Home ছোটগল্প লাবণ্য প্রভা / মুক্ত-আখ্যান > ব্রাত্য-আত্মযজ্ঞ-জলের ক্রন্দন

লাবণ্য প্রভা / মুক্ত-আখ্যান > ব্রাত্য-আত্মযজ্ঞ-জলের ক্রন্দন

প্রকাশঃ April 16, 2017

লাবণ্য প্রভা / মুক্ত-আখ্যান > ব্রাত্য-আত্মযজ্ঞ-জলের ক্রন্দন
0
0

ব্রাত্য

সবাই আমাকে ত্যাগ করেছে।

একবিন্দু পৃথিবীকে ছুঁয়েছি বলে আমাকে ত্যাগ করেছে স্বজনরা। দূরাগত নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আছি বলে বন্ধুরা আমায় ছেড়ে চলে গেছে।

তবু, বিরান পথের ধারে বসে থাকি। কেননা এই পথ ধরে তিনি আসবেন। আমি দীর্ঘ পথের কণ্টকগুলো সরাতে থাকি দ্রুততর। তার জন্য নিষ্কণ্টক পথে বিছিয়ে দিতে চাই কুয়াশার গালিচা। তিনি যেন আহত না হন, রক্তাক্ত না হন।

বাকুর্তা গ্রামের বুড়ো বটগাছের নিচে অজস্র বটফল পড়ে আছে। বৃদ্ধ নরসুন্দর আচমকা ক্ষুরের ধার পরখ করতে গিয়ে আচমকা নিজের হাত কেটে ফেলেন। নরসুন্দর মন খারাপ করেন। এই গ্রামের সবাই গহনা বানায়, কেবল সে-ই মানুষের চুল কাটে।  কতোদিন হয়ে গেল! কদম ছাট, মিলিটারি ছাট, দীলিপকুমার ছাট, আজকাল তার বড়ো ক্লান্ত লাগে। কাটা হাতের রক্তঝরা বন্ধ করতে তিনি নদীর ধার থেকে কিছু দুর্বা নিয়ে আসেন।

দুর্বা, মা ! সর্বরোগহরি।

তিনি দুর্বা চিবুতে চিবুতে খানিকটা রস বার করে আঙুলে লাগান। আমি বসেই থাকি । নরসুন্দর আমায় দেখতে পাচ্ছেন না। কেবল নরসুন্দর নয়, বাজারের কোনো মানুষই আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি জানি, ঘরে ঘরে বউ-ঝিরা গহনা বানাতে ব্যস্ত – জমিদার হেরেমে যাবে এই গহনা। এই পথ দিয়াই তো তার আসার কথা ছিল। ঘোড়ায় চড়ে রাজপুরুষ গহনা নিয়ে যাবেন মহলে।  আমায় কী সে কথা দিয়েছিল? তবে কেন আমি এই পথের ধারে বসে থাকি দিবারাত্র!

দীর্ঘ প্রতীক্ষা!

প্রতীক্ষার পর প্রতীক্ষা শেষ করে অবশেষে নিজেকে একটি জলাশয়ের ধারে টেনে নিয়ে আসি। জলাধারে নিজের প্রতিবিম্বকে জিজ্ঞেস করি, কী চাও তুমি! নিজেকে আবার জড়ো করি। মনোনিবেশ করি পাঠে। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে বিরান পথের ধারে। তবু আরো দীর্ঘক্ষণ লেখার টেবিলে বসে থাকি আমি।

দূরে এক বালিকা বসে আছে বিমূঢ়…

আমার জন্মান্ধ চোখ অভ্র আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় সে বসে আাছে। আর তার সামনে নীল আলোর রেখা স্পষ্ট অবয়ব নিচ্ছে, কেঁপে উঠছে হাওয়ায় হাওয়ায়। তার স্বপ্নের ক্ষয়িষ্ণু রঙটুকুও নীল হয়ে আছে তার সমস্ত শরীরে। অশ্রু-আলোয় তাকে বিমর্ষ দেখায়।… হাওয়ায় মাতামাতি, মৃত নক্ষত্ররা পাতার মতো ঝরে পরছে তার মাথায়। তাকে ছুঁয়ে যায় অর্জুন বৃক্ষ ও রক্তমৃত্তিকার উদ্ভ্রান্ত অন্ধকার। সে যাত্রা শুরু করে। খরাক্রান্ত মাঠের ভেতর দিয়ে এইবার আমারও শুরু হবে একান্ত যাত্রা…

 

স্মৃতিরা বড়ো বেশি দুর্মর

বাতাস মরে গেছে

দুঃখিনী রূপবালা ভালোবাসা হারাইয়া কেশ বিছায়, রূপবালা কেশ বিছাইয়া বিলাপ করে।

কথা ছিল কেশ দুই ভাগ করে তাকে বেঁধে রাখবে। ব্রজকুমার চলে গেছে দূরে, কোন গহনে, কে জানে! থমকে আছে সময়। অন্যসব উপাখ্যানের মতোই এ গল্প। সরল।

রূপবালা বসে থাকে নির্বিকার। পৃথিবীর পুরোনো কোনো রোঁয়া-ওঠা মানুষের মতো। মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি কিংবা বোমারু বিমান। চুলের মাঝে অযুত নিযুত নক্ষত্র ঝরে পড়ছে; কামিনী ফুলের পাপড়ির মতো সাদা সাদা নক্ষত্রের অতলে ডুবে যাচ্ছি আমি। মুখে কী যেন একটা কটুস্বাদের মতো লাগছে। একটু আগে ওরা জোর করে মুখে ঠেসে দিয়েছে। বিষ নাকি? কী যেন বলল ওরা! তুমি দোষী, তুমি ভুল করেছ।

আমি চিৎকার করে বলতে চাই, হু দ্য হেল য়্যু আর জাজিং মী!

বলা হয় হয় না। এক ঢোকে জীবনকে গিলে ফেলি। হায়! জীবন আমার গলায় আটকে যায়। অথবা আমি জীবনের গলায়। কতো নির্লজ্জ আমি! কেন বেঁচে থাকি! আমি কী এতোই ভীতু যে এই জীবনকে পায়ে ঠেলে হেঁটে যেতে পারি না।

এই দুঃসহ সময়েও তোমার কথা জানতে ইচ্ছে করে। একবার জানতে ইচ্ছে করছে কেমন আছো তুমি। ইদানিং তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভয় হয় আমার।  ফোন বেজে উঠলেই তুমি যদি ভাবো আমি তোমাকে কোনো দুঃসংবাদ দিচ্ছি! এই ভয়ে তোমাকে ফোন করা হয় না। কীবোর্ডে হাত রেখেও ফিরিয়ে নেই, থাক। জানো তো, এর মাঝে বেশ কয়েকবার আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। কী অশ্লীল! কী ভয়ঙ্কর! কী ভয়াবহ কণ্ঠস্বর তাদের! ভয়ে চোখ বন্ধ করে থাকি। তারা আমার আঙুল মাড়িয়ে দেয় দু’ পায়ে, তারা আমার কেশ ধরে দেয়ালে আছড়ে ফেলে, তারা আমার কণ্ঠনালী  চেপে ধরে। তারা আমার পেটের ভেতর ছুরির ফলা ঢুকিয়ে দিতে চায়। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। ইদানিং কিছুই দেখতে ইচ্ছে করে না।  দেখতে চাই না। ইদানিং আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে ভয়। বাড়ি থেকে বের হতে ভয়, ঠিকমতো বাড়ি ফিরতে পারবো তো? বাড়ির দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে ভয় হয় ঘরে সব ঠিক আছে তো! ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভয়, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবো তো! নাকি মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়বে? নাকি মাঝরাতে ঘরের ভেতর দুর্বৃত্তরা হানা দেবে! নিজের নিঃশ্বাস পতনের শব্দকেও আমার ভয়। মনে আছে, দীর্ঘ বিরতির পর আবারও কথা শুরু করলে সেই কথা খুব বেশিদূর এগুতে পারে না। আমরা চা-পর্ব দিয়ে কথা শুরু করি। আমি বললাম, চা খাবে? তুমি বললে, খাওয়া যায় একটু। তারপর আমাদের কথা শেষ হয়ে যায়। কেমন অদৃশ্য দেয়াল আমাদের মাঝে! অথচ তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় চারপাশে মৌ মৌ সৌরভ থাকে সবসময়। আজ কোনো সৌরভ নেই কেন! খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বলি, তোমার পাশে একটু বসি। বলা হলো না।

দেয়াল! দেয়াল! দেয়াল!

 

মেইল ট্রেনের  হুইসেল শুনব বলে একদা

উৎকীর্ণ দুজন মাঝরাতের অন্ধকার সরিয়ে কান পেতেছিলাম  ভোরের স্লিপারে

হায়!

কেবলই হুইসেল শোনা যায়! হুইসেল ফিরে আসে চাপা আর্তনাদ হয়ে।

আমাদের রাত্রি এখন নির্জন একাকীত্বে ভরা। আমাদের নির্জনতাগুলো আরো বেশি বাঙ্ময়

আমরা পরস্পর অচেনা শরীর নিয়ে বসে থাকি অন্ধকার বারান্দায়।  ভাবলেশহীনভাবে  দেখি উত্তর ফাল্গুনী মৃগশিরার স্থানান্তর। স্বাতী- রোহিনী-অরুন্ধতির মতো  চেনা নক্ষত্রও আছে সেখানে। আরো আছে অনেক অচেনা নক্ষত্র। ঠিক আমাদেরই মতো…

 

আত্মযজ্ঞ

দিগন্ত পরিব্যপ্ত করে জ্যোৎস্নার নিরাই নিরাই রোদ ফুটে আছে। কার যেন অষ্পষ্ট অবয়ব দেখা যায়। সে থাবা তুলে নখর দেখায়। আর হিম জ্যোৎস্না লেপ্টে থাকে আমার বুকের ভেতর। নদী কীর্তনখোলার পাশ ঘেঁষে কাশবনের ভেতর নিমগ্ন শেয়াল তার দুই চোখ দিয়ে জ্যোৎস্না গিলে খায়। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে একজন মানুষ শেয়ালের মতো, পেঁচার মতো জেগে থাকে। লিখে রাখে রজনী কথন। মানুষ নাকি পাখির পরান ধারণ করলে কেবল লিখতে পারে। সোলেমান বাদশা পাখির ভাষা জানতেন। আমি কি পাখির ভাষা বুঝি? আমি কি বাজিকরের মতো আঙুলের ইশারায় পাখির শরীর দ্বিখণ্ডিত করতে পারি! তবে কী করে লিখে যাবো এই রজনীকথন! নিমে আখরে যে তোমার নাম লিখবো তাও তো ভুলে গেছি আমি।

এতো বিস্মৃতপ্রবণ আমি কী করে হলাম। আমায় চক্ষুষ্মান করো খোদা।

ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো আমি পথ চলি, রাঁধি, মোড়ের দোকান থেকে গুঁড়ো দুধ কিনে আনি। অপেক্ষায় থাকি কখন সূর্যাস্ত হবে! কেননা চন্দ্রপ্রভা না হলে আমার সাদা পৃষ্ঠাগুলোতে কালো কালো অক্ষর ফুটে উঠবে না। কেননা নক্ষত্রের আলো না হলে তো তিনি পথ চিনে চিনে বাড়ি ফিরতে পারবেন না। কেননা অন্ধকার গাঢ় না হলে তার কণ্ঠস্বরে মাদকতা আসবে না। কেননা রাতের শেষপ্রহর না হলে তিনি আমায় কবিতাপাঠ করে শোনাবেন না।

হে রাত্রি!

তুমি নেমে এসো এই নির্ঘুম মৃত্তিকায়, দিগন্তে ডানা মেলে এসো। মৃত্যুভূমি আর প্রেতপূরী পেছনে ফেলে এসো। না হলে আমি যে শব্দফুল বাতাস থেকে আহরণ করতে পারবো না। অতঃপর আমি প্রার্থনা পড়ি, রজনী দীর্ঘ হও। আমি তার হাত ধরে পৃথিবীর পথে হাঁটব।

খুব অভিমান হয় তোমার প্রতি। তোমার স্বশরীর উপস্থিতি না পেয়ে আমি কাঁদি। যদিও জানি তুমি আছো আমার হৃৎমন্দিরে। তবু তোমার আশ্বাস না পেয়ে অস্থির লাগে। তুমি আমাকে অস্থির হতে বারণ করেছো।

দিনের পর দিন টর্চার সেলে বসে থাকি। চোখের সামনে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। একটা ধাতব পাত ঘুরছে নাক-মুখ-গলা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। কখনো পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য হাতটি ছুটে আসে। আমি তীক্ষ্ণ চিৎকারে চোখ বন্ধ করে ফেলি। মেঝের ওপর পড়ে থাকা থুথু চেটে খেতে হবে। হাঁটু মুড়ে বলতে হবে, আমি অপরাধী।

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। ভেতর থেকে কে যেন বলে বাঁচতে হবে। কেননা কেউ একজন বলেছিল, তুমি যা-ই হও, তোমাকে গ্রহণ করলাম। আমি তো আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারি না। এই হাত, এই চোখ, এই শরীর, এই মন সব যে তার হয়ে গেছে। আমাকে হত্যা করা মানে তাকে হত্যা করা। আমি বেঁচে থাকি। নির্লজ্জের মতো।

এখন রাত না দুপুর ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অ্যালান পো’র বেড়াল এগিয়ে আসে। বাতাসে কি জলীয়ভাব আছে? খুব শুনতে ইচ্ছে করছে তোমার কণ্ঠস্বর। তোমার মতো পিতৃস্নেহ দার্শনিক নির্দেশনা কোথায় পাবো বলো তো?

আমার শরীর হালকা হয়ে উঠছে। আমি ভাসছি মহাশূন্যে।

এক

দুই

তিন

পেরিয়ে যাই মহাসমুদ্র

তুমি বলো, শিল্পে ডুবে যাও কন্যা, শিল্পের জন্য রক্ত ঝরাও।

শিল্পের জন্য আর কতো রক্তক্ষরণ প্রয়োজন তুমি তো বললে না।

আমার ভয় করছে খুব। মৃত্যু ভয়। নিঃশেষ হয়ে যাবার ভয়। অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়ার ভয়।

বয়সী বুদবুদ মেখে একদিন মিশে যাবো কালের ধুলোয়। আর মৃত খোলসের মাঝে জেগে থাকব আমি। আমার দীর্ঘশ্বাস নৃত্য করবে ঝরে-পড়া শিশিরের মতো। সমুদ্রে আছড়ে পড়বে কান্নারা, একদিন সততই মুছে যাবে সব। মুছে যাবে প্রতিচিহ্ন; ভূমির উজান। মৃত নক্ষত্রের নিচে ডানা মেলবে পাথর সময়।

আমাকে বলে যাও তবে, এ লাবণ্যভূমে কে হাঁটে

বাতাসে মসলিন আলো দোল খায়। জেগে ওঠে মমির শরীর

নিবীর্য ঘামের ওপর প্রাগৈতিহাসিক গাভীর বিষণ্ন জিহ্বা

অথচ যাত্রা নাস্তি জেনেও আমি কেবলই উজানে উজাই…

আর, প্রিয়তম বন্ধুরা আমার!

নিয়ত অমরত্বের লোভে পান করে রক্ত ও পুঁজ…

আমার বাক্যমালা ভেঙে ভেঙে যায়। বাক্যগুলো কাব্যময় হয়ে ওঠে না। দৈনন্দিন জীবন যাপনের মতো ক্লীশে হয়ে যায়। আমার কোনো প্রতিপক্ষ নেই। নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠি প্রতিনিয়ত। যুদ্ধ করি নিজের সঙ্গে, কাম-লোভ-মোহ থেকে মুক্তি চাই। নিজেকে একটি স্থির বিন্দুতে দাঁড় করাতে চাই। সমুদ্রের ধারে নির্জন একটি পাথরে মতো স্থির। যে পাথর বহুকষ্ট ধরে তরঙ্গের আছড়ে পড়া সহ্য করে। নিশ্চল, নিশ্চুপ।

অথচ প্রতি সন্ধ্যায় গুমরে গুমরে কান্না উথলে উঠতে থাকে আমার ভেতর। কিন্তু আমার কান্না বারণ আছে। কেননা আমি জানি আমার কান্না মানেই ভয়াবহ বিপদসংকেত। একেকটি ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি। ছাদ ধসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর আগ মুহূর্তে আমার যদি হু হু কান্নার বান না ডাকত তবে হয়তো এ মৃত্যু ঠেকানো যেতো! মানবের মৃত্যু ঠেকাতে আমার কান্না রোধ করতেই হয়।

হায়! মানুষের মুত্যু রোধ করতে পারি না, কান্না ঠেকাতে আমি পারি না।

চলন্ত ট্রেনের নিচে মানুষ

নদী গহ্বরে যাত্রীবাহী বাস

কিশোরের টুকরো টুকরো শরীর

কিশোরীর আত্মহত্যা

বহুতল দালান ধসে পড়ে

কেবল লাশের নগরী জেগে রয়…

 

জলের ক্রন্দন

গাঁয়ের দক্ষিণ রেখায় ঝুমকোলতায় থোকা থোকা ফুল ফুটলে তুমি আন্দোলিত হও। তোমার সেই মুগ্ধতা গ্রাম পেরিয়ে গ্রামান্তরে পরিব্যপ্ত হলে আমার জ্বর আসে। তোমাকে অদ্ভুত কিছু ভাললাগার অনুভূতি জানাতে চাই। এই যেমন, কালরাতে মেহেন্দীর গন্ধে আমার নিদ্রা টুটে গেলে সারারাত এক জ্যোৎস্না-কবলিত মাঠে বসে ছিলাম; কিংবা নদীর ধার ঘেঁষে অলৌকিক শুদ্ধতা নিয়ে যে মানবী দাঁড়িয়ে আছে সে আমার মৃত বোন।  এরকম অজস্র দৃশ্যচিত্রের কথা তোমাকে লিখতে চাই। তবে লেখা হয়ে ওঠে না, কেননা, আমার বানান ভুল হলে তুমি রাগ করো। অথচ মহাপৃথিবীর মহাসৃষ্টি জুড়ে যে অজস্র ভুল বানানের ছড়াছড়ি তা তুমিও যেমন জানো, আমিও জানি। মহাপৃথিবীর মহাগ্রন্থের অজস্র বানান ভুল আমার ভুল বানানের কাছে কিছুই নয়। তুমি অনুধ্যায়ী হয়েছো মহাগ্রন্থের বানান ভুল শুধরে দিতে। পিরামিড স্ফিংসের ভুল বানান রোধ করতে করতে তোমার কলমের দজলা-ফোরাতের কালি নিঃশেষিত প্রায়। আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে ঈশ্বরের বিভ্রমে যে আধাজন আধা মানুষের জন্ম তাও তুমি জ্ঞাত আছো। তুমি কি জ্ঞাত আছো বংশাই নদের জল ঘোলা হয় কেন ভরা বর্ষায়? কিংবা দুই নদীর জল কখনো একরকম হয় না কেন? আমি জানি তুমি এসব প্রশ্নের উত্তর জানো। তবু তোমাকে জানাতে ইচ্ছে করে খুব। তবে, তুমি ইচ্ছে করলেই জগতের মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারো না, যেমন পারো না আমার বানান ভুল রোধ করতে।

তীব্র ভালোলাগা এখন আমার ভেতর। কোথায় যাই বলো তো! নগরীর ওই পুরাতন বৃক্ষটির পাতা ছুঁয়ে আসতে ইচ্ছে করছে খুব। পৃথিবীর কোথাও কি লায়ন লিলিগুচ্ছ সৌরভ ছড়াচ্ছে! কী জানি!

নিজেকে সেই আকাডিয়ান কন্যা মনে হচ্ছে। আজ থেকে চার হাজার তিনশত বর্ষ পূর্বে সুমেরু কন্যা আকাডিয়ান রাজকুমারী; রাজমন্দিরের প্রধান পুরোহিত এনহেদুয়ানা চন্দ্রদেবী নান্নার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন।

হে আমার দেবী; আমি একান্ত অনুরক্ত তোমার উপস্থিত হয়েছি সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে; এই রাজ্যের বিদুষী রাজকন্যা এক কেবল তোমার উপাসনা করি এবং করে যাবো চিরদিন জেনে রেখো, আমিই একমাত্র এবং বিশ্বস্ত পূজারী যদি এক ফোঁটা অনুগ্রহ বর্ষিত না হয়, যদি বিস্মৃত হও আমাকে তবুও সমস্ত যজ্ঞ তোমার কেননা তোমার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যক্ষণের অভিজ্ঞতা আমার আছে

তুমি তো জানো, এই মন্ত্র উচ্চারণের মুহূর্তে নতুন করে বাগদেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো। তবু তোমাকে একথা আবার জানাতে চাই, জানাতে চাই, কী নিমগ্নতা আর ধ্যানস্থ হয়ে তিনি উচ্চারণ করেন এই মন্ত্রগুলো। তার উচ্চারণে ঝরে পরে আভিজাত্য, সৌন্দর্য আর শুদ্ধতা। কবিকূল জননী তিনি। তবু তোমাকে তা বলা হয় না। বানান ভুল হওয়ার ভয়ে তোমাকে জানাতে পারিনা কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমিক, কৈশোরসঙ্গী জয়ানন্দ কেমন করে মুহূর্তের মধ্যে পিছু নেন। চন্দ্রাবতীর বিয়ের লগ্ন প্রায় হয়ে এসেছে, অথচ জয়ানন্দ তখন নৌকায় করে জল-পরিভ্রমণ করছেন। নৌকার ছইয়ের ভেতর এক মায়াবতী শুয়ে আছে। বৃদ্ধ মাঝি দাঁড় টানছে। কনক গাঙ্গুলী তখন। মাঝি তার মেয়েকে ডাকে পালের দড়িটা ধরতে। সেই মেয়ে ওঠে, দু’পায়ের আঙুলে ভর করে পালের দড়িতে টান দেয়। পূবের হাওয়ায় উড়ছে তার শাড়ি। জয়ানন্দ দ্যাখে, মেয়েটির নাকের পাটায় জোনাকির ফোঁটা। অলীক আলোয় সেই নারী জোয়ারি জলের ওপর। তার সেই মুহূর্ত নদী হয়েই তাকে ডুবে মরতে বলছে।

এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ! এমন সময় অনন্তেও আসে না কিংবা কচিৎ আসে। জয়ানন্দ মুহূর্তের পিছু নেন। আর ভাটিতে পড়ে থাকে তার বিদুষী প্রেমিকা চন্দ্রাবতী। চন্দ্রাবতী তখন কী করেন! চন্দ্রাবতী! কবি তিনি। তিনি জানেন কী করে শোককে পরিণত করতে হয় শক্তিতে। তিনি রচনা করেন সীতার বারোমাসি। সম্পূর্ণ নতুন করে। যে সীতা কেবলই এক মানবী। চন্দ্রাবতী তাকে রামায়ণের নারী থেকে আলাদা করেছেন। এসব কথা তুমি জানো, তবু বারংবার তোমাকে জানাতে ইচ্ছে হয়।

কেবল জানো না, চাঁদের লাগোয়া ঘরে বাস করে এক চন্দ্রাবতী নারী

কালীগঙ্গার ঢেউয়ের ভেতর থেকে সুর ভেসে আসে- সময় গেলি সাধন হবে না। কেউ প্রশ্ন করে, এমন ঘুটঘুইট্যা আন্ধারে কই যাও কইন্যা?

কে প্রশ্ন করে আমি তারে দেখি না। তবু বলি, আমি আমার সাঁইজির তালাশ করি।

তাঁর খোঁজ কী আর এমনি এমনি পাওয়া যায়? তাকে পেতে হলে ডুব দাও কালীগঙ্গায়, মন ভাসাও হৃৎযমুনায়।

দ্যাখো, জল বাড়ছে বংশাইয়ের। জোয়ারের জল আসতেছে। তুমি কী শুনতে পাচ্ছ জোয়ারের ডাক! জলের শব্দ!

পাগল! এ-তো জলের শব্দ নয়; জলের কান্দন। এমন কান্দন তোমার ভেতরেও আছে। তখন তুমি ঘর-বাহির করো, নিমবৃক্ষের তলায় দাঁড়িয়ে থাকো, তখন তোমার ভেতর কান্দনের সুর ওঠে। তুমি বুঝতে পারো না। তাই অমন অস্থির হয়ে ওঠো।

‘জলের কান্দন’-এর কথা তোমাকে বলা হয় না। তুমি তো জানো, আমার জন্মগৃহে রাহু আর কেতুর অবস্থান। তাই কন্যালগ্নে জন্ম নিয়েও খুব সহজে কোনো কিছুর প্রাপ্তি ঘটে না আমার। আর ভাগ্যরেখা সোজা উঠে গেছে চন্দ্রক্ষেত্র থেকে শনি-ক্ষেত্রর দিকে। তাই চন্দ্র প্রসন্ন হলেই আমি কেবল মহাপৃথিবীর মহাপথগুলো পাড়ি দিতে পারি।

আর তাই ‘পুরণমাসি’ রাতে প্রার্থনা পড়ি

হে চন্দ্র, হে আমার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক, তুমি প্রসন্ন হও, আমি তো তোমারই কন্যা

চন্দ্র প্রসন্ন হন কি হন না ঠিক বুঝতে পারি না।

তবু, তোমাকে আমার জীবনের যাবতীয় বানান ভুলের কথা লিখে যেতে চাই; আমার কী দোষ বলো, ঈশ্বর যদি ভুল বানানে আমার জীবনগাথা লিখে রাখেন!

…একদিন আমাদের গাঁয়ের বাঁশঝাড়ে নিরাধারা কান্না করে চৈত্রের বাতাস। নিভৃত গন্দমের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে নৈঋতে নৈঋতে। দক্ষিণের ভিটায় ঘুঘুর ডাক প্রলম্বিত হয়। আমরা ভীত হই। সমস্বরে জপ করি ঈশ্বরের নাম। সেই দিবালোকে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে; দিনের আলোয় রাত্রি নেমে এলে আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা কিয়ামত আসন্ন ভেবে আমাদের আগলে রাখেন। ঝড় ও ঝঞ্ঝায় উড়ে যায় ঢেউটিন। আমাদের রক্তপ্লাবিত কাটা স্কন্ধ পড়ে থাকে ফসলি ক্ষেতে। কেউ কেউ বেঁচে থাকে কিংবা পুনর্জন্ম লাভ করে। তারা ঈশ্বরের নামে গৃহ বানায়; জমিতে হাল দেয়।

আর আমি!

জন্ম নিচ্ছি পুনর্বার, আপন উদর হতে ক্রমশ নতুন। প্রগাঢ় অন্ধকারে ডিম ভেঙে জন্ম নিলে সূর্য ও কুসুম, আমিও খোলস ভেঙে ফেলি। আমি নীত হচ্ছি নতুন এক শহরে। এটা কোনো মৃতের নগরী নয়। এইখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় জীবনের রেণু। আরো একবার কোনো এক পুষ্পভোরে আমার মৃত্যু হলে এইখানে ছিলাম আমি। এই বর্ষণসিক্ত পথ, পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ আমার চেনা। ঘন বর্ষা আবেগ ঝরায় দুর্বার ধার ঘেঁষে। পৃথিবীর কোথাও কী তবে জীবনের আকাঙ্ক্ষা ছিল! এখন মহাকাল গুটিয়ে নিয়েছে তার ডানা বিপন্ন বিষাদে। এখন বিসর্জিত অস্তিত্ব আমার ধাবমান অনস্তিত্বের দিকে।

এখন সকাল নয়

সন্ধ্যা নয়,

দিন কিংবা রাতও নয়

নিয়মও স্থিরতম

মন্দিরের ঘণ্টাগুলো কবেই বন্ধ হয়ে গেছে লাফিয়ে লাফিয়ে…

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close