Home মুক্তগদ্য লাবণ্য প্রভা > চন্দ্রপ্লাবিত শস্যক্ষেত্র, অর্গানিক খুলি ও তরমুজ >> মুক্তগদ্য

লাবণ্য প্রভা > চন্দ্রপ্লাবিত শস্যক্ষেত্র, অর্গানিক খুলি ও তরমুজ >> মুক্তগদ্য

প্রকাশঃ June 15, 2018

লাবণ্য প্রভা > চন্দ্রপ্লাবিত শস্যক্ষেত্র, অর্গানিক খুলি ও তরমুজ >> মুক্তগদ্য
0
0

লাবণ্য প্রভা > চন্দ্রপ্লাবিত শস্যক্ষেত্র, অর্গানিক খুলি ও তরমুজ >> মুক্তগদ্য

 

[সম্পাদকীয় নোট : কী বলবো এই সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত লেখাকে? গদ্য না পদ্য, নাকি মুক্তগদ্য? কাকে বলবো মুক্তগদ্য? গদ্যকে যা ছাড়িয়ে যায় তা-ই কি মুক্তগদ্য? লেখক লাবণ্য প্রভাকে অনেক বার তাগাদা দেওয়ার পর এই লেখাটি তীরন্দাজকে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বলেছেন, এই লেখাটি মুক্তগদ্য। কিন্তু আমরা পড়তে গিয়ে কবিতার সঙ্গে এর তেমন একটা পার্থক্য খুঁজে পেলাম না। তাই মুক্তগদ্য বলে চিহ্নিত করলেও কী যে বলবো এই লেখাটিকে, বলা মুশকিল। তবু আমরা লেখকের কথা মতো মুক্তগদ্য বলেই প্রকাশ করলাম। আরেকটা কথা বলি, লেখাটা আমাদের খু-উ-ব ভালো লেগেছে। এরকম চমৎকার লেখা যিনি লিখতে পারেন, তাকে অভিনন্দিত করি।]

০১

নিশ্চয়ই আপনি জানেন, নিম বাগানের স্নিগ্ধ ছায়ার নিচেই আমার এক চিলতে উঠোন। সেই উঠোনে মধ্যরাতে অন্ধ হরিণ আর অন্ধ বনমোরগের কান্না শোনা যায় । সারারাত আর ঘুমাতে পারিনা। খুব ভোরে একটু একটু করে আলো ফুটলে আমি উঠোনে দাঁড়াই। দেখতে পাই নীল একটি পালক। প্রতি ভোরেই আমি পালক কুড়াই। এভাবে কয়েক লক্ষ পালক আমার শিথানের কাছে রেখে দিয়েছি। আপনি তো জানেন, এই নগরী ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারি না। কতো কতো উৎসব যে হয়! আপনারা সেখানে আলোকবর্তিকার  মতো জ্বলতে থাকেন। এতো দূর থেকেও আপনার উজ্জ্বল মুখ আমি দেখতে পাই। আপনার পা সেই স্বর্গের পাখির মতো; যা ধুলির স্পর্শে মলিন হয় না। পিনপতন নিরবতার মধ্য দিয়ে আমার হৃৎপিণ্ড গড়িয়ে গড়িয়ে আপনার দিকে ধাবিত হয়। যারা আপনার কথা মুগ্ধভাবে শোনেন তাদেরকে আমার বড়ো স্নিগ্ধ মনে মনে হয়। আমিও অমন স্নিগ্ধ হতে চাই। পান করতে করতে চাই আপনার অব্যক্ত কুয়াশাগুলো…

 

০২

ফেসবুক থেকে উঠে আসুন, কবি। বাইরে ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই।

আমাদের আহসানমঞ্জিল থেকে সোনারগাঁ যাবার কথা। দেরি হবে? তাহলে চলুন নিজেদের হৃৎপিণ্ড ঘিরে কয়েক চক্কর দেই।

০৩

আপনি তো জানেন, আমার জন্য কোথাও কোনো অপেক্ষা নেই। থাকে না। তবু জানান দিতে ভালোবাসি আমি আছি। খুব ভোরে ঘুম ভাঙে আপনার। আলোকবর্তিকার মতো সৌররশ্মি স্থির হয়ে থাকে আপনার জানালায়। আপনার গোপন ঘরে একবার উঁকি দেই, কিন্তু শব্দ করি না। আপনি কি জানেন, শুধুমাত্র সুপ্রভাত বলব বলে সারারাতই জেগে থাকি।

০৪.

একলা হয়ে যাওয়ার ভয়টা আমায় এতো তাড়িয়ে বেড়ায়। আশ্চর্য! জনারণ্যেও নিজের অস্তিত্বহীনতা টের পাই।

০৫.

আজও বাড়ি ফেরেনি প্রিয় শূকর আমার
হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে যীশুর রক্ত
০৬
আমার প্রিয়জন কুরিয়ারে একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন পাঠিয়েছে
ওভেনে সেদ্ধ হচ্ছে বাচ্চা বাচ্চা পাখি….

০৭
কুকুর বংশীয়া বলে গন্ধ না শুঁকেও বলে দিতে পারি প্রতিটি রজনীর আছে দানবীয় ফাঁদ

০৮

এতো আনন্দ! এতো তীব্র বেদন! কী চঞ্চল মন আমার! অকারণেই।

০৯

দীর্ঘ পথ বেয়ে হাঁটছি তো হাঁটছিই
দূর আফ্রিকায় অন্ধকার গাঢ়ত্ব নিয়ে সূর্যের বিপরীতে দাঁড়ায়; সহোদরাদের কান্নার জল বাষ্প হয়ে যায়
আজ আর কাঞ্চনমালার দুঃখের কথাও বলতে চাই না
কিউসেক বেঁধে জল পেতে কত কাঞ্চনমালাকে সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতে হবে কে জানে!
গ্যালো মাসে চুক্তি মোতাবেক বাড়ি ছাড়তে পারিনি বলে চড়ুইয়ের বাসাটিও ভেঙে দিল দাঁতাল বুলডোজার
এমন মহিমান্বিত রাতে তবে এসব কথা থাক
তার চেয়ে বরং
চন্দ্রপ্লাবিত শষ্যক্ষেত্র পেরিয়ে চলো নুরজাহান বাঈজীর মসজিদে একখানা মোমবাতি জ্বেলে আসি

১০

উঠানে জ্যোৎস্না ভেঙে পড়ছে খলবলিয়ে। সেইসাথে মাটিতে নিমপাতার কারুকাজ। তাকে দেখি ডালিম গাছের ফাঁক দিয়ে। তার সঙ্গে বোধহয় প্রথম দেখা হয়েছিল একটা মৌতা বাড়িতে। আসলে বাড়ি কি? বোধহয় একটি নার্সিং হোমে। অন্ধকার প্যাসেজে আইসিইউয়ের সামনে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। কেমন ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাই। সেই সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, তাকে নিয়ে জীবনে একবার প্রদীপ জ্বালাবো নূরজাহান বাঈজীর মসজিদে। একথা ভাবতেই মনের ভেতর পুদিনাপাতা হেসে ওঠে।
আহা! কো থায় সেই অলীক রজনী!
১১
পরিভ্রমণ দীর্ঘ ছিল
ঊনিশ শ আশির দশকের মধ্যরজনীতে শীর্ণকায় কুকুরটি আমাদের উঠোনে কেন যে কান্না করেছিল!
তখন পূর্ণিমা। তখন ভরা-চন্দ্র আড়াল করে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে হাত-পা-জিহ্বাওয়ালা পাথর। ধীরে তা নরম হতে হতে আকাশের অনেক নিচুতে নেমে আসে
আর শূন্যদশকে এসে মিশে যায় খোদেজাদের পেলভিসে। এইসব ভরাট জ্যোৎস্না ফণিমনসার ঝাড় আর নাভীর কম্পনে ভাঙা অস্থি ও আপেল গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য…
তাহাদের ঘনিষ্ঠ মশারিতে রাত বারোটা বাজে
ঘড়ির কাঁটায় ঘুমোতে যায় তাবৎ ফড়িং

১২

সিঙ্গাপুর থেকে নেভীর জাহাজ ফিরে এসেছে
মুঠি ভরে ভরে ভ্রাতৃত্ব আর সৌহার্দ্য বিলিয়ে
অথচ প্রাপ্য মজুরির জন্য কপালে জোটে লাঠির প্রহার
তবু, সন্ধ্যার প্রাক্কালে শ্রমজীবীরা সড়ক অবরোধ করে
তবে আজ যৌননিপীড়নের বিরুদ্ধে স্মারকযাত্রায় কোনো বাধা ছিল না
কেন তা তো জানই

চুপি চুপি বলি, পদ্মার চরে খুলি ও কঙ্কালের সাথে এবছর অর্গানিক তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে

এতো কিছুর ভিড়েও তোমার সঙ্গে সড়কদ্বীপের একসন্ধ্যা ভুলি না যে কেন!

তুমি ভেবো না তীর্থঙ্কর!
নগরপিতাকে বলে সড়কদ্বীপটি সরিয়ে দেবো

১৩
হৃদয় আমার প্রকাশ হলো অনন্ত আকাশে
বেদনবাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে
…তুমিই তো বলেছিলে হৃদয় প্রকাশ হলে বেদন বাঁ শি বাজবেই। কেননা বেদনায় নিজেকে জানা যায়। বিদ্যা এবং বেদনের শেকড়বিদ। বিদ মানে জানা। আমি তো ভুলেই গেছিলাম!

১৪

কবি বাড়ি ফিরেছেন!
“বাড়ি কোথায়? বাড়ি খেয়েছে ইঁদুরে।”
আমারও বাড়ি নেই কবি!
হারিয়ে ফেলেছি বাড়িফেরার পথও.

১৫

অসম্ভব সুন্দর রোদ!
মনে পড়ে, এমন রোদে গোলাঘর থেকে ভেসে আসে ১২ মশলার ঘ্রাণ! রোদের উঠোনে কত রকমের যে কাচের বয়াম; আমের আচার। বর্ষাকাল আসার আগে জ্বালানি কাঠগুলো শুকনো করে জমিয়ে রাখতে হবে। আমাদের দায়িত্ব ছিল হঠাৎ বৃষ্টিতে যেন সব ভিজে না যায় তা খেয়াল রাখা। এমন উজ্জ্বল রোদ ছিল সেদিনও

১৬

তুমি বারংবার বলো, লেখা পাঠাও। লেখা পাঠাও।, লাবণ্য।
আমি তো কালই সব লেখা মহাবিশ্বে পাঠিয়ে দিলাম তীর্থঙ্কর! এবার নিশ্চিত তোমার কাছে পৌঁছে যাবে

১৭

তবে আমি সেই জননী, মহাকালের উনুনে রান্না করছি পাথর।
বাছা আমার! আর একটু অপেক্ষা করো

১৮

গান পাউডার, ফেস পাউডার, বোমা, বারুদ, বকফুল, নাকফুল, হরতাল, অবরোধ, নিমরুদ, এসআই,, আইএসআই, ফাঁসির দড়ি, হাসির বড়ি, হিজাব, ওড়না, ঢিলা, কুলুখ, মিসওয়াক, ক্যাটওয়াক, মাউথওয়াস, ডিটারজেন্ট, এয়ারফ্রেশনার, এরোসোল, উটপাখি, বাজপাখি, চিলচিতল, নীলতিমি, সাপ, ব্যাঙ, কেঁচো, দালান, বার্ন ইউনিট, ফায়ার সার্ভিস, হাতিরঝিল, মতিঝিল, ট্যাব, ওয়ালেট, আয়না থেকে আজ সরিয়ে নিয়েছি, হাত, পা, মাথা, মুখ, জিহ্বা, কান, নাক, গিলা, কলিজাসহ দুই চোখ।

তারপর দিগন্তের দিকে তাকাই
আমার দৃষ্টিসীমায় এখনো উজ্জ্বল শৈশবের বুড়ির সুঁতো। আমরা জানতাম অনন্ত আকাশ থেকে তার আগমন। আমরা তার পিছু নিতাম।
আহা! সুঁতো উড়ছে তো উড়ছেই।
ধরবো কি ধরবো না, ভাবছি
অতঃপর উড়াল দেই ছায়াপথ ধরে….

 

১৯

‌“কে ওখানে?/ পাখির কণ্ঠের গানে / কুয়াশায় আমি কালো জ্যোৎস্না ঘুরে হঠাৎ তখনো / চাঁদের আগুনে পুড়ে / ছুঁয়ে দিতে উদ্যত হলাম/ অপসৃয়মাণ তুমি?/ তোমাকে ছুতেঁ না পেরে / আমি নিজ নিয়তির অন্তর্গত রোদন কে বললাম / দ্যাখো/ আমি আর কাঁদতে পারবো না।”

তবু মেয়েটি সারারাত কাঁদে। লাল-ফোলা দুই চোখে আয়নার দিকে তাকায়। বলে, পাখি তুমি কেঁদেছিলে কেন?

কোথায় কাঁদলাম?

ওই যে ঘুমোবার আগে, তুমি কাঁদলে? আর আমিও সারারাত কাঁদলাম।

আহা, নারী! তুমি কি জানো না, মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা?

 

২০

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে কোনো সুইসাইড নোট লিখে যান নি…

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close