Home কবিতা লাবণ্য প্রভা > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা

লাবণ্য প্রভা > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশঃ July 31, 2017

লাবণ্য প্রভা > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা
0
1

 

লাবণ্য প্রভা > স্বনির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি ও গল্পকার লাবণ্য প্রভার জন্মদিন। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে তাকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আর এই উপলক্ষে আমরা প্রকাশ করছি তার একগুচ্ছ কবিতা।]

 

জ্যোতিশ্চক্র

 

এ কোন বেদনাযাত্রা নয়

গৌড়চন্দ্রিকা আর বহুবিধ আখ্যান শেষে বেহুলা ভাসান নেয়

বায়ুপথে, মেঘের ডিঙায়। গৃহবাসী পক্ষীসকল দরোজায় দাঁড়ায়

সারি সারি…

 

ফিরে যাই

এইবার ফিরে যেতে হবে, অতলান্ত ভূমির শয়ানে

অনেক তো কুড়িয়েছি ডানাভাঙা পরীদের পালক। সাজিয়েছি সপ্তবর্ণা মেঘের চিবুক, বিবিধ দর্পনে…

 

এতো এতো অর্ঘ্য চারিদিকে

তবুও হঠাৎ চমকে ওঠা জানালার ওইপাশে

জেগে থাকে এ কার বিম্বিত মুখ…

চিনি না তো!

 

এই মাটি

আকাশের পাশে ঘুমাইনি বহুদিন আমি

নাকি ছিলাম শীতনিদ্রায় ব্যাঙের বাকলের নিচে তরঙ্গদৈর্ঘ্যে…

মনে নেই

মনে নেই

 

তখনো কি দীঘল রজনী ছিল মাত্রা ছাড়িয়ে…আহা! তখনো কি

জ্বর ছিলো কারো? সবুজ আঁচল পুড়ে যায় ভুলের পারদে

পাখনা ছড়ায়…দীঘির খোঁজে কারা যেন ঋষি হয়, সিঁড়ি ভাঙে

তুলে নেয় তাল তাল সোনা, নগরীর নিষিদ্ধ প্রহরে…

রজনী গভীর হলো যমুনায়…

 

যাই

আধখানা পদচ্ছাপ ফেলে দূরতম যাই দ্রাঘিমাংশে যাই

ওইখানে জেগে আছে বিধবার গ্রাম

নীলবর্ণ জবার জঠরে

 

বিমূর্ত

 

সশব্দ মৃত্যু হলে আমরাও খুলে ফেলি হাত, জঠরের ভাঁজ

 

সতীর্থ যারা এগিয়ে দিয়েছিল স্বর্ণ ও পৃথিবীর সিঁদুর

তাহাদেরও মৃত্যু হয় অনন্ত চুম্বন-থেঁতলানো ইঁদুরের সাথে। তাহাদের

সৌরভ ভেসে যায়…ভেসে যেতে দেখি দূর সমুদ্রে। অভিযাত্রীদল! তাহারাও

আত্মহনন শেষে জেনে যায়…এ জীবন হননের।

হাতের তালুতে মহাকাল ভারি হয়, দিকভ্রান্ত চিলের

চোখ গাঢ় দেখি শূন্যে শূন্যে। এমন প্রহরে

জেগে থাকো একা সখীলয়ে, তুমিও কি তবে হেঁটে যাও লাবণ্যনগর

ঘুঘুর বিলাপে! ভোর হলো দেখে তুমিও সন্ন্যাসী হায়!

 

ভাঙা কাঁচে বিমূর্ত

কত শত প্রলোভন, রূপোর শরীর…

 

মানসাঙ্ক

 

দ্বৈরথ ভেঙে পালকি উড়ে যায়, মাঠের সিঁথি ধরে দ্রুততম। মগ্ন শিরায় এ-দৃশ্যে নৃত্যরত বিবিধ জঠর

উৎসব। শিশুরাও কুড়াতে যায় প্রতিপক্ষ ঈগলের চোখ, বর্শার ফল্ াঝাঁকে ঝাঁকে আসছে মানুষ;

জলের তলদেশে কপোতাক্ষ কমলার চারা…

 

দৃশ্যান্তরে

ঈশ্বরের আঙুল পুড়ে গেছে বনে

কেশর কেটে বেঁধে রাখি দশটি ছায়া…

 

বিপন্ন

 

ঘুমন্ত পৃথিবীর শৈশব থেকে উড়ে আসে নিঃসীম পালক ও অন্ধকার

দ্রুত খোলস ঝেড়ে মানুষ বদলাচ্ছে

 

আমাদের বিবর্ণ ধানকুড়া পাখির পরানে

শঙ্খিনী হরিণীর চোখ কেবলই ঝরে বিবিধ বিন্যাসে

বিগত রাত্রির বিস্মৃতি ভুলে যেতে আমরাও খুলে ফেলি পোশাক পরষ্পর

মিশে যাই…

মিশে যেতে থাকি বৃক্ষ ও লোহার শেকড়ে

 

বাতাস ভারাক্রান্ত

 

কারা যেন নিয়ে যায় নগরীর সমস্ত উৎসব

সময়ের সহোদরা নৃত্যরত ঐ ঋতুপোকা সহচরে

আলো নেই, অন্ধকারও…

 

অনস্তিত্বে ভর করে যারা কবি হতে চেয়েছিল

তাহাদের হাত মরুঝড়ে ক্রমশ সবুজ হলো

বিনিদ্র প্রেমিকের চোখ মৃতপ্রায়

পাথর পাথর…

 

কোথাও কি হেঁটে যায় কেউ!

নদীহীন মৎস্যপ্রাণ আজ

হননপিয়াসী

 

বিভ্রম

০১

আমিও তন্তুজ এক…

আসমানি রাতে বুনে যাই কামরাঙা পাখির পরাণ

মা আমার নক্ষত্রের উঠোনে ছড়ায় খুঁদ ও চন্দ্রের গুঁড়া

 

আর কোনো সত্য নেই

অন্ধকার দুইহাত বাড়ায় পৃথিবীর পুরোনো রমণীদের মতো

উপবৃত্ত ভেঙে পড়ে

কফিনের কম্পিত ডানা ভেঙে পড়ে

 

বিপন্ন বয়ন আর সূচিকর্ম শেষে আমিওতো অগ্নি আহরণে

নাভীর ঘুর্ণনে দুপুর ডুবে যায়, উদভ্রান্ত সারস ডুবে যায়।

 

জন্মনগ্নিকা যারা

খুলে ফেলে দ্বিধার বসন

 

হায়!

মিশে যায় ধুলায় ধুলায়

 

০২

 

তখনো বায়ুর বিভ্রমে শরীর জ্বলেনি তো

প্রদোষের প্রারম্ভে কেবলই ধূয়া উড়েছিল

 

বেভুল বালিকা আহা!

মহাকালে কব্জি ভাসায়, তুলে আনে বেহিসাবী চোখের চুম্বন

বনমূলে বিষণ্ণ রোদ আর জরায়নে মেঘ

শুয়ে থাকে উত্থিত নাগের ফণায়…হৃদকম্প ঝেড়ে ফেলে

তাহারাও পাঠ করে ছায়ার কম্পন। বেঁধে নেয় হাড়ের তাবিজ

কেশরে কেশরে…

 

ভোর হয় অনতিক্রান্ত

কে হায় নিলুয়া বাতাসে উড়ায় মৃত্যুর কাফন

কাহাদের শরীর ভেঙে ঘ্রাণ আসে খনিজ খনিজ…

 

কস্তুরী ভূষণ

 

০১

ভুলে গেছি

এ-কোন অন্ধকারে সারারাত সাঁতার কেটে কেটে ভোর এসেছিল, স্খলিত…

পুষ্পসখীদের প্রতিঅঙ্গে দেখি ধুলার আদর

 

পৃথিবীর কোথাও কি তবে শিরিষের পাতা ঝরেছিল!

 

পারদ রজনী হায়!

ডাহুকের হৃৎপিণ্ডে ঝরে ছায়ার শিশির

 

উপকূলে

কতো কতো জাহাজ ভিড়িয়াছে

অর্বাচীন বণিকেরা নিয়ে যায় স্বর্ণ ও সাপের ফসিল

 

এমন দেহ-ভাঙা দিনে

আমারেও দিয়ো তুমি

ভুলে ভরা দরিয়ার কসম…

আমি তো নাবিক পুরাতন

সুবর্ণ বলয় কেবলই রুয়ে যাই অর্ধেক জল আর অর্ধেক স্থলে…

 

০২

কে-তুমি বিদগ্ধ হেকিম

মহাকালে মিশিয়ে দাও জটিল অনুপান

চন্দ্রর্চূণ সহযোগে কুমারী গোলাপ…

 

ঘৃতবনে কেবলই জ্বলে সবুজ আগুন

 

আমিও অসুখে আছি

দিয়ো তুমি জ্যোৎস্নার আরক

 

স্থির জানি

এহেন মানবজন্মে আরোগ্যলাভ হবে না কোনোদিন নদীতীরে

 

কলস উল্টে দিয়ো তবু, নিশিগন্ধা সাপের কসম…

 

দ্বিধা

 

0১

ছুঁয়ে দিয়ো

একবার ছুঁয়ে দিয়ো

 

পাথরের গ্রীবা বেঁকে যাবে ধীরে

পাথরে পাথরে দেখি জলের জলসা অহোরাত্র…

 

এ রজনী খণ্ড খণ্ড

 

ছুঁয়ে দিয়ো বাতাসের বক

চিতার আগুনে পুড়িয়ে এসেছি

দুইখণ্ড পালক।

 

0২

হাড়ের ভেতর বাঁশি বাজে

 

বরফের শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়ে স্বেদ ও শ্লেষা

রোদের উঠোনে মাছেরাও নৃত্যরত…

 

পৃথিবীর কোথাও তো সূর্য উঠেছে…আর এখানে মিহি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে আমাদের ঘর। শাটিন পর্দা দুলে ওঠে বিপন্ন বাতাসে। পৃথিবীর উদ্যানে ফুটে থাকা বন্য লিলির উদ্যত ফণা ক্রমশঃ সবুজ…

ছেঁড়া ছেঁড়া মৎস্যের ডিমে দেখি আমার মরণ। একটা সাদা ঘুঘু ডেকে যায় নিরুত্তাপ…

 

তুলোর বীজ ফেটে যাচ্ছে ক্রমে…

মা আমার বয়ে বেড়ায় জ্বলন্ত মুদ্রার দাগ

 

আয়ূষ্কাল থামিয়ে দিয়েছি তো

আমিও নিদ্রা যাই জলের গহীনে

 

আমায় ডেকে নাও মা

 

 

চিহ্নস্থানে

 

০১

এ-রজনী বাকলবিলাসিনী

বাজুর বাঁধন খুলে কেবলই ভাসে কাজলি পরাণ

 

চোখের পদ্মে স্থিরতম

কালি ও কলঙ্ক আমার, পাকুড়ের ঘ্রাণ

 

আমারে বলিও বন্ধু আসমান আর জমিনের ফারাক

ভুলের সায়রে ডুবে যাই, তুলে আনি মাটির তবক

এ কোন ভ্রমের নগরে তোমার চোখে চোখে চারুলিপি, নীলাদ্র নিবেশ

 

বেদীমূলে নৃত্যরত অগ্নি ও জলের কোরক

আনন্দসঙ্গীত বাজে মৃত্যু সহচরে, মন্দিরে মন্দিরে

বায়ুর বিভ্রমে জেনে নিই আমার সাকিন…

 

প্রাণবন্ধু হে

এমন বিদায়ের দিনে প্রতিপন্থে কলঙ্ক বুনে দিয়ো, মাঝে মাঝে মাটির চারা

 

০২

শব্দ ও কাফনের দেশে মৎস্যেরা মৌনবান আজ

মৃত জ্যোৎস্নায় সারি সারি জেগে ওঠে সরালের বন

ধুলির অরণ্যে সন্ধ্যা নামে

বেড়ালের ডানা দীর্ঘ দীর্ঘ…

 

আমি ও বলেছি তারে

কেউ আসবে না রতিপুষ্পদিনে

কেউ আর বলবে না এমন কলঙ্করাতে বলে দিতে চাঁদের বয়স…

 

রঙ ও রতিপুষ্প

 

০১

আমার কাফেলা যাবে ধুলার নগরে নগরে

 

ভগ্ন মন্দিরে পালক উড়িয়েছে পূর্বপুরুষেরা

কামরাঙাপরাণ ধীরমতি…

 

জলের জমিনে হায় কাঁটার বাগান

 

দেখে যাও

ডাবের আগুনে বেড়ে ওঠা ঝিমধরা দুপুরের নাভী

 

একবার দেখে যেয়ো ঘৃতফুল, কুমারী কুমারী তারা

 

এ-কোন রতিরঙ ফেটে গেলে

গন্ধ ভেসে আসে কামিনী কামিনী…

 

০২

আমারেও বলে যাও

এ-কোন শিশার সাগরে সে নক্ষত্রের বীজ বুনে যায়

জলঘোর অমানিশা যায়…

কে তুমি ছড়িয়েছ জাল, সাগরের নুন কম্পিত কম্পিত

 

জোনাকিরা ঝাঁপ দেয় দূরে

অগ্নিযোনিমূলে

ঝাঁকে ঝাঁক, ঝাঁকে ঝাঁক…

 

জ্যোৎস্নাসখিরা অলৌকিক দ্বার খুলে দেয়, মাছেরাও দ্বিধার বসন…

 

মৃত কিশোরীর কাঁচের বাগানে বসে

শিখে নিই পাপের পঠন

 

আমিও অন্ধ জেনো

দৈবীভোরে হারিয়েছি পালাবার পথ

 

আফিম অথবা গন্ধমাদিনী

 

[এক]

একদিন জ্বর হবে

আমারও জ্বর হবে ডানা ভেঙে…

 

কালের ধুলায় রয়ে যাবে ছায়া ছায়া রোদরাঙাপরী

 

বিবর্ণ

অহ বৈতালিক!

ঐ দূরে নৃত্যরত অগ্নি সহচরে…

 

আর আমারে দিও না জন্মের দোহাই

 

আয়ুমূলে বন্ধক রাখি ভুল, বিষল্যকরণী

 

বন্ধু হে

এমন নির্ঘুম রাতে

ঘুমের ভেতরে কে তুমি হেটে যাও বেহুলা নগর…

 

[দুই]

 

তোমার শহরে পূর্ণিমা পাহারা দেই

আমি আর অন্ধকার পরষ্পর…

 

আদিম অভিযাত্রীরা রোদের উঠোনে পরান বিছিয়েছে

সাপের মগজে বেড়ে ওঠে হরিণের রূপ

 

ভ্রাতা সব দূরে যায়…

ভগ্নিরা পাঠ করে পাখির উড়াল।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. `সাপের মগজে বেড়ে ওঠে হরিণের রূপ’ —উপলব্ধ বাগানে দেখা মায়াবী হরিণ…

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close