Home অনুবাদ ডিনো বুজ্জাটি > পতন >> ভাষান্তর : রাবেয়া রব্বানী

ডিনো বুজ্জাটি > পতন >> ভাষান্তর : রাবেয়া রব্বানী

প্রকাশঃ August 23, 2018

ডিনো বুজ্জাটি > পতন >> ভাষান্তর : রাবেয়া রব্বানী
0
1

ডিনো বুজ্জাটি > পতন >> ভাষান্তর : রাবেয়া রব্বানী

 
[সম্পাদকীয় নোট : ইতালীয় কথাসাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী ডিনো বুজ্জাটি-র (১৯০৬-১৯৭২) যে গল্পটি এখানে প্রকাশিত হচ্ছে সেটি পরাবাস্তববাদী অ্যাবসার্ড গল্প। নগরজীবনের ইঙ্গিতধর্মী কিছু অনুষঙ্গে গল্পটি নির্মিত। বাংলায় এরকম ছোটগল্প লেখা হয়েছে, তেমনটা চোখে পড়বে না। এটাই বিস্ময়ের। গল্পটি পড়লেই পাঠকেরা সেটা বুঝতে পারবেন।]
মার্টার বয়স উনিশ। আকাশচুম্বী ভবনের ছাদ থেকে সে আবছা কালচে শহরটা জ্বলজ্বল করতে দেখছে। এত উঁচুতে ওঠার কারণে সৃষ্ট মাথা ঘোরাটা এখন কমে।
শহরের সবচেয়ে উঁচু রুপালি রঙের ভবনটাকে এই সুন্দর সন্ধ্যায় বেশ ঋদ্ধ দেখাচ্ছে। আকাশের নীল পটভূমিতে বাতাস তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কিছু মেঘের খণ্ড। এটা এমন একটা সময় যখন পুরো শহরই আলগা রকম উদ্যমী ও অস্থির হয়ে ওঠে। একমাত্র অন্ধই এই সময়ের বিশেষ প্রভাব থেকে গাঁ বাঁচাতে পারে। এখন এই অতিমাত্রার উঁচু স্থান থেকে মেয়েটির মনে হচ্ছে রাস্তা, দালান, লোকজন, এসবই যেন সূর্যাস্তের লম্বা আলোর দ্বারা তৈরি খিঁচুনিতে তির তির করে কাঁপছে। যেখানে বাড়িগুলোর সাদা রঙ শেষ হয়ে গেছে সেখানেই যেন সাগরের নীল রঙের শুরু। তার এও মনে হচ্ছে সাগর জেগে উঠছে আর শহরটা হয়ে উঠছে দপদপ করে জ্বলে ওঠা একটা নরক।
হাসি-তামাশা, ভায়োলিনের শব্দ, মণি-মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করা গাড়িগুলো, রাতের ক্লাবের নিয়ন বাতি,অন্ধকার অট্টালিকার প্রবেশদ্বার, ফোয়ারা, হিরা-মুক্তো, পুরনো নীরব বাগান, অনুষ্ঠান, কামনা, প্রেম এসব কিছুই একটু একটু করে সন্ধ্যার এই কোমল মায়া শুষে নিচ্ছে আর উশকে দিচ্ছে যাবতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্নগুলোকে। এসব দেখে বিষণ্ণ মার্টা রেলিংয়ের বাইরে হেলান দিয়ে নিজেকে শূন্যে ছেড়ে দিয়েছে। তার মনে হচ্ছে সে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কেবল কিন্তু আসলে সে পড়ে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী ভবনের অস্বাভাবিক উচ্চতার কারণে ছাদ থেকে নিচের রাস্তা পর্যন্ত দূরত্ব অনেকটা। সেই পর্যন্ত যেতে মেয়েটার কতটা সময় লাগবে তা কেউ জানে না কিন্তু মেয়েটা এখনো নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে।
ভবনটার উপরতলার খোলা ছোট ছাঁদগুলোর চত্বর এবং বারান্দাগুলোতে নামীদামী ধনী ব্যাক্তিরা পানীয় এবং খোশগল্পে মশগুল। তারা বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের কোলাহলে সুমধুর সংগীতের শব্দে ভাটা পড়ছে। মার্টা তাদের অতিক্রম করছে আর অনেকেই তাকে দেখতে বাইরে তাকাচ্ছে।
সত্যি বলতে এই ধরণের উড়ন্ত মানুষ (বিশেষ করে মেয়েমানুষ) দেখতে পাওয়া এরকম আকাশচুম্বী ভবনের জন্য নতুন কোন বিষয় না। এগুলো এখানকার ভাড়াটিয়াদের জন্য বিনোদনের একটা ভিন্ন মাত্রা। আর একারণেই এ ধরণের ভবনগুলোর ভাড়া এতো বেশি।
সূর্য এখনও ঠিকঠাক ডুবে যায় নি। গোধূলির আলো সাধ্যমত মার্টার সাধারণ পোশাককে উদীপ্ত করছে।যদিও সে আজ বিকেলে একটা কম দরের বিশেষত্বহীন মার্জিত বসন্তের পোশাক তার আলনা থেকে গায়ে দিয়েছে কিন্তু এই মোহময় আলো যেভাবেই হোক তাতে একটা উঁচুমাত্রার পরিপাট্য ভাব এনে দিয়েছে।
এখন কোটিপতিদের বারান্দা থেকে কিছু সাহসী হাত তাকে টেনে নিতে চাইছে, ফুল ও পানীয় সাধছে। বলছে, “ওহে যুবতী, তুমি কি এই পানীয়টা চেখে দেখবে?… হে নম্র প্রজাপতি, আমাদের সাথে কিছুক্ষণ থাকো না।”
সে হাওয়ায় ভেসে ভেসে (আদতে সে পড়ে যাচ্ছে) হাসছে আর খুশি হয়ে বলছে, “না না থামা যাবে না।”
তারা জিজ্ঞেস করছে, “তুমি যাচ্ছোটা কোথায়?”
“আহ সে প্রশ্ন করো না তো” এই বলে মার্টা বিদায় জানাতে হাত নাড়ছে।
এবার দেখতে লম্বা, শ্যামলা একেবারে অন্যরকম দেখতে একজন যুবক হাত বাড়িয়েছে তাকে টেনে কাছে নিতে। তাকে কিছুটা ভালো লাগলেও মার্টা নিজেকে সামলে নিয়েছে, “আপনার সাহস তো কম নয় স্যার।” নাহ! বেশী কিছু না। সে লোকটার নাক টিপে দিয়েছে কেবল।
এত এত সুন্দর মানুষ তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে মার্টার মন ভরে গেছে। নিজেকে কেতাদুরস্ত মনে হচ্ছে তার। ফুল দিয়ে সাজানো ছাঁদ বারান্দায় সাদা পোশাকের অসংখ্য খাবার পরিবেশনকারী এবং উচ্চৈস্বরের গান-বাজনার মধ্যে এই অতিক্রম করতে থাকা নারীর কথা হচ্ছে। কেউ তাকে সুন্দরী মনে করছে আর কারও কাছে মনে হচ্ছে সে মোটামুটি চলনসই। কিন্তু সবার কাছেই সে কৌতূহল-উদ্দীপক কিছুই।
তারা বলছে, “তোমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। তোমার কিসের এত তাড়া? কিছুক্ষণ থাকো না।এটা বন্ধু সুলভ একটা মার্জিত আড্ডা। বিশ্বাস কর, চমৎকার সময় কাটাবে তোমার।”
সে উত্তর দিতে চাইছে কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ তাকে দ্রুত নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে। একবারে তিন চার তলা নিচে চলে গেছে সে।আসলে উনিশ বছর বয়সে লোকজন যেভাবে ফুর্তিতে দ্রুত ছুটে, সেভাবে ছুটছে মার্টা।
ছাদ থেকে বেশ কিছু দূরত্ব পার করলেও রাস্তা থেকে এখনো দূরত্ব ঢের। এটাই সত্য যে কিছুক্ষণ আগে সে নিচে পড়ে যেতে শুরু করেছে কিন্তু রাস্তা সব সময় একি রকম দূরত্বের মনে হচ্ছে।
ইতিমধ্যে সূর্যটা সমুদ্রে ডুবে গেছে। সূর্যের এই অন্তর্ধানকে একটি লাল চকচকে মাশরুমের রান্না করা পদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যার ফলে এটা আর মেয়েটার পোশাকের গায়ে আলো ফেলে পোশাকটাকে আকর্ষণীয় করতে পারছে না, তাকে নজরকাড়া ধূমকেতুতে পরিণত করতে পারছে না।
তবে এটা একটা ভালো ব্যাপার যে এখন ভবনটার জানালা এবং ছাদ বারান্দাগুলো সব আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছে।এই আলোর উজ্জ্বল প্রতিফলন তাকে পুরোপুরি সোনালি ছটায় সজ্জিত করছে। মনে হচ্ছে যেন সে দ্রুত না ধীরে ধীরেই নেমে যাচ্ছে।
এখন মার্টা কেবল কাজকর্মহীন ফ্লাটের বাসিন্দাদেরই না বরং কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদেরও দেখতে পাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ কালো না নীল পোশাকে লম্বাসারিতে বসে আছে। তাদের অনেকেই তার বয়সী বা তার চেয়ে বড়। তাদের কেউ কেউ এত খাটুনী আর ক্লান্তির মধ্যেও তার দিকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও কাজ এবং টাইপ-রাইটার থেকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে।
সবাই তাকে এভাবে দেখছে কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ জানালার দিকে ছুটে গিয়ে বলছে, “তুমি কোথায় যাচ্ছ? এত দ্রুত কেন?তুমি কে?”
তারা একরকম চেঁচাচ্ছে। মার্টা উত্তর দিচ্ছে, “তারা আমার জন্য নিচে অপেক্ষা করছে।আমি থামতে পারবো না ক্ষমা করো।”
এবারও সে প্রতারণামূলক এই পতনে কেঁপে কেপে হেসেছে। কিন্তু এটা তার আগের হাসির মতো না কোনভাবেই। শৈল্পিক ভাবে রাত নেমে এসেছে এবং মার্টার শীত লাগছে। এর মধ্যে নিচের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে প্রবেশদ্বারে একটা আলোর চক্র। লম্বা লম্বা কালো গাড়ি থেমে আছে। বিশাল দূরত্ব থেকে সেগুলোকে পিঁপড়ার মতো দেখাচ্ছে। অনেক নারী-পুরুষ বের হয়ে যাচ্ছে কিংবা ভেতরে যেতে উৎসুক হয়ে আছে। এই ভিড়ভাট্রার মধ্যেও সে মনিমুক্তোর ঝলক দেখতে পাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে প্রবেশদ্বারের পতাকা পতপত করে উড়ছে।
তার মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই এখানে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে। যে রকমটা সে ছোট থেকে স্বপ্ন দেখে এসেছে ঠিক সেরকম কিছু। সে ভাবছে, নাহ কোনমতেই এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। নিশ্চয়ই সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে ভাগ্য, প্রেম, জীবনের একটি সত্যিকারের সূচনা। তার ভয় হচ্ছে সে কি ঠিক সময়ে নীচে পৌছতে পারবে?
হঠাৎ আরও একটি মেয়েকে নিচে পরে যেতে দেখতে পেল সে। মেয়েটি তার থেকে ত্রিশ মিটার দূরে। মেয়েটা নিশ্চিতভাবে মার্টার চেয়ে সুন্দরী এবং গায়ে মার্টার চেয়েও ধ্রুপদী সন্ধ্যাকালীন পোশাক। অজানা কারণে সে মার্টার চেয়েও দ্রুত নেমে এসে তাকে অতিক্রম করে নিচে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেছে। মার্টা মেয়েটাকে ডেকেছে তবে সে শুনতে পায় নি। মার্টা বুঝতে পারছে মেয়েটা তার আগেই অনুষ্ঠানে যাবে এবং হয়তো মার্টাকে স্থানচ্যুত করার পরিকল্পনা করেই সে নেমেছে।
এখন সে এও বুঝতে পারছে যে সে একা না। আকাশচুম্বী ভবনটার পাশ দিয়ে অনেক যুবতী নারী নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সেই বিশেষ উড়ালের উত্তেজনায় তাদের মুখ টানটান, তাদের হাত আনন্দে নড়ছে, যেন বলছে, “আমাদের দিকে তাকাও, এখানে আমরা ,আমাদের বিনোদন দাও, পৃথিবীটা আমাদের।”
মার্টা এখন নিশ্চিত এটা আসলে একটা প্রতিযোগিতা। কিন্তু তার গায়ে এমন সাদামাটা ছোট একটা জামা! যেখানে অন্যান্য মেয়েরা মডেলদের মতো চমৎকার পোশাক পরে আছে। এমনকি কেউ কেউ চমৎকার সাপের মতো আঁটসাঁট কাঁধ খোলা জামা গায়ে দিয়েছে। তার এখন আফসোস হচ্ছে ঝাপ দেবার আগে তার এসব ভাবা উচিত ছিল। মার্টা এখন নিজের ভেতর একটা কাঁপুনি অনুভব করছে। হতে পারে অনুভূতিটা শুধু শীতের জন্যই হয়েছে কিংবা হয়ত এটা একধরণের ভয়ও। অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-ভাল করার ভয়।
রাত বেড়ে গেছে। জানালাগুলো একটার পর একটা অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। এখন গানের প্রতিধ্বনি নেই বললেই চলে। অফিসগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে যুবকরা আর হাত বাড়িয়ে নেই। রাত কয়টা হবে এখন? ভাবছে মার্টা।ভবনের প্রবেশদ্বার এখন আগের চেয়ে বড় দেখাচ্ছে। নিচের দিকের স্থাপত্যকলার প্রতিটা বিশেষত্ব আলাদা ভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। আলোগুলো এখনও জ্বলছে। গাড়ির ভিড় এখন আর নেই। মানুষের ছোট ছোট দল ক্লান্তি নিয়ে বের হয়ে আসছে মূল প্রাঙ্গণে। প্রবেশদ্বারের আলোও নিভিয়ে দেয়া হয়েছে।
মার্টার বুক টনটন করছে। আহ শেষমেশ সে বলরুমে ঠিক সময়ে পৌঁছুতে পারেনি! উপরের দিকে তাকিয়ে সে কেবল আকাশচুম্বী ভবনের নিষ্ঠুর উচ্চতা দেখতে পাচ্ছে। একেবারে নিরেট অন্ধকার। উপর তলার ফ্লাটগুলোতে একটা দুটো জানালায় বাতি জ্বলছে এবং তারও উপরে আকাশে ভোরের প্রথম আলোর রেখা একটু একটু করে ফুটে উঠছে।
অন্যদিকে এসময় চব্বিশ তলার খাবারের ঘরে একজন চল্লিশ বছর বয়সী পুরুষ তার সকালের কফি পান করছে আর সংবাদপত্র পড়ছে। তার স্ত্রী ঘর গোছাচ্ছে। হঠাৎ একটা ছায়া জানালা অতিক্রম করতেই তার স্ত্রী চেঁচাল, “আলফ্রেডো, দেখতে পাচ্ছ?একজন মহিলা এখান দিয়ে গেল।”
সংবাদপত্র থেকে চোখ তুলল লোকটা, “সে কে?”
“একজন বৃদ্ধা মহিলা, অথর্ব বৃদ্ধা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ভয় পেয়েছে।”
লোকটা বিড়বিড় করল, “এমনই হয় সব সময়। এরকম নিচের তলাতে থাকলে কেবল পড়ন্ত বুড়ো মহিলা দেখা যায়। একশো তলায় থাকলে সুন্দরী যুবতী মেয়েদের পতন দেখতে পেতাম। এমনি এমনি উপররে দিকে ভাড়া বেশি না বুঝলে?”
তার স্ত্রী তাতে একমত না হয়ে বলল, “অন্তত পক্ষে এখানে একটা সুবিধা পাওয়া যায় দেখো, এই যে ওদের মাটিতে পড়ার ‘ধরাস’ শব্দটা শোনা যায়।”
লোকটা দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কান পেতে শোনার চেষ্টা করল তারপর কফির পেয়ালায় পরবর্তী চুমুক দেবার চূড়ান্ত মুখভঙ্গি করে বলল, “ধুর।এবারতো তাও শুনতে পেলাম না”।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close