্ধন, রবীন্দ্রনাথের সাধনার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে।

পাশ্চাত্য জগতে রবীন্দ্রনাথ প্রধানত লেখক বলেই খ্যাত এবং আমার মনে হয় লেখক হিসেবেই এদেশেও সকলে তাঁকে দীর্ঘকাল মমতার সঙ্গে স্মরণ করবে। ব্রিটেনে তিনি বহুবার নানা উপলক্ষ্যে এসেছেন। স্কুলের ছাত্র হিসেবে তিনি ইংলণ্ডে বাস করেছেন, সাহিত্য সৃষ্টিতে আত্মনিয়ােগ করবার আগে আইনের ছাত্র হিসেবেও থেকেছেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এদেশে আবার এসেছিলেন এবং পরের বছর বক্তৃতা দেবার জন্যে ফিরে আসেন। তিনি এদেশে শেষবারের মতন আসেন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। সেবার তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিবার্ট-বক্তৃতা দেন এবং সেই বক্তৃতামালা পরে মানুষের ধর্ম নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এদেশের বহু, খ্যাতিমান ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল, যেমন স্যার উইলিয়াম রােদেনস্টাইন এবং ডব্লিউ. বি. ইয়েটস। ইয়েটসই ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা লেখেন এবং গীতাঞ্জলিই রবীন্দ্রনাথের কাব্যসংকলনের প্রথম স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ। এই কবিতা সংগ্রহই পাশ্চাত্য জগতে তাঁর প্রতিভাকে প্রথম উদ্ভাসিত করে।

আমি শুনেছি যে আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ অদ্বিতীয়। তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তবু সারাজীবন তিনি মুখ্যত কবিই ছিলেন। আমার বিশ্বাস তাঁর সবচেয়ে বড়াে সাহিত্যকীর্তি তাঁর কবিতা এবং নাটক, বিশেষত তাদের মধ্য দিয়ে বাংলার জীবন এবং গ্রাম বাংলার উদ্বোধন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে যখন নােবেল পুরস্কার দিয়ে পাশ্চাত্য জগত তাঁর প্রতিভার সমাদর করল, সারা এশিয়ায় তিনিই প্রথম এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সাহিত্য-সৃষ্টিই ভাষার সৌন্দর্যে অনবদ্য। আমরা তার সৌন্দর্য আন্দাজ করতে পারি মাত্র, পুরােপুরি উপলব্ধি করতে পারি না—এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। তবু মূল কবিতার অনুপম সৌন্দর্য অনুবাদেও ধরা পড়েছে। বিশেষ করে অন্যান্য লেখায়- যেমন উপন্যাসে, বাংলার দিগন্তছোঁয়া নদীতে ভ্রমণের কাহিনিতে আমি শুনেছি, অনুবাদেও মূল রচনার মহত্ত্ব ও মাধুর্য বহুল পরিমাণে বােঝা যায়।

রবীন্দ্রনাথ সেই স্বল্পসংখ্যক শিল্পীদের একজন যাঁরা শিল্পের বহু শাখায় পারদর্শী। তাই তাঁকে বলা হয়েছে ভারতীয় রেনেসাঁর দাভিঞ্চি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ছবি আঁকতে শুরু করলেন এবং শিল্পের অন্যান্য শাখায় যেমন এক্ষেত্রেও অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর ছবি আঁকলেন। তাঁর ছবির প্রকৃতিগত স্বাতন্ত্র্য প্রথম দৃষ্টিতেই নজরে পড়ে, ভারতীয় সনাতন শিল্পরীতির সঙ্গে বাহ্যত, তার সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বরঞ্চ তাঁর ছবি দেখে আধুনিক য়ুরােপীয় চিত্রকলার কথাই মনে আসে এবং তাই য়ুরোপীয় দর্শকদের কাছে তার আবেদন অনেক বেশি দ্রুত হবার সম্ভাবনা। এ বিষয়ে যাঁরা পারদর্শী, তাঁরা কিন্তু বলেন রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প যে নিগূঢ় অথচ নিশ্চিতভাবে ভারতীয় একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই।

এসব ছাড়া রবীন্দ্রনাথ সংগীতসাধকও ছিলেন এবং সেক্ষেত্রেও তাঁর প্রতিভা শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় অনুজ্জ্বল নয়। নিজের বহু কবিতা মিলিয়ে তিন হাজারেরও বেশি গানে তিনি সুর দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি তাঁর কাব্যপ্রতিভার ওপরই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু দার্শনিক হিসেবেও তিনি প্রখ্যাত হয়েছিলেন এবং দর্শনশাস্ত্রে তাঁর উৎসাহ সমস্ত জীবনব্যাপী এবং অত্যন্ত গভীর। বেদান্ত দর্শনের মূলে উপনিষদের সূত্ৰ কবিপ্রতিভার দ্বারা তিনি তাদের ব্যাখ্যা করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার আলােকে তাদের নতুন করে প্রকাশিত করেছেন। জীবাত্মা ও পরমাত্মার অদ্বৈত ঐক্য উপনিষদের বাণী। তিনি মনেপ্রাণে সে বাণীকে গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়—

এ আমার শরীরের শিরায় শিরায়
যে প্রাণ তরঙ্গমালা রাত্রিদিন ধায়
সেই প্রাণ ছুটিয়াছে বিশ্বদিগ্বিজয়ে।
সেই প্রাণ অপরূপ ছন্দে তালে লয়ে
নাচিছে ভুবনে।

সংসার বর্জন করে ভগবান মেলে, এ মতবাদ রবীন্দ্রনাথ পুরােপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর স্বয়ং কর্মী এবং তাঁর কর্মে আমাদের যােগ দিতে হবে। ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে অবহেলা করা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ।

ইংরেজি গীতাঞ্জলির একটা কবিতায় তাঁর ভীষণ অনুভূতির পরিচয় মেলে—

এই যে তােমার প্রেম ওগাে হৃদয় হরণ।
এই যে পাতায় আলাে নাচে সােনার বরণ।

তাঁর জীবনদর্শন ছিল আবেগময় এবং মূলত মানবীয়, নিরুত্তাপ বৃদ্ধির কসরৎ তাঁর মনকে স্পর্শ করেনি। তাঁর মানবপ্রেম, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসার জন্যই বােধ হয় তিনি চিরকাল মানুষের হৃদয় আকর্ষণ করতেন।

শান্তিনিকেতনে তিনি যে আদর্শকে রপ দিতে চেয়েছিলেন, তার উল্লেখ না করলে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন সম্পূর্ণ হবে না। মধ্যজীবনে যেখানে তিনি ঘর বেঁধেছিলেন, সেখানে বিরাট তরুচ্ছায়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্ডিত ব্যক্তি এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। এখানেই প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিণতির মতন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির কেন্দ্র বিশ্বভারতী গড়ে উঠল। এই প্রচেষ্টায় তিনি অকুণ্ঠ সাহায্য পেয়েছেন দুজন ইংরেজের কাছ থেকে, রেভারেণ্ড চার্লস এনড্রুজ এবং উইলিয়ম পিয়ারসন। রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধী, দুজনার সঙ্গেই তাঁরা কাজ করেছেন। দুজনেই তাঁদের ভালোবেসেছিলেন। আজ তাঁদের কথাও আমাদের স্মরণ করা উচিত।

অন্য অনেকে আমার চেয়ে আরাে ভালােভাবে শান্তিনিকেতনের আদর্শ সম্বন্ধে আপনাদের বলতে পারবেন। তাঁর বসন্তোৎসবের কথা, বিরাট গাছের ছায়ায় পাঠরত শিশুদের কথা, আজকের যান্ত্রিকতার হট্টগােল থেকে সরে অধ্যয়নরত পরিণতবুদ্ধি শিক্ষাথীদের কথা তাঁরা আপনাদের বলবেন। আমি শুধু, বলব যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনার অনেকগুলি শান্তিনিকেতনেই রচনা করেছিলেন, বাংলার মাটিতে এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন যে, কোনকালে তার বিনাশ নেই।

রাজনীতির বাস্তব বিষয় নিয়ে আমার কারবার, আমার মতন রাজনীতিকের মুখে এই প্রশস্তি বিচিত্র শােনাতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একজন বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জাতীয় নেতা, সেকথা কি করে ভুলব? অবশ্য তিনি কোনদিনই প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক ছিলেন না এবং এ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা পরিষ্কার রাখা প্রয়ােজন। এক অর্থে তিনি রাজনীতিকে অপছন্দই করতেন কিন্তু জাতির লক্ষ্য সাধনে রাজনীতির ভূমিকাকে তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। তাঁকে যে রাজনৈতিক কর্মপ্রবাহে যােগ দিতে হয়েছিল, এক অর্থে তা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তাঁর মানসিক নির্মিতির বিরুদ্ধে তাে বটেই। তাঁর লেখায় প্রায় সর্বত্রই জাতির পুনরুজ্জীবনের যে দীপ্ত পরিচয় মেলে, তাঁর নিজের রাজনৈতিক কার্যকলাপের চেয়ে সেই বাণীই স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতার প্রত্যেকটি সংগ্রামের জন্য, ইতিহাসের প্রত্যেক বিপ্লবের জন্যই কবির প্রয়ােজন। তাঁর রচনায় সে যুগের আত্মা প্রকাশিত হয়, কবির বাণী সংঘাত ও বিপ্লবের পথে মশাল জেলে ধরে। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেই ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ উগ্র আবেগে রবীন্দ্রনাথ কখনই বিশ্বাসী ছিলেন না, এধরনের জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত বিপদ সম্বন্ধে তাঁর চেতনা ছিল প্রখর। যেখানেই তিনি উগ্র জাতীয়তার প্রকাশ দেখেছেন, মানবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে তার নিন্দা করেছেন। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ শান্তি এবং ঐক্যের মধ্যে বাস করবে, শান্তিময় এবং পূর্ণতর জীবনের জন্য তারা সাধনা করবে এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য সাধন করতে হলে সকলকেই স্বাধীন হতে হবে, ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা অর্জন করে নিজের জাতির এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ঘােষণা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধীর মধ্যে বহু বিষয়ে অমিল ছিল, কিন্তু দুজনেই একই স্বপ্ন দেখতেন, দুজনেরই লক্ষ্য একই ধরনের বলে এত পার্থক্য সত্ত্বেও তাঁদের পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্ব এবং শ্রদ্ধা কোনদিন ক্ষুণ্ন হয়নি।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার ছ-বছর আগে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হলো, এটা আমাদের ভাগ্য। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে যেদিন ভারতের স্বাধীনতা ঘােষিত হলো, তিনি যদি সেই দিনটি প্রত্যক্ষ করতে পারতেন তা হলে তাঁর শেষজীবনের লেখায় যে হতাশার সুর, তা নিশ্চয়ই দূর হয়ে যেত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রূপান্তরে, কমনওয়েলথ-এর আবির্ভাবে তিনি নিশ্চয়ই এই শতাব্দীর সবচেয়ে আনন্দজনক পরিণতি বলে অকুণ্ঠ অভিনন্দন জানাতেন। ব্রিটেন এবং ভারতবর্ষের সম্পুর্ক মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এমন নাটকীয়ভাবে পাল্টে যাবে, ১৯৪১ সালের যুদ্ধতিক্ত দিনে একজন অশীতিপর বৃদ্ধের পক্ষে তা কল্পনা করা সহজ ছিল না। কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠার ফলে বর্তমানে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে বন্ধুত্বের, সহযােগিতার এবং পরস্পরকে বােঝবার সহস্র পথ খুলে গেছে, বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথ তাতে নিশ্চয়ই আনন্দিত হতেন।

কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠার পর চৌদ্দ বছর অতিবাহিত হয়েছে। ইংরেজ এবং ভারতবাসী এই নতুন পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে। আমার মনে হয় প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য জগতে বৃটেন এবং ভারতের মতো এমন সহমর্মী দুটি দেশ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ ঘটনা রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু যে অভিনন্দনই পেত তা নয়, তাঁর জীবন এবং সাধনাই প্রধানত একে সম্ভব করেছে।

রবীন্দ্রনাথের মতাে প্রতিভা পৃথিবীতে খুব কমই আসে। তাঁর ধ্যানের জগৎ বাস্তবরূপ নেবার পূর্বেই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষির মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, তাঁর প্রতিভা অনুগামীদের মনে সেই ধ্যানকে সঞ্চারিত করে এবং তারাই তাকে সিদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ চলে গেছেন, কিন্তু আমরা রয়েছি। তাঁর মহিমা, তাঁর স্মৃতিই আজ আমাদের সকলকে একই ক্ষেত্রে সমবেত করেছে। ঈশ্বর এবং মানুষের প্রতি তাঁর প্রেমের উজ্জ্বল ঐশ্বর্য, মানবাত্মার বিশ্বজনীনতার প্রতি তাঁর আস্থাকে আগামীকালে বয়ে নিয়ে যাবার মতাে সংকল্পের স্থিরতা এবং সৎ মনােবৃত্তি আমাদের আছে কিনা, ভবিষ্যতই তার বিচার করবে।

ছবি : লন্ডনের গর্ডন স্কয়ারে ২০১১ সালে স্থাপিত রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি অবমুক্ত করেন ব্রিটেনের যুবরাজ চার্লস।

অনুবাদ : মেহরাব হাসান

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close